ভয়তাড়িত সমাজ (দ্বিতীয় পর্ব)

পরিবারের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

 

    পরিবার ‘অভিব্যক্ত’ হওয়ার ইতিহাস সমাজপাঠের ক্ষেত্রে, তার অভিমুখ নির্ণয়ের জন্য খুবই জরুরী। এই ইতিহাস অবশ্যই পশুজগতে ‘পরিবার’-গঠনের ‘ইতিহাস’ মনে রেখে খুঁজতে হবে। পশুপরিবার গঠনের ‘ইতিহাস’ জীববিদ্যার আলোকে গঠন করা সম্ভব কিন্তু বিষয়টি জীবের উৎপত্তির নানা বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত— তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার বিশ্লেষণ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। আমরা বরং আমাদের সহবাসী কুকুরকে পর্যবেক্ষণ করতে পারি। এমনকি এবিষয়ে গবেষণালব্ধ বয়ান থেকেও যুক্তি তৈরি করা যাবে।

 

   কিন্তু তার আগে অন্তত জৈবসত্তা গঠনের উপাদান বিষয়ে জানা কিছু কথা আমাদের মনে রাখতে হবে। যেমন, জৈব কোষ— মূল উপাদান কার্বন হাইড্রোজেন অক্সিজেন নাইট্রোজেন দ্বারা গঠিত হয়েছে, হয়... সমস্ত জীবজগতের প্রাণধারণের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান কার্বোহাইড্রেড প্রোটীন ও লিপিড— এদের গঠন-উপাদানও ওই চারটি। এছাড়া বিভিন্ন মৌলিক খনিজ পদার্থের কথাও আমাদের মনে রাখতে হবে; যেমন, ক্যালসিয়াম ম্যাগনেসিয়াম সোডিয়াম আয়রন পটাসিয়াম কপার ইত্যাদি। মনে রাখতে হবে একারণে যে, পশুজগৎ ও মনুষ্যজগতে আমরা যা-ই করি না কেন, তাতে এদের ‘ভূমিকা’ আছে। আরও স্পষ্ট করে বলা যায় যে, ‘আমাদের’ কোষ-কলায় নিহিত এদের কার্যকলাপ দ্বারা আমরা (পশু ও মানুষ) চালিত হয়ে চলেছি। যে চারটি জীব বৈশিষ্ট্যের কথা আমরা উল্লেখ করেছি, বলাবাহুল্য, তাদের ‘কার্য-কারণ’ নিহিত রয়েছে ওই সব উপাদানের মধ্যে।

 

   এবার ‘পরিবার’-এ ফেরা যাক। পরিবার— এই শব্দটি একান্তভাবেই মানবপ্রজাতির জন্য, বিশেষ করে শব্দটির ইংরাজি প্রতিশব্দ family-র নিরিখে; শব্দটির আদিরূপ ‘familia’, এর অর্থ ‘একটি ব্যক্তির অধিকারভুক্ত সমস্ত ক্রীতদাস।’ এবং নৃতত্ত্বে ‘পরিবার’কে বলা হয়েছে ‘যৌনমিলনের আদর্শ আশ্রয়’।

 

   এই ‘যৌনমিলন’-অনুষঙ্গে পশুজগতেও কিন্তু পরিবারের একটি রূপ আমরা কল্পনা করে নিতে পারি এবং আমাদের সহবাসী কুকুরের প্রজননঋতু ও সন্তানপালন পর্যবেক্ষণ করে পরিবারের একটি সংজ্ঞা এই মর্মে তৈরি করা যায় যে, দুটি জৈবসত্তার মিলনে সৃষ্ট নতুন নতুন জৈবসত্তার ‘লালন-আধার’ হল পরিবার।

 

   প্রসঙ্গত, পরিবার— এই সংগঠনটির পূর্ববর্তী সংগঠন(প্রকৃতি-নির্মিত)হল সত্তা(নারীসত্তা পুরুষসত্তা)। অর্থাৎ প্রতিটি সত্তা বা  অস্তিত্ব এক-একটি সংগঠন। এর তাৎপর্য এই যে, পরিবার-পরবর্তী যতগুলি সংগঠনের উদ্ভব ঘটেছে তাদের সকলের অন্তরে রয়েছে পরিবার-পূর্ব একক সত্তা(>ব্যক্তি)-র উপস্থিতি।

 

   অতএব, একথা বলা অসংগত হবে না যে, মানুষের যে কোনও সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান নারীসত্তা ও পুরুষসত্তা দ্বারা গঠিত। অর্থাৎ নারী ও পুরুষ সত্তার উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠানকে চালনা করে।

 

   এই সূত্রে আর-একটু বলতে হবে যে, জীববিদ্যার পাঠকমাত্রেই জানেন, বিবিধ বস্তুকণা, জৈবসত্তা গঠনের উপাদান হিসাবে যাদের কথা ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, তারা রাসায়নিক বিক্রিয়ায় ‘প্রোটোপ্লাজম’-এ সংগঠিত হয়েছে। অর্থাৎ জৈব সত্তার পূর্ববর্তী সংগঠন হিসাবে প্রোটোপ্লাজমকে আমরা মনে রাখব। মনে রাখব একারণে যে,  ‘জীবের সমস্ত জীবজ    (biological) ক্রিয়াগুলি প্রোটোপ্লাজমের মধ্যে ঘটে।’ এটা মনে রাখলে ‘কার্য-কারণ’-এর আদি উৎসকে আমরা অনুমান করতে পারব।

 

   কিন্তু একই সঙ্গে স্বীকার করতে হবে, কার্যকারণ-সূত্র ধরে তার ‘স্বরূপ’ নির্ণয় করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। তবে আমরা আশা রাখতে পারি, বংশাণুবিদ্যার গবেষক-ছাত্ররা তা আবিষ্কার করবেন।পরিবার অভিব্যক্ত হওয়ার ‘কার্য-কারণ’ হল যৌনতা। ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস তাঁর গ্রন্থ পরিবার, ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তিৎ-তে পরিবার-বিষয়ে যে আলোচনা তাঁর সমসাময়িক আলোচকদের মতামত উল্লেখ করে রেখেছেন, তার থেকে  প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতিটুক এখানে আমরা রাখছি, “বস্তুত এইসব তথ্যের প্রকৃতি দেখে সৎ লেতুর্ণো স্বীকার করেছেন: ‘স্তন্যপায়ী জীবদের মধ্যে মানসিক উন্নতির স্তরের সঙ্গে যৌন সম্পর্কের রূপের আদৌ কোন নির্দিষ্ট সম্বন্ধ দেখা যায় না।’ এবং এস্পিনাস খোলাখুলি বলেছেন, ‘পশুদের সর্বোচ্চ যে সামাজিক সংগঠন দেখা যায় সেটা যূথ। এই যূথ বহু পরিবার নিয়ে গঠিত মনে হয়, কিন্তু গোড়া থেকেই পরিবার ও যূথ পরস্পর বিরোধী এবং তাদের বিকাশ ঘটে পরস্পর বিপরীত অনুপাতে...’ এস্পিনাস চমৎকার বিবরণ দিয়েছেন কেমন করে সঙ্গম ঋতুর সময়ে মর্দাদের মধ্যে ঈর্ষার ফলে প্রত্যেকটি পশুযূথের বাঁধন আলগা হয়ে যায় অথবা সাময়িকভাবে ভেঙে যায়।”

 

   আমাদের মনে প্রশ্ন জাগছে, কোন কার্য-কারণ সমন্ধে পশুজগতে ‘ঈর্ষা’ উদ্ভূত হয়েছিল? আপাতত জানার উপায় নেই। তবে তার কেন্দ্রে রয়েছে যৌনতা— এটা হলফ করে বলা যায়। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে— পশুস্তর থেকে তার বেরিয়ে আসা সম্পর্কে বলতে গিয়ে এঙ্গেলস ‘ঈর্ষা’কে গুরুত্ব দিয়ে এমনটা বলতে চেয়েছেন যে, ‘পশুত্ব থেকে মানবত্বে উৎক্রমণ পর্বে’ কারণ-শক্তি হিসাবে সমজের উপর ক্রিয়াশীল ছিল মর্দাদের ঈর্ষামুক্তি; অন্তত তাঁর বয়ান থেকে আমাদের তেমনই মনে হয়েছে। যেমন তিনি বলছেন, “প্রাপ্তবয়স্ক মর্দাদের মধ্যে  পরস্পর সহিষ্ণুতা, ঈর্ষা থেকে মুক্তিই হচ্ছে সেইসব বৃহৎ এবং স্থায়ী যূথ গঠনের প্রথম শর্ত, যার মধ্যে দিয়েই কেবল পশুস্তর থেকে মানুষে উৎক্রান্তি সম্ভবপর হয়েছে।”

 

   কিন্তু মনুষ্যচরিত্রে ঈর্ষা এক প্রবল রিপু। কোনও যুক্তির অবতারণা না করেই একথা বলা অসংগত হবে না যে, মানুষের পরিবারে ঈর্ষা রয়েছে। পরিবার থেকে সমাজ, অতএব সমাজ ঈর্ষার লালনক্ষেত্র— সমাজ থেকে রাষ্ট্র এসেছে বলে রাষ্ট্র ঈর্ষামুক্ত হতে পারে না। এবং প্রতিটি সংগঠনের মধ্যে ঈর্ষার বিপরীত ভাবনা যা ‘সহিষ্ণুতা’র অনুগামী, থাকবে।   

তাহলে রাষ্ট্রীয় জীব হিসাবে আমরা ঈর্ষাকে আত্মধ্বংসের কারণ-শক্তি রূপে শনাক্ত করতে পারি!

 

চার

 

   তাহলে এই কথা বলা যায় যে, পশুজগতে বিদ্যমান ঈর্ষার বিপরীত শক্তি হিসাবে সহিষ্ণুতার উদ্ভব না হলে পশুজগৎ থেকে একদল পশু বিচ্ছিন্ন হয়ে মানুষ হয়ে উঠত না।

 

   মনে রাখতে হবে, কালক্রমে মানুষ হয়ে উঠেছে পশুজগতের প্রভু। এর আরও একটি তাৎপর্য আছে— পশুজগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া মানে প্রকৃতি থেকেও মানুষের আপাত বিচ্ছিন্ন হওয়া।– এবিষয়ে উদাহরণ সহ কোনও আলোচনা আমরা রাখছি না। শ্রদ্ধেয় পাঠক তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা থেকে উদাহরণ চয়ন করতে পারবেন। আমরা বরং ‘ঈর্ষা’ সম্বন্ধে— আমাদের প্রশ্নটা রাখি: আমরা যদি ধরে নিই পশুজগতে ঈর্ষা প্রথমে উপ্ত হয়েছিল মর্দাদের মধ্যে— তাহলে প্রশ্ন, ঈর্ষার কার্য-কারণ কী? সঙ্গম ঋতুতে মদ্দাদের মধ্যে ঈর্ষা মানেই যৌন ঈর্ষা। পশুজগতে যৌন ঈর্ষার কার্য-কারণ যদি জানা যায় তা হলে মনুষ্যজগতে চলমান ‘অসহিষ্ণুতা’র উৎস হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে।

 

   এটা অনুমান করা সম্ভব যে, পশুজগতে পুরুষপশুর যৌন ঈর্ষার কারণ প্রাকৃতিক— প্রকৃতির নিয়মেই তা ঘটে অর্থাৎ ঈর্ষা ব্যাপারটা প্রকৃতিগত। এর অর্থ, এক, জন্মগত— সাধারণভাবে এটাই আমরা বুঝি। অর্থাৎ পুরুষজীব যেসব উপাদানে গঠিত তাদের অবিরত একক ও পারস্পরিক নানাবিধ কার্যকলাপের অন্যতম বহিঃপ্রকাশ হল ঈর্ষা; আর দুই, ‘প্রকৃতির নিয়ম’ মানে প্রকৃতিজগতের নিয়ম— জীবজগৎ-এর অস্তিত্ব রক্ষাকারী প্রকৃতির মূল নিয়মটি হল ‘খাদ্য-খাদক’ সম্পর্কের নিয়ম— এই নিয়ম থেকেই যৌন ঈর্ষার উৎপত্তি।

 

   এর থেকে অন্য একটি অনুমিত পাঠ আমরা এই মর্মে নিতে পারি যে, জীব সৃষ্টির উপাদানগুলির মধ্যেই কারও কারও পারস্পরিক সম্পর্ক ‘খাদ্য-খাদকে’র থাকা সম্ভব। এই অনুমান থেকে আমরা আর-একটি অনুমানে যেতে পারি-- উপাদানগুলির মধ্যে এমন উপাদান আছে যাদের পারস্পরিক কার্যকলাপ থেকে উপ্ত হয়েছে যৌন ‘সহিষ্ণুতা’।  

 

   এখন প্রশ্ন হল, মদ্দাদের যৌন ঈর্ষার ক্ষেত্রে মাদিদের ভূমিকা কী? এই প্রশ্নের উত্তরের ক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রত্যেকটি জীব কোনও না কোনও জীবের ‘খাদ্য’। একই সঙ্গে সে ‘খাদক’ও। খাদ্য-খাদক সম্পর্কে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষেত্রে মাদি জীব প্রকৃতিগতভাবেই অসুবিধাজনক অবস্থায় থাকে, বিশেষ করে গর্ভধারণের পর থেকে প্রসব ও তৎপরবর্তী সময়ে যতক্ষণ না শাবক ‘আত্মরক্ষা’ করতে শেখে। এই সময়পর্বে নিরাপত্তার জন্য মাদিসত্তা ‘চাইবে’ এমন পুরুষসত্তা নির্বাচন করতে যে তাকে ‘সুরক্ষা’ দিতে পারবে। অর্থাৎ সে ‘যোগ্যতম’কে নির্বাচন করবে। মাদিদের এই ‘চাওয়া’ই মদ্দাদের মধ্যে যৌন ঈর্ষার কারণ। বলা বাহুল্য এই ঈর্ষার পরিণতি প্রায়শই ‘রক্তাক্ত’— কুকুরের প্রজনন ঋতু পর্যবেক্ষণ করলেই ‘রেডি রেফারেন্স’ পাওয়া যাবে।

 

   এর থেকে মনুষ্যজগৎ সম্বন্ধে কোনও সিদ্ধান্ত করা ঠিক হবে না। তবে— ‘তবে অধিকাংশ জন্তুর মতো মানুষের ভিতরেও পুরুষে-পুরুষে দ্বন্দ্ব মেয়েদের ভিতরকার দ্বন্দ্বের চাইতে বেশি।’ জীনের লিখন বইতে পড়া কথাটা মনে পড়ে গেল। বইটির লেখক বংশাণুবিদ্যার অধ্যাপক স্টিভ জোন্স(ভাষান্তর: শত্রুজিৎ দাশগুপ্ত) ‘স্ত্রী-পুরুষের দ্বন্দ্ব’-পরিচ্ছেদে পশুজগতের যৌনতা বিষয়ে তুলনামূলক নানাবিধ আলোচনা রেখেছেন, প্রসঙ্গত এসেছে মানুষের কথা— মানুষ সম্বন্ধে সিদ্ধান্তের আভাস কথাটার মধ্যে আছে। তাকে আর-একটু পরিষ্কার করার জন্য আমরা জোন্সকে উদ্ধৃত করব। ওই কথাটির পরেই তিনি লিখছেন, “পুরুষমানুষ হওয়া একটা বিপজ্জনক ব্যাপার। জন্মের সময় প্রতি ১০০ জন পুরুষ পিছু ১০৫ জন নারী থাকে, কিন্তু ষোল বছর বয়সে এটা কমে ১০৩ জন পিছু ১০০ জনে এসে দাঁড়ায় এবং সত্তর বছর বয়সে এলে পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা হয় দ্বিগুণ। পুরুষদের দুর্ঘটনা বেশি হয়, সংক্রামক ব্যাধিও হয় বেশি এবং পরস্পরকে হত্যার ঘটনাও স্ত্রীলোকদের তুলনায় পুরুষদের ভিতর বেশি। হত্যায় তো পুরুষদের প্রায় একচেটিয়া অধিকার, লন্ডন এবং ডেট্রয়েট— উভয় স্থানেই হত্যার হার সর্বোচ্চ পৌছায় পঁচিশ বছর বয়সে (যদিও লন্ডনের তুলনায় ডেট্রয়েটে বাস্তব হার চল্লিশ গুণ বেশি)। এটা প্রজননের সেরা বয়স” (গুরুত্ব আরোপ আমাদের)।এই কথাটার মধ্যে এই ইঙ্গিত পাওয়া সম্ভব যে, এই হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষে রয়েছে যৌন ঈর্ষা। আবার অর্থনীতি ও যৌনতা(খাদ্য ও যৌনতা)-র নিরিখে দুটি ভিন্ন ভিন্ন দেশের দুটি সভ্য শহুরে যুবকদের পারস্পরিক হত্যার পরিসংখ্যানে এমন ফারাক আমাদের মনে অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়, কেননা আমরা একদা তৃতীয় বিশ্বের মানুষ, একসময় ‘লন্ডন’-এর অধীন ছিলাম, এখন যুক্তরাষ্ট্রের(ডেট্রয়েট) পুঁজির প্রভাবে আছি— আমাদের কলকাতা কি দিল্লিতে যত যুবক খুন হয় অনুমান করা যায় তাদের একটা বড় অংশ যৌন ঈর্ষার ‘শিকার’।  

 

   এর সঙ্গে আর একটি তথ্য আমরা উল্লেখ করব, আমাদের দেশে ১০০০ পুরুষ পিছু ৯৪৩ জন নারী। আর ১০০০ জন পুরুষ শিশু পিছু ৯১৯ জন মেয়ে শিশু(জনগণনা ২০১১)। জোন্সের তথ্যের সঙ্গে আমাদের দেশের তথ্য মিলছে না। কিন্তু একটা প্রশ্নের জায়গা  তৈরি করে দিয়েছে— পুরুষের যৌন ঈর্ষা কি নারীকেও হত্যা করে? এই প্রশ্নের উত্তর ‘সদর্থক’ ধরলে নারীর প্রতি ক্রমবর্ধমান দুষ্কর্মের নতুন এক মনস্তাত্ত্বিক ‘কারণ’ আছে বলে মনে হয়। যা পশুমনস্তত্ত্বে নেই। অর্থাৎ যৌনতার প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরে তা ঘটছে(যেমন ভ্রূণের লিঙ্গ নির্বাচন, কন্যাভ্রূণ হত্যা)।

 

   এবং মনে রাখতে হবে, মানুষের ঈর্ষা আর কেবল ‘যোনিজ’ নয়, তা আরও আরও বস্তুবিশ্বের সঙ্গে যুক্ত হয়ে  নারী-পুরুষ নির্বিশেষের জন্য নতুন প্রতিশব্দ তৈরি করেছে, মাৎসর্য! শব্দটির ‘দার্শনিক’ প্রয়োগ আছে, বিশেষ করে ভারতীয় দর্শন যে মুক্তির কথা বলে তার অন্তরবস্তুতে রয়েছে কাম ক্রোধ লোভ মোহ মদ মাৎসর্য— আমাদের শরীরের মধ্যে বসত করা শত্রু, রিপু নামে আখ্যাত; বৌদ্ধ দর্শন এদের ‘মার’ আখ্যা দিয়েছে; পাশ্চাত্য দর্শনে, এরা ‘পাপ’— এদের কবল থেকে মুক্তির কথা বলে দর্শন।

বলা বাহুল্য, যে-ঈর্ষা পশুজগতে প্রকৃতিগত ও বংশবিস্তারে সহায়ক, তা-ই মনুষ্যে বাহিত হয়ে তার ‘স্বকৃতি’র স্পর্শ পেয়ে হয়ে উঠেছে অন্যতম রিপু, আত্মনাশক ও বংশবিস্তারবিরোধী!  

 

পাঁচ

 

   সমজ > সমাজ— কার্য-কারণ সূত্র ধরে আত্মধ্বংসের কারণ যেন খানিকটা অনুমান করা যায়, এক কথায় তা যৌনশক্তির বিকৃতি। কিন্তু যে তিনটি চলমান ‘ঘটনা’র প্রেক্ষিতে আমরা এই আলোচনায় প্রবৃত্ত হয়েছিলাম তার মধ্যে ‘ধর্ষণ’— যৌনশক্তির বিকৃতি হেতু ঘটতে পারে। কিন্তু তা ‘কারণ’ কি না বলা মুশকিল। কেননা আর দুটি চলমান ঘটনা্(রাষ্ট্র ও ধর্ম-রাজনীতি)-র সঙ্গে প্রত্যক্ষত যৌনশক্তির সম্বন্ধ নেই।

 

   তবে পরোক্ষ সম্বন্ধ থাকা সম্ভব। তত্ত্বের নিয়মে এটা মনে রাখতে হবে। এবার একটা ‘ঘটনা’— ধর্ষণের ঘটনা আমাদের ‘চয়ন’ করা উচিত।

 

   কিন্তু তার আগে কতকগুলি বিষয় আমাদের একটু গুছিয়ে নিতে হবে। যেমন, ১। সমজ থেকে সমাজের চলন বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে, সমাজ থেকে রাষ্ট্রের উৎপত্তি ও পারস্পরিক সম্পর্ক সম্বন্ধে কোনও কথা বলার সুযোগ হয়নি, এটা বলতে হবে; ২। মানুষের যৌনতা সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণা রাখতে হবে; ৩। ধর্ষণের সমাজমনস্তত্ত্ব... এসব বলতে হবে একারণে যে, আমরা যে ঘটনাকেই ‘স্টাডি মেটেরিয়াল’ হিসাবে চয়ন করি না কেন তা ঘটেছে— এক কথায় রাষ্ট্রীয় পরিসরে।

 

রাষ্ট্র হিংসার/নৈতিকতার সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান

 

   আমরা সকলেই রাষ্ট্রের ‘নাগরিক’— রাষ্ট্র সম্বন্ধে সকলেরই কমবেশি ‘ধারণা’ আছে তবু কতকগুলি বিষয়ের উল্লেখ করতে হবে যাতে আমাদের আলোচনার ভিতর-বাইরে নিহিত ‘কার্য-কারণ’ সহজে ধরা যায়।

 

  আমরা যদি ‘আত্মধ্বংস’কে বিষয় ধরি তাহলে প্রথমে যে শব্দটি আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায় তা হল ‘ব্যক্তি’— দেহ-মন বিশিষ্ট এক জৈব সত্তা, যে পরিবারবদ্ধ ও নানান সামাজিক সত্তায় তার ব্যক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর পর ব্যক্তি > পরিবার— পরিবারের যে সংজ্ঞার মধ্য দিয়ে আমরা এসেছি তা মনে রেখে পুনরুল্লেখ করা জরুরী যে, নারী-পুরুষের যৌন তাড়না সম্পর্ক তৈরি করে পরিবারে ‘প্রতিষ্ঠা’ পায়; যৌনসম্পর্ক প্রাকৃতিক বিধির অধীনে থাকার ফলে অস্তিত্বের সংকট দেখা দিয়েছিল(মদ্দাদের মধ্যে পারস্পরিক ঈর্ষা) তা থেকে গড়ে ওঠে নৈতিক বিধি ইতিপূর্বে তাকে ‘সহিষ্ণুতা’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। মানুষের পরিবার পত্তনের ‘কার্য-কারণ’ সম্বন্ধের মধ্যে নিহিত রয়েছে নৈতিক বিধি আর নিরাপত্তার অভাবজনিত(ভয় >) প্রেরণা। মানুষের জৈব অভিব্যক্তির এই পর্ব, আসলে যা সমাজকাঠামোর নির্মাণপর্ব, একটু বিশদ করা প্রয়োজন, কেননা ‘প্রাকৃতিক বিধি’— এই কথাটার সূত্র ধরে আমরা প্রকৃতির সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্ক আন্দাজ করতে পারি— তা বিরোধমূলক। এই বিরোধের স্বরূপ যার যার মতো করে আমাদের জানা আছে। মূলত তা মানবীয়। অর্থাৎ প্রকৃতি এই বিরোধ সম্বন্ধে ‘সচেতন’ নয়— এবিয়য়ে আমরা সহমত। ব্যক্তিকে এই বিরোধ সম্বন্ধে ‘সচেতন’ করে তোলে ব্যক্তিতে নিহিত প্রকৃতি আর পরিণামে সে হয়ে ওঠে ‘জ্ঞেয়’— মানুষ প্রথমে ‘প্রাকৃতিক বিধি’কে অনুভব করতে শিখেছে তারপর সে ক্রম আবিষ্কারের পথে(বিজ্ঞান)... পুনরুক্তির দোষ ঘটিয়ে আবারও বলা যাক, ব্যক্তি-ব্যক্তিতে যে মৌল সম্পর্ক, তার যে প্রেরণা(<যৌনতা <প্রজনন) তা প্রাকৃতিক বিধি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও সম্পর্কটি পরিবার পত্তন করেছে— খাদ্যসংগ্রহ ও সন্তানপালনের জন্য প্রকৃতির নিয়মের বিরোধিতা করতে হয়েছে, পরিণামে উদ্ভাবন হয়েছে নৈতিক বিধির।

 

   এই খাদ্যসংগ্রহ ও সন্তানপালনের সূত্র ধরেই মানুষ হয়ে উঠেছে খাদ্য উৎপাদক ‘রাজনৈতিক জীব’। ক্রমে আমাদের পূর্বসূরিদের দেখানো পথে আমরা দেখব সে সমাজ গঠন করছে, সমাজ থেকে রাষ্ট্র। আবারও পুনরুক্তি করে বলা যাক যে, সমাজ ও রাষ্ট্রের একক প্রতিষ্ঠানটি হল পরিবার, নৃতত্ত্বের ভাষায় যৌন মিলনের আদর্শ আশ্রয়, অর্থনীতির ভাষায় শ্রম যোগানের ইউনিট— এর অর্থ যৌনতা ও খাদ্য বিষয়ক নিরাপত্তার জন্য সমাজ ও রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে। এই জন্যই তা আজও বহাল আছে। ভবিষ্যতে রাষ্ট্র থাকবে কি না তা নির্ভর করবে মানুষের চূড়ান্তভাবে মানবিক(< সহিষ্ণু) হওয়ার উপরে। অন্যকথায় বলা যায়, যে-কারণে রাষ্ট্র তৈরি হয়েছিল সেই কারণ না-থাকলে আর রাষ্ট্র থাকবে না।

 

   রাষ্ট্রের উৎপত্তি— এ বিষয়ে নানা মত আছে। একুশ শতকের বুর্জোয়া সংবাদপত্র তার সম্পাদকীয় কলামে যখন এই মন্তব্য করে যে, ‘রাষ্ট্র স্পষ্টতই হিংস্রতায় বিশ্বাসী।’  তখন উনিশ শতকীয় রাষ্ট্রদর্শন অনুসারে  ‘রাষ্ট্র শোষণ নিপীড়নের যন্ত্র’, ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস’ ইত্যাদি কথাগুলির বামপন্থী ব্যবহার নতুন মাত্রা পেয়ে যায়; উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের উৎপত্তি বিষয়ক ‘মার্ক্সীয়’ তত্ত্ব— ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের যে বইটি থেকে এই আলোচনায় উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে, সেখান থেকেই রাষ্ট্র বিষয়ক উদ্ধৃতি রাখব রাষ্ট্রের স্বরূপ বোঝার জন্য:  “অতএব রাষ্ট্র কোনক্রমেই সমাজের উপর বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া একটি শক্তি নয়;  যেমন একে বলা যায় না  ‘নৈতিক ধারণার বাস্তবরূপ’  অথবা  ‘যুক্তির প্রতিমূর্তি ও বাস্তবতা’  যেমনটি হেগেল দাবি করেছেন। পরন্তু এটি বিকাশের একটি বিশেষ স্তরে সমাজ থেকেই উদ্ভূত; সমাজ যে নিজের ভিতরকার সমাধানহীন বিরোধগুলির মধ্যে একেবারে জড়িয়ে পড়েছে, এমন অনপনেয় দ্বন্দ্বে সে বিভক্ত যার নিরাকরণ করতে সে অক্ষম, এটি তারই স্বীকৃতি। কিন্তু যাতে এইসব বিরোধ, বিরোধী অর্থনৈতিক স্বার্থসম্বলিত শ্রেণীগুলি নিজেদের এবং সমাজকেও নিষ্ফল সংগ্রামের মধ্যে ধ্বংস করে না ফেলে তাই দরকার হল এমন একটি শক্তি যা আপাতদৃষ্টিতে সমাজের ঊর্ধ্বে থেকে এই সংগ্রামকে সংযত করবে, একে ‘শৃঙ্খলা’র চৌহদ্দির মধ্যে রাখবে। এবং এই যে শক্তি সমাজ থেকে উদ্ভূত হয়ে তার ঊর্ধ্বে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে এবং ক্রমাগত সমাজ থেকে পৃথক হতে থাকে, এই শক্তি হল রাষ্ট্র।”  এই উদ্ধৃতির মধ্যে রাষ্ট্র যে ‘শোষণ নিপীড়নের যন্ত্র’ এমন কোনও ভাবনা নেই। একমাত্র ‘শৃঙ্খলা’ শব্দের অনুষঙ্গ ধরে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস’-এ পৌঁছানো সম্ভব। কেউ বলতে পারেন, রাষ্ট্রই যে সন্ত্রাসের আঁতুড় ঘর— এবিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই, যুক্তি হিসাবে সন্ত্রাস-প্রতিসন্ত্রাসের তত্ত্ব ব্যবহার করা হতে পারে— এসব মেনে নিয়েও আমরা বলব, তত্ত্বের নিয়মে রাষ্ট্র নেতিবাচক হলে, একই সঙ্গে তা সদর্থকও— উদ্ধৃতির মধ্যে রাষ্ট্র সম্বন্ধে সদর্থক ধারণা পাওয়ার মতো যথেষ্ট উপাদান রয়েছে। যেমন, রাষ্ট্র ‘সমাজ থেকেই উদ্ভূত’— সমজ > সমাজ মনে রাখলে আমরা দেখব কর্মজীবী মানুষের পরিবার জন্ম দিয়েছে সমাজকে— এই সূত্রে আরও একবার মনে করতে হবে যে, বেঁচে থাকা, যৌনতা ও বাঁচিয়ে রাখার প্রাকৃতিক অনিবার্যতাকে জয় করার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে নৈতিক বিধি; অর্থাৎ পরিবারের নৈতিক বিধি সামাজিক বিধিতে রূপ পেয়েছে।

 

   তাহলে একথাও বলা যেতে পারে যে, রাষ্ট্র সম্বন্ধে হেগেলের ধারণাকে নস্যাৎ করা যায় না— যেহেতু সমাজ > রাষ্ট্র সেহেতু রাষ্ট্রীয় বিধিতে ‘নৈতিকতা’ থাকবে এটা স্বতঃসিদ্ধ। একটা ক্লিশে উদাহরণ দেওয়া যাক, বৃদ্ধ বয়সে পিতা-মাতাকে সেবা-শুশ্রূষা দেওয়ার ব্যাপারটা পরিবারের নৈতিকতা, সমাজ তাকে মান্যতা দিয়েছে বলেই তা সামাজিক বিধি এবং এই নৈতিকতার পতন দেখা দেওয়ায় সমাজের তরফ থেক রাষ্ট্রের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে, তৈরি হয়েছে রাষ্ট্রীয় বিধি— বৃদ্ধ বয়সে সন্তানের কাছ থেকে ‘সেবা-শুশ্রূষা’ পাওয়া একটি আইনি অধিকার। এর থেকে একটি সরল সিদ্ধান্ত আমরা রাখতে পারি, যে কোনও সদর্থক আইন অন্তরবস্তুতে নৈতিকতার রক্ষক। এই সূত্রে রাষ্ট্রকে নৈতিকতার সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান হিসাবে গণ্য করা যায়।

তা যদি হয়, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে যেসব হত্যার ঘটনার সঙ্গে রাষ্ট্র প্রত্যক্ষ-পরোক্ষে জড়িত, সেখানেও তো আইনি সাপোর্ট রয়েছে, সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে আমরা কী বলব?

 

   অর্থাৎ সেই আইনের নিরিখে রাষ্ট্রকে কী বলা উচিত? অবশ্যই রাষ্ট্রকে আমরা হিংসার সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান বলব! এর তাৎপর্য এই যে, রাষ্ট্র-তত্ত্বটিও binary – ‘হিংসা’ প্রকৃতিগত কিন্তু প্রকৃতিতে হিংসা-শব্দটি নেই  তাহলে খাদ্য-খাদক ক্রিয়াকর্ম চালানো যেত না; মানুষের নৈতিক দৃষ্টিকোণ শব্দটি তৈরি করেছে, তার অন্তঃপ্রকৃতি হিংসাকে ‘লালন’ করে বলে।

 

   এবং একই সঙ্গে সে-কিন্তু হিংসা(ঈর্ষা < যৌনতা)-কে বর্জনও করতে চায়। মনে রাখবার বিষয়, মনুষ্যপ্রকৃতির এই বৈশিষ্ট্যই রাষ্ট্রচরিত্রে বর্তেছে। অর্থাৎ রাষ্ট্র-তত্ত্ব বিচারে, তার চরিত্র বিশ্লেষণে ‘যৌনশক্তি’কে মনে রাখতে হবে।

 

ভিন্ন ভিন্ন পূর্বপুরুষের বংশাণুকে একই ব্যক্তির ভিতরে একত্রিত করার প্রক্রিয়ার নামই যৌনতা

                                   স্টিভ জোন্স

 

   মানুষপ্রজাতির যৌনতা— নারীকেন্দ্রিক, এটা কমবেশি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সাহিত্যপাঠ ইত্যাদির মাধ্যমে পুরুষ যেমন জানে, তেমনই নারীও জানে। এবং সংস্কৃতিগতভাবেও বিশেষ করে পুরুষ জানে, ‘অন্নগত প্রাণ আর যোনিগত মন’— কথাটার মাধ্যমে তার প্রকাশ আমরা অনেকেই লক্ষ করেছি। বয়সন্ধির অভিজ্ঞতা ও বয়সন্ধির পাঠ একই কথা বলবে।

 

   তবু নারীর প্রতি অন্যায়-অবিচার-দুষ্কর্মের প্রেক্ষিতে কি মনে হয় না যৌনতাকে নিয়ন্ত্রণ করছে পুরুষ?

 

   অর্থনৈতিক জীব হিসাবে বিচার করলে তা-ই মনে হবে। কিন্তু প্রকৃতিগতভাবে বিচার করলে, এমনকি সংস্কৃতিগত ভাবে পর্যবেক্ষণ করলেও যৌনতাকে নিয়ন্ত্রণ করছে নারী— শিল্প-সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শনগুলিতে নারীকে ‘নির্মাণ’ করা হয়েছে— নারী শক্তির আধার!

 

   তাহলে শক্তির এমন বিপর্যয় কেন?

 

   এর উত্তর রয়েছে ‘অন্নগত প্রাণ’-এর মধ্যে। এর অর্থ, প্রাণ অন্নে রক্ষিত বা অন্ন > প্রাণ; আমাদের অনেকেরই মনে পড়বে তৈত্তিরীয় উপনিষদের কথা সেখানে আমরা দেখেছি অন্ন > প্রাণ > মন > বিজ্ঞান > আনন্দ— ‘অন্ন’ শব্দের অর্থ ভাত, খাদ্য বা আহার্য। ভাত মানে সিদ্ধ চাল যা ধানগাছ থেকে পাওয়া যায়। আমরা সকলেরই কমবেশি জানি যে, এই জীবগ্রহের সমস্ত প্রাণশক্তির উৎস সূর্য— ‘‘জীববিজ্ঞানের ছাত্র মাত্রই জানেন যে, সূর্যকিরণে উপস্থিত ফোটন কণা হল তাপশক্তির উৎস। একমাত্র উদ্ভিদ এই শক্তিকে শোষণ করতে পারে। এবং তাকে রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে সে নিজে বাঁচে ও প্রাণীজগৎকে বেঁচে থাকার রসদ যোগায়। অর্থাৎ ওই রাসায়নিক শক্তি খাদ্যরূপে গ্রহণ করার ফলে প্রাণীদেহে তা গতিশক্তিরূপে মুক্ত হয়। ফড়িং-এর উড়াল কি পাখির ডানার গতি— তা সূর্য থেকেই এসেছে।...

 

   “তাহলে একজন জীববিজ্ঞানের ছাত্র কেবলমাত্র খাদ্যশৃঙ্খলের নিরিখেই তো এ সত্য সোচ্চারে ঘোষণা করবেন  যে, এ বিশ্বপ্রকৃতিতে কেউ কারও প্রভু নয়! আমরা সকলেই শক্তির মুক্তিদাতা!”(পরিবেশ আন্দোলনের দার্শনিক প্রত্যয়, কণিকা সাহিত্য ২০১৩)।

 

   কিন্ত এই সত্য জানা সত্ত্বেও ঘোষণা করা যায়নি। কেননা মানুষ, বিশেষ করে পুরুষ মানুষ শক্তিকে বেচাকেনা করতে শিখেছে, ‘প্রাণশক্তি’কে সে মজুত করে রাখতে পারে! এইখানে আমরা কল্পনা করে নিতে পারি, প্রকৃতির খাদ্য-খাদক নিয়ম থেকে বেরিয়ে আসার পর, খাদ্যের জন্য নারীকে, বিশেষ করে তার মাতৃত্বকালীন সময়ে, পুরুষের মুখাপেক্ষী হতে হয়েছে— এর থেকে যে সংস্কৃতি(প্রভু-অধীন)গড়ে উঠেছে, তার একদিকে প্রকৃতির উস্কানি অন্য দিকে নৈতিকতার চাপ— এদের থেকে জাত জীবনবোধ নারীর যৌনতার উপর প্রভাব বিস্তার করেছে তার বেঁচে থাকা-বাঁচিয়ে রাখার পক্ষে।

 

   অর্থাৎ মানুষের ‘যৌনতা’ আর কেবল বংশাণুবিদ্যার সংজ্ঞা মাফিক থাকল না, বিশেষভাবে ‘নারীর যৌনতা’ হয়ে উঠল সংস্কৃতির অন্তরালবর্তী কেন্দ্রীয় চরিত্র— অজাচার, যৌনপ্রেম, পরকীয়া... শিল্প-সাহিত্যে, ধর্ম-দর্শনে   কত না তার প্রকাশ!

তবু প্রকৃতিগতভাবে যৌনতা নারীকেন্দ্রিক থাকবে, অন্তত পুরুষের ‘যৌনতা’র নিরিখে। এখানে আর একটু প্রগলভ আমাদের হওয়া উচিত— যৌনতা < যোনি; যোনি, ইংরেজি প্রতিশব্দ vagina, অর্থ মেয়েচিহ্ন; যেমন penis, পুরুষচিহ্ন— শিশ্ন। শিশ্ন ও যোনি উভয়ই জনন-ইন্দ্রিয়। কিন্তু শিশ্ন শব্দটি না কোনও বিশেষণে, না নতুন বিশেষ্য পদে পরিবর্তিত হতে পারে; যেমন হয়েছে যোনি [> যৌন(বিশেষণ)> যৌনতা(বিশেষ্য)]। অতএব, ‘যৌনতা’র অর্থ, যোনি সম্বন্ধীয় বোধ বা ধারণা।

 

   অতএব, বলা অসংগত হবে না যে, প্রাকৃতিক বিধি ছাড়াও মানুষের যৌনতার অন্য আর-এক অর্থ, যৌনসুখ উৎপাদন।

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com