NRC কি এথনিক ক্লিঞ্জিংয়ের সার্টিফিকেট হতে চলেছে?

 

 

৩০ জুলাই, আসামে  National Register of Citizenship (NRC)-র চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশিত হলো। তথ্য অনুযায়ী ৪০ লক্ষেরও বেশি মানুষের নাম এইখসড়ায় জায়গা পায়নি। এদের সিংহভাগটাই বাঙালী, যাদের বিরুদ্ধে অসমিয়া রাজনীতিকরা বহুদিন ধরেই অনুপ্রবেশকারীর অভিযোগ তুলছেন।সরকারীভাবে বলা হচ্ছে, যাদের নাম নেই, এরপরেও তাদের জন্য আবেদনের সুযোগ থাকছে। ডিসেম্বরে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এদেরকোনও সমস্যা নেই। এরপরেও ট্রাইবুনাল, হাইকোর্ট, সুপ্রিমকোর্টে যাবার সুযোগ থাকবে। অতএব ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। ৩০ জুলাই সংসদেকেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংও ঠিক এই কথাই বলেছেন। 

 

কথাগুলো শুনতে খুবই ভালো। যে কোনও নথিবন্ধির ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা থাকেই। আধার কার্ড কিংবা ভোটার তালিকায় এমন অসঙ্গতির কথা তো শোনাইযায়। তাহলে এত মাথা খারাপের কী আছে?  যারা এই নিয়ে বাঙালীবিরোধী চক্রান্তের কথা বলছেন, তারা কি আসলে একটু অকারণে হাওয়া গরম করতেচাইছেন না? এমনও কেউ কেউ বলছেন। 

 

মানুষ একটা ঘটনায় যতটা আশঙ্কিত হয়,  অভিজ্ঞতার পৌনঃপুনিকতায় তার মাত্রা ও বিস্তার আরো বাড়ে। ধরুন, আপনি শুনলেন একজনের জ্বর হয়েছে।সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার দায়ে আপনি চিন্তিত হয়ে পড়বেন, ডেঙ্গি হয়নি তো! এটাই হয়। আজ যারা আসামে NRCতে লক্ষলক্ষ বাঙালীর নাম বাদ যাওয়ানিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, তারা এই অভিজ্ঞতার জন্যই আলোড়িত হচ্ছেন। তাহলে আসুন, সেই অভিজ্ঞতাটাকে একটু ঝালিয়ে নেওয়া যাক। 

 

আসাম ও বাংলা

এই যে আসাম রাজ্য এটিকে অহোমও বলা হয়।  ১২২৮ সালে চীনের ইউনান প্রদেশের অন্তর্গত মং মাওয়ের রাজকুমার চাওলুং সুকাফা পাহাড় ডিঙিয়ে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় প্রবেশ করেন এবং প্রায় ছয়শো বছরব্যাপী  বিস্তৃত অহোম বংশের শাসনের সূচনা করেন। এখানে একটা প্রশ্ন করা যেতেই পারে, স্রেফ তর্কের খাতিরে। মধ্য ও পশ্চিম এশিয়া থেকে আগত তুর্ক, মোগল বা পাঠানদের বংশধরদের কেউ কেউ বহিরাগত বলে মনে করেন। তাহলে চীনা রাজার বংশধরদেরই বা তারা বহিরাগত বলবেন না কেন? আসলে এই প্রশ্নটার মধ্যেই বর্তমান প্রবণতার আসল উত্তর লুকিয়ে আছে, যা আমরা পরে আলোচনা করব।

মোগল সাম্রাজ্যও অহোম রাজ্যকে পদানত করতে পারেনি। ১৭৬৯ সালে অহোম রাজার বিরুদ্ধে মোয়ামোরিয়া বিদ্রোহের সূচনা হয়, যার ফলে অহোমরাজ্যের ক্ষমতা হ্রাস পায়। ১৮০৫ সালে বার্মার সামরিক আগ্রাসন হয় এবং অহোম রাজ্য বার্মার অন্তর্ভূক্ত হয়ে যায়। ১৮২৪ সালে শুরু হলো প্রথম ইঙ্গ-বার্মা যুদ্ধ। পরাজিত বার্মার রাজা ১৮২৬ সালে বৃটেনের সঙ্গে ইয়ানদাবোর চুক্তি করতে বাধ্য হন এবং ক্ষতিপূরণ হিসাবে মনিপুর ও আরাকান সহ গোটা অহোম রাজ্য বৃটেনের হাতে তুলে দেন।

এভাবেই আসাম ভারতের বৃটিশ এলাকার অন্তর্ভূক্ত হয়েছিল। প্রথম থেকেই আসামকে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মধ্যেই রাখা হয়। এই সময় থেকেই আসামে বাঙালীদের অভিবাসন শুরু হয়। মূলত প্রশাসনিক দায়িত্ব নিয়েই বাঙালীদের আসামে আগমন। এর পাশাপাশি স্কুলকলেজের শিক্ষক-অধ্যাপক ও চিকিৎসক হিসাবেও তারা আসামে চলে আসেন। ১৮২৩ সালেই আসামের জঙ্গলে রবার্ট ব্রুস চা গাছ আবিষ্কার করেন। ১৮২৮ সালে তার ভাই চার্লস আলেকসান্ডার আসামে প্রথম চা বাগানের পত্তন করেন। চা বাগানের সূত্রে আসামে নতুন করে বাঙালী ও আদিবাসীদের অভিবাসন ঘটে।  

   ১৮৭৪ সালে আসামকে একটি চিফ কমিশনারিয়েট হিসাবে ঘোষণা করা হয়। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন যখব বঙ্গভঙ্গ করেন, তখন আসামকে পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হয়। এই সময়ে মূলত পূর্ববঙ্গ থেকে প্রচুর বাঙালী আবার সামে চলে যান। ১৯১১ সালে দুই বঙ্গ একত্রিত হলো। আর আসামকে ঘোষণা করা হলো পৃথক প্রদেশ হিসাবে। ভারতে প্রথম সেনসাস হয়েছিল ১৯১১ সালে। সেই সময়ই আসামে তথাকথিত অভিবাসনের প্রশ্নটি উঠে এসেছিল সেনসান রিপোর্টে। এই রিপোর্টের Chapter III, Page NO 28, Clause No 37-এ প্রতি হাজারে অভিবাসীদের সংখ্যা বলা হলো এমনটি  –

 

 

From

Bengal –   220               

Bihar & Orissa       -       453   

Central Province –      109    

Madras –         39       

United Province      -    112       

Rajputana –         13              

Central India –      6

Rest of India –       10                

Outside of India – 58

_______________

Total -1000

 সূত্র – CENSUS of INDISA, 1911, Volume -III

তার মানে সেই ১৯১১ সালেই আসামে অভিবাসনের সমস্যা ছিল। তালিকা থেকেই পরিস্কার, অনুপাতে যথেষ্ট হলেও বাঙালীরা কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন না। বিহার ও উড়িষ্যা থেকে আসা মানুষদের তুলনায় বাঙালীদের অনুপাত ছিল অর্ধেকেরও কম। তাহলে যদি বহিরাগত নিয়েই সমস্যা থাকে, তাহলে তো বিহার ও উড়িষ্যা থেকে আগতদের বিরুদ্ধেও কথা উঠবে। ইতিহাস কিন্তু বলে আসামের রাজনীতিকরা শুধুমাত্র বাঙালী অভিবাসীদের বিরুদ্ধেই সোচ্চার ছিলেন এবং এখনো আছেন। তাহলে ইতিহাসটা একবার দেখেই নেওয়া যাক।

  • স্বাধীনতার আগেই ১৯৪৬ সালে আসামের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী গোপীনাথ বরদলৈ প্রকাশ্যেই বলেছিলেন বাঙালী অধ্যুষিত সিলেট পূর্ব পাকিস্তানেই চলে যাক।  

  • ১৯৪৭ সালের ৭ জুলাই সিলেটে গণভোট হলো। আসাম সরকার সুর্মা উপত্যকার চা বাগানের বাঙালী কর্মীদের ভোটের অধিকার দিলেন না। এরা প্রায় সকলেই ছিলেন হিন্দু। এর ফলে সিলেটের গণভোটের ফল যাতে পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে থাকে, সেই বন্দোবস্ত করে দেওয়া হলো। গণভোটের ফলে বাঙালী অধ্যুষিত বরাক উপত্যকা রয়ে গেল আসামে, যেখানে আবার ষাটের দশকে ঘটল বাংলা ভাষার অধিকারের দাবীতে আন্দোলন।

  • ১৯৪৮ সালে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় ঘটানো হলো প্রথম বঙ্গাল খেদা আন্দোলন ও বাঙালীবিরোধী দাঙ্গা।

  • ১৯৫৬য় রাজ্য পুনর্গঠন কমিশনের সদস্যরা আসামে এলেন। উপলক্ষ্য গোয়ালপাড়া জেলাকে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে কিনা। শুরু হলো বাঙ্গালীবিরোধী দাঙ্গা। শুধু গোয়ালপাড়া জেলাতেই ২৫০র মতো বাংলামাধ্যম স্কুলকে রাতারাতি অসমিয়ামাধ্যমে রূপান্তরিত করা হলো।

  • ১৯৬০ সালে আবার ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় ঘটানো হলো বাঙালীবিরোধী দাঙ্গা। গৌহাটীর জেলাশাসক এবং পুলিশের ডি অ্যাই জি বাঙ্গালী হবার কারণে প্রকাশ্যে ছুরিকাহত হলেন। গৌহাটী বিশ্ববিদ্যালয়, ডিব্রুগড় মেডিকেল কলেজ ও আসাম মেডিকেল কলেজ থেকে সমস্ত বাঙালী ছাত্র বহিষ্কৃত হলেন। ৫ লক্ষের উপর বাঙালী ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা ছেড়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হলেন পশ্চিমবঙ্গে। এদের মধ্যে রবি বসুর মতো আসমিয়া ভাষায় শিশু ও কিশোর সাহিত্যের সূচনাকারীও ছিলেন।

  • ১৯৭২-৭৩ সালে আবার দাঙ্গার ফলে আবার ১৪,০০০ বাঙালী পালিয়ে আসতে বাধ্য হলেন পশ্চিমবঙ্গে। কেউ কেউ ত্রিপুরা ও মেঘালয়েও আশ্রয় নিলেন।

  • ১৯৭৯-৮০তে আবার ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় একই কাণ্ড ঘটানো হলো। এর পাশাপাশি মেঘালয়ে যেসব বাঙালী আস্তানা গেড়েছিলেন, তাদের উপরও আক্রমণ করা হলো। ২৫০০০ বঙালীকে বাধ্য করা হলো মেঘালয় ও আসাম থেকে পালিয়ে আসতে।

  • ১৯৮৩ সালে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় আবার শুরু হলো বঙ্গাল খেদা আক্রমণ। ১৮ ফেব্রুয়ারি নওগাঁ জেলার ১৪টি গ্রামে মাত্র ৬ ঘন্টার অপারেশনে খুন করা হলো বাঙালীদের। সরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা ২১৯১, আর বেসরকারি মতে ১০,০০০এর বেশি। ঘটনার পর্যালোচনা করে হর্ষ মান্দার লিখেছিলেন, নিহত বাঙালী মুসলমানদের সকলেরই পূর্বপুরুষ বৃটিশ আমলেই ঐ অঞ্চলে বসবাস শুরু করেন। নেল্লি গণহত্যা স্বাধীনতার পরে ভারতবর্ষের সবথেকে বড় গণহত্যা। অথচ ১৯৮৪ সালে তেওয়ারি কমিশন তার ৬০০ পাতার রিপোর্ট আসাম সরকারের হাতে তুলে দিলেও অদ্যাবধি সেটি প্রকাশ করা হয়নি। একজনেরও বিচার হয়নি।

 

এই পরিপ্রেক্ষিতি মাথায় রেখেই আসামের বর্তমান পরিস্থিতিকে যদি আমরা বিচার না করি, তাহলে মহা ভুল করব।

(ক্রমশ)      

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com