নীলকণ্ঠ রবীন্দ্রনাথ

 

গল্পের রাজপুত্র ছিলেন রবীন্দ্রনাথ l সুখী রাজপুত্র l সুখ জিনিসটা যদি কাউকে পরিপূর্ণ ভরিয়ে তোলে তো সে রবীন্দ্রনাথ l ঐশ্বর্য প্রতিপত্তি আর সৌভাগ্য-খ্যাতি  তাঁর গলার হার l ছোটবেলা থেকে এ ধারণা অন্তত আমাদের মনে বদ্ধমূল l তাঁকেই আমরা একমাত্র সুখী মানুষ বলে ভাবতে শিখেছি l “সোনার চামচ” হাতে নিয়ে যাঁর জন্ম আমাদের রূপকথার সেই সুখী রাজপুত্রের গল্প আজ আমি বলব না, বলব দুঃখী এক রাজপুত্রের কাহিনী, ওই সুখী মানুষটার আর এক দুঃখময় সত্তার কথা l

 

   আপাতদৃষ্টিতে সুখ আর খ্যাতি যাঁকে মণিমালার মত বেষ্টন করে ছিল বলে আমাদের ধারণা, আসলে সেই রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত অসহায় দুঃখী এক মানুষ l বাস্তবের নিষ্করুণ কলঙ্ক বার বার জর্জরিত করেছে তাঁর সুন্দর কবিমনকে l ব্যক্তিজীবনের নানান বেদনাময় আঘাত তাঁকে বিমূঢ় করেছে, করেছে বিভ্রান্ত l একটার পর একটা দুঃখের অগ্নিশলাকায় তাঁকে বিদ্ধ হতে হয়েছে ক্রমাগত l বিশ্বকবিকে বহন করতে হয়েছে অনেক গ্লানি অপবাদ আর মিথ্যা কলঙ্কের চাপানো বোঝা l সে বোঝা এমনই দুঃসহ হয়েছে যে, কবি বহন করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন l এক সময় আত্মহত্যার কথাও ভেবেছিলেন l সখেদে বলেছেন, আমার দেশ আমাকে  যত ছোট করেছে, অপরে তা করতে সাহস পায় নি l

 

   কী ব্যক্তি-জীবনে, কী সমাজ-জীবনে কী সাহিত্য-জীবনে কবিকে যে নিদারুণ আঘাত ও অপমান সহ্য করতে হয়েছিল তা অভাবনীয় l  একমাত্র রবীন্দ্রনাথ বলেই বোধহয় সম্ভব হয়েছিল সে আঘাত বুক পেতে নেওয়া l  কবির সেই দুঃখের কাহিনী শুনলে কোথায় মিলিয়ে যাবে আমাদের মনগড়া সুখী রাজপুত্রের ধারণা l ব্যক্তিজীবনে রবীন্দ্রনাথের আঘাতের সীমা নেই l একের পর এক আচম্বিতে আঘাত এসে তাঁকে ব্যথিত করে তুলেছে lপারিবারিক জীবনে কবি ছিলেন বড় বেদনার্ত l

 

   ব্যক্তিমানুষ রবীন্দ্রনাথের সর্বোত্তম আঘাত স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর অকাল মৃত্যু l মাত্র ২৯ বছর বয়সে পুত্রকন্যাদের রেখে অসহায় স্বামীকে নিরালম্ব করে বিদায় নিলেন তিনি l বড় একান্নবর্তী পরিবার ছিল জোড়াসাঁকোয় l সেই সংসার আগলাতে গিয়ে অত্যন্ত পরিশ্রমের ফলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন, তারই পরিণতি তাঁর  অকাল মৃত্যু l বড়ই মর্মান্তিক সেই মৃত্যুদৃশ্য ! “মৃণালিনী দেবী শেষশয্যা পেতেছিলেন বিচিত্রা বাড়িতে l যে ঘরে তাঁকে রাখা হয়েছিল সেখানে আলোবাতাস ঢোকার রাস্তা ছিল না...স্ত্রীকে একটু শান্তি দিতে রবীন্দ্রনাথকেই চালাতে হয়েছে হাতপাখা l এতবড় বাড়ির অন্য কোনও খোলামেলা ঘরে রোগিনীর স্থান হয়নি l”

 

   স্ত্রীর মৃত্যুর পর শিশু পুত্রকন্যাদের নিয়ে রবীন্দ্রনাথ পড়লেন বিড়ম্বনায় l কে ছেলেমেয়েদের দেখাশোনা করবে? এই বিপদের সময় জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার কবির পাশে নেই l কোনও সাহায্যের হাত তাঁরা বাড়ালেন না l নিজের পরিবার-পরিজনদের এই ব্যবহার

 

   কবিকে খুবই মর্মাহত করেছিল l বাধ্য হয়ে তিনি  সন্তান প্রতিপালনের জন্য খুলনার এক গ্রাম থেকে নিয়ে এলেন রাজলক্ষ্মী দেবী নামে মৃণালিনীদেবীর দূর সম্পর্কের পিসিমাকে l জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মানসিক দূরত্ব বাড়ল যখন তিনি স্থায়ী ভাবে শান্তিনিকেতনে বসবাস করতে আরম্ভ করলেন (১৯০১) l
স্ত্রীর মৃত্যুর কিছুদিনের মধ্যে সেজ মেয়ে রেণুকা ও ছোটছেলে শমীন্দ্রনাথের মৃত্যু পিতা রবীন্দ্রনাথের বুকে চরমতম আঘাত l কবি জীবনে তিনি কত যশস্বী, কত চরিত্রের ভাঙাগড়ার জনক, সেই স্রষ্টার জীবন শূন্য মরুভূমি l রেণুকা যখন ক্ষয়রোগে অসুস্থ, পাহাড়ী এলাকার পাইন গাছের হাওয়া তার স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো, তখন কবির পাশে কেউই দাঁড়ায় নি l অসুস্থ অতবড় মেয়েকে নিজে কোলে করে নিয়ে চড়াইয়ের পর চড়াই ভেঙেছেন পাহাড়ে l শমীন্দ্রনাথ যখন মুঙ্গেরে হঠাৎ মারা যায়, তখন শেকার্ত পিতার পাশে তাঁর পরিবারের কেউ ছিল না, কেবল শান্তিনিকেতনের এক অধ্যাপক ছাড়া l ভাবতেও কষ্ট হয় l

 

   কবি বিহারীলাল চক্রবর্তীর বড়ছেলে শরতের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ তাঁর আদরের বড়মেয়ে মাধুরীলতার বিয়ে দিয়েছিলেন l কিন্তু সে বিয়ে সুখের হয়নি  l জামাই শরত নানাভাবে কবিকে হেনস্থা ও অপমান করতেন l চেয়ারে দু’পা তুলে কবির সামনেই সিগারেট খেতেন l সে যে কী লজ্জার l সেই জামাই শরত শেষ পর্ষন্ত বিশ্বখ্যাত শ্বশুরের নামে আদালতে মামলা করেছিলেন l এমনি ভাবে বার বার বেদনায় নীলকণ্ঠ হয়েছিলেন l নিজের পুত্র রথীন্দ্রনাথের কাছ থেকেও চরম আঘাত পেয়ে হতাশায় আর মনোবেদনায় নির্বাক হয়ে গিয়েছিলেন l
প্রাচীন ভারতবর্ষের শিক্ষাদানের আদর্শে কবিগুরু বিশ্বভারতীতে যে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলন করেছিলেন, তা প্রথমে বহুলোক দ্বারা নিন্দিত হয়েছিল l এমন কি বাইরের ছাত্র আসা তো দূরের কথা, নিজের বাড়ি থেকে মাত্র দু’একজন ছাড়া কেউই বিশ্বভারতীতে অধ্যয়নের জন্য আসে নি l মিথ্যা কলঙ্ক ও অপবাদ দিয়ে কবির এই মহান প্রচেষ্টাকে হেয় করার অনেক হীন চেষ্টাও চলেছিল সে সময় l তাঁর রচনার অপব্যাখ্যা, প্যারোডি, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ কত না হয়েছে l বিরূপ সমালোচনায় তাঁকে জর্জরিত করেছে স্বদেশ ও বিদেশের সমালোচকরা l এই সব পণ্ডিতম্মন্য সমালোচকরা রবীন্দ্রসাহিত্য যথার্থ মনোযোগের সঙ্গে না পড়ে অনেক কটূক্তি করেছেন l কবির সুমহান উজ্জ্বল কবিকৃতিকে অস্বীকার করার কত না হীন অপচেষ্টা হয়েছে সেসময় l তাই তিনি সখেদে লিখেছিলেন—
আমার এ ধূপ না পোড়ালে গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে,
আমার এ দীপ না জ্বালালে দেয় না কিছুই আলো l

   এমনিভাবে কবি নিজের আপনজনদের কাছ থেকে ও বাইরের মানুষদের কাছ থেকে অনবরত যে আঘাত  ও দুঃখ পেয়েছেন, তার সবটুকু বিষ নিজকণ্ঠে ধারণ করে তিনি আমাদের অমৃত বিলিয়েছেন l

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com