ভয়তাড়িত সমাজ (প্রথম পর্ব)

‘কার্য-কারণ সম্বন্ধ’ আবিষ্কারই মানব প্রজাতিকে চিন্তাশীল জীব হিসাবে বিকশিত করে চলেছে... নানান অভিধায় সে ভূষিত— অধ্যাত্ম উপলব্ধিকারী জীব, সামাজিক জীব, রাজনৈতিক জীব, নৈতিক জীব, অর্থশিকারি-ইত্যাদি... এবং তা-ই তাকে ক্রম-ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে ‘নৈতিক জীব’ হিসাবে মানুষের ‘অবক্ষয়’ শুরু হয়ে গেছে। তাছাড়া দু’-দুজন বিজ্ঞানী, আলবার্ট আইনস্টাইন ও স্টিফেন হকিং, যে আশঙ্কা প্রকাশ করে গেছেন, তারই যেন লক্ষণ কমবেশি দেখা যাচ্ছে প্রকৃতি ও স্বকৃতির সর্বত্র। মানুষের এমন আত্মধ্বংসী আচরণ এর আগে বোধহয় দেখা যায়নি।

 

   পরিবেশবিদ্যার ছাত্র, পরিবেশ আন্দোলনের কর্মী বা গণতন্ত্র-মানবাধিকার নিয়ে যারা আন্দোলন-রাজনীতি করছেন, তাঁরা এই ‘অবক্ষয়’কে রুখতে চাইছেন, সন্দেহ নেই তবু আশঙ্কা ঘনীভূত প্রতিমুহূর্তে। ‘অবক্ষয়’ই যেন স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে উঠেছে— এই মনে হওয়াটাতেও যেন কোনও সংশয় থাকছে না। যেমন, রাজনৈতিক জীব হিসাবে আমাদের আকাঙ্ক্ষা গণতন্ত্র, সরকার বদল করলে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে আসবে, এমনটা মনে করে যখন কোনও রাজনৈতিক দলকে সমর্থন দিই, সরকার পরিবর্তন হয় কখনও কখনও, কিন্তু গণতন্ত্রের তেমন স্ফূর্তি দেখা যায় না— বিশেষ করে উত্তর ঔপনিবেশিক ভারতে এর ব্যত্যয় ঘটেছে, এমন তথ্য আমাদের হাতে নেই। বরং সরকারি স্তরে সংগঠিত দুর্নীতির ইতিহাস ও ‘রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন’-এর ঘটনাগুলি গণতন্ত্র সম্বন্ধে আমাদের হতাশ করেছে। কেবল তা-ই নয়, আমরা ভীত-সন্ত্রস্ত— যে কোনও সময়ে আমরা ‘আত্মধ্বংসে’র কবলে পড়তে পারি।

‘আত্মধ্বংসী আচরণ’— এর কোনও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ না করে খবরের কাগজ বা নিউজ চ্যানেল থেকে আমরা  যে যার মতো খবর সংগ্রহ করে নিতে পারি যা আমাদের ‘অস্তিত্ব’কে নানাভাবে ‘থ্রেট’ করে চলেছে। খবর  মানে ‘ঘটনা’। আর আমরা এটাও জানি যে, ঘটনা হল কার্য-কারণ সম্বন্ধের পরিণাম। এবং যে ঘটনা ‘খবর’ হয় তার সঙ্গে মানুষের সংযোগ থাকা বা গড়ে-ওঠা (প্রত্যক্ষ-পরোক্ষে) স্বাভাবিক। অন্তত খবরের কাগজের পাঠক বা নিউজ চ্যানেলের দর্শক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে কোনও ঘটনার সঙ্গে আমাদের সংযোগ তৈরি হয়ে যায়, তৈরি হতে পারে।

অর্থাৎ ‘আত্মধ্বংসী আচরণ’ মানে এক বা একাধিক সামাজিক মানুষের জীবনে ঘটা ‘ঘটনা’! অতএব, তার একটি ‘সাংস্কৃতিক রূপ’ থাকবে এবং ওই সংস্কৃতি গড়ে-ওঠার ‘কারণ’ অবশ্যই ছিল বা আছে! নইলে ‘ঘটনা’ ঘটত না। তাহলে এখানে অনিবার্য প্রশ্ন, কী সেই ‘কারণ-শক্তি’ যা প্রযুক্ত হয়ে(‘কার’ও দ্বারা) ‘আত্মধ্বংসী কার্য’ সৃষ্টি করেছে? হুমকির মুখে(কেউ দিয়েছে)পড়া ‘অস্তিত্ব’কে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য ওই ‘কারণ-শক্তি’কে জানার বিষয় করতে হবে। এটা আমাদের সময়ের দাবি। সময় মানে সংস্কৃতি-প্রবাহ। যাকে আন্দোলিত করে রাজনীতি(< অর্থনীতি)।  

তাহলে, আরও স্পষ্টীকরণের জন্য এই কথা কি বলা সংগত হবে যে, ‘আমাদের বেঁচে থাকার সংস্কৃতি’ ‘আত্মধ্বংসী সংস্কৃতি’ দ্বারা আক্রান্ত?

 

   অসংগত হবে না, যদি আমরা স্বীকার করে নিই যে, দুটি পক্ষ হিসাবে ‘আমরা’(আক্রান্ত-আক্রামক) একই স্থান ও কালের মধ্যে অবস্থান করছে।

 

   শ্রেণী-বর্ণ বিভক্ত সমাজের সদস্য হিসাবে আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে, আক্রামক ও আক্রান্ত ভিন্ন স্থান-কালে অবস্থান করতে পারে না।

 

   অর্থাৎ সামাজিক পরিসরে ওই ‘কারণ-শক্তি’ রয়েছে— এটা স্বীকার করে তা জানার প্রয়াস চালাতে হবে।

 

দুই

 

   আলোচনা যেভাবে শুরু হয়েছে, তার অব্যবহিত পূর্বচিন্তা যা থেকে এই আলোচনার সূত্রপাত তার উল্লেখ জরুরী। অবশ্য ব্যাপারটা আমাদের সকলেরই জানা— এক, নারীসত্তার সঙ্গে সামাজিক সম্বন্ধ থাকার জন্য  ‘ধর্ষণ’-এর নিরিখে আমাদের ‘সম্পর্ক’ বিপন্ন; দুই, শাসকের ‘অসাংবিধানিক রাজনীতি’র দরুণ আমাদের  অর্থনৈতিক কার্যকলাপ, রাজনৈতিক পরিচয় ইত্যাদি গণতন্ত্রের নিরিখে সংকটাপন্ন; তিন, সশস্ত্র ধর্ম-রাজনীতি, অসংসদীয় আমাদের হিংসাশ্রয়ী আবেগকে উদ্দীপিত করছে, ‘মনুষ্যত্ব’কে ধ্বংস করে দিচ্ছে— এই বিষয়গুলি পৃথক-পৃথকভাবে আলোচিত হচ্ছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ‘হিংসা’র পক্ষে যুক্তি সাজানো হয়, বিশেষ করে খবরের কাগজ, টিভি চ্যানেল ইত্যাদিতে; ঐতিহাসিক কারণে খুব একটা অস্বাভাবিক মনে হয় না; ‘বলরাম’-এর অনুগামীরা হিংসার বিরুদ্ধে বলেন বটে কিন্তু কাউকে বলতে শোনা গেল না যে, এগুলোর অভিন্ন এক ‘কারণ’ আছে! যেমন বলেছিলেন বুদ্ধ, জরা-ব্যাধি-মৃত্যুর কারণ হল ‘জন্ম’। বিতর্ক সরিয়ে রেখে ‘জন্ম’কে যেন ‘মহাকারণ’-ই মনে হয়। তেমন— উক্ত তিনটি বিষয়ের কোনও সধারণ মহাকারণ আছে— এটা আমাদের মনে হওয়া এবং ‘বুদ্ধিজীবী’দের কাছ থেকে তা্র হদিশ পাওয়া যেতে পারে— এই ভাবনা-সূত্রে ‘কার্য-কারণ’ যে মানুষের এক মহৎ আবিষ্কার— এটা আমরা প্রথম উপলব্ধি করি এবং কোনও প্রস্তুতি ছাড়াই শুরু হয়েছে আমাদের কথা।

অতএব, বলা যায় ‘কার্য-কারণ-সূত্র’ মেনে এই আলোচনা হিংসা-অহিংসার ‘মহাকারণ’ অনুসন্ধানে ব্রতী থাকবে।

যে কোনও সামাজিক ঘটনা কার্য-কারণ সম্পর্কের পরিণাম তা হলে প্রথমে জানতে হবে, সমাজ-গঠন কার্যে কোন ‘কারণ-শক্তি’ সক্রিয় ছিল। অর্থাৎ সমাজ-উৎপত্তি (অরিজিন অফ সোসাইটি)-র কারণ কী। এই বিষয়ে যথেষ্ট আলোচনা সমাজতাত্ত্বিকেরা করেছেন, বিশেষ করে পাশ্চাত্যের সমাজদর্শন— প্লেটো, অ্যারিস্টটল, এপিকিউরাস থেকে ম্যাকিয়াভেলি, টমাস হবস, রুশো, মার্ক্স-এঙ্গেলস— এঁদের রচনার মধ্য থেকে ওই কারণ খুঁজে নেওয়া যেতে পারে। এমনকি ‘আত্মধ্বংসে’র কারণও হবসের চিন্তাপাঠ থেকে আমরা চয়ন করে নিতে পারি(a war of every man against every man)। কিন্তু প্লেটোর চিন্তা অনুসরণে ‘সুখী ন্যায়পরায়ণ’ সমাজের যে চিন্তা বিকশিত হয়ে মার্ক্সের ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ নির্মাণসম্ভব হয়ে উঠল উনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে... বিশ শতকের প্রথম থেকে যার ক্রম নির্মিতি ও শেষের দিকে তার ভেঙে পড়া(নির্মীয়মাণ বাড়ির ভেঙে পড়ার সঙ্গে তুলনা চলতে পারে)— এসবের কার্য-কারণ ব্যাখ্যায় ‘মহাকারণ’ হিসাবে ধরা হয়েছে সেই ‘ধনতন্ত্র’কে— ধনতন্ত্র-বিশ্লেষণ করেই ‘সমাজতন্ত্র’কে অ্যান্টিথিসিস রূপে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন মার্ক্স— এসবই ঘটেছে ‘যুদ্ধের কারণ’ মেনে। এমনকি, আজও সেই ‘কারণ’ ভ্যালিড হয়ে আছে। অর্থাৎ আমরা বলতে চাইছি, সমাজের ‘উৎপত্তি-কারণ’ হিসাবে প্রচলিত তত্ত্বগুলিতে সুখ ও ন্যায় তত্ত্ব হিসাবে মর্যাদা পায়নি। যদিও যুদ্ধকে ‘ন্যায়’ হিসাবে প্রতিষ্ঠা দেওয়া হয়েছে। সুখ ও ন্যায়— এই বিষয় দুটি আমাদের বিচারে তত্ত্বের বিষয়, একই সঙ্গে তা প্রাকৃতিক ও স্বকৃতিগত(মানবীয়)। প্রসঙ্গত, আমরা মনে রাখব যে, যে কোনও তত্ত্বই binary অর্থাৎ যে কোনও তত্ত্ব দুটি পরস্পর বিপরীত ধারণাকে ধারণ করে। অতএব, একথা বলতে আমাদের কোনও দ্বিধা নেই যে, প্রচলিত সমাজতত্ত্বের মধ্য থেকে সমাজ-গঠনের যে-‘কারণ-শক্তি’ পাওয়া যাবে তার অন্তরালে অবশ্যই আর-একটি ‘কারণ-শক্তি’ বিদ্যমান থাকবে। এর অর্থ ‘কারণ-শক্তি’ দ্বিমূল বিশিষ্ট। আমাদের বিশেষ আগ্রহ থাকবে অন্তরালের প্রতি। বাইরের ‘প্রকাশ’কেও আমরা গুরুত্ব দেব।

 

   দু’ভাবে এই কাজটা করা যেতে পারে। ‘সমাজ’-এর অর্থ-তাৎপর্যের নিরিখে, এক; দুই, ‘আত্মধ্বংস’ ঘটিয়েছে বা ঘটাতে পারে, এমন কোনও ঘটনাকে ‘স্টাডি’ করে।  

 

  প্রথমে আমরা ‘সমাজ’কে আলোচনার বিষয় করব। সংহতি, সমিতি, সম্প্রদায় ইত্যাদি বোঝাতে ‘সমাজ’ শব্দের ব্যবহার সর্বজন বিদিত। শদটির ইংরাজি প্রতিশব্দ society-র প্রথম অর্থ companionship, সঙ্গ, সংসর্গ; প্রায় সংজ্ঞার মতো করে বলা হয় : ‘পরস্পর নির্ভরশীল এক জায়গায় বসবাসকারী মানবগোষ্ঠী’(বিদ্যার্থী বাংলা অভিধান, ২য় সংশোধিত মুদ্রণ); বাঙ্গালা ভাষার অভিধান-এ অবশ্য একাধিক ‘সংজ্ঞা’ রয়েছে :  ‘পশ্বাদি জাতি ভিন্ন মনুষ্যাদি শ্রেষ্ঠ জীববৃন্দের সংহতিকেই সমাজ বলে, এবং পশুদের সমূহকে সমজ বলে, উৎকৃষ্ট জীবগণের সম প্রয়োজন বা সমানার্থ সিদ্ধির নিমিত্ত একীভূত ভাবের নামই সমাজ ’   

 

   লক্ষণীয় বিষয়, এর মধ্যে কোথাও ‘যুদ্ধ’-এর আভাসমাত্র নেই। বরং ‘সংহতি’, ‘সম প্রয়োজন বা সমানার্থ’— এই কথাগুলির মধ্যে সাম্যের প্রস্তাবনা আছে। আর সমজ > সমাজ; অর্থাৎ পশুসমাজ থেকে মনুষ্যসমাজ— এর অর্থ, পশুজগৎ থেকে মানুষের উৎপত্তি— এই বাক্যটিকে যদি তত্ত্ব হিসাবে ধরা হয় তাহলে মানুষের মধ্যে পশুপ্রকৃতি আছে, এটা একটা স্বতসিদ্ধ ব্যাপা্র— ধরে নিতে পারি; সেক্ষেত্রে সমাজ-গঠনের ‘কারণ-শক্তি’ ওই পশুপ্রকৃতির মধ্যে খোঁজ করা যাবে। কিন্তু তার আগে— বাক্যটি ‘তত্ত্ব’ কি না অর্থাৎ তার মধ্যে পরস্পর বিপরীত ধারণা নিহিত আছে কি না, এবিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে— বাক্যটির মধ্যে উদ্ভাসিত হয়ে আছে ‘মানুষের উৎপত্তি’— এর বিপরীত ধারণা হল ‘মানুষের নিষ্পত্তি’— এই নিষ্পত্তির ‘কারণ’-উৎস কি পশুজগৎ হতে পারে? এর উত্তরে বলা যায় যে, ‘জৈব বিবর্তন’(evolution)-তত্ত্ব অনুসারে পশুজগৎ থেকে ‘মানুষের উৎপত্তি’— এটা সত্য। এবং চার্লস ডারউইন বিবর্তন বা অভিব্যক্তির যে ‘গতিসূত্র’ আবিষ্কার করেছেন তার উৎস রয়েছে প্রকৃতির ‘খাদ্য-খাদক’ নিয়মের মধ্যে; এই নিয়ম বহু প্রজাতির বিনাশ ঘটিয়েছে। প্রকৃতির অংশ মানুষ এই নিয়মের অধীন— পশুজগতের সঙ্গে তার সম্পর্ক ‘খাদ্য-খাদকে’র। অতএব, পশুজগৎ মানুষের নিষ্পত্তির কারণ-উৎস হতে পারে।

 

   এর অর্থ, ‘পশুজগৎ থেকে মানুষের উৎপত্তি’— একে ‘তত্ত্ব’ হিসাবে কোনও সংশয় না রেখেই আমরা গ্রহণ করতে পারি। পশুজগতে বেঁচে থাকার নিয়ম যেমনটা ডারউইন আবিষ্কার করেছেন, আমাদের মানবীয় দৃষ্টিতে— এক কথায় তা ‘রক্তাক্ত’ নিয়ম— সহৃদয় পাঠক নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন, অভিব্যক্তির গতিসূত্রে ‘আধুনিক মানব’(homo sapiens sapiens)উদাহরণ হিসাবে আসেনি। না আসাই স্বভাবিক। তবে জীব হিসাবে তার সমস্ত বৈশিষ্ট্য নিয়ে মানব সেখানে অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু পশুজগৎ থেকে সে যে বিচ্ছিন্ন হয়েছে, এবিষয়ে কোনও আভাস নেই জৈব অভিব্যক্তিবাদে। আমাদের অনুমান, এই বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণের মধ্যেই নিহিত রয়েছে ‘সমজ’ থেকে ‘সমাজ’-গঠনের ‘কারণ-শক্তি’। এবং সমজ-পর্বেই ‘কার্য-কারণ’-এর আবিষ্কার ঘটেছিল যা থেকে ‘প্রাকৃতিক বিধি’কে নিয়ন্ত্রণ করেত শিখেছিল জীবজগৎ। এর স্বপক্ষে নানান ‘তথ্য’ জৈব বিবর্তনের ইতিহাস থেকে পাওয়া যাবে। খুব পরিচিত উদাহরণ, পাখি-পিপড়ের বাসা, বিশেষ করে বাবুই পাখি; আমরা ‘মৌমাছি’দের বাসার কথাও ভাবতে পারি।

 

   এই সূত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ‘ঘটনার কার্য-কারণ’ সম্বন্ধ— একটি প্রাকৃতিক নিয়ম।  প্রকৃতির অংশ হিসাবে প্রত্যেক জীবপ্রজাতি তাদের মতো করে এই সম্বন্ধ প্রকৃতিগতভাবেই (instinctively) ‘জানে’। মানবপ্রজাতি এই নিয়মকে আবিষ্কার করে চলেছে ও তার মতো করে বেঁচে থাকা বাঁচিয়ে রাখার পক্ষে সে ‘ঘটনা’কে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছে। এই তত্ত্বটি মনে রাখলে, মানুষের বৈশিষ্ট্য সূচক এই কথাটি, ‘a war of every man  against every man’ পশুজগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া মানুষের ক্ষেত্রে সযত্নে প্রয়োগ করা হয়নি বলে মনে হবে। কারণ war-এর বিপরীত শব্দ peace, কার্য-কারণসূত্রে ততদিনে শব্দটির আবিষ্কার হয়ে গেছে এবং আলোচনাতেও এসেছে।

 

  তা সত্ত্বেও তাত্ত্বিকদের এদিকে যথেষ্ট নজর পড়েনি। অথবা এই প্রশ্ন ওঠেনি, সমাজ বিকাশের চালিকা শক্তি যুদ্ধ— এই তত্ত্বকে কেন মান্যতা দিতে হবে?

মানুষের সামাজিক অস্তিত্বের অবস্থাই তার চিন্তাকে গঠন ও নিয়ন্ত্রণ করে— এরকম একটা কথা তত্ত্ব হিসাবে সুবিদিত। অর্থাৎ ব্যক্তিমানুষের বেঁচে থাকা ও বাঁচিয়ে রাখার ‘পরিবেশ’-ই তাকে চিন্তা করায়। একজন তাত্ত্বিক এর বাইরে থাকতে পারেন না। বিশেষ করে তাত্ত্বিকবর্গ সমাজের সুবিধাজনক অবস্থানে থাকেন, তাঁদের সুবিধা ভোগের ভিত্তিতে রয়েছে ‘যুদ্ধ’; যুদ্ধকে মান্যতা দেওয়ার একটা নৈতিক দায় থেকে তাত্ত্বিকের এই পক্ষপাত(প্রকৃতিগত কারণে)স্বাভাবিক। আর দ্বিতীয় প্রশ্নের ক্ষেত্রে আমরা বলব, সমজ-বিকাশের নিয়মের ‘ব্রেক’ থেকে সমাজ-বিকাশের আরম্ভ কিন্তু সমাজভুক্ত মানুষকেও বেঁচে থাকার ‘প্রাক্টিস’-এ ডারউইনের সূত্র মনে রাখতে হয়েছে... ওই সূত্ররই সংগঠিত রূপ যুদ্ধ... হ্যাঁ, যুদ্ধের মধ্যে বাস করছি... এর বিরুদ্ধে যে কথা বলা হয়নি, তা নয়— মহাভারতে যুদ্ধের বিরুদ্ধে বহু কথা আছে... দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুদ্ধবাজেরাই ঘোষণা করেছিল তাদের  ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আর যুদ্ধের বীভৎসতা প্রত্যক্ষ করতে হবে না... তবু তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে— এক সময়ের ‘তৃতীয় বিশ্বের দেশ’গুলিতে আজ তার বীভৎস রূপ দেখা যাচ্ছে।  

 

   কিন্তু টমাস হবস একটি ল্যাটিন ফ্রে’জকে তত্ত্ব হিসাবে ব্যবহার করার প্রায় ২০০ বছর পর কার্ল মার্ক্স সমাজবিকাশের যে তত্ত্ব দিলেন (শ্রেণীসংগ্রাম) তাকেও কিন্তু সেই ফ্রে’জ দিয়ে প্রকাশ করা যায় :  a war of every society against every society. এবং ডারউইনের তত্ত্ব-আলোকে তা যুক্তিগ্রাহ্যও বটে! আমাদের অনেকেরই মনে পড়বে, ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইস্তাহার’-এর ভূমিকায়(ইংরাজি সংস্করণ, ১৮৮৮) খুব স্পষ্টভাবে এই কথাটি বলেছিলেন যে, ‘ডারউইনের তত্ত্ব জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যা করেছে, আমার মতে এই প্রতিজ্ঞা ইতিহাসের বেলায় তাই করতে বাধ্য।’

 

  কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, জৈব অভিব্যক্তির মূলে রয়েছে প্রকৃতির ‘খাদ্য-খাদক’ সম্পর্ক ও ‘প্রতিলিপি সৃষ্টি’র প্রবৃ্ত্তি। ডারউইনের তত্ত্ব মন-নিরপেক্ষ কিন্তু জৈব অভিব্যক্তির শেষ ধাপে থাকা মানুষের সমাজ অভিব্যক্ত হওয়ার মূলে আছে মানুষের মন। এর তাৎপর্য হল সামাজিক ঘটনার কার্য-কারণে মিশে আছে যে মনন, তা প্রাকৃতিক নয়।

 

   তাহলে উক্ত ফ্রে’জটির অনুকরণে আমরা এ কথা বলতে পারি যে, a peace of every man with every man!

এটা পূর্ব কথিত বা অ্যাপ্লায়েড, আমরা উল্লেখ করলাম মাত্র। এটা তত্ত্বের মধ্যেই ছিল— তত্ত্বের নিয়মে এই থাকাটা অনিবার্য।

 

   এবং এই সূত্রে এটা বলা যায় যে, সমজ থেকে সমাজ-গঠন কার্যের প্রারম্ভে জৈবসত্তায় নিহিত ‘কারণ-শক্তি’ ছিল শান্তি [ব্যুৎপত্তিগত সকল অর্থে, মানবীয় (> মানবিক)] ও যুদ্ধ (ডারউইনীয় struggle-অর্থে, পাশবিক)।

তিন

 

   মানুষের শ্রেণীসংগ্রাম ও জীবের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম— দুটিই  তত্ত্বায়িত হয়েছে উনিশ শতকে। প্রকাশ হয়েছে যথাক্রমে ১৮৪৮ ও ১৮৫৯ সালে কমিউনিস্ট পার্টির ইস্তাহার ও প্রাকৃতিক নির্বাচনবাদ জীবের উৎপত্তি (Origin of the Species) নামে। আজকের ভাষায় ইউরোপের দেশগুলির তখন পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ ও সাম্রাজ্য বিস্তারের যুগ; একই সঙ্গে তা উপনিবেশগুলির পরাধীন হওয়ার ইতিহাসও বটে— সামগ্রিক এই প্রেক্ষাপটে তত্ত্বগুলির নির্মাণ। কিন্তু ব্যক্তির উদ্বর্তনের ক্ষেত্রে ‘আত্মধ্বংস’ কোনও পদ্ধতি হতে পারে, এমন আভাস আমাদের চোখে পড়েনি। তৎসত্ত্বেও শ্রেণীসংগ্রামের তত্ত্ব— সমাজবিজ্ঞান সম্মত নয়, এমনটা বলা যাচ্ছে না। বরং ব্যক্তিগত সম্পদ কম-বেশি থাকা না-থাকার নিরিখে এক-একটি শ্রেণীকে ‘স্পিসেস’ ধরলে, ডারউইনের অভিব্যক্তির সূত্রকে সমাজ বিবর্তনের ক্ষেত্রেও যেন মিলিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু তা যে মেলে না, সম্পদ না-থাকা ব্যক্তিমানুষ সারভাইভ করছে বিত্তবানের সহযোগিতায়— এই উদাহরণ-ই তার প্রমাণ। বা, তুলনাটা যদি এক ধরনের বিভ্রমও হয় তবু এই প্রশ্ন ওঠে যে, দয়া, করুণা, সমবেদনা, সহানুভূতি ইত্যাদি মানবিক গুণবাচক শব্দগুলির জন্ম হল কীভাবে?  তা ছাড়া মানুষের সমাজে ‘স্ব-প্রজাতির সঙ্গে সংগ্রাম’-ব্যাপারটা যদি ধরেও নেয়া যায় যে, আছে; যেমনটা টমাস হবস ‘ধনতান্ত্রিক মানুষের বৈশিষ্ট্য’ হিসাবে ডারউইনের আগেই ‘আবিষ্কার’ করেছিলেন, মূলত তা খাদ্যের অভাবজনিত; কিন্তু অন্যান্য প্রজাতির সঙ্গে তাকে তুলনা করা যাবে না।

 

   তা হলেও মানুষে-মানুষে লড়াইয়ে ‘যৌনতা’র ভূমিকা আছে— এটাও-কিন্তু মনে রাখার মতো বিষয়— পশুজগতে জননের জন্য সঙ্গী নির্বাচন— রক্তাক্ত হতে পারে, আজও তা খবর হয়! মানুষও ‘প্রেমের নামে’ সেই ‘রক্তাক্ত উত্তরাধিকার’ বহন করে চলেছে, খবরে প্রকাশ...

 

   এই আলোচনায় এর তাৎপর্য এই যে, সমজ থেকে সমাজ-অভিমুখে মানুষের অভিব্যক্তির অন্যতম কারণ নিহিত রয়েছে ‘খাদ্য ও জনন’-চাহিদার মধ্য— এবং সমাজ গঠনের অব্যবহিত পূর্ববর্তী যে সংগঠন, তা হল ‘পরিবার’, পরিবারের ‘নৈতিক ভিত্তি’ও গড়ে উঠেছে ওই ‘খাদ্য ও জনন’-চাহিদা থেকেই। এটা অনেকেরই জানা, হেনরি মর্গান ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস পরম্পরাগতভাবে এবিষয়ে আমাদের যথেষ্ট আলোকিত করেছেন। ইতিপূর্বে আমরাও একটি উদ্যোগ নিয়েছি (নারী-পুরুষের যৌথ অভিযান মানবিক সমাজের দিকে # উবুদশ, ২০১০)।

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com