বঙ্গবিভাজন ও ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর ভূমিকা

 

ইদানিংকালে অনেকেই দাবী করছেন, ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী না থাকলে পশ্চিমবঙ্গের জন্মই হতো না। ১৯৪৭ সালে স্বাধীন ও পৃথক বাংলার মাধ্যমে আসলে পাকিস্তানের তাঁবেদার একটা রাষ্ট্র গড়ে তোলার প্রক্রিয়া অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছিল। সেদিন যদি ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী তীব্র প্রতিবাদ না করতেন্, তাহলে আজ এই পশ্চিমবঙ্গকে আমরা দেখতেও পেতাম না। আজকাল এই নিয়ে নানাদিকে আলোচনাও চলছে। আর এইভাবে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে  পশ্চিমবঙ্গের জনক বলে প্রতিষ্ঠা করে দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। তাহলে একবার ইতিহাসের বন্ধ পাতাগুলো উলটে দেখা যাক, এই বিষয়ে আসল ঘটনাপ্রবাহ কী। 

 

প্রাক-চল্লিশ

 

   ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে বাংলায় কংগ্রেস ও লিগ যথাক্রমে ৫৪ ও ৩৭টি আসন পেয়েছিল। কিন্তু আবুল কাশেম ফজলুল হকের কৃষক-প্রজা পার্টিও ৩৬টি আসন দখল করে। ফজলুল হক কংগ্রেসের সাথেই মন্ত্রীসভা গড়তে চেয়েছিলেন।তিনি বারবার কংগ্রেসের কাছে প্রস্তাব পাঠান। বাংলার কংগ্রেস নেতৃত্বও এই প্রস্তাবে রাজি ছিলেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আপত্তিতে সেটা আর বাস্তবায়িত হলো না। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে ফজলুল হক মুসলিম লিগের সঙ্গে যৌথ মন্ত্রীসভা গঠন করলেন। ঐতিহাসিক সত্য হলো, কংগ্রেস এগিয়ে না এলেও নিম্নবর্ণের নির্দল হিন্দু প্রতিনিধিরা ফজলুল হককে সমর্থ করলেন। এইভাবে মুসলিম লিগ ক্ষমতার স্বাদ পেল এবং সেটাকে ব্যবহার করেই ক্রমশঃ অন্যান্য মুসলিম দলগুলোকে গ্রাস করতে শুরু করে দিল।

 

   ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে বড়লাট লর্ড লিনলিথগো কেন্দ্রীয় বা প্রাদেশিক সরকারগুলোর সঙ্গে কোনও আলোচনা না করেই মিত্রশক্তির পক্ষে ভারত যুদ্ধে যোগ দিচ্ছে বলে ঘোষণা করেন। বিনা আলোচনায় যুদ্ধ ঘোষণা কংগ্রেসকে ক্ষুব্ধ করে এবং কংগ্রেসের সমস্ত মন্ত্রী পদত্যাগ করেন। কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়া ভারতের আর একটি দলও ভাইসরয়ের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেনি। বরং জিন্নাহ এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে যেখানে যেখানে মুসলিম লিগের শক্তি আছে, সেখানে সেখানেই মন্ত্রীসভা গঠনে উদ্যোগী হন। সবথেকে মজার ব্যাপার এই কাজে তাঁর সহযোগী হয়ে ওঠে হিন্দু মহাসভা। ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর নেতৃত্বে হিন্দু মহাসভাও ১৯৩৭এর নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। কিন্তু আশানরূপ ফল করতে পারেনি। এইবার ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী কংগ্রেসের অনুপস্থিতির সুযোগ নিলেন। সিন্ধুপ্রদেশ ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে হিন্দু মহাসভা ও লিগের মন্ত্রীসভা গড়ে উঠল। এমনকি বাংলায় কোনও প্রয়োজন না থাকলেও হিন্দু মহাসভাকে মন্ত্রীসভায় নেওয়া হল বৃহত্তর ঐক্যের রূপ দেবার জন্য। বোঝাই যাচ্ছে, মুসলিম লিগ বা হিন্দু মহাসভার উদ্দেশ্যই ছিল বৃটিশ সরকারকে খুশি রাখা এবং কংগ্রেসকে বেকায়দায় ফেলে নিজেদের প্রভাব বাড়ানো। 

 
বিভাজন না ঐক্য

 

   ক্ষমতা হস্তান্তরের বিভিন্ন বিষয় নির্ধারণের জন্য ১৯৪৬ সালের ২৩শে মার্চ ক্যাবিনেট মিশনের সদস্যরা ভারতে আসেন। দিল্লীতে কংগ্রেস ও মুসলিম লিগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সাথে ধারাবাহিক আলোচনা চলতে থাকে। গান্ধী ও নেহরুর নেতৃত্বে কংগ্রেস একটি প্রায় সমস্ত ক্ষমতাধারণকারী কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে মত দেয়। প্রাদেশিক সরকারগুলির হাতে তুলনায় কম ক্ষমতা দেবারই তাঁরা পক্ষপাতী ছিলেন। অন্যদিকে জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম লিগ ভারতের ঐক্যের পক্ষে অবস্থান নিলেও মুসলিমদের জন্য রক্ষাকবচ দাবী করেন। বিস্তারিত আলোচনার পর ১৬ই মে ক্যাবিনেট মিশন ভবিষ্যতের রূপরেখা নিয়ে একটি প্রস্তাব পেশ করে।

 

   এই প্রস্তাবে বলা হয় ভারত একটি অখণ্ড দেশ হিসাবেই স্বাধীনতা পাবে এবং স্বাধীন ভারতবর্ষ প্রদেশগুলোর একটি আলগা ধাঁচের কনফেডারেশন হিসাবেই গড়ে উঠবে। প্রতিরক্ষা, অর্থ, কূটনীতির মতো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়গুলি থাকবে কেন্দ্রীয় স্তরে। বাকি সমস্ত ক্ষমতা থাকবে প্রদেশগুলোর হাতে। হিন্দু ও মুসলিমপ্রধান প্রদেশগুলোকে আঞ্চলিক স্তরে আলাদা গোষ্ঠীতে সংযুক্ত করা হবে। উত্তর-পশ্চিমে সিন্ধু, পাঞ্জাব, বালুচিস্থান ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ একটি মুসলিমপ্রধান গোষ্ঠীতে আসবে। পূর্বে বাংলা ও আসাম আসবে এমনই একটি গোষ্ঠীতে। অবশিষ্ট হিন্দুপ্রধান প্রদেশগুলো একটি গোষ্ঠীর মধ্যে আসবে। কেন্দ্রিয়স্তরে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য থাকবে। একদিক থেকে এই প্রস্তাব মুসলিম লিগের লাহোর প্রস্তাবের সাথেই সঙ্গতিপূর্ণ। তাই মুসলিম লিগ এই প্রস্তাবকে সমর্থন করে। কিন্তু গোষ্ঠীভিত্তিক ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রস্তাবে কংগ্রেসের আপত্তি ছিল। কংগ্রেস প্রথম থেকেই একটি প্রবল ক্ষমতাধর কেন্দ্রের পক্ষপাতী ছিল। তাই কংগ্রেস এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে।

 

   ১৯৪৬এর ১৬ই আগস্ট মুসলিম লিগ ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। সেইদিন কলকাতায় নারকীয় দাঙ্গা হয়, কংগ্রেস যার অন্যতম রূপকারের আখ্যা দেয় মুসলিগ লিগের প্রধানমন্ত্রী শহীদ হাসান সুরাবর্দীকে।  ২১ তারিখ লিগ মন্ত্রীসভা বাতিল করে গভর্নরের শাসন চালু হয়। মুসলিম লিগ দাবী করে এই উদ্দেশ্যেই কংগ্রেসের তরফে দাঙ্গায় মদত দেওয়া হয়েছিল। সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি তখন দ্রুত খারাপ হয়ে পড়ছে। নোয়াখালি, ছাপরা, সারন, মুঙ্গের, ভাগলপুর, গড়মুক্তেশ্বরে দাঙ্গা ব্যাপক চেহারা নিল। পরিস্থিতি যে ক্রমশঃ বিভাজনের দিকেই এগিয়ে চলেছে, সেটা স্পষ্ট হয়ে উঠল।

 
বিভাজন

 

   এতদস্বত্ত্বেও গান্ধী ও কংগ্রেসের কেউ কেউ ভারত বিভাজনের বিপক্ষে ছিলেন। কিন্তু মূলত প্যাটেল কংগ্রেসের অধিকাংশকে, এমনকি নেহরুকেও বিভাজনের পক্ষে টেনে আনেন। মুসলিম লিগ এবং হিন্দু মহাসভা তো ততদিনে বিভাজনের পক্ষেই চলে গেছে। বাংলা বিভাজনের পরিপ্রেক্ষিতে তদানীন্তন লিগ প্রধানমন্ত্রী হুসেন শহীদ সুরাবর্দি ভারত ও পাকিস্তান থেকে স্বতন্ত্র, স্বাধীন অখণ্ড বাংলার প্রস্তাব দেন। বাংলার মুসলিম লিগ এই প্রশ্নে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়লেও জিন্নাহ এই প্রস্তাবকে সমর্থন করেন। বাংলার কংগ্রেস নেতাদের মধ্যে শরৎ চন্দ্র বসু ও কিরণ শঙ্কর রায় এই প্রস্তাব সমর্থন করলেও তাঁরা ছিলেন সংখ্যালঘু। কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও এমন ভাবনার চরম বিরোধিতা করেন। হুসেন সুরাবর্দি ও শরৎচন্দ্র বসুর মধ্যে বেশকয়েকবার আলোচনা হলেও কেন্দ্রীয় স্তরে তার কোনো প্রভাবই পড়েনি।  আগের দিন কংগেস, লিগ, অকালি দল ও দলিত প্রতিনিধি ডঃ আম্বেদকরের সমর্থনে পুষ্ট হয়ে ৩রা জুন মাউন্টব্যাটন পাঞ্জাব ও বাঙলার বিভাজনসহ ভারতবিভাজনের পরিকল্পনা পেশ করেন। স্বাধীন ও অখণ্ড বাংলার প্রস্তাবকে খারিজ করে দেওয়া হয় মাউন্টব্যাটনের পরিকল্পনায়।  

 
শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা

 

   হ্যাঁ, এটা ঘটনা স্বাধীন ও স্বতন্ত্র বাংলার প্রস্তাবের চরম বিরোধিতা করেছিলেন ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী। এটা ঐতিহাসিক সত্য। কিন্তু সেই প্রস্তাব গ্রহণ বা বর্জনের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করার মতো সামান্য শক্তিও তার বা হিন্দু মহাসভার ছিল না। এটা তখনই সম্ভব হতে পারতো, যদি কংগ্রেস ও লিগ এই প্রস্তাবে সহমত হতো। কিন্তু কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি এমন কোনও প্রস্তাবকে পাত্তাই দেয়নি। এমনকি বাংলার কংগ্রেস নেতৃত্বের অধিকাংশই ছিলেন এমন প্রস্তাবের বিরোধী। ফলে সুরাবর্দির প্রস্তাবকে বাংলার কংগ্রেস কখনই গ্রহণ করেনি। আর সেখানেই স্বাধীন ও স্বতন্ত্র বাংলার প্রস্তাবের সলিলসমাধি হয়ে যায়। এমনকি শরতচন্দ্র বসুও পরে পিছিয়ে আসেন। জিন্নাহ অবশ্যই ব্যক্তিগতভাবে এই প্রস্তাবকে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু মুসলিম লিগের কেন্দ্রীয় কমিটি তো দূরস্থান, বাংলার প্রাদেশিক কমিটিও এই বিষয়ে সরকারিভাবে কোনও প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। অর্থাৎ পুরো বিষয়টাই ছিল মুখেমুখে ছড়ানো একটা প্রস্তাব, যা কোনোপক্ষই গ্রহণ করেনি।

 

   হ্যাঁ, যদি দেখা যেত, কংগ্রেস ও লিগ স্বাধীন ও স্বতন্ত্র বাংলার প্রস্তাবে একমত হয়েছে, তখন হয়তো ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর ভূমিকার কোনও প্রশ্ন আসতো। কিন্তু যেহেতু সেটা আদপেই ঘটেনি, তাই তার কোনও ভূমিকার প্রশ্ন উঠতেই পারে না। এটুকুই সত্য, তিনিও স্বাধীন বাংলার প্রস্তাবের বিরোধী ছিলেন। আবার এমনটাও নয় যে তার প্রভাবেই বাংলার কংগ্রেস নেতৃত্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের উপাচার্য হিসাবে তার যে ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা বাংলার কংগ্রেসি নেতৃত্বের কাছে ছিল, লিগের সঙ্গে যৌথ মন্ত্রীসভা গঠন করার পর তা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে ব্যক্তিগতভাবে কংগ্রেসের কাউকে প্রভাবিত করার মতো জায়গাতেও তিনি ছিলেন না। তাই একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর জন্যই পশ্চিমবঙ্গ তৈরি হতে পেরেছে, এটা অনেকটা ‘ঝড়ে কাক মরে, ফকিরের কেরামতি বাড়ে’র মতো রটনামাত্র। ইতিহাসের সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই।

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com