রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু ভাবনা

 

 

রবীন্দ্র প্রতিভার ব্যাপ্তি নিয়ে তুলনামূলক আলোচনায় রবীন্দ্র গবেষকেরা বলেছেন - বিশ্বকবির রচনায় রবার্ট ব্রাউনিং-এর দার্শনিকতা,  কোলরিজ, বাইরনের জীবনমুখী বাস্তবতা, জন কীটসের অনিঃশেষ সৌন্দর্যচেতনা, ওয়ার্ডসোয়ার্থের পরিশুদ্ধ প্রকৃতি প্রেম এবং পার্সি বিশি শেলীর অতীন্দ্রিয় রহস্যময়তার অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে।  তাঁর রচনা শুধু বাংলা সাহিত্যে নয়,  বিশ্বসাহিত্যেরও অনন্য সম্পদ। বাংলা সাহিত্যে রোমান্টিসিজমের অতুল্য প্রতিনিধিত্ব রবীন্দ্রনাথই করেছেন।  প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের সংযোগ তাঁর রচনায় এমন একটি রোমান্টিকতার আবহ নির্মাণ করেছে, যার ভিত্তি প্রস্তুত হয়েছে জীবন সম্বন্ধে কবির সুগভীর ধারণা এবং বিশ্বপ্রকৃতি সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধির প্রগাঢ়তা থেকে।

 

  কবির মৃত্যু ভাবনা প্রসঙ্গেও এই মন্তব্য সত্য। মরণকেও তিনি উদঘাটিত করেছেন বিচিত্র রূপে-রসে। উপলব্ধির নতুন নতুন পর্যায় অতিক্রম করে। যখন ব্যক্তিগত জীবনে স্বজন হারানোর ব্যথা শোকের আবর্তে তাঁকে মথিত করেছে, তখন কোলরিজ, বাইরনের জীবনমুখী বাস্তবতা প্রত্যক্ষ হয়ে উঠেছে তাঁর চেতনায়।  জীবনের সুধাপাত্র নিঃশেষ করে রিক্ততার অপার বেদনায় মৃত্যু তখন ধরা দিয়েছে নিষ্ঠুর নির্লিপ্ত বৈরাগীর বেশে। আবার কীটসের মতো সৌন্দর্যচেতনা অপরূপ প্লাবন তুলেছে মৃত্যু সম্পর্কে কবির উপলব্ধিতে।  শেলীর কাছে রহস্যময়তাই যেমন জীবনের নতুন প্রেরণা হয়েছে বারবার, বিশ্বকবিও তেমনি মৃত্যুর মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন নব নব জীবনের সন্ধান।  ওয়ার্ডসোয়ার্থের প্রকৃতিপ্রেম মৃত্যুর সঙ্গে একাকার হয়েই রবীন্দ্রনাথের রচনায় অবগুণ্ঠণ খুলেছে জীবন-প্রণয়ীর মতো।  আবার পরক্ষণে দেখা যাচ্ছে - দার্শনিক ব্রাউনিং-এর জীবন গভীরতার সুর সেখানে ধ্বনিত হচ্ছে বৈচিত্র্যের হাতছানিতে ।

 

  কিন্তু এতসব তুলনা সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথের ‘মৃত্যু ভাবনা’ জীবনের আরেক নাম। জন্মজন্মান্তরের যাত্রাপথে পরমাত্মীয়ের মতো নতুন নতুন জীবনপথের অনুসন্ধান দান করে সে। মরণ কখনো তাই মহাকালের মিলনদূত। কবির মানস-সরোবরে অনুভূতির বর্ণচ্ছটায় রহস্যময় আবরণ পরে বিশেষকে ছাড়িয়ে হয়ে উঠেছে নির্বিশেষ। আবার পরক্ষণেই নির্বিশেষ থেকে বিশেষের স্তরে নেমে এসে ব্যক্তিসত্তা নিয়ে উপস্থিত হয়েছে প্রণয়িনী রাধিকার শ্যামকৃষ্ণ হয়ে। পাশ্চাত্যের লেখকদের সঙ্গে ভাবনার মিল থাকা সত্ত্বেও অন্যসব ক্ষেত্রে যেমন, তেমনি মৃত্যুভাবনার ক্ষেত্রেও বিশ্বকবির মৃত্যুচেতনা একান্তভাবে একক।

 

  এর কারণ, স্পর্শকাতর মানসিকতার অধিকারী রবীন্দ্রনাথের রোমান্টিক চিত্ত জীবন জগতের সৌন্দর্য এবং প্রেমের অনুভূতিতে আচ্ছন্ন থাকলেও, মূলত ভারতীয় সন্ন্যাসীর মতো অন্তরে তিনি এক সত্যাণ্বেষী দার্শনিক। রহস্যময়তার আড়াল ছাড়িয়ে সত্যের পরমতত্ত্বে উপস্থিত হওয়াই তাঁর লক্ষ্য। তাই একদিকে বিশ্বসৃষ্টির সুগভীর তত্ত্বকে পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধির জন্য অসাধারণ শিল্পময়তায় অতীন্দ্রিয় সত্তার রহস্যময়তাকে যেমন কবির অন্তরে চিত্রায়িত করেছেন, তেমনি রহস্যের আবরণ ছিন্ন করতে চেয়েছেন ধ্যানীর ধ্যানের অন্তর্দৃষ্টির পরশ দিয়ে। যেমন উপনিষদের সত্যদ্রষ্টা ঋষিরা বলেছেন -“এই জগৎ মৃত্যুহীন। শাশ্বত সত্তার আনন্দ সম্মিলনের মহাপ্রকাশ। বিশ্বসৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ কিংবা অদৃশ্য হিসেবে যা কিছু বিরাজিত, সবই সেই চিরসুন্দর, চিরশুদ্ধ অমরনাথের আনন্দময় অভিব্যক্তি। বিশ্বের সকল সৌন্দর্য, পার্থিব জগতের সমস্ত সঞ্চিত সুধা তাঁর থেকে সৃষ্ট বলেই অবিনাশী। অনাদিকাল ধরে তিনিই নানা রূপে বিকশিত। বিশ্বের জীবনপ্রবাহ তাই মৃত্যুহীন। হে অমৃতের অমর সন্তান, এই পরম সত্য জ্ঞাত হয়ে তুমি অমৃততত্ত্ব লাভ করো”।

 

  রবীন্দ্রনাথও জীবনের প্রথম প্রভাতে মৃত্যুকে অমৃতের স্বরূপ হিসেবেই আহ্বান করেছিলেন- ‘মরণ রে, তুঁহুঁ মম শ্যামসমান। মেঘবরন তুঝ, মেঘজটাজূট / রক্ত কমলকর, রক্ত অধরপুট/ তাপবিমোচন করুণ কোর তব / মৃত্যু অমৃত করে দান। (ভাণুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী ১২৮৮)। সংকীর্ণতার প্রাচীর ভেঙে বিশ্বের সঙ্গে মিলনের আকাঙ্ক্ষা তাই কৈশর থেকেই ডানা মেলেছিল তাঁর রচনায়। ‘হৃদয় আজি মোর কেমনে গেল খুলি/জগৎ আসি সেথা করিছে কোলাকুলি। (প্রভাত উৎসব, প্রভাতসঙ্গীত ১২৮৮)।

প্রভাতসঙ্গীতের কাল থেকেই কবির মধ্যে জেগে উঠেছে সমগ্র ভুবনের সঙ্গে নিজ জীবনের একাত্মতার আনন্দঘন মিলন। এই আনন্দামৃতের অনুসন্ধান বেদান্তের দার্শনিকেরা রেখে গিয়েছেন হাজার হাজার বছর আগে পৃথিবীর অমৃতস্য পুত্রদের জন্য। তাঁরা জানিয়েছেন - এই অমৃত লাভ খণ্ডত্বে নয়, অন্তরে অখণ্ড চেতনার উন্মেষ হলেই উপলব্ধি করা সম্ভব হয়। যখন এই উপলব্ধি জাগ্রত হয়, মহাকালের সঙ্গী হয়ে অনন্ত জীবনস্রোত চঞ্চলা নদীর মতোই নিয়ত প্রবাহিত হচ্ছে, তখনই মানুষ জীবনের সত্য উপলব্ধি করতে সমর্থ হয়। বুঝতে পারে, ক্রমাগত মৃত্যুর স্পর্শ পেয়েই জীবন নতুন জীবনের আশীর্বাদে ধন্য হয়। ভানুসিংহ মরণকে তাই প্রণয়িনী রাধিকার মতো বলছেন - ওগো মরণ, তুমি শ্রীরাধিকার প্রণয়ী শ্যামের মতোই প্রিয়তম আমার কাছে! শ্যামের মতো রহস্যময়, নিত্য নতুন। আর তাঁরই মতো সর্বতাপ বিমোচনকারী অনিন্দ্যসুন্দর!

 

   এখানে এই কথাটি বলে রাখা ভালো, মৃত্যুভাবনার যে বিকাশের স্তরগুলো রবীন্দ্র রচনায় ধরা পড়ে, সেটা রবীন্দ্র দর্শনের তাত্ত্বিক দিক নয়। রোমান্টিক কবি চিত্তের সৌন্দর্য আর প্রেমের রাজ্যে বিচিত্রের আস্বাদন। কবি তাই জীবনের নব নব সঙ্গীতের কুসুম ফোটাতে চেয়ে, হাসিকান্না বিরহমিলনভরা ধূলির ধরণী ছেড়ে, মানুষের মাঝে পড়ে থাকার আকুলতা নিয়ে যে মহূর্তে তীব্র বিষণ্নতায় বলে ওঠেন -‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে/ মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই (প্রাণ, কড়ি ও কোমল ১২৯৩), ঠিক তার পরের মুহূর্তেই উৎসর্গের ‘জন্ম ও মরণ কবিতায় এসে বলেন - ‘নব নব জীবনের গন্ধ যাব রেখে / নব নব বিকাশের বর্ণ যাব এঁকে। কে চাহে সংকীর্ণ অন্ধ কূপে / এক ধরাতল মাঝে শুধু এক রূপে / বাঁচিয়া থাকিতে! (জন্ম ও মরণ, উৎসর্গ ১৩১০)।    

 

  কবির বিশ্বাস, মরণের স্রোতে বারবার ধৌত হয়েই জীবনের অসম্পূর্ণতা থেকে মুক্তি ঘটে মানুষের। অন্তরের আনন্দরস মৃত্যুর বিচ্ছেদবেদনা থেকে উৎসারিত হয় বলেই মানুষ মৃত্যুতে শাশ্বত অমৃতের পরশ লাভ করে। পার্সি বিশি শেলী বিষাদের গভীর নিমগ্নতায় এভাবেই খুঁজতে চেয়েছিলেন অফুরান আনন্দের রহস্যসম্ভার -`আওয়ার সুইটেস্ট সঙ্কস্ আর দোজ, দ্যাট টেল অফ দ্য স্যাডেস্ট থটস! / আই হ্যাভ ড্রাঙ্কেন ডিপ অফ জয়,/ এণ্ড টেস্ট নো আদার ওয়াইন টুনাইট!’ (টু দ্য স্কাইলার্ক)। কবি বলছেন - সেগুলোই জীবনের মধুরতম সঙ্গীত, যারা বিষণ্নতম বেদনার রসে রচিত হয়। তার রসে তলিয়েই আমি গভীর আনন্দে মাতাল হয়েছি। আজ রাতে তাই অন্য মদ পান করতে চাই না। পরিশুদ্ধ প্রকৃতির সঙ্গলাভে ধন্য হওয়া কবি ওয়ার্ডসোয়ার্থের কবিতাতেও ধ্বনিত হয়েছে -‘এ সিম্পল চাইল্ড / দ্যাট লাইটলি ড্রস ইটস ব্রেথ / এণ্ড ফিলস ইটস লাইফ ইন এভরি লিম্ব / হোয়াট শুড ইট নো অফ ডেথ? (উই আর সেভেন)। একটি নিষ্পাপ সরল শিশু যখন তার ছোট ছোট নিঃশ্বাসের টানে দেহের প্রতি অঙ্গপ্রত্যঙ্গে জীবনের উপস্থিতি অনুভব করে, মৃত্যুর ধারণা তার থাকে কোথায়?   

 

   রবীন্দ্রনাথও এই দর্শনে বিশ্বাসী যে, বিশ্বজগতে যা কিছু অস্তিত্বময় সবই সেই চিরপবিত্র নিষ্পাপ শাশ্বতের থেকে উৎপন্ন বলে মৃত্যুতে শোকার্ত হওয়া উচিৎ নয়। কারণ যে অসীম প্রাণপ্রবাহ অনাদিকাল ধরে বিশ্বনৃত্যের ছন্দে ছন্দে দোলায়িত, মৃত্যুতে তার অবসান নেই। যাকে মৃত্যু বলে বিশ্বাস করে শোকের বেদনা অবহ হয়ে ওঠে সেটি এক ধারণামাত্র। প্রিয়জন নয়নের সমুখ থেকে অপসারিত হলেই সে হারিয়ে যায় না চিরতরে - ‘নয়ন সম্মুখে তুমি নাই / নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই, / আজি তাই / শ্যামলে শ্যামল তুমি / নীলিমায় নীল। (ছবি, বলাকা ১৩২১)। কারণ জীবনের পরিসমাপ্তি একটি সুনির্দিষ্ট দেহের মধ্যে নয়। নব নব পরিচিতির ভেতর দিয়ে অনন্তকাল ধরে অনন্ত যাত্রাপথে তার পথচলা।

 

  মরণের সিংহদ্বার দিয়েই বারবার এই যাত্রপথ রচিত হয়। আদিঅন্তহীন কাল ধরে পৃথিবী সৃষ্টিরও আগে থেকে যে প্রাণপ্রবাহ স্পন্দিত হয়েছিল সৃষ্টির কারণ-সমুদ্র গর্ভে, সেই প্রাণপ্রবাহ আজও নিঃশেষিত হয়নি। রবীন্দ্রনাথ তাই ছিন্নপত্রে লিখেছেন -‘আমি বেশ মনে করতে পারি, বহু যুগ পূর্বে যখন তরুণী পৃথিবী সমুদ্রস্নান থেকে সবে মাথা তুলে উঠে তখনকার নবীন সূর্যকে বন্দনা করছেন, তখন আমি এই পৃথিবীর নতুন মাটিতে কোথা থেকে এক প্রথম জীবনোচ্ছ্বাসে গাছ হয়ে পল্লবিত হয়ে উঠেছিলুম। তখন জীবজন্তু কিছুই ছিল না, বৃহৎ সমুদ্র দিনরাত্রি দুলচে এবং অবোধ মাতার মতো আপনার নবজাত ক্ষুদ্র ভূমিকে মাঝে মাঝে উন্মত্ত আলিঙ্গনে একেবারে আবৃত করে ফেলচে, তখন আমি এই পৃথিবীতে আমার সমস্ত সর্বাঙ্গ দিয়ে প্রথম সূর্যালোক পান করেছিলুম। নবশিশুর মতো একটা অন্ধ জীবনের পুলকে নীলাম্বরতলে আন্দোলিত হয়ে উঠেছিলুম। এই আমার মাটির মাতাকে আমার সমস্ত শিকড়গুলি দিয়ে জড়িয়ে এর স্তন্যরস পান করেছিলুম’। (ছিন্নপত্র, শিলাইদহ ১৮৯২)।   

 

  কবি তাঁর সংখ্যাহীন জন্মজন্মান্তরের কথা আজও তাই বিস্মৃত হননি- ‘মনে আজি পড়ে সেই কথা / যুগে যুগে এসেছি চলিয়া / স্খলিয়া স্খলিয়া / চুপে চুপে/ রূপ হতে রূপে/ প্রাণ হতে প্রাণে। (চঞ্চলা, বলাকা ১৩২১)। মরণ যদি বিনাশের কারণই হবে তাহলে জীবন থেকে জীবনান্তরে এই অশেষ পথ চলা কেমন করে সম্ভব? তাই বিনাশসাধন নয়, নিরন্তর চলার জন্যই মৃত্যুর স্পর্শলাভে দেহের খোলস বদলে যায় বারবার। সম্ভব হয়, নানা রূপ পরিগ্রহের ভেতর দিয়ে বিচিত্র জীবনের আস্বাদন।

 

   মৃত্যু তাই কখনো প্রণয়ী হয়ে, কখনো বাউল হয়ে, কখনো বা বালিকা বধূর বরের বেশে, সখা সেজে বন্ধুরূপে, অন্ধকারের ধ্যাননিমগ্ন ভাষার মতো অবগুণ্ঠণ পরে, অরুণবহ্নির রুদ্র সাজে, জীবন রথের সারথি হয়ে, ললিত লোভন মোহন রূপে কিংবা জ্যোতির্ময়ের পরশমণি হয়ে ধরা দিয়েছে কবির মনে। কারণ রবীন্দ্রনাথ সমস্ত জীবন বিশ্বরহস্যের গভীর স্পর্শ অনুভব করেছেন সূক্ষ্ম উপলব্ধির সৌন্দর্য চেতনা থেকে। অন্তরের গভীরতম প্রেমে। কিন্তু তাঁর মগ্নচেতনায় বেদান্ত দর্শনের সেই সত্যটিও জাগ্রত ছিল, যা আধুনিক বিজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে -‘ঈশ্বর কণা’ তত্ত্বরূপে। অর্থাৎ জগতে কোনো কিছুই শেষ হয়ে যায় না, পরিবর্তিত হয় মাত্র। কারণ বিশ্বের সবকিছুই এক অনিঃশেষ সত্তা থেকে উৎপন্ন। জীবন-মৃত্যুর নিঃশব্দ প্রণয়খেলা কবির কাছে বহুবার তাই নবজীবন, নবযৌবন লাভের আহ্বান নিয়ে এসেছে- ‘ অত চুপি চুপি কেন কথা কও / ওগো মরণ হে মোর মরণ, / অতি ধীরে এসে কেন চেয়ে রও / ওগো একি প্রণয়েরই ধরন! (মরণ মিলন, উৎসর্গ ১৩১০)।

 

   ‘ফাল্গনী’ নাটকেও কবির বক্তব্য -‘জীবনকে সত্য বলে জানতে গেলে মৃত্যুর মধ্য দিয়েই তার পরিচয় পেতে হবে। যে মানুষ ভয় পেয়ে মৃত্যুকে এড়িয়ে জীবনকে আঁকড়ে রয়েছে, জীবনের পরে তার যথার্থ শ্রদ্ধা নেই বলেই জীবনকে সে পায়নি। যে লোক নিজে এগিয়ে গিয়ে মৃত্যুকে বন্দী করতে ছুটেছে, সে দেখতে পায়, যাকে সে ধরেছে সে মৃত্যুই নয়, সে জীবন’, (ফাল্গনী, ১৩২২)। 

 

   উপসংহারে বলা চলে, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু ভাবনায় বিকাশের যে স্তর সেটা বিচিত্র ভাবানুভূতির সঙ্গে কবিকল্পনার এক অপরূপ সম্মিলন। তাঁর কবিসত্তায় পার্সি বিশি শেলীর মতো রহস্যময় অতীন্দ্রিয় সত্তার গূঢ় অনূভূতি রয়েছে, রয়েছে কীটসের অনিঃশেষ সৌন্দর্যচেতনার অবগাহন। ওদিকে ওয়ার্ডসোয়ার্থের মতো বিশ্বপ্রকৃতির গভীর রহস্যের সঙ্গে মৃত্যু ভাবনাকে একাত্ম করার দৃষ্টান্তও সর্বত্র চোখে পড়ে। আবার কোলরিজ আর বাইরনের মতো বস্তুগত অভিব্যক্তিরও অভাব সেখানে নেই। আছে দার্শনিক লেখক ব্রাউনিং-এর দার্শনিকতার শিল্পময় বিশ্লেষণও।

কিন্তু তারপরও এঁদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পার্থক্য এখানে - জগতের সবখানে তিনি উপলব্ধি করেছেন চির শাশ্বতের পরিব্যাপ্ত আনন্দ তরঙ্গকে। যে আনন্দের তরঙ্গে ভেসে মরণের শোকময় বিষাদও লোভন মোহন ললিত বরের বেশ ধারণ করেছে তাঁর কাছে। মৃত্যু হয়ে উঠেছে জীবনের চিরপ্রার্থিত প্রণয়ী। কারণ কবির কাছে মৃত্যু বলে কিছু নেই। মরণ কেবল নতুন নতুন জীবনলাভের বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া মাত্র।

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com