আফসার আহমেদ : নিম্নবর্গ ও মুসলমান সমাজের শক্তিশালী রূপকার

 

 

সময়টা সম্ভবত ১৯৮০। দিল্লিতে আফ্রো-এশিয়ান ইয়ং প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোশিয়েসনের একটা সম্মেলন হচ্ছে। কলকাতা থেকে পাঁচজনকে প্রতিনিধি করে পাঠিয়েছিলেন কথসাহিত্যিক সৌরী ঘটক। কবি অপূর্ব কর, আফসার আহমেদ, কেশব দাস, আমি আর একজন (মনে পড়ছে না নামটা) গিয়েছি। আফসারের 'ঘরগেরস্তি' উপন্যাস সেবারই 'শারদীয় কালান্তর'এ প্রকাশিত হয়েছে। চমকে দিয়েছে আমাদের। উদ্যোক্তা ভীষম সাহানি। বিজ্ঞান ভবনে উদ্বোধনে রাষ্ট্রপতি আসবেন। আমরা ঢুকতে যাব, বডি সার্চিং হচ্ছে। চারজন পাস করলাম, আটকে গেলেন অপূর্ব কর। তার কোমরে যন্ত্র ছোঁয়ালেই ট্যাক ট্যাক প্যাক প্যাক আওয়াজ করছে। একে একে বস্ত্র উন্মোচন। এক বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার। আমরাও উদ্বিগ্ন। না জানি কোমরে লুকিয়ে ছোরা টোরা এনেছে কিনা! শেষে দেখা গেল,  একটি মাদুলি। তাই দেখে হো হো করে হেসে উঠেছিল অত্যন্ত মৃদুহাসির সাহিত্যিক আফসার। তার পর দু দিন অপূর্ব দার শান্তি ছিলনা রসিক আফসারের চিমটিতে। 

 

   সেই আফসার চলে গেল! অবিশ্বাস্য! ফেস বুকে জালালদার পোস্টে জানলাম, বিকেলে চলে গেছে, এস এস কে এমে, একা অভিমানে। লিভারের সমস্যাই নাকি কারণ। 'ঘরগেরস্তি' ছেড়ে সত্যিই নিখোঁজ হল মানুষটা।

 

   গ্রাম থেকে উঠে আসা তরুণ সংখ্যালঘু সাহিত্যিকদের মধ্যে অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল আফসার। যে জীবন আমাদের অচেনা, তাকে শিল্পীত মননে প্রকাশ করে গেছে নিয়ত। বয়সে আমার চেয়ে সামান্য ছোট হলেও সমবয়সী বন্ধু ছিলাম। দীর্ঘদিন রোজগারের সমস্যা, চাকরির স্থায়ীকরণের সমস্যা তাকে সাহিত্যের থেকে দূরে সরাতে পারেনি। 

 

   আমার সঙ্গে আলাপ সেই 'পরিচয়' আর 'কালান্তর' পত্রিকার মাধ্যমে। কেশব দা আর আমি তো কালান্তরেই ছিলাম। পরে আফসারের সঙ্গে দেখা হতো বাংলা আকাদেমি চত্বরে। অনেকেই ওকে কাছে পেতে চাইতো, তার মাঝে অল্পবিস্তর কথাই হতে পারতো। 

 

   ১৯৭৮ সালে ‘‌পরিচয়’‌ পত্রিকায় বাঙালি মুসলমানের বিয়ের গান’‌ নামে একটি লেখা নিয়ে প্রথম এসেছিল‘‌। এই লেখা থেকেই রত্ন চিনে নে পরিচয় সম্পাদক জহুরী দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। লেখাটি পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন দেবেশ রায়, অমলেন্দু চক্রবর্তী। অমিতাভ দাশগুপ্ত তাকে নিয়ে এলেন কালান্তর-এ। সেখানে তেতলার ক্যান্টিনে লাল চা আর রুটি তরকারি খেতে খেতে কত আড্ডাই না হয়েছে। 

 

   দেবেশ রায় তখন প্রতিক্ষণ এর সম্পাদক। তিনি টেনে নিয়ে এলেন আফসারকে সেখানে। কয়েক বছর কাজও করল। জীবনানন্দ দাশের রচনাবলি খণ্ডে খণ্ডে সম্পাদনা করেন দেবেশ রায়। আফসারের ওপর ভার পড়েছিল জাতীয় গ্রন্থাগার থেকে জীবনানন্দ-র যাবতীয় লেখা কপি করে নিয়ে আসার। এই কাজটা তাঁর কাছে ছিল একটা বড় অভিজ্ঞতা। তারপর আবার ছোট কাগজে লেখা আর 'যেখানে যা পাই' পেশা। 

 

   গত বছর এই মানুষটা সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পেল ‘সেই নিখোঁজ মানুষটা’ উপন্যাসের জন্য। এই স্বীকৃতি ওর অনেক আগেই পাওয়া উচিত ছিল।  ২০১০ সালে একটি লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত 'সেই নিখোঁজ মানুষটা উপন্যা বই হয়ে বেরোয় ২০১-র বইমেলায়। একে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানষ, তায় বাগনানের মতো দূর গ্রামের ছেলে। হয়তো একারণেই শুরুত অল্প কিছু মননশীল পাঠকেরসাড়া পেয়েছিল। সেই উপন্যাসই আফসারকে সাহিত্য আকাদেমি এনে দিলে বহু পাঠকের স্বীকৃত পেল। নিজেও তৃপ্তি পেয়েছিল সাহিত্যের ক্ষেত্রে আপোসহীন আফসার। বলেছিল, "মাথা পেতে এই পুরস্কার গ্রহণ করছি। অনেক পরিশ্রমের স্বীকৃতি পেলাম সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার-এ। এই পুরস্কার আমার পাঠকদের প্রাপ্য।"

 

   তবে প্রকৃত অর্থে এটি ছিল তাঁর দ্বিতীয় সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার। প্রথমটি পেয়েছিল ২০০০ সালে, উর্দু কবি কলিম হাজিখের সঙ্গে যৌথভাবে উর্দু উপন্যাস অনুবাদের জন্য। আরেকটি পুরস্কার পেয়েছেন মৃণাল সেনের 'আমার ভুবন' চলচ্চিত্র দর্শকদের থেকে। তাঁর বনজ্যোৎস্না উপন্যাসই মৃণাল সেনের আমার ভুবন।

 

   বাঙালি মুসলমান সমাজের অন্তঃপুরের কথা বের করে নিয়ে আসতো আফসার, যার অর্থ সূর্য, যে অন্ধকার সরিয়ে প্রকাশ ঘটায়। এই উপন্যাসের পর সে আরও খ্যাতিমান হয়। বইপাড়ায় বাঁধাই ও অন্য কর্মীদের একদিন প্রতিদিনের দুঃখচরি লিখেছে ‘‌খণ্ড বিখণ্ড’‌ উপন্যাসে।

 

   হাওড়া জেলার বাগনান থানার বাইনান কড়িয়া গ্রামে ১৯৫৯-এর ৫ এপ্রিল তার জন্ম। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা সাহিত্যের স্নাতকোত্তর। পরে বাংলা অ্যাকাডেমিতে যুক্ত হন। মূলতঃ কথাসাহিত্যিক গল্প ও উপন্যাসে সমান দক্ষতা ছিল। প্রবন্ধ ও অনুবাদ কর্মেও ছিলেন সচ্ছল। ৩ খানি গল্পগ্রন্থ, ২২ টি উপন্যাস, প্রবন্ধ ও অনুবাদ গ্রন্থ ছিল বেশ কয়েকটি। নব স্বাক্ষর বয়স্কদের জন্য ও তিনি বই লিখেছেন।

 

   সাহিত্য অ্যাকাডেমি ছাড়াও সোপান পুরস্কার, নিখিল ভারত বঙ্গসাহিত্য পুরস্কার সহ রাজ্য স্তরের একাধিক সাহিত্য সন্মানে সন্মানিত হয়েছিলেন। উল্লেখযোগ্য রচনা দ্বিতীয় বিবি, প্রেমপত্র, ধানজোৎস্না ও ব্যাথা খুজে আনা,  হত্যার প্রমোদ জানি ইত্যাদি। তিনি ২০০৮ সালে নতুন গতি সাহিত্য পুরস্কার পান। 

 

   কিসসা লেখায় মাহির ছিল আফসার। বিবির মিথ্যা তালাক, মেটিয়াব্রুজের কিসসা, হিরে ও ভিখারিনী সুন্দরী রমণী কিসসা, এক আশ্চর্য বশীকরণ কিসসা, ‌তালাকের বিবি ও ‌হলুদ পাখির কিস্‌সা’ তার স্বাক্ষ্য বহন করছে।

অমর মিত্র বলেছেন, এই কিস্‌সা সিরিজ বাংলা উপন্যাসে একটি আধুনিক যাত্রাপথ, যা আফসারই খুঁজে বের করেছে। প্রচলিত লোককাহিনী, কিংবদন্তি, নানারকম কিস্‌সা— এগুলোকে অসম্ভব ভালভাবে ব্যবহার করেছে। তার কিসসা পড়ে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ অমর মিত্রকে বলেছিলেন, আফসার আমেদ এক উদার মানবিক লেখক এবং নিম্নবর্গের মানুষ, মুসলমান সমাজের অসামান্য রূপকার।‌

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com