শিক্ষাক্ষেত্রে চলছে চাটু -দর্শন,বিপন্ন যুব সমাজ

 

শিক্ষাক্ষেত্রের দিশাহীনতার জন্যে কাকে দায়ী করবেন? যে শিক্ষা ব্যবস্থা দশ শতাংশ ছাত্রছাত্রীকে নিয়োগ যোগ্য করে তুলতে পারেন না, সেই শিক্ষা ব্যবস্থার গলদ টা কোথায়? এই মুহূর্তে দেশের সামনে এই প্রশ্নটি কেউ তোলে না, যদিও খুব জরুরি।

 

   একথা ভেবে সরকার চেয়েছিল বেকার সমস্যার মোকাবিলায় স্কিল ইন্ডিয়া স্কিমকে সারা দেশে ছড়িয়ে লক্ষ লক্ষ বেকার হাতে কাজ দিতে।কিন্তু তার জন্য উচিত ছিল মূল শিক্ষা ব্যবস্থাকেই কর্ম উপযোগী করে তোলা।জ্ঞান ও কর্মের সমন্বয়ে একজন ক্রমশ দক্ষ হয়ে ওঠে। দক্ষ নাগরিক তৈরি হলে দেশের উৎপাদন বাড়ে।আয় বাড়ে মানুষের। তৈরি হয় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ।প্রশ্ন এই খানেই।নতুন করে বর্তমান সরকার স্কিল ইন্ডিয়া স্কিম চালু করে ভোকেশনাল শিক্ষার্থীদের পেশায় দক্ষ করার চেষ্টা করছে।কিন্তু দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে।প্রয়োজন যেখানে ইতিহাস,বিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব,সমাজবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার জ্ঞানকে দেশের অর্থনেতিক উন্নয়নের কাজে লাগানো, সেখানে যদি তার বিকৃত চর্চাই হয়ে ওঠে শাসকের রাজনৈতিক স্বার্থ, তখন রাষ্ট্র দেশের মানব সম্পদে বিকাশে কাজ করে না,উল্টে মানব বিকাশের অন্তরায় হয়ে ওঠে।এদেশে এখন সেটাই হচ্ছে।

 

   তাহলে উপায়? শিক্ষাবিদের অভাব নেই।কমিশন বসিয়ে তার উন্নয়নে শত শত পাতার সুপারিশ জমা পরে।কাজে লাগে না।কেন? কারণ, কবিগুরুর কর্ণ কুন্তী সংবাদে দুর্যোধনের সেই আপ্ত বাক্যটি মনে পড়ে। ' চাটু যেন নাহি জানে পিষ্টকের স্বাদ'। এদেশে  সরকারের কোনো শিক্ষাদর্শন নেই।শিক্ষা যে একটি দীর্ঘমেয়াদি বিষয়, দশ বা পনেরো বছরের একটি দীর্ঘ কার্যক্রমের মধ্যে দিয়ে একটি প্রজন্মকে গড়ে তুলতে হয়, তার জন্যে দুমদাম ইচ্ছেমত বদল ঘটাতে নেই।সেই ভাবনাটা সরকারে যারা আসেন তারা ভাবেন না। অর্থনীতির চাহিদা আর সামাজিক উন্নয়নের কথা ভেবে উচিত শিক্ষা কমিশনের মাধ্যমে সারা দেশে অভিন্ন শিক্ষা কাঠামো প্রবর্তন করা।তার মাধ্যমে একটি অভিন্ন সিলেবাস তৈরি করা।তাতে ইংরেজি, বিজ্ঞান, কম্পিউটারের সঙ্গে স্থানীয় ভাষা ও পেশাদারি জীবনে নিজেকে গড়ে তোলার মতো বিষয় থাকা উচিত।দেশের ইতিহাস, ভূগোল, পরিবেশ জ্ঞানের একটি প্রাথমিক ধারণার ব্যবস্থাও থাকতে পারে,কিন্তু ব্যবহারিক জীবনে ও চাকুরী হোক বা ব্যবসা হোক সফল মানুষের জ্ঞান অর্জনের ভিত্তি টাও এই স্কুল শিক্ষার ও উচ্চ শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।কিন্তু কে শোনে এসব কথা? চাটু দর্শনই এ দেশের একমাত্র দর্শন।অথাৎ চাটুর উপর আপনি যতই পিঠে বানান, সে যেমন তার স্বাদ জানে না, সরকারে যারা আসবেন , তারা শিক্ষা সমাজ ও অর্থনীতির উন্নয়নে আসল কাজটি করবেন না।

 

   কেন করেন না? কারণটা রাজনীতি।যে দলই সরকার চালাতে ক্ষমতায় এসে দেখে দেশের প্রয়োজনে সত্যিই কিছু করা দরকার, সেটা করার চেষ্টা শুরু হলে দলের তাত্বিকরা বাধা দেন।যারা বিপরীত কথা বলেন, তারা বলেন সেই দলের রাজনৈতিক দর্শনের ভাবনা থেকে।কিন্তু বাস্তবে চাহিদা উল্টো হয়ত, কিন্তু দল তা শোনে না।সরকারের প্রধানের সঙ্গে দলের প্রধানের বিরোধে এভাবেই সোনিয়ার কংগ্রেস আর মনমোহনের সরকার, মোহন ভাগবতের হিন্দু দর্শন আর মোদীর সরকারের কার্যকলাপের বিরোধ সামনে এসে যায়। সিপিএম পলিটব্যুরো র ঠেলায় ত বুদ্ধবাবুকে বারবার আটকে যেতে হয়েছে।অন্য যে সমস্ত দলের এই সমস্যা নেই তাদের সমস্যা ভোট ব্যাংক।মায়াবতী-,কুমারস্বামী দের সমস্যা তারা কিছু করতে গেলে হয় নিজের ভোট ব্যাংকের জন্য ভাবতে হবে আগে, নয়ত না করা আরও ভালো যদি উচ্চবর্ণের লোকজন সেই উদ্যোগে বেশি উপকৃত হয়ে যায়।

 

   সমস্যাটা এই কারণে এদেশের ভোট নির্ভর গণতান্ত্রিক অবস্থান নির্ভর। যুব সমাজের কথা ভেবে শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার হয় না যে দেশে, তার চাইতে অনেক বেশি সংস্কার হয় যুব সমাজকে একটি বাজার রূপে কল্পনা করে। বেসরকারি পুঁজি চায় যুব সমাজকে ভোগবাদী করে তুলতে,সেটা যত বেশি হবে,তত লাভ।সেই লাভের সঙ্গে যুক্ত পুঁজির নিবেশ।লাভ তাতে সরকারের, এবং লাভ তাঁদের যারা ওই পুঁজির মালিকদের সঙ্গে সরকারে  রফা করিয়ে দেন।এই কারণেই একদিকে জিও ইনস্টিটিউট কে  সরকার সেন্টার অফ এক্সসেলেন্স তকমা দিতে চাইছেন বলে অভিযোগ ওঠে, কারণ জিও শুধু রিলায়েন্সের মুকেশ আম্বানির বলে নয়, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র ভর্তি হওয়ার আগেই ঘোষণা করে দেওয়া হল,অথচ দুশো বছর ধরে চলে আসা দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ নোবেলজয়ীর প্রতিষ্ঠান হয়েও এদেশের  সেন্টার অফ এক্সসেললেন্স তকমাটা পেল না।রাজনীতি তাই সবেতেই।যুব সমাজকে পথ দেখানোর কথা ভাববে কে?

 

   এই সমস্যা শুধু উচ্চ শিক্ষার কোনো একটি বিশেষ ক্ষেত্রে  নয়।প্রাক প্রাথমিক থেকে একেবারে ডাক্তারি ,ইঞ্জিয়ারিং, আইন, বি এড সব ডিগ্রি লাভের ক্ষেত্রেই এক বিরাট অঙ্কের বেসরকারি লগ্নি গাঁটছড়া বেঁধেছে সরকারের সঙ্গে।বেসরকারি পুঁজির কাছে সেটা যেমন বিশাল মুনাফার সম্ভাবনা আর বিশাল বাজারের হাতছানি,তেমনি সরকারের কাছেও দায় হীন  জি ডি পি বাড়ানোর সুযোগ।সেটা করতে গিয়ে এখন নিট (NEET) পরীক্ষায় যারা শূন্য বা ২ পেয়েছে,তাদেরও কেউ কেউ মেডিকেলে  ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পাচ্ছে।এটা অবিশ্বাস্য হলেও সত্য।এটার মানে, কড়ি ফেললেই ডিগ্রি।

 

   এমন অবস্থায় ঠিক যা হওয়া সম্ভব,সেটাই এদেশে হচ্ছে।ছাত্র সমাজের কাছে লেখাপড়া হয়ে উঠছে তার জীবিকা অর্জনের এক ভারবাহী উপায়।সমাজেরও সেই ডিগ্রির প্রতিই আস্থা হারিয়ে যাচ্ছে।এক ভয়ংকর অনাস্থার সমাজ তৈরি হচ্ছে।অন্তরে রিক্ত দীর্ন এক অনাস্থার বাতাবরণ তৈরি হচ্ছে।পরিসংখ্যায়ন দেখলে এটা বোঝা যাবে না।সরকার যত দিন যাচ্ছে, তত স্কুল ,কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করছে, কিন্তু তার রাজনৈতিক দখলদারি আর শিক্ষাকে পন্য করে তোলার নিরন্তর বাজারি প্রয়াস শেষ করে দিচ্ছে শিক্ষার মূল লক্ষ্য, যুবসমাজ শুধু বিভ্রান্ত নয়, বিক্ষিপ্ত হয়ে যাচ্ছে বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে। সরকারে যারা আছেন, তারা যদি এই বাস্তব পরিস্থিতি থেকে যুবসমাজকে বাঁচাতে এখন ও  নতুন করে না ভাবেন, তাহলে বুমেরাং হবে এই ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির হারাকিরি।

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com