ভয়তাড়িত সমাজ (তৃতীয় পর্ব)

ধর্ষণের সমাজমনস্তত্ত্ব :    

 

ধর্ষণ— শব্দটির ব্যুৎপত্তি অনুসরণ করে বলা যায় ধর্ষণ একটি ‘সামাজিক ব্যাধি’। মূলত ক্রোধবশত পুরুষের ‘লিবিডো’তে ‘সংক্রমণ’ ঘটে আর তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে নারীর শরীরের উপর। সামাজিক ব্যাধি বলেই রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে ধর্ষক খুব স্পষ্টভাবে শনাক্ত হয়েছে : “A man is said to commit ‘rape’ if he:- (a) penetrates his penis, to any extent, into the vagina, mouth, urethra or anus of a woman or makes her to do so with him or any other person… or(b)… or(c)… or(d) applies his mouth to the vagina, anus, urethra of a woman or makes her to do so with him or any other person against her will, without her consent”

 

   অর্থাৎ যক্ষার মতো সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের মতো ধর্ষণ-ব্যাধি রুখতেও নানান উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে। কিন্তু ব্যাধির প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে।

 

   সংগতভাবেই ‘কেন বাড়ছে?’ এই প্রশ্নকে আমরা এড়িয়ে যেতে পারি না। কিন্তু উত্তর দেওয়ার মতো যোগ্যতা আমাদের নেই। তবু, ‘বৈবাহিক ধর্ষণ’ বিষয়ে আমরা কিছু কথা বলেছিলাম অন্যত্র(গণসংস্কৃতি )। তার থেকে প্রাসঙ্গিক অংশ এখানে ‘কপি পেস্ট’ করা যেতে পারে :

 

   আইনের এই বয়ানে ও যেসব ব্যাখ্যা দেওয়া আছে তাতে ‘ম্যান’ ও ‘উওম্যান’-এর কোনও সামাজিক পরিচয় নেই। কিন্তু ধর্ষণের ঘটনায় ৯৫% পরিচিত জন জড়িত থাকার সুবাদে একথা বলা যায় যে, ‘পরিচিত জন’ মানেই ধর্ষক ও ধর্ষিতার মধ্যে সম্পর্ক ছিল আর সামাজিক পরিসর ব্যতীত সম্পর্ক হওয়া অসম্ভব। শুধু ‘পুরুষ’ ও ‘মহিলা’ শব্দ দিয়ে ‘ধর্ষণ’কে ‘সংজ্ঞায়িত’ করলে যথাক্রমে ‘শাস্তি’ ও ‘ক্ষতিপূরণ’ দিয়ে ব্যাপারটির ‘নিষ্পত্তি’ হতে পারে কিন্তু সামাজিক ব্যাধি হিসাবে তাকে নির্মূলকরণের কোনও দিশা পাওয়া যাবে না, যায়নি; অন্তত ‘নির্ভয়া কাণ্ড’র পর, এমনকি ‘কামদুনির ধর্ষণ’ নিয়ে ‘রাজনীতি’ ও বিচারের পর ‘অসুখ’টার এমন বাড়বাড়ন্ত আর হত না। মনে রাখতে হবে ধর্ষণ-কিন্তু ‘পাশবিক’ নয়। তবে পশুজগৎ থেকে মানুষের উৎপত্তি হওয়ায় নারী-পুরুষের ‘যৌনতা’র মধ্যে নানা ধরনের পাশবিকতা ও বিকৃতি রয়েছে (যেমন, যোনি বা শিশ্ন লেহন; পায়ু মৈথুন)। যৌনসঙ্গমে ‘পাশবিকতা’ বা ‘বিকৃতি’ থাকার অর্থ— সঙ্গমরত নারী-পুরুষের মধ্যে কমবেশি যৌন নৈতিকতা না থাকা। কোনও এক পক্ষে একেবারেই না থাকা(রুচির প্রশ্নে)। এই নৈতিকতার প্রশ্নেই রাষ্ট্রের দায় রয়েছে ‘সামাজিক ব্যাধি’টির উৎসমূল আবিষ্কার করা।

 

   সেখান জোর দিয়ে বলা হয়েছিল, তার জন্য অনুসন্ধান শুরু করতে হবে সমাজের আদি একক ‘পরিবার’ থেকে... নারীর প্রতি যে ‘ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স’ তার অন্তঃসারে রয়েছে পুরুষের অমানবিক যোনি-মনস্কতা। যা থেকে ‘যৌনমিলনের আদর্শ আশ্রয়’-এর মধ্যেও  ঘটে  চলেছে বিপর্যয়(‘ধর্ষণ’)।  

 

   প্রসঙ্গত, মনে রাখতে হবে যে, যৌনতার এই মনুষ্যপ্রকৃতির ধরন(marital rape)থেকেও-কিন্তু প্রকৃতি তার দুই ব্যক্তিসত্তা(স্বামী-স্ত্রী > ধর্ষক-ধর্ষিতা)-র পূর্বপুরুষদের ‘‘বংশাণুকে একই ব্যক্তির ভিতরে একত্রিত করার প্রক্রিয়া’’ চালিয়ে যায়... অর্থাৎ সন্তানের জন্ম হতে পারে।

 

   এই সূত্রে আরও একটি কথা আমাদের বলতে হবে, মানুষ যত তার যৌনতাকে ‘বিনোদন’-এর বিষয় করে তুলেছে, ততই ‘বৈবাহিক ধর্ষণের’ মাধ্যমে সন্তান জন্মের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পেয়েছে— এই জন্মপ্রক্রিয়া না-যথার্থভাবে প্রাকৃতিক, না মানবিক!

 

   আর-একটি প্রাসঙ্গিক কথা, বিশ শতকের সাতের দশকের পর থেকে ‘বৈবাহিক ধর্ষণ’ আইনত বহু দেশে অপরাধ; আমাদের দেশে আইনত একে স্বীকার করে নিয়েও অপরাধ হিসাবে গণ্য করা হয়নি।

 

   একই সঙ্গে এটাও উল্লেখ্য, ‘ধর্ষণ’ যুদ্ধের অন্যতম হাতিয়ার হিসাবে রাষ্ট্রসংঘ স্বীকার করে নিয়েছে। এবং ‘এলাকা দখল’-এর ক্ষেত্রে ধর্ষণ যে একটি কার্যকরী উপায়— এটা তো বারবারই দেখা যাচ্ছে।

 

   সার্বিক এই প্রেক্ষাপট অসাংবিধানিক রাজনীতি(= দুর্নীতি) ও ধর্ষণ যেন এক অনপনেয়(যাকে সরানো যায় না)বাস্তব হয়ে উঠেছে। কেউ কেউ অবশ্য বলেন, ‘সমাজের বৈপ্লবিক রূপান্তর না হলে ধর্ষণ-দুর্নীতির মতো সামাজিক ব্যাধির কবল থেকে মানুষের মক্তি নেই।’ এমন কথাও শোনা গেছে যে, যৌননৈতিকতার অভাব থেকেই ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটে— যৌননৈতিকতার জন্য সামাজিক আন্দোলন ভীষণ জরুরী! সন্দেহ নেই, কথাগুলির তাত্ত্বিক মূল্য আছে। প্রতর্কের বিষয়। যদি কখনও এসব আলোচ্য হয়ে ওঠে, সেক্ষেত্রে কেন পুরুষের লিবিডোতেই কেবল ‘সংক্রমণ’ ঘটে— এই জিজ্ঞাসার মীমাংসা যেন থাকে!   

 

ছয়

 

সন্দেহ নেই ‘ধর্ষণ’ একটি ‘আত্মধ্বংসী’ ঘটনা। সেই সঙ্গে ‘আত্মঘাতী হামলা’র কথাও আমাদের মনে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে একারণে যে, একটি সামাজিক ব্যাধি, অন্যটি ধর্ম-রাজনীতির প্রতিক্রিয়া এবং উভয়ই ঘটছে রাষ্ট্রীয় পরিসরে—  অর্থাৎ রাষ্ট্রের সমস্ত প্রতিষ্ঠানের কার্যকলাপ ঘটনাগুলির সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

এর অর্থ কি এই যে, রাষ্ট্রকে আমরা যে ভাবেই দেখি না কেন— ‘নৈতিক ধারণার বাস্তব রূপ’-কি সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানোর শক্তি— কোনও ‘রাষ্ট্রশক্তি’ই মানুষের মধ্যে আত্মধ্বংসসম্ভব ‘শক্তি’র উদ্ভবকে রুখতে পারেনি।

 

   বরং তার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়— যদি ‘আত্মধ্বংস’-এর  প্রতিশব্দ ‘স্যুইসাইড’ ধরে নেওয়া হয়, তাহলে দেখা যাবে আক্ষরিক ও প্রতীকি অর্থে পৃথিবীতে আত্মহত্যার ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে তথাকথিত উন্নয়নশীল দেশগুলিতে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি।

 

   এর সঙ্গে ‘আত্মঘাতী হামলা’র ঘটনাগুলো ধরলে অবস্থাটা ভীষণ ভয়ংকর! একটা পুরনো তথ্য উল্লেখ করা  যাক, একুশ শতকের প্রথম দশ বছরে বিশ্বজুড়ে আত্মঘাতী হামলার ঘটনা ৩০০% বৃদ্ধি পেয়েছে। অপেক্ষাকৃত উন্নত দেশগুলিতে আত্মঘাতী হামলার হার বেশি, শুধুমাত্র আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলে হামলা চালানোর ঘটনাগুলোর নিরিখে তার ভয়াবহতা আন্দাজ করা সম্ভব।

 

   তাহলে কি আমরা এই সিদ্ধান্ত নিতে পারি যে, এটাই ‘মনুষ্যজগৎ-প্রকৃতি’র নিয়ম— ক্রুদ্ধ পুরুষ-লিবিডো আত্মধ্বংসের মাধ্যমে এই জগৎ নির্মাণ করে চলেছে?

 

   এরকম কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য আমরা নিশ্চয়ই এই আলোচনা শুরু করিনি! তাছাড়া আত্মধ্বংসাত্মক কোনও ঘটনার ‘স্টাডি’ না করে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো— ব্যাপারটা অনৈতিক হয়ে যাবে। বরং একটা ‘ঘটনা’ স্টাডি করা যাক।

 

   এমন কোনও ঘটনা নির্বাচন করতে হবে যার সঙ্গে ব্যক্তি পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্বন্ধ প্রত্যক্ষত ছিল বা গড়ে উঠবে। অর্থাৎ ঘটনা  ‘সম্বন্ধকারণ’ হয়ে উঠবে।

 

   একটা কথা স্বীকার করা ভালো, ধর্ষণ ও দুর্নীতি, বিশেষ করে ধর্ষণ শব্দটি এতবার এই আলোচনায় এসেছে যে, ধর্ষণের নানা ঘটনার কথা মনে পড়ছে, দিল্লি, কলকাতা, উন্নাও, কাঠুয়া...

 

   আমরা কাঠুয়ার ঘটনা স্টাডি করব।

 

ঘটনা

 

   খবরের কাগজের সূত্র ধরে আমরা যা জেনেছি তার ঘটনা-পরম্পরা : আসিফা বানু। বয়স ৮ বছর। গ্রাম রাসনা। জিলা কাঠুয়া। জম্মু-কাশ্মীর। পিতা মহম্মদ ইউসুফ। মেষপালক। আসিফা অপহৃত হবে।

 

   ১০ জানুয়ারি, ২০১৮ ঘোড়া চরাতে বেরিয়েছিল আসিফা। দুপুর ২.০০ পর্যন্ত সে ঘোড়ার সঙ্গে ছিল। তারপর থেকে তাকে দেখা যায়নি। বিকেল চারটের সময় ঘোড়া একা ফিরে আসে। ১২ জানুয়ারি, আসিফার বাবা হিরানগর পুলিশ থানায় এফ.আই.আর. করেন। ১৭ জানুয়ারি, গ্রাম থেকে ১ কিমি দূরে আসিফাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। ওই দিন ২.৩০ মিনিট নাগাদ জেলা হাসপাতালে পোস্টমর্টেম করা হয়।

 

   পোস্টমর্টেম রিপোর্ট থেকে জানা গেছে— আসিফাকে clonazepam দেওয়া হয়েছিল, তাকে বহুবার ভিন্ন ভিন্ন জন ধর্ষণ করেছে যা তাকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে গেছে; মৃত্যু নিশ্চিত করতে তার মাথায় ভারী পাথর দিয়ে আঘাত করা হয়।

 

   পুলিসের অনুসন্ধান ও জিজ্ঞাসাবাদের সূত্র ধরে পিটিআই জানাচ্ছে(দ্য নিউ ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস, ২৭.৪.১৮) যে, মুসলমান আসিফাকে অপহরণ করেছিল এক হিন্দু মন্দিরের ‘সেবক’(custodian), তাকে রাখা হয়েছিল তারই ‘দেবিস্থান’ বা মন্দিরে। সেবকের কথা থেকে অপহরণের উদ্দেশ্য জানা যাচ্ছে যে, ‘The  aim of kidnapping was to scare and drive away the nomadic Gujjar and Bakarwal communities from the Hindu dominated area’। প্রথম দিনেই  সেই দেবিস্থানে তাকে ধর্ষণ করে সেবকের নাবালক ‘nephew’ এবং তারপর ভাইপোর সঙ্গে যোগ দেয় তার ছেলেও। তারপর হত্যার ছক।

 

   ১৩ তারিখে আসিফাকে মন্দির থেকে বাইরে কোথাও নিয়ে যাওয়া হয়, ১৪ তারিখে তাদের (দুই ভাই ও তাদের এক বন্ধু) সঙ্গে যোগ দেয় একজন স্পেসাল পুলিস অফিসার ‘who wanted to rape her once more before she was killed’ ।

 

   চারজন পুলিস সহ আটজনের বিরুদ্ধে চার্জশীট ফাইল করা হয়েছে।...

 

   এই ঘটনাটির বিশেষত্ব হল, ব্যক্তি-পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রের উপস্থিতি খুবই স্পষ্ট কিন্তু আক্রমক ‘ব্যক্তি’রা  সচেতনভাবে ‘সম্প্রদায়-স্বার্থে’ কাজ করেননি, তাই তাদের ‘অ্যাকশন’ আত্মবিনাশী হয়ে উঠেছে। আর আক্রান্ত ব্যক্তিরা হয়তো জানেনই না, তাদের দোষ কোথায়। কারণ, গ্রীষ্মকালে কাশ্মীর উপত্যকায় এঁরা তাঁবু ফেলেন, কাশ্মীরে শীত এলে জম্মুর জঙ্গলে এঁদের পরিযাণ ঘটে। প্রাকৃতিক নিয়মেই যুগ যুগ ধরে এটা ঘটে আসছে। প্রকৃতির নিয়ম থেকে যে সংস্কৃতি গড়ে ওঠে— এটা একটা দৃষ্টান্ত, মনে রাখতে হবে পশুজগতের ‘পরিযাণ-প্রকৃতি’ থেকেই (পরিচিত উদাহরণ সাইবেরিয়ার পাখি) মানুষ গড়ে তুলেছে ‘পরিযাণ-সংস্কৃতি’— পশুপালক জাতির ক্ষেত্রে এই সংস্কৃতি অনেক বেশি প্রাকৃতিক (সাইবেরিয়ার পাখিদের সঙ্গে তুলনা করা যায়)।

 

   তবে খেয়াল রাখতে হবে, পরিযায়ী পাখিদের দুর্গতির যে সব খবর আমরা জানি, তার সঙ্গে পরিযায়ী বকরওয়ালদের জীবনে ঘটা এই ধরনের দুর্গতির তুলনা যেন করা না হয়। এমনকি, ডারউইন-তত্ত্ব বা শ্রেণী সংগ্রামের তত্ত্ব এক্ষেত্রে প্রয়োগ হতে পারে। দোহাই তা কেউ করবেন না।

 

   যাই হোক, ঘটনার ‘কার্য-কারণ’সূত্র আমাদের ‘অভীপ্সা’— আমরা যদি ‘ধর্ষণ’-ঘটনাটিকে কেন্দ্রে রাখি তাহলে তার আগে-পরে ঘটা ঘটনাগুলি যথাক্রমে অতীতমুখি ও ক্ষণিক বর্তমান ছুঁয়ে ভবিষ্যৎমুখি হবে। আমরা অবশ্য তার সঙ্গে আমাদের চিন্তার সাযুজ্য রক্ষা করতে পারব না। কিন্তু এটা আমাদের মনে রাখতে হবে। এক্ষেত্রে ধর্ষণের ঠিক আগের ঘটনা অপহরণ— এই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুজন ব্যক্তি(< পরিবার), ‘সেবক’ ও আসিফা; অপহরণ যে ঘটবে— এটা সেবকের পরিবার জানত কি না বলা মুশকিল কিন্তু আসিফা ও তার পরিবার কেউই জানত না যে, আসিফা অপহৃত হতে পারে। তবে অপহরণের কারণ উভয় পরিবারের মধ্যেই ছিল। এটা হলফ করে বলা যায়। উভয় পরিবার ভিন্ন ভিন্ন সমাজের অংশ। সমজ > সমাজ— এই তত্ত্ব মনে রেখেও আমাদের বলতে হবে, প্রকৃতি(জল-জমি-জঙ্গল) থেকে বেঁচে থাকার বাঁচিয়ে রাখার রসদ ‘সংগ্রহ’ করার কাজকে ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে সমাজ। প্রথমাবস্থায় তা ছিল বাস্তুতান্ত্রিক। বকরওয়াল সমাজ আজও বাস্তুতান্ত্রিক। সন্দেহ নেই সমাজবিবর্তন বলতে আমরা যা জেনেছি তা মূলত বস্তুতান্ত্রিক কিন্তু বাস্তবত বাস্তুতান্ত্রিক সমাজ থেকে, অবশ্যই দ্বন্দ্বের মাধ্যমে, বস্তুতান্ত্রিক সমাজের জন্ম হয়েছে এবং ক্রমে বস্তুতান্ত্রিক(> পণ্যতান্ত্রিক) সমাজমন বাস্তুতান্ত্রিক সমাজকে তার শত্রু বলে মনে করে(< অপরত্ব < বিচ্ছিন্নতা)।  এরকম পরস্পর বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জাত দুটি সমাজের দ্বন্দ্ব আপাতদৃষ্টিতে অমীমাংসেও মনে হলেও মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র তার সমাজকে নিরাপত্তা দিতে চাইবে। আমাদের আলোচ্য ঘটনা নিরাপত্তার প্রশ্নে বকরওয়াল সমাজের পক্ষে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রতিক্রিয়ায় ঘটেছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ আর এক পক্ষের নিরাপত্তার অভাবের কারণ হয়েছে। এর অর্থ ঘটনার অন্যতম কারণ ‘রাষ্ট্র’। এখন প্রশ্ন, রাষ্ট্রকে এই উদ্যোগ নিতে হল কেন? কারণ ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো’র মধ্যে উপজাতি ও উপজাতি না-থাকা ‘জাতি’র মধ্যে সংঘর্ষ ও বৈষম্যকে কমিয়ে আনা রাষ্ট্রের অন্যতম সংগঠন Tribal Affairs Department-এর কাজ। আমাদের অনেকেরই মনে থাকতে পারে, ১৯৯৬-এ হওয়া Panchayat Extention to scheduled Area Act-এর কথা— এই অ্যাক্ট কেমন কাজ করছে তার একটা সমীক্ষা IRMA-কে দিয়ে করিয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকার, তার রিপোর্টের একটি অধ্যায়ের(Left-Wing Extremism and Governance…) শুরুতে  রয়েছে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ২০০৯ সালে্র কোনও এক ভাষণের উদ্ধৃতি, তা থেকে জানা যাচ্ছে যে, ‘আধুনিক অর্থনীতি ধারাবাহিকভাবে আদিবাসীদের কোনও সুযোগ সুবিধা দেয়নি, বরং অবাঞ্ছিতভাবে তাদের জীবনের গণ্ডিতে থাবা বসিয়েছে। আদিবাসীদের উপর  এই সামাজিক ও অর্থনৈতিক উৎপীড়ন আর সহ্য করা হবে না।’ যদিও এই রিপোর্টে জম্মু-কাশ্মীরের কথা নেই তবু অনুমান করা সম্ভব যে, বকরওয়ালদের ‘জীবনের গণ্ডিতে থাবা’ বসেছে। আর সেই কারণে জম্মু-কাশ্মীর সরকার নির্দেশ দিয়েছে(১৪ ফেব্রুয়ারি,২০১৮) জম্মুর জঙ্গল থেকে বকরওয়ালদের উচ্ছেদ করা যাবে না। এটা একটা ‘attempt to avoid unnecessary harassment to tribal community in the name of anti-encroachment drives or checking of cattle smuggling(The Indian Express, March 8, 2018)। অর্থাৎ আসিফা অপহরণ ছিল ওই ‘আন্টি এনক্রোচমেন্ট ড্রাইভস’-এর অংশ, এর অন্তঃসারে রয়েছে ভয়, সংখ্যালঘু হয়ে যাওয়ার ভয়— এই ভয়ের ‘উৎস’ তথাকথিত ‘গণতন্ত্র’ যেখানে সংখ্যালঘুর ‘মত’ চর্চার ‘স্পেচ’ পায় না। সংখ্যাগুরুর ‘মত’ই সেখানে সর্বোচ্চ। সংখ্যাগুরু অংশের ‘সদস্য’ হওয়ার সুবাদে অ-আদিবাসী সমাজের ‘বেআইনি’ কাজ করার যেন অলিখিত ‘অধিকার’ আছে, যে অধিকার বলে একজন সমাজসদস্য ‘ভয়ের বিরুদ্ধে’ ‘অপারেশন’ করতে পারে। আলোচ্য ঘটনার ‘দেবি-সেবক’ তেমই ঘটনা ঘটিয়েছে বকরওয়ালরা ‘ভয়’ পেয়ে যাতে ছাউনি উঠিয়ে দেয়। ‘সেবকে’র  ‘স্বীকারোক্তি’তে অবশ্য এরকম কথা আছে কিন্তু তার নাবালক ভ্রাতুষ্পুত্র ও পুত্রের ‘ধর্ষক’ হয়ে ওঠা ও ‘দেবিস্থান’-এ ধর্ষণকর্ম সম্পাদন করার কোনও কার্য-কারণসূত্র পাওয়া যায়নি। তবে মনে রাখতে হবে মেয়েটিকে আচ্ছন্ন করে রাখার জন্য তাকে clonazepam দেওয়া হয়েছিল। আচ্ছন্ন একটি আট বছরের বালিকাকে দেখে এক নাবালক কামার্ত হয়ে দুষ্কর্ম করার মধ্যে কোনও দৈবীমাহাত্ম্য আছে কি না বলা মুশকিল! বা ধর্ষণের পর খুনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পশ্চাতে কোনও গূঢ় ‘সংস্কার’ যে নেই, এমনটাও বলা যাচ্ছে না। খুনের সিদ্ধান্ত ও তা কার্যকর করার মধ্যবর্তী সময়ে এসপিও’র সঙ্গে  ‘সেবকে’র যোগাযোগ— একে কি আমরা রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ‘নেগেটিভ’ হস্তক্ষেপ বলব, না রাষ্ট্রনৈতিকতা থেকে বিচ্যুত একজন ব্যক্তির দুষ্কর্ম হিসাবে দেখব? এই প্রশ্নের উত্তরও কোনও না কোনও কারণকে অনুসরণ করতে চাইবে...

 

   এর থেকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় যে, যে কোনও ঘটনা অসংখ্য জটিল কার্য-কারণ বন্ধনে আবদ্ধ ও আবদ্ধপ্রবণ। যদি ছবি আঁকা যায়, তাহলে সেই ছবি দেখতে হবে রাসায়নিক বন্ড স্ট্রাকচারের মতো!

 

   প্রশ্ন উঠতে পারে, আমরা কি ছবি এঁকেই বলছি এ কথা? না। তবে কার্য-কারণের পরম্পরা যে সরলরেখায় চলবে না, তা যে বহুমাত্রিক হবে, এই ভাবনা অনুষঙ্গে জৈব রাসায়নিক বন্ডের কথা মনে পড়েছে... যাই হোক, প্রতিটি ঘটনা ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে ঘটে চলেছে। পুনরুক্তির দোষ ঘটিয়ে আবারও বলা যাক, সামাজিক সত্তার নিরিখে ব্যক্তি বহুমাত্রিক(<ধর্ম-অর্থ-কাম)। অর্থাৎ প্রতিটি মাত্রাই(dimension)সত্তাজ্ঞাপক। প্রতিটি সত্তা ধর্ম-অর্থ-কামের ‘বিধানপরিষদ’। এর অর্থ সামাজিক সম্পর্ক কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে তার ‘বিধায়ক’ সামাজিক সত্তা নিজেই। মনে রাখতে হবে, সামাজিক সত্তার নির্মাতা সমাজ(<সমজ)বা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল।

 

   আমাদের আলোচ্য ঘটনার সঙ্গে জড়িত সামাজিক সত্তাগুলির(পিতৃসত্তা, পুত্রসত্তা, পুরোহিতসত্তা, ভ্রাতৃসত্তা ইত্যাদি)প্রতি তাদের ‘বিধায়ক’সত্তা যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারেনি। মনে রাখতে হবে, ধর্ম-অর্থ-কামেরও ‘কারণ’ আছে।

 

সাত     

এসব যে আমরা জানি না তা নয়, এমনকি এই আলোচনাতেও তা এসেছে, বিশেষ করে জৈব সত্তার বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য অনুষঙ্গে কামের ‘কারণ’ অবগত হয়েছি। কাম থেক ঈর্ষা, তাও জেনেছি। ঈর্ষা থেকে সংঘর্ষ > ভয়। ব্যক্তির ক্ষেত্রে কাম শব্দটির অর্থ-বিস্তার ঘটালে দেখা যাবে যে, জগতের সমস্ত কাম্যবস্তুই ঈর্ষা জাগাতে পারে ও কাম্যবস্তু হস্তগত হতে পারে যদি অর্থ থাকে । এবং অর্থ— কেবল একটি কাম্য বস্তুই নয়, সে শিকারের বস্তুও বটে। আমাদের আলোচ্য ‘ঘটনা’ ঘটেইনি—এটা ‘প্রতিষ্ঠা’ করার জন্য ‘ঘটনা’র সমস্ত ‘কার্য-কারণ’-এর চিহ্ন-চলমানতা ধুয়েমুছে স্তব্ধ করে দিতে হবে— এটা করবার টোপ দিয়ে চার লক্ষ টাকা শিকার করা হয়েছে পুলিশের তরফ থেকে।

 

   এটা দুর্নীতির প্রশ্ন। সবই আমরা জানি। ধর্ম-অর্থ-কামের নানা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ যোগ্য জনেরা(কৌটিল্য থেকে মার্ক্স)করেছেন। বিশেষ করে অর্থকে ‘মহাকারণ’ ধরে মার্ক্সের সমাজ-বিশ্লেষণজাত রাজনৈতিক দর্শন— উনিশ শতকে একটা স্বপ্ন দেখিয়েছিল এই সব সামাজিক বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে! সমাজতন্ত্র। কিন্তু কবির ভাষায় ‘রণ রক্ত সফলতা’ একপেশে নির্মিত সত্য বলে তা সম্যক সত্য হয়ে ওঠেনি। আমরা আগেই বলেছি সমাজতান্ত্রিক নির্মাণের ভেঙ্গে পড়ার কথা। কিন্তু সমাজতন্ত্র— এটা মানব সভ্যতার স্বপ্ন, আজও প্রাসঙ্গিক।

 

   অতএব, মার্ক্সবাদও প্রাসঙ্গিক! আমরা কি আমাদের আলোচনার বিষয় থেকে সরে যাচ্ছি না? না। আসলে বলা যায় ইতিহাস সংলগ্ন থাকতে চাওয়া। আমরা তো এমন একটা সমাজ চাই, যেখানে ‘আত্মধ্বংসে’র ঘটনা ঘটার মতো কার্য-কারণের সামাজিক পরিবেশ থাকবে না। অন্তত আমাদের আলোচনার অভিমুখ সেদিকেই— আমাদের পক্ষপাতিত্ব বাস্তুতান্ত্রিক সমাজের দিকে। ইতিপূর্বে আমরা তাকে ‘মানবিক সমাজ’ আখ্যা দিয়েছি।

 

   তাহলে আমরা কি তাকে ‘বাস্তুতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র’ বলব?

 

   অর্থাৎ স্বপ্নের মধ্যে স্বপ্ন— সমাজতন্ত্রের মধ্যে বাস্তুতান্ত্রিক সমাজ! তা যদি হয়, তাঁর পূর্ব-উত্তরসূরি সহ মার্ক্স প্রাসঙ্গিক থাকছেন। এবং আমাদের আলোচ্য ঘটনার প্রেক্ষিতেও তাঁর দ্বন্দ্বতত্ত্ব ব্যবহার করা যেতে পারে।

নিশ্চয়ই তা মালিক-শ্রমিকের নিরিখে ‘শ্রেণীদ্বন্দ্ব’ হিসাবে দেখব না?

 

   আলোচ্য ঘটনায় মালিক-শ্রমিক, এমনকি প্রভু-অধীন সম্পর্কেরও কোনও স্থান নেই। বরং এমন এক ‘অপরত্ব’ রয়েছে যা থেকে এক পক্ষকে ‘জমি বেদখল হওয়ার ভয়’ গ্রাস করে ফেলেছে আর কে না জানে জমিই যুদ্ধের কারণ— আমাদের আলোচ্য ঘটনাটি যুদ্ধের অংশ হিসাবে গণ্য করতে কোনও দ্বিধা নেই কিন্ত একে শ্রেণীযুদ্ধ বলা যাবে না।

 

   তা হলে কি ‘ধর্মযুদ্ধ’? ‘ধর্মযুদ্ধ’— কথাটা আলটপকা মনে হতে পারে। তা-কিন্তু নয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে ঘটনার ‘হিন্দু-মুসলমান’ পরিচয় উঠে এসেছে— বিশেষ করে “ধর্মে মুসলমান বকরওয়াল জম্মুতেই থেকে যাবে, পাল্টে যাবে জম্মুর জনসংখ্যায় হিন্দু-মুসলমানের অনুপাত। কাশ্মীরের মতো জম্মুতেও সংখ্যালঘু হয়ে যাবে হিন্দুরা। সংখ্যাগরিষ্ঠের মনে সংখ্যালঘু হয়ে যাওয়ার ভয় তৈরি করা হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির পুরনো খেলা(প্রশ্নটা একান্তই রাজনীতির, অমিতাভ গুপ্ত, আঃ বাঃ পত্রিকা)।” (গুরুত্ব আরোপ আমাদের)। আমরা জানি ‘ভয়’ অন্যতম জীববৈশিষ্ট্য— সবচেয়ে বড় ভয় হল অস্তিত্ববিলোপ বা মৃত্যুভয়। ভয় থেকে আক্রমণ বা পলায়ন—  পশুজগতে এ হল ভয়ের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, মনুষ্যজগতে আর-একটি প্রতিক্রিয়া আছে, তাৎক্ষণিক নয় বলে তা ভয়কে জয় করার মানসিক ক্রিয়ায় রূপান্তরিত হতে পারে। মনে রাখতে হবে, ভয়কে জয় করার প্রক্রিয়া থেকেই মানুষ শিখেছে ভয়ের রাজনৈতিক ব্যবহার— সন্ত্রাস। ‘সন্ত্রাস’-এর আভিধানিক অর্থ ও ‘সন্ত্রাসবাদ’-এর সংজ্ঞা থেকে এটা স্পষ্ট যে, সন্ত্রাসের ‘কার্য-কারণ’ রয়েছে ‘ভয়’— এই জীব বৈশিষ্ট্যটির মধ্যে। অর্থাৎ সন্ত্রাসের উৎস ভয়। আবার ধর্মের উৎসেও রয়েছে ভয়! স্মরণ করা যাক, আসিফাকাণ্ডের স্থান-কাল-পাত্রে, তার কার্য-কারণের মধ্যে ধর্ম ও ভয়ের উপস্থিতি নজর কাড়ার মতো এবং কাশ্মীরের ‘সন্ত্রাসবাদ’(রাজনীতি) ধর্মের সঙ্গে যুক্ত— অতএব, আমাদের আলোচ্য ঘটনাকে ‘ধর্মযুদ্ধের অংশ’ কেউ বলতেই পারেন। তবে তা যদি বলা হয়, আমাদের জানা ইতিহাস-- মহাকাব্য থেকে ‘সক্রেটিসের মৃত্যু’-কি চার্বাক-ব্রুনোকে জ্বালিয়ে দেওয়া থেকে নরেন্দ্র দাভোলকার-এম এম কালবর্গি হত্যাকাণ্ডের ইতিহাস অনুসরণ করে আমাদের বলতে হবে, মার্ক্সকে অনুকরণ করেই আমরা বলব, মানবজাতির সমগ্র ইতিহাস হল ধর্মযুদ্ধের ইতিহাস!

 

   অর্থাৎ মনুষ্যজগতের ব্যাখ্যাই হোক-কি কাঠুয়া ঘটনার বিশ্লেষণ— তার থেকে আমরা একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছলাম! কিন্তু এই আলোচনা শুরুতে যে ‘আশঙ্কা’ ছিল— আমাদের ‘ইতিহাস ধর্মযুদ্ধের ইতিহাস’— একে যদি আমরা ‘আবিষ্কার’ হিসাবে গণ্য করি, তা কি আমাদের আশঙ্কামুক্তির কোনও দিশা দিতে পারবে, যেমন দিয়েছে ‘শ্রেণী-সংগ্রামের ইতিহাস’?

 

   শ্রেণী-সংগ্রাম বা শ্রেণীযুদ্ধ বলতে আমরা বুঝি শোষিত ও শোষক বা অধীন-অধিপতি শ্রেণীর সংগ্রাম— এই সংগ্রামের উদ্দেশ্য শোষণ-নিপীড়ন থেকে মুক্তি। শ্রেণীযুদ্ধের কার্য-কারণ স্পষ্ট। ধর্মযুদ্ধের কার্য-কারণ কিন্তু অস্পষ্ট। যে কোনও যুদ্ধের এক পক্ষের উদ্দেশ্য-- ‘মুক্ত হওয়া’ বা ‘মুক্ত করা’। অপর পক্ষের উদ্দেশ্য হল ‘দখল রাখা’ বা ‘দখল করা’।

 

   মধ্যযুগের ইতিহাসে অবশ্য ধর্মযুদ্ধের(Crusade)উদ্দেশ্য ছিল ‘দখল’— একপক্ষে ছিল দখল ধরে রাখার উদ্দেশ্য, অন্য পক্ষ দখল মুক্ত করার উদ্দেশ্য নিয়ে লড়েছিল। কিন্তু মনে রাখতে হবে, অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই— ধর্মযুদ্ধ(just war)। এবং আমাদের দেশের যে ইতিহাস বেদ-রামায়ণ-মহাভারতে নিহিত রয়েছে তা ধর্মযুদ্ধের ইতিহাস। অর্থাৎ ‘অন্যায়’ সেখানে একটি পক্ষ।

 

   অতএব, ধর্মযুদ্ধের কার্য-কারণ যতই অস্পষ্ট হোক না কেন, শ্রেণীযুদ্ধের মতো সেখানেও দুটি পক্ষ ‘ন্যায়-অন্যায়’ রয়েছে এবং এই ‘আধুনিক’ যুগেও ন্যায়যুদ্ধের ইতিহাস তৈরি হয়েছে, হচ্ছে— আমাদের মনে পড়বে, ইরাকের বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধ ছিল— ‘জাস্ট ওয়ার’।

 

   ‘ক্রুসেড’ও বলা যেতে পারে, জর্জ ডব্লিউ বুশ অবশ্য তেমনই বলেছিলেন— এই সুত্রে আমাদের কিন্তু মনে রাখতে হবে ‘ক্রুসেড’-এর কার্য-কারণ(ইসলাম-খ্রিস্টান)।

 

   আফগানিস্তানে ‘শয়তান’(=মার্ক্সবাদ)-এর বিরদ্ধে ‘জিহাদ’! এটাও মনে রাখতে হবে। ‘জিহাদে’ আত্মধ্বংসের প্রকাশ রয়েছে।

 

   এর পাশাপাশি হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা, ধর্ম-পরিচয়ে গণহত্যা ইত্যাদি ঘটনাগুলির ‘কার্য-কারণ’-এ নিহিত রয়েছে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার।

 

   ধর্মকে ব্যবহার করে যে রাজনীতি তা নিশ্চয়ই ‘শ্রেণী-রাজনীতি’ নয়! কারণ, ‘শোষিত-শোষক’ একই ‘রাজনীতি’ করবে— এটা অসম্ভব ব্যাপার। এর অর্থ, শ্রেণী-সংগ্রামের তত্ত্ব দিয়ে ‘ধর্মযুদ্ধ’ বিশ্লেষণ করা মুশকিল। কেবল তা-ই নয়, ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার রোখার মতো কোনও তত্ত্ব সম্ভবত তৈরি করা যায়নি। অন্তত আমরা জানি না। কিন্তু কোনও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বা পক্ষে স্বতস্ফূর্তভাবে ‘ধর্ম’ (=ধর্মপরিচয়) শ্রেণী নিরপেক্ষভাবে ক্রিয়া করতে পারে। দৃষ্টান্ত যথযক্রমে কাঠুয়াকাণ্ড ও দাদরিকাণ্ড(মহম্মদ ইখলাক হত্যা, Dadri mob lynching)।

তাহলে ‘সমগ্র ইতিহাস’-এর ‘কার্য-কারণ’ নিহিত রয়েছে ধর্মযুদ্ধ ও শ্রেণীযুদ্ধের কার্য-কারণের মধ্যে। আর এই দ্বিবিধ যুদ্ধের মধ্যে রয়েছে আত্মধ্বংসের ‘কার্য-কারণ’— ধর্ম-রাজনীতির কার্য-কারণ যৌনতায় নিহিত রয়েছে বলেও ধরে নেওয়া যায়!

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com