একই বৃন্তে দুটি ঢ্যাঁড়শ

 

প্রশ্নটা স্রেফ এনআরসি নিয়ে নয়। "অবৈধ অনুপ্রবেশ"এর সন তারিখ ১৯৫১ বা ৭১ বা ৮১ বা ২০১১ যাই হোক না কেন, তাতে কিস্যু এসে যায়না, কারণ প্রশ্নটা সালতামামি নিয়ে নয়। প্রশ্নটা "অবৈধ অনুপ্রবেশ" নামক একটি অদ্ভুত ধারণাকে নিয়ে। বলা ভালো "অবৈধ অনুপ্রবেশ" নামক বস্তুটির বৈধতা নিয়েই। "অনুপ্রবেশ" শব্দটি নতুন। বৃটিশ ভারত এই শব্দটির অস্তিত্ব জানতনা। ভারতে তখন শাসক ছিল, শাসিত ছিল, শোষক ছিল, শোষিত ছিল, ঔপনিবেশিক ছিল, সায়েবসুবো ছিল, জমিদার ছিল, জাতপাত ছিল, চোর-চোট্টা-চিটিংবাজ ছিল, ধান্দাবাজ্ব রাজনীতিবিদ ছিল, বহু রকম উঁচু-নিচুর বিভাজন ছিল, কিন্তু কোনো অনুপ্রবেশকারী ছিলনা। উপমহাদেশের মানুষের এই নতুন শ্রেণীবিভাজনটি একদম খাঁটি বাদামী চামড়ার "গণতান্ত্রিক" শাসকদের সৃষ্টি, যাঁদের কাউকে কাউকে আমরা জাতির পিতা বলি। ১৯৪৭ সাল অবশ্য আমাদের জাতির অভিধানে এই একটিই শব্দ দিয়েছে তা নয়। বহু মানুষ, যাঁরা বাদামী চামড়ার শাসকদের কৃপায় ভিটেমাটি হারিয়েছেন, তাঁরা স্বাধীনতা বলেননা, বলেন পার্টিশন। স্বাধীনতার এই প্রতিশব্দটি নতুন। ১৯৪৭ সাল আমাদের দিয়েছে "উদ্বাস্তু" নামক আরও একটি ঝকঝকে সংস্কৃত ঘেঁষা শব্দ। একটি আস্ত ভূখন্ডের মধ্যে যে "পার্টিশন" বানানো যায়, একদল লোককে ভিটে-মাটি থেকে উচ্ছিন্ন করে মনুষ্যাধম "উদ্বাস্তু" আখ্যা দিয়ে ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘোরানো যায়, কিংবা অনুপ্রবেশকারী স্ট্যাম্প মেরে দলবদ্ধভাবে জেলের মধ্যে আরও কোনো অন্ধকার কুঠুরিতে ভরে রেখে দেওয়া যায়, এসবই আমাদের উত্তর-৪৭ সালের শিক্ষা।

 

   প্রশ্নটা তাই এসবের বৈধতা নিয়েই। "অনুপ্রবেশ" এর বৈধতা নিয়ে নয়। উদ্বাস্তুরা বৈধ আর অনুপ্রবেশকারীরা নয়, এসব কূটকচালির কোনো মানেই নেই, কারণ, এসবের জন্ম যে "পার্টিশন" থেকে, সেই "পার্টিশন"টির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সময় এসে গেছে। ১৯৩০ এবং ৪০ এর দশকের ইতিহাস অব্যর্থভাবেই আমাদের একথা জানায়, যে, এই "পার্টিশন" কোনো গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নয়। এ নিয়ে কোনো গণভোট হয়নি, স্রেফ কংগ্রেস এবং মুসলিম লিগ নামক দুটি ক্ষমতালোভী দল, উভয়েই সর্বেসর্বা হতে চেয়ে একটা আস্ত উপমহাদেশকে বাঁটোয়ারা করে নিয়েছিল। যেকোনো সভ্য দেশে প্রধানমন্ত্রী বা রাশ্ট্রপতি নির্বাচিত হন জনতার ভোটে, যিনি হারেন তিনি বিরোধী আসনে বসেন। কিন্তু এখানে আগে ঠিক হয়েছিল, রাষ্ট্রনায়ক, তারপর দেশকে বাঁটোয়ারা করে দেওয়া হয়েছিল তাঁদের মধ্যে। তাতে কোটি-কোটি লোককে সীমান্ত পার করে 'নিজের দেশ'এ যেতে হয়েছিল সর্বস্ব হারিয়ে। অনেকেই অবশ্য পৌঁছতে পারেননি। এর চেয়ে ঢের কম আকারে একই রকম কান্ড ঘটিয়ে, দিল্লি থেকে দৌলতাবাদে সমস্ত দিল্লীবাসীকে নিয়ে যাবার ফরমান দিয়ে ইতিহাসে চিরনিন্দিত হয়ে আছেন মহম্মদ বিন তুঘলক। কিন্তু এই অতি-তুঘলকি কান্ডের নায়করা সীমান্তের দুই পারে জাতির নায়ক।

 

   এবং এ নিয়েও কোনো সন্দেহ নেই, যে দুটি জাতি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এই বিভাজনে, দ্বিখন্ডিত হয়েছিল, সেই বাঙালি এবং পাঞ্জাবিরা কেউই এই বিভাজন চায়নি। পাঞ্জাবে পার্টিশনের সময়ই তার বিরুদ্ধে তীব্র আওয়াজ উঠেছিল, বাঁটোয়ারাকারীরা কেউ কান দেননি। বাংলায় সেসব যাতে না হয়, তাই দীর্ঘদিন ধরে নানা কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। সুভাষ ও শরৎ বসুকে কংগ্রেস থেকে বিতাড়ন, নির্বাচনে কংগ্রেসের কেবলমাত্র হিন্দু আসনে অংশগ্রহণ, ফজলুল হকের সঙ্গে সরকার না গড়া, কংগ্রেসি রাজনীতিতে গান্ধী ঘনিষ্ঠ বিড়লা-খৈতানদের অনুপ্রবেশ, স্থানীয় নেতাদের হাইকম্যান্ডের রাবার স্ট্যাম্পে পরিণত করে ফেলা এবং দেশভাগের পক্ষে সংগঠিত প্রচার চালানো, সবই এর অংশ। এমনকি কংগ্রেস ঘনিষ্ঠ একটি পত্রিকা, সম্ভবত ১৯৪৬ সালে নিজেদের মতো করেই একটি সমীক্ষাও ছেপে ফেলেছিল, হিন্দুরা দেশভাগ চায় এই সিদ্ধান্ত প্রচার করতে। আর মুসলিম লিগ তো সরাসরি ডায়রেক্ট অ্যাকশান ডের ডাকই দিয়ে দেয়।

 

   তা, এইসব পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটার জন্য এই লেখা নয়। বস্তুত এটা কোনো প্রবন্ধই নয়। এখানে স্রেফ ছোটো করে কাজের কথাটা বলা হচ্ছে। কথা হল, অনুপ্রবেশকারীরা বৈধ বা অবৈধ এটা কোনো প্রশ্নই নয়। অনুপ্রবেশের জন্য আগে প্রয়োজন পার্টিশন। সেই পার্টিশনটিই গণতান্ত্রিক নয়। অতএব অবৈধ। এই অবৈধ কাজটি না করলে গোটা উপমহাদেশে কোথাও কোনো অনুপ্রবেশ হতনা। হওয়া সম্ভব ছিলনা। কাজেই পাপ কিছু হয়ে থাকলে সেটা যেমন উদ্বাস্তুদের পাপ নয়, তেমনই অনুপ্রবেশকারীদেরও পাপ নয়, আদি পাপটি এনআরসির চতুর্দশপুরুষের, যাঁদের মধ্যে আমাদের জাতির পিতারাও অন্তর্ভুক্ত। যাঁরা অর্ধেক অর্ধেক তেল ভাগাভাগি করবেন বলে তেলের শিশিটি দু ভাগ করেছিলন। বেচারি অন্নদাশঙ্কর রায় পিতাদের সম্পর্কে হয় এই তথ্যটি জানতেননা, কিংবা সম্ভবত ভদ্রতাবশে উল্লেখ করেননি।

 

   এখানে "আমাদের পিতারা", বা "পিতাদের" শব্দগুলি লক্ষ্য করবেন। সবই বহুবচন। অর্থাৎ এপারের পিতা এবং ওপারের পিতা সকলকেই গাল দেওয়া হচ্ছে। সবাই "আমাদের" পিতা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে। এবং ছানা-পোনাদের মধ্যে কোনো আমরা-ওরা করা হচ্ছেনা। দুর্ভাগা পিতাদের মাতৃহারা সন্তানদের (দেশেদের শুধু পিতারাই ছিলেন, লক্ষ্য করবেন) মধ্যে বিভাজন, এই লেখায় করা হচ্ছেনা। ওসব নেতাদের বা পিতাদের কারবার, যা তাঁরা করে ফেলেছেন। সেই আদিপাপ ঢাকতে পাবলিকের টাকার শ্রাদ্ধ করে অবিরত যুদ্দু-যুদ্দু খেলে চলেছেন। কখনও পূর্ব-পাকিস্তানে, কখনও কাশ্মীরে। কখনও উগ্রপন্থী ঢোকাচ্ছেন, কখনও এজেন্ট। কখনও মুম্বাইতে বিস্ফোরণ হচ্ছে, কখনও করাচিতে। এপারের লোককে বোঝানো হচ্ছে, ওপারটা স্রেফ সন্ত্রাসবাদীদের আখড়া, আর ওপারের লোকরা জানেন, এপারে গরুখেকো দেখলেই কেটে ফেলা হয়। এই অ্যাজেন্ডারই সুসংহত রূপ হল অনুপ্রবেশ জুজু। নেপাল থেকে লাখে লাখে লোক ভারতবর্ষে কাজ করতে এলে কারো কোনো সমস্যা দেখা যায়না, সমস্যা হল বাংলাদেশের লোক ঢুকলে। আফগানিস্তান-পাকিস্তানে অবাধ মুজাহিদিন চলাচলে কারো কোনো সমস্যা নেই, সমস্যা হল কোনো ভারতীয় 'এজেন্ট' ঢুকে পড়লে।

 

    তা, এসব আটকানোর একটাই উপায়। আদি-পাপের প্রতিকার। আমরা কিছু বাইবেলীয় মনুষ্যসন্তান নই, যে, আদম-ইভের পাপকার্যের বোঝা আমাদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলতে হবে। তদুপরি আমাদের কোনো মাতা নেই, সবই পিতা। তাঁদের পাপ আমাদের ঘাড়ে বয়ে চলার কোনো কারণ নেই, জাস্ট ঝেড়ে ফেললেই হয়। অর্থাৎ, অনুপ্রবেশ নয়, প্রশ্ন তুলুন পার্টিশান নিয়ে। সে পার্টিশান এখনই মুছে ফেলা সম্ভব নয়। কিন্তু যাতায়াত তো উন্মুক্ত হওয়া সম্ভবই। খুলে যাক ওয়াঘা। খুলে যাক পেট্রাপোল। আর্মি আর সিক্রেট সার্ভিসের দাপাদাপি বন্ধ হোক। লোকে অবাধে এপার থেকে ঠুংরি-ভজন গাইতে হাইতে ওপারে যাক, ওপার থেকে এদিকে আসুক গজল-কাওয়ালির বোল। ১৯৪৭ সালের বিভাজন চুলোয় যাক। প্রতিকার হোক আদি পাপের। ভারতবর্ষে কস্মিনকালেও কোনো অনুপ্রবেশকারী ছিলনা। এখনও থাকবেনা।

 

   এই দাবী তুলতে হলে আপনাকে আমাকেই তুলতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠিত হল তুলবেনা। কারণ, আদি-পাপের ভাগীদার এরা সবাই। আর ভুল স্বীকার করা উপমহাদেশের রাজনীতির উত্তরাধিকারে কোথাও নেই। যদি দাবী তুলতেই হয়, এই আমি যেমন লিখছি, "অবৈধ অনুপ্রবেশ" নামক হযবরলর চক্করে না পড়ে আপনাকেও লিখতে হবে। পার্টিশনের পাপকে অস্বীকার করে, "অনুপ্রবেশ" এর ডিসকোর্সে ঢুকে, তারপরে সম্প্রীতির হাজারটা বাণী দেবার কোনো মানে নেই। তার চেয়ে বরং নজরুলের গানকে প্যারডি করে গানঃ মোরা একই বৃন্তে দুটি ঢ্যাঁড়শ, হিন্দু-মুসলমান।  (ফেসবুক থেকে গৃহীত) 

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com