স্বাধীনতা তুমি কার?

 

 

 

 

বাহাত্তর তম স্বাধীনতাদিবস উদযাপন নিয়ে প্রস্তুতি দেশ জুড়ে। নানা অনুষ্ঠানে স্বাধীনতা তুলে ধরে জাতীয় দিবসে গর্বিত হওয়ার দিন সমাগত।ফি বছরই দিনটি জাতীয় উৎসবের, কিন্তু ফি বছরই দেশটা আরো আরো বেশি অনৈক্যে বিদীর্ণ হতে হতে জাতিসত্ত্বা আজ সংকটে। ঠিক যে উদ্দেশ্যে স্বাধীনতার উদযাপন সেই অখন্ড জাতীয়তাবোধটাই হারাতে বসেছে,সেই জাতীয়তাবোধের স্থানে আমদানি করা হচ্ছে মুসোলিনি -হিটলারের আগ্রাসী জাতীয়তার ধারণা, যা শুধু গোটা দেশকেই  বিপন্ন করে না, জাতিসত্ত্বার প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে তার কাঠামো ভেঙে ছুঁড়ে ফেলে দেয় । নানা জাতির মধ্যে ঐক্যের পরম্পরা, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থানের ইতিহাস মুছে ফেলতে আগ্রাসী হয়ে ওঠে।

 

   আসলে জাতি,জাতিসত্ত্বা,রাষ্ট্র সব ধারণার ভিত্তি ত মানুষ।মানুষের বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা দিতেই এসবের প্রয়োজন।কিন্তু যদি এই ধারণার মোড়কে একটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিহিত থাকে, সেই মোড়কের উপর কোনো এক গোষ্ঠীর তকমা লাগানো থাকে, তাহলে? আধিপত্যবাদের চাপে মৃত্যু ঘটে স্বাধীনতার।বেঁচে থাকার স্বাধীনতা বিকিয়ে যদি বলা হয় আপনার জন্যে আছে পছন্দ করার স্বাধীনতা, তার চাইতে নির্মম পরিহাস ও অদ্ভুতুড়ে কথা কি আছে?

 

   আজ স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে ঠিক এমনই পরিস্থিতির মুখোমুখি অসমে বরাক -শিলচর-কাঁছাড়ের চল্লিশ লক্ষ মানুষ।এদের বলা হয়েছে, তোমরা দেশের শাসন ক্ষমতায় কে থাকবে তা নির্বাচন করো, তোমার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, পছন্দের স্বাধীনতা রাষ্ট্র জানতে চায়,মানতেও চায়। তবুও তুমি এই দেশের নাগরিক না হতেই পারো, তুমি বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী যে নও তার প্রমাণ ত এদেশের ভোটের আই কার্ড নয়।ভোট দিয়ে কি প্রমান হয় তুমি দেশের নাগরিক?

 

   আশ্চর্যের কথা আরো বাকি আছে।যার বাবা নাগরিক বলে নাগরিক পঞ্জিতে চিহ্নিত, তার ছেলের নাকি নাম নেই।তাহলে জন্মসূত্রে দেশের নাগরিক হয় যে আইনে তার কি বিলোপ ঘটে গেল? যদি তাই ই হয়, তাহলে মানুষগুলোকে কেন বলা হচ্ছে, তুমি প্রমান দাও, তোমার বাবা মা এদেশেই জন্মেছিলেন ?যে তার প্রমান দাও!! রাষ্ট্র নিজেই তার স্ববিরোধী প্রক্রিয়ার স্রষ্টা,অনুসরণকারী ও অনুশীলনকারী।সুপ্রিম কোর্ট একটি  সংস্থার আবেদনে সাড়া দিয়ে বলেছেন, খুঁজে দেখো, এদেশের নাগরিক কারা? কিন্তু তাদের এই সিদ্ধান্ত কার্যকর কিভাবে হচ্ছে সেটাও দেখা কি সুপ্রিম কোর্টের কাজ হতে পারে না? ২জি কেলেঙ্কারি তদন্ত হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের নিজের তত্ত্বাবধানে,চল্লিশ লক্ষ মানুষের জীবন মরণ প্রশ্ন, তাদের অস্তিত্ব, পরিচিতির সংকট কাটাতে সুপ্রিম কোর্ট নিজে উদ্যোগী হন, দেখে নিন নাগরিক পন্জিকরনে একজন প্রকৃত ভারতীয় যেন বাদ না পড়েন!!তা হলে স্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকে, নইলে রাজনৈতিক নেতাদের অঙ্গুলিহেলনে স্বাধীন দেশেও পরাধীন হয়ে যেতে হয় কেবলমাত্র একটি কালির খোঁচায়।শুধু এই চল্লিশ লক্ষ নয়, স্বাধীনতার পর সত্তর  বছরে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের বলি হয়ে গৃহহীন জমিহীন ঠিকানাহীন হয়েছে সাত কোটি মানুষ!! সকলেই এ দেশের মানুষ, তাদের কাছে এই স্বাধীনতার কি মানে? সেই ফ্যাকাসে চোখগুলোর সামনে যখন রঙিন বিজ্ঞাপনে লেখা হয়

 

Freedom of Choice SALE
Buy 1kg Get 1kg on Potato
Buy 2 Get 1 on Fruit Juice 1L
Buy 3 Get 1 - Biscuit
Buy 4 Get 1 on Soap

 

   তখন তাদের মনে হয়, এই বাজারি স্বাধীনতা নিয়ে আমি কি করব?

 

   আসলে দেশের মানুষ এখনও বোঝে না যে বাজারি মূল্যেই তারা মূল্যবান।তাই ভোটের বাজারে কিংবা বিলাসী মলের সম্ভারে তাদের জন্যে আছে নিরন্তর হাতছানি, কিন্তু নেই মানুষের মূল্য, মানবিক অধিকার।।নির্বাচনের অধিকার তাই আইনসংগত, কিন্তু দেশের মানুষের পরিচয়  প্রশ্নাতীত নয়।

 

   দেশ। ছোট্ট এই শব্দটাই সব থেকে বড় প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে।ভারত আমাদের দেশ, নাকি রাষ্ট্র? যে কেউ এ প্রশ্ন শুনে বলবে, একি পাগল নাকি, এটা কোন ধরণের প্রশ্ন?

 

   আমারই এখন মনে হচ্ছে, দেশের শাসন ক্ষমতায় যারা আছেন, তাদের সকলের কাছে জিজ্ঞাসা করি, আগে কি সীমানানির্দিস্ট জমি খন্ড নাকি মানুষগুলি যারা এই ভূখন্ডকে নিজের পরিশ্রমে শস্য শ্যামল করেছে, বাদাড়  কেটে বসতি স্থাপন করেছে,শিল্প স্থাপন করেছে,নিত্য এই রাষ্ট্রযন্ত্র সচল রেখেছে।একটা সময় এই অসমে মানুষ থাকত না।তখন ব্রিটিশরা বাংলা থেকে শিক্ষিত মানুষ, বিহার ,মায়ানমারথেকে শ্রমজীবী কিছু মানুষ নিয়ে গিয়েছিল।পরবর্তীকালে তারাই গড়ে তোলে আসামের জনপদ, সরকারি প্রশাসনের চাকা চলতে থাকে তাদের গতর আর মাথার ঘামে।তখন রাষ্টের প্রয়োজন ছিল, তাই বাইরে থেকে আনা হত মানুষ, এখন তাদের প্ৰয়োজন ফুরিয়েছে, তাই নাগরিক তালিকা থেকে এখন তাদের বংশধরদের বাতিল করাটাই কাজ হয়েছে ।এই হলো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, কিন্তু মানুষ ত দেশের মাটির সাথে মিশে থাকে।সে যাবে কোথায়?

 

   রাষ্টের স্বাধীনতা কি তার উত্তর দিতে পারে?রাষ্ট্র স্বাধীন হয়, দেশের মানুষ কি স্বাধীনতার স্বাদ পায়? স্বাধীনতার দায় আমজনতার, আর ক্ষমতা সরকারে আসীন যিনি তাঁর।তাই ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লববাবু কোন দেশের মানুষ, এ প্রশ্ন রাষ্ট্র প্রশ্ন তুলবে না। তিনি স্বাধীনতা দিবসের পতাকা তুলবেন, প্রধানমন্ত্রী লাল কেল্লা থেকে বলবেন, মিত্রো:,কিন্তু তিনি বলবেন কি--যারা নিজ দেশেই পরদেশী যাতে না হয় তার জন্য এখন ছুটছেন এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে, তাদের দেশ কোথায়? 

 

   তিনি বলবেন না জানি। নেহরু বলেছিলেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী বরদোলুইকে।যখন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বরদোলুই স্বাধীনতার পরেই পূর্ব বঙ্গ থেকে আগত জনস্রোতকে দেখিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে বলেছিলেন যে এতে অসমবাসীর জীবন জীবিকার উপর ভয়ঙ্কর চাপ পড়বে, তখন নেহরু,প্যাটেল দুজনেই বলেছিলেন,ওদের চাপ নিতে হবে।কারণ এই দেশভাগের শিকার ওরা।ওরাও এদেশে থাকার অধিকারী।দেশটা ওদের।এটা মেনে নিন।

 

   হায়, সেই দিন নেই।নতুন ভারত রাষ্ট্রের নির্মান যারা করেছিলেন, তাদের কাছে আগে ছিল মানুষ, দেশবাসী, কারণ তারা জানতেন এখানে অনুপ্রবেশকারী ইউরোপের মত নয়।সেখানে অন্য দেশ থেকে আসে।তাও ভিন্ন দেশে তাদের স্থান দেয়। আর এখানে যাদের অনুপ্রবেশকারী ভাবা হচ্ছে, তারা ত এদেশেরই মানুষ।ব্রিটিশের রাজনীতিতে , দেশের রাজনীতিতে  এরা বোড়ে। এই দেশটা ভেঙেই হয়েছে অন্য দেশ, এরা অনুপ্রবেশকারী নন, এরা ছিন্নমূল।মূল ভূখণ্ডে যে ফিরে আসতে চায়, তাকে ফিরিয়ে নেওয়ার দায় এই ভারত রাষ্ট্রেরই।

 

   এই ঔচিত্যবোধ থেকে ভারত রাষ্ট্রের জন্ম। আধুনিক রাষ্ট্র নায়করা তা ভুলে যেতে চাইছেন।কেন্দ্র নীরব, আসামের দেখাদেখি মধ্যপ্রদেশও চাইছে নাগরিক পঞ্জির ছাঁকনিতে নিজের মত করে রাজ্য বাসের অধিকার ঠিক করতে।এভাবে যদি বাকি রাজ্য ঠিক করতে বসে, তাহলে এই দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো টা কেবলই একটি মৃত মানুষের কঙ্কাল হয়ে থাকবে। দেশ হয়ে বাঁচবে না।স্বাধীনতা তুমি কার?এই প্রশ্নের মধ্যেই পালিত হবে ১৫আগস্ট।

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com