ভয়তাড়িত সমাজ (চতুর্থ পর্ব)

আট

 

‘আত্মধ্বংস’কে বিষয় করে ‘ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র’ সম্বন্ধে কিছুটা তত্ত্বগত বিশ্লেষণ আমরা করেছি। কিন্তু ‘আত্মধ্বংস’ কী ও কেন— এই বিষয়ে কোনও কথা বলা হয়নি । অর্থাৎ ‘বিষয়টি’র সংজ্ঞা ও কার্য-কারণ সম্বন্ধে কোনও কথা না বলেই তা করা হয়েছে। অর্থাৎ পদ্ধতিগত ত্রুটি আছে। আমরা সতর্ক ছিলাম না। অন্তত আমাদের বলা উচিত ছিল যে, আত্মধ্বংসের ‘রেডিমেড’ কোনও সংজ্ঞা নেই। সবচেয়ে কাছের পরিচিত শব্দ ‘আত্মহত্যা’ বা ‘স্যুইসাইড’ কিন্তু তাতে ‘আত্মধ্বংস’-এর ব্যঞ্জনা নেই।

 

   তবে ‘স্যুইসাইড অ্যাটাক’ বা ‘স্যুইসাইড স্কোয়াড’-এর মধ্যে ওই ব্যঞ্জনা অনুভব করা যায় বলে স্যুইসাইডের ‘কার্য-কারণ’ বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে।

 

   আইনানুসারে স্যুইসাইডের সংজ্ঞা এরকম হতে পারে, কোনও কারণে ব্যক্তির আপন প্রাণপ্রবাহকে স্বেচ্ছায় স্তব্ধ করে দেওয়াই হল আত্মহত্যা।

 

   মনরোগ চিকিৎসক, স্যুইসাইডোলজির গবেষক— এঁরা জানিয়েছেন যে, যারা আত্মহত্যা করেন, তাঁদের বেশিরভাগই মানসিক অবসাদে ভোগা ব্যক্তি— ব্যক্তিজীবনে সম্পর্কের জটিলতা, আর্থিক সমস্যা ইত্যাদি থেকে  মানসিক অবসাদ আসতে পারে— এক কথায় মনের অসুখ, ডিপ্রেসিভ ইলনেস। অর্থাৎ মনের অসুখের(কার্য-কারণের)পরিণতিই হল আত্মহত্যা! এই ‘কার্য-কারণ’ আমাদের বুঝতে হবে। কোনও বিদগ্ধ-‘রেডিরেফারেন্স’ আমাদের হাতে নেই। একবার ‘বিষাদতত্ত্ব’-এর এক আলোচনায়(ক্র্যাকার,২০১৫)আমরা দেখেছিলাম: বিষাদ মানে ‘বিশিষ্টরূপে মনের অবসন্ন হওয়া’— এক কথায় অবসাদ। অভিধান মতে ‘যে অবসাদপ্রাপ্ত হয়েছে’— বিষণ্ন। এই ‘যে’ কে? কে অবসাদ প্রাপ্ত হয়? অবশ্যই ‘মন’ অবসাদ প্রাপ্ত হয়। এর তাৎপর্য হল, কার্য-কারণসূত্রে ‘দাতা’ পক্ষের অনিবার্য উপস্থিতি ও ‘দাতা-গ্রহীতা’র অবস্থান একই পরিসরে— এই তত্ত্বকে স্বীকার করে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু তাতে অস্বস্তিকর এক প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়, যে ব্যক্তিমন(গ্রহীতা)অবসাদ পেল সেই ‘অবসাদ’ কি ‘দাতা’র কাছেই ছিল?

 

   ‘দাতা-গ্রহীতা’র অবস্থান একই পরিসরে— এ কথার তাৎপর্য এই যে, আমরা একটা ‘সম্পর্ক’ স্বীকার করে নিয়েছি— ‘দাতা-গ্রহীতা’র সম্পর্ক। ইতিপূর্বে সত্তা-সম্পর্ক-পরিবার-ব্যক্তি-সমাজ ইত্যাদি আমাদের আলোচনায় এলেও ‘মন’ আলোচিত হয়নি। অথচ ‘ব্যক্তি’কে দেহ-মন বিশিষ্ট জৈব সত্তা রূপে উল্লেখ করা হয়েছে। সন্দেহ নেই তত্ত্ব হিসাবে ‘ব্যক্তি’ খুবই জটিল। একই আধারে দুটি তত্ত্বের(দেহ-মন) সমবায় সে— দেহের ‘অসুখ’ সম্বন্ধে একটা ধারণা আমরা করে নিতে পারি— এক কথায় বাইরের কোনও অণুজীব দেহে এসে দেহে অসুখ তৈরি করে। এবং তা প্রকৃতির ‘খাদ্য-খাদক’ সম্পর্কের নিয়মেই ঘটে। কিন্তু মনের অসুখের ক্ষেত্রে— ওই ‘দাতা-গ্রহীতা’ সম্পর্ক থেকে দেখা যাচ্ছে, এক ব্যক্তির মন আর-এক ব্যক্তিমনে অসুখ ‘হস্তান্তরিত’ করছে।

 

   এবং সেই অসুখ শেষ পর্যন্ত দেহনাশক হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ-- এ কথা বলা যায় যে, অসুস্থ মনের সমস্ত আক্রোশ যেন গিয়ে পড়ে দেহের উপর। যা থেকে ‘আত্মহত্যা’ ঘটতে পারে।

 

   এর থেকে আত্মহত্যার অন্য এক অর্থ পাওয়া যাচ্ছে, অসুস্থ মনের দেহনাশ। এই অর্থ পাওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্য আমাদের জীববিজ্ঞান-ধারণা(প্রাথমিক) কাজ করেছে। দেহের সঙ্গে মনের সম্পর্ক হল আধার-আধেয়। আরও স্পষ্ট করে বলা যেতে পারে, মনের আধার হল সজীব দেহ। সজীবদেহ হত্যা করা মানেই মনের ‘কার্য-কারণ’-উৎসকে হত্যা করা। আমরা  যে ‘আত্মধ্বংস’ থেকে শুরু করেছিলাম তার সঙ্গে ‘মনের কার্য-কারণের উৎস-হত্যা’র কোথাও যেন মিল আছে।

 

   কিন্তু মনে রাখতে হবে, আমাদের আত্মধ্বংসের যে আশঙ্কা তার যদি ‘কার্য-কারণ’ বিশ্লেষণ করতে হয় তা হবে ‘সমাজ-মনোবিদ্যা’র বিষয় আর আত্মহত্যা হবে ‘সাইকোবায়োলজি’র বিষয়।

অতএব, এই আলোচনায় ব্যক্তি একই সঙ্গে সমাজ-মনোবিদ্যা ও জৈব-মনোবিদ্যার বিষয় হওয়ায় ব্যক্তির নতুন সংজ্ঞা না রাখলে পরবর্তী বিস্তারে যাওয়া অসুবিধা হবে। কিন্তু তেমন কোনও সংজ্ঞা আমাদের জানা নেই। তাৎক্ষণিকভাবে একটি সংজ্ঞা তৈরি করা যেতে পারে: নানাবিধ সামাজিক সত্তায় ব্যক্ত হওয়া না-হওয়া  দেহ-মনের  আধার জৈব সত্তাই   ব্যক্তি।   

 

   এর পাশপাশি আমাদের এটাও উল্লেখ করতে হবে যে, মনের আধার দেহকে আমরা বহুবিধ কোষ ও কলাকোষের সংগঠন হিসাবে জানি(জীববিজ্ঞানের সাধারণ ছাত্র হিসাবে)কিন্তু দেহের মতো ‘মন’ সম্পর্কে কোনও মূর্ত ধারণা আমাদের নেই। তবে জীববিজ্ঞানীরা বলেছেন যে, মনের বস্তুগত ভিত্তি স্নায়ুতন্ত্র। এটা বিস্ময়ের ব্যাপার মনে হতে পারে যে,  যে-মনের বস্তুগত ভিত্তি আছে অথচ তার মূর্তি নেই! কিন্তু মনের ‘কাজ’ দিয়েই তো আমরা ‘মন’কে অনুভব করি, যেমন বিদ্যুৎশক্তির অস্তিত্ব। এটা কিন্তু আমরা সকলেই জানি, ব্যক্তিমনের ‘কাজ’ চিন্তা করা আর যে কোনও ‘কাজ’-এ শক্তি দরকার— এই যুক্তিতে মন চিন্তাশক্তির আধার। প্রসঙ্গত, উল্লেখ থাক— মন কী চিন্তা করে— এই সম্ভাব্য জিজ্ঞাসার উত্তর : তার আধার যেসব ঘটনাপুঞ্জের মধ্যে আছে মন সেসবের ‘কারণ’ চিন্তা করে।

 

   চিন্তার কারণ কী?

 

   চিন্তার কারণ নানাবিধ হতে পারে— মূলত তা সামাজিক সত্তা রূপে  বেঁচে থাকার পক্ষে, মৃত্যুর বিরুদ্ধে। যেমন, আমরা এই চিন্তা লিখছি— অনেক ‘মন’ এর সঙ্গে যুক্ত, সব মনের হয়ে আমার মন লিখছে। মানে আমি লিখছি।

তাহলে তো এই সিদ্ধান্ত করতে হয় : আমি আর মন অভিন্ন!

 

   সেই ‘বিষাদতত্ত্ব’ রচনার সময় এই সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল, তার মীমাংসা এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক : সিদ্ধান্তের আগে বরং এই প্রশ্নটা করা যাক : আমি কে? এর উত্তরে আমরা নিশ্চয়ই বলব না যে, আমি মন। অবশ্য দর্শনের জিজ্ঞাসা হিসাবে আমরা তা বলতেই পারি, তখন মন মানে আত্মা। তখন আধ্যাত্মিক ব্যাপার-স্যাপার এসে যেতে পারে। ‘মন’ আলোচনায় তা আসতেই পারে। কিন্তু আমাদের প্রশ্নটি নিতান্তই সামাজিক— এর উত্তর এভাবে দেওয়া যেতে পারে : ‘আমি’ এক জৈব সত্তা। যত সামাজিক সত্তায় ‘আমি’ ব্যক্ত হতে পারে বা পারে না, তাদের সকলেরই মন আছে। অর্থাৎ যত রকমের সামাজিক পরিচয় তত রকমের ‘মন’। এর তাৎপর্য হল-  একই ব্যক্তিদেহে ‘মন’ অনেক রকমের।

 

   এর থেকে আর-একটি সিদ্ধান্ত আমরা এই মর্মে নিতে পারি যে, দেহ-মন ও সমাজ যৌথভাবে ব্যক্তিকে নির্মাণ করে। এটা মনে রাখবার বিষয়, বিশেষ করে আত্মহত্যা বা ধ্বংসের ক্ষেত্রে।

 

   দেহ-মন ও সমাজের যৌথ নির্মাণ ব্যক্তি— একথাটির তাৎপর্য এই যে, ব্যক্তির সম্বন্ধে যে কোনও ভাবনা(কার্য-কারণ)তার সম্পর্কের পরিসরে(পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র)রয়েছে। ‘সম্পর্ক’ তৈরি হওয়ার মৌল ‘কার্য-কারণ’ ইতিপূর্বে আমরা জেনেছি(যৌনতা), তৎসত্ত্বেও ‘অবসাদ’-এর ‘কার্য-কারণ’ বুঝতে হলে ‘সম্পর্ক’কে আর-একটু জানতে হবে। ১. ‘সম্পর্ক’ বিমূর্ত বা অবয়বহীন, অর্থাৎ ‘মন’-এর মতো সম্পর্কের মধ্যেও শক্তি রয়েছে। ২. যে কোনও ‘সম্পর্ক’ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে সেখানে রয়েছে দুটি সামাজিক সত্তা। ব্যক্তির কোনও একটি সত্তা আর-এক ব্যক্তির সম্পর্ক-সম্ভব সত্তার সঙ্গে স্ব-স্ব স্বার্থ পূরণের জন্য সম্বন্ধ রচনা করে; যেমন, ছাত্র-শিক্ষক। ৩. সম্পর্কে আবদ্ধ সত্তাদুটি পরস্পর দাতা ও গ্রহীতা। ৪. সংজ্ঞা- যে কোনও দুটি সত্তা পরস্পর আধার-আধেয় গুণে অন্বিত হয়ে স্ব স্ব স্বার্থ পূরণের শর্ত সৃষ্টি করলে তা (গুণান্বয়) সম্পর্ক। ৫. যেহেতু সত্তার গুণ মনোগত সেহেতু সম্পর্ক হল দুটি সামাজিক মনের অন্বয়।

 

   মনে রাখতে হবে একজন ব্যক্তি মানে একজন সামাজিক মানুষ যাকে বহু সম্পর্কে বাঁচতে হয়।

অতএব একথা বলা যায় যে, অবসাদ হল কোনও এক ‘সম্পর্ক’-অন্বিত মনের বিযুক্ত হওয়ার আশঙ্কার (< ভয়) প্রকাশ। অর্থাৎ অবসাদের ‘কারণ’ স্বার্থের সমস্যার মধ্যে পাওয়া সম্ভব।

 

   স্বার্থ, স্বার্থের সমস্যা— এসব বিষয়ে আমাদের যথেষ্ট ধারণা থাকলেও আলোচনার সুবিধার জন্য কিছু কথা জানিয়ে রাখা ভালো। যেমন, স্বার্থ বলতে আমরা বুঝি, ‘নিজের প্রয়োজন’— এর নানা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ হতে পারে কিন্তু মূলত বেঁচে থাকার উপাদান সমূহের নিরিখে স্বার্থ দু’রকমের— প্রকৃতিগত ও সামাজিক। প্রকৃতিগত মানে ইন্দ্রিয়গত। আর সমাজের অন্যান্য সদস্যের স্বার্থের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ব্যক্তি স্বার্থ হল সামাজিক স্বার্থ। ইন্দ্রিয়গত স্বার্থের চরিতার্থতায় ব্যক্তি সুখী হয়। আর সামাজিক স্বার্থ পূর্ণ হলে মানুষের মধ্যে আনন্দ জেগে ওঠে। এই সূত্রে ‘সুখী-ন্যায়পরায়ণ’ সমাজের যে ধারণা অস্পষ্ট ছিল তা স্পষ্ট হতে পারে— যেমন ইন্দ্রিয়গত স্বার্থগুলির মধ্যে কেবলমাত্র জনন-ইন্দ্রিয়ের স্বার্থ সম্পর্ক তৈরি করতে পারে, এই সম্পর্ক একই সঙ্গে প্রাকৃতিক ও নৈতিক— এটা আমরা জানি কিন্তু সামাজিক মানুষের সুখ-ভাবনায় এই জানাটাকে আমরা মনে রাখি না, ফলে দাম্পত্যের পরিসরে অধিকাংশ নারী-পুরুষের ‘স্বার্থ’ যে যথার্থভাবে চরিতার্থ হতে পারে না, এটা ভাবনার বাইরে থেকে যায়, তার আরও এক কারণ এই যে, দাম্পত্য আসলে ‘প্রভু-অধীন’ সম্পর্ক— এর অর্থ, দম্পতির ‘যৌনতা’র একদিকে রয়েছে প্রভুর নৈতিকতা আর অন্যদিকে অধীনের নৈতিকতা— যৌনতা ছাড়া ‘প্রভু-অধীন’ সংস্কতি তার কদর্য রূপ প্রকাশ করেছে। অবশ্য যে যার অভিজ্ঞতা থেকে যৌনতার ব্যাপারটা জানলেও তা প্রকাশ হয়নি। ‘নারী-আন্দোলন’ তা প্রকাশ করেছে। দাম্পত্য ধর্ষণের কথা ইতিপূর্বে সবিস্তার বলা হয়েছে।... সমাজের একক ‘পরিবার’ হওয়ার কারণে দাম্পত্য-সত্তাদুটির যৌনসুখ-ই ‘সুখী সমাজ’ গঠন করতে পারে অর্থাৎ অদ্বৈত যৌন নৈতিকতার পরিবেশ তৈরি করাই ‘সুখী-ন্যায়পরায়ণ’ সমাজ গঠনের বুনিয়াদি কাজ...

 

   ‘নৈতিক পরিবেশ তৈরি করা’— একটি ‘রাজনৈতিক’ কাজ। এই কাজ কবে শুরু হয়েছিল, নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল; সন্দেহ নেই কাজটির অন্তঃসারে রয়েছে পশুত্ব ও নৈতিকতার দ্বন্দ্ব নিয়ন্ত্রণ— এই কাজের উল্লেখ  বাইবেল, পুরাতন নিয়মে আমরা লক্ষ করেছি। ‘অজাচার’ বা অবৈধ সংসর্গ সংক্রান্ত বিধিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, পুরুষ বা নারী— তোমরা কেউ পশুসম্ভোগ দ্বারা নিজেদের অশুচি করবে না।

 

   এর অর্থ, ‘যৌননৈতিকতা’কে শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করানোর ‘রাজনীতি’ যবে থেকেই শুরু হোক না কেন, তা যে সফল হয়নি, তার প্রমাণ অজাচার তথা অবৈধ সংসর্গ বিরোধী আইনের অস্তিত্ব! এমনকি, পরকীয়ার ‘সাহিত্যিক স্বীকৃতি’ও ‘আইনি বিরোধিতা’ তার দৃষ্টান্ত হতে পারে।

 

   এর পাশাপাশি ধর্ষণ-বিরোধী আইনের বারবার সংশোধন হওয়া মনে রাখলে কোনও পর্যালোচনা না করেই এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হতে পারে যে, ‘যৌন মিলনের আদর্শ আশ্রয় পরিবার’ তার ‘আদর্শ’ হারিয়েছে। অর্থাৎ সামাজিক পরিসরে মৌল সম্পর্কটির নৈতিকশক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। অতএব, অন্যান্য সামাজিক সম্পর্কভুক্ত সত্তামন— স্বার্থের নিরিখে ঠিক কী কারণে অবসাদগ্রস্ত হচ্ছে— এটা অনুমান করা সহজ ব্যাপার নয়।

 

   অথচ একজন মনোরোগ চিকিৎসকের লেখায় জানা গেছে, অদূর ভবিষ্যতে অবসাদ বৃহত্তম অসুখ হতে চলেছে(অবসাদ এক গোপন মহামারি # ডাঃ হিরণ্ময় সাহা)!

 

নয়

 

অন্য সব অসুখের মতো মনের অসুখেরও সামাজিক ভিত্তি আছে। কিন্তু তা— ধরা যাক টিবি বা ম্যালেরিয়া, এদের মতো নয়। একটি সামাজিক মন যখন বিষণ্ণ হয়, তার প্রভাব অন্য মনগুলির উপর কমবেশি পড়ে। যেমন, ধরা যাক বাবার মন খারাপ, পরিবারের অন্যদের মনে তা এফেক্ট করে, বাবার মন খারাপের কারণ যদি পরিবারের বাইরে অন্য কোনও প্রতিষ্ঠানে নিহিত থাকে তাহলে সেখানকারও কোনও কোনও সত্তার তা জড়িয়ে থাকবে— যদি বাবা শিক্ষক হন, তাহলে ছাত্র-শিক্ষক, সহকর্মী(শিক্ষক-অশিক্ষক) ইত্যাদি নানা সম্পর্কে নিহিত সত্তাদের মনের সঙ্গে, এমনকি তুচ্ছাতিতুচ্ছ সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তাঁর মনের মিথস্ক্রিয়া ঘটবে। এবং ঘটনার সামাজিক প্রতিক্রিয়া মৃদু থেকে প্রচণ্ড হতে পারে। সাধারণত ‘প্রচণ্ড’ হলেই সমাজ-রাষ্ট্র ধাক্কা খায়। তারও প্রতিক্রিয়া ঘটতে পারে। কেবল মনে রাখার বিষয়, এক্ষেত্রে অবসাদের কার্যকারণ কিন্তু তাৎক্ষণিক নয়, তার শিকড় থাকতে পারে সুদূর অতীতে... খুব পরিচিত ঘটনা হিটলারের আত্মহত্যা বা নাথুরাম গডসের গান্ধী-হত্যা— ‘স্টাডি’ করা যেতে পারে।

 

   এর সঙ্গে অবশ্য মনে রাখা জরুরি যে, দুর্নীতি ও অনৈতিক কাজ থেকে জন্ম নেওয়া ‘ভয়’ও মনকে অবসাদ দিতে পারে, যেমন, আমাদের অনেকেরই মনে পড়বে, ভারত সরকারের কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স মিনিস্ট্রির একজন ডিরেক্টর জেনারেল দুর্নীতির অভিযোগে সিবিআই হেপাজতে ছিলেন... গ্রেপ্তার হওয়ার দুদিন পর তাঁর স্ত্রী ও কন্যা আত্মহত্যা করেন আর তার দুমাস পর, জামিনে মুক্ত  অভিযুক্ত ও তাঁর পুত্র একই সঙ্গে জীবনের ছেদ টানেন...

 

     একটা পরিবারই ধ্বংস হয়ে গেল— এটা এক;  দুই, অবসাদ কেবল ‘ধ্বংসাত্মক’ নয়, তা ‘ক্রিয়েটিভ’ও অর্থাৎ সামাজিক কোনও মন(শিল্পীমন)বিষাদের ব্যবহারও জানে। এটা হল ‘ভয়’কে জয় করবার প্রক্রিয়া।  বলা যেতে পারে পশু থেকে মানুষের অনন্যতা এইখানে।

 

   ‘ধ্বংসাত্মক’ কাজেও-কিন্তু শিল্পীমন ব্যবহৃত হতে পারে, এটা মনে রাখবার বিষয়; উদাহরণ, আমেরিকার ‘ট্যুইন টাওয়ার’ ধ্বংস— অনেকের মনে হয়েছিল টিভির পর্দায় ‘ইনস্টলেশন আর্ট’ দেখছেন— তা ছাড়া ‘অ্যাকশন’ মার্কা যে কোনও ফিল্ম  এর উদাহরণ হতে পারে।

 

   এবং অ্যাকশন-ধর্মী সিনেমাগুলিতে দেখা যাবে সেক্স-ক্রাইম-ভায়োলেন্সের এক ‘অদ্ভুত’ রসায়ন বা শিল্পরস। অর্থাৎ আমরা বলতে চাইছি, এই সিনেমাগুলি যেহেতু ‘বাণিজ্য’ করে, সেহেতু যৌনতা(<পরিবার)-দুর্নীতি(<রাষ্ট্র)-হিংস্রতা(<সমাজ <সমজ)— এইগুলির উপভোক্তা কি অবসাদগ্রস্ত মন নয়? বিদগ্ধ পাঠকের সামনে প্রশ্নটি থাকল।

সেক্স-ক্রাইম-ভায়োলেন্স— শিল্পবাস্তবের এই তত্ত্বত্রয়ীকে যদি সমজ > সমাজ-ক্রমে সাজানো হয় তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়ায় (সত্তা >) পরিবার(<যৌনতা)-সমাজ(<হিংস্রতা)-রাষ্ট্র(<দুর্নীতি)— একটা চক্রক্রমের অধীন। আর সেই কারণে শিল্পবাস্তব আর বিদ্যমান বাস্তবের মধ্যে ফারাক কেবল ‘আলো-ছায়া’য়।

 

   অন্যভাবেও বলা যায়, বাস্তবকে অনুকরণ করছে শিল্পীমন আর শিল্পবাস্তবকে বাস্তবে রূপ দিচ্ছে উপভোক্তার সামাজিক মন। উপভোক্তা মানে ক্রেতা। ক্রেতা মানে যার ক্রয়ক্ষমতা আছে।

 

   অর্থাৎ অর্থ— ইকনমি, আর্থিক ব্যাপার-স্যাপার— মানে অর্থনীতি!

 

   তাহলে আমরা বলতে পারি সব কিছুর মূলে অর্থনীতি?

 

   এ আর নতুন কী কথা! মার্ক্স তো সে কবেই বলেছেন! রাষ্ট্র-সমাজ-পরিবার— সব কিছুর ভিত্তিতে রয়েছে অর্থনৈতিক উৎপাদন। এটা যুগ নিরপেক্ষ একটা ব্যাপার— কমিউনিস্ট পার্টির ইস্তাহারের ভূমিকায় প্রত্যক্ষভাবে বলা হয়েছে যে, ইতিহাসের প্রতি যুগে অর্থনৈতিক উৎপাদন ও তা থেকে আবশ্যিকভাবে গড়ে ওঠে যে সমাজ-সংগঠন, তা-ই থাকে সে যুগের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিগত ইতিহাসের মূলে।

 

   তাহলে কি একথা বলা যাবে যে, প্রতিটি হত্যা-আত্মহত্যার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ‘রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিগত’ প্ররোচনা?

 

   যে সব দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা হয়েছে তার সঙ্গে মনে পড়ছে ইতিহাসে দাগ রেখে যাওয়া আত্মহত্যার ঘটনা— ভ্যান গখ, মায়াকোভস্কি, আর্থার কোয়েসলার— এঁদের প্রত্যেকেই বিষাদের ক্রিয়েটিভ ব্যবহার জানতেন, রাজনৈতিকভাবেই জানতেন, তবু তাঁদের মনের অবসাদ মনের আধারকেই ধ্বংস করেছে— অতএব, প্রতিটি হত্যা-আত্মহত্যায় যে ‘রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিগত’ প্ররোচনা থাকে তা অস্বীকার করা যাচ্ছে না।

 

   তাহলে যেহেতু অবসাদের কার্য-কারণে যৌনতা, হিংস্রতা, অপরাধ— এই বিষয়গুলি রয়েছে সেহেতু সমাজের ‘রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির ইতিহাসে’ও ওই বিষয়গুলি থাকবে, শুধু থাকাই নয়, ওই ইতিহাস অবসাদজাত হতে পারে; এটাই স্বাভাবিক কিন্তু ‘আমাদের’ ঘোষিত রাজনৈতিক লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও কর্মসূচিতে এ সব থাকে না অথচ রাজনৈতিকভাবে এগুলির ব্যবহার ঘটে চলেছে! আর এখানে আমাদের প্রশ্ন, শ্রেণী-সংগ্রামের ইতিহাস বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে শিল্পের উক্ত ‘রসায়ন’-এর প্রতি আমজনতার যে আগ্রহ তাকে কোন দর্শনের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা যাবে? আদৌ কি কোনও দর্শন আছে? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়াটা খুব জরুরী, কেননা জগৎ ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে দার্শনিকেরা যৌনতাকে খুব একটা গুরুত্ব দেননি। প্রেমকে গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে যৌনতা আর প্রেম— একই বিষয় নয়। আর সেকারণে ‘আদর্শ’ অনুশীলনের ক্ষেত্রে প্রেমের ভূমিকা সদর্থক হতে পারে কিন্তু ‘যৌনতা’ প্রায়শই আদর্শ বিরোধী। বিশেষ করে ‘শ্রেণী-সংগ্রাম’-এর পরিসরে। সন্দেহ নেই, ‘শ্রেণী-সংগ্রাম’ এক দার্শনিক তত্ত্ব যা ধনতান্ত্রিক বিশ্বকে বদলানোর প্রস্তাবনাও বটে— আমাদের মনে পড়বে বহু উদ্ধৃত মার্ক্সের এই কথাটি, “দার্শনিকেরা নানাভাবে পৃথিবীকে শুধু ব্যাখ্যাই করেছেন, কিন্তু একে বদলানোই হল আসল কথা।” আর এই কথার সূত্র ধরেই কমিউনিস্টরা বলেন, ‘নিজেকে বদলাও, দুনিয়াকে বদলাও!’ গান্ধীবাদীরাও বলেন। কিন্তু মুশকিল হল ‘নিজেকে বদলানো’র ক্ষেত্রে ব্যক্তির ‘ধর্ম-অর্থ-কাম’-এর ভূমিকা কী হবে? বা, এই ত্রিবর্গ দ্বারা সদানির্মীয়মাণ ব্যক্তি কীভাবে ত্রিবর্গকে বদলাতে পারে?

 

   প্রসঙ্গত, মনে রাখতে হবে ব্যক্তিনির্মাণের চলমানতায় বিকৃতি তথা অসংগতি-হেতু ব্যক্তির কোনও এক সামাজিক মন অবসাদের কবলে পড়ে— এর ‘কার্য-কারণ’ সম্বন্ধ যথার্থভাবে জানতে না পারলে ‘নিজেকে বদলানো’র তত্ত্বটির ব্যবহারিক প্রয়োগ যে অসম্ভব, তার উদাহরণ আমরা নিজেরাই। বা, অবসাদের ‘কার্য-কারণ’ জানতে পারলে ধনতান্ত্রিক বিশ্বকে হয়তো বদলানো যাবে।

 

   আরও একটি ব্যাপার মনে রাখতে হবে, দার্শনিক দৃষ্টি এমনও বলেছে যে, প্রতি মুহূর্তে এই বিশ্বপ্রকৃতি নতুন হচ্ছে, বদলে যাচ্ছে... এই দার্শনিক সত্য অনুসারে প্রতিটি মানুষও প্রতি মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে— এই সত্যকে অস্বীকার করা যাচ্ছে না। তাহলে ‘নিজেকে বদলানো’র কাজটি ব্যক্তি নিজে কীভাবে সম্পাদন করবে? অথবা এই বদলানোর স্বরূপ কী?

 

   এর সঙ্গে সবচে’ অস্বস্তিকর একটা প্রশ্ন-কিন্তু উঁকি দিচ্ছে, ‘আত্মধ্বংস’ও কি শেষ বিশ্লেষণে ‘নিজেকে বদলানো’ নয়?

 

   ভাববাদী চিন্তায় এরকম প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক কিন্তু আমরা বস্তুবাদেই থাকতে চাইছি। অর্থাৎ ‘নিজেকে বদলানো’-ব্যাপারটা  বস্তুনিষ্ঠভাবে দেখা উচিত।

 

   ‘আত্মধ্বংস’— ব্যাপারটি কিন্তু বস্তুগতই... ব্যাপারটি ঘটা পর্যন্ত একটা চিন্তন প্রক্রিয়া চলতে থাকে আর বিজ্ঞান আমাদের জানিয়েছে যে,  চিন্তা আসে ইলেক্ট্রো-কেমিক্যাল বিক্রিয়া থেকে আর চিন্তা যে মনের কাজ (মন < প্রাণ < অন্ন)— এটা মনে রাখলে যে কোনও ভাবনাই বস্তুগত। অতএব, ভাববাদ বস্তুগত। এবং ‘আত্মধ্বংস’ও ‘নিজেকে বদলানো’র এক প্রক্রিয়া। এটা ভাবগত অর্থে যেমন সত্য, তেমন সমাজ-রাজনৈতিক তাৎপর্যেও সত্য— যেমন, ভাবগত অর্থে— যে সব উপদান-কারণ থেকে জৈবসত্তার উৎপত্তি, তার স্বাভাবিক মৃত্যুতে যেমন সেই সব উপাদান জটিল রূপ থেকে সরল রূপে মুক্ত হয়, প্রকৃতিতে মেশে, ঠিক তেমনভাবেই জৈবসত্তার অস্বাভাবিক মৃত্যুতেও উপাদানগুলির সরল রূপে মুক্তি ঘটে ও উভয় ক্ষেত্রে উপাদানগুলি নতুন রূপান্তরের দিকে যায়... আর ‘আত্মধ্বংস’-এর সমাজ-রাজনৈতিক তাৎপর্য এই যে, তা অনেকটা বংশাণু রক্ষার সঙ্গে তুলনা চলে... শোষণ-নিপীড়ন থেকে ‘স্বজাতি’কে রক্ষার নিমিত্তে ও সমাজের ‘বৈপ্লবিক রূপান্তর’-এর জন্য যারা ‘আত্মত্যাগ’ব্রত অবলম্বন করেন, তাঁদের ‘শহীদ’ হওয়া— এক ধরনের সামাজিক নির্মাণ। এবং মনে রাখতে হবে, তার বিপরীতে শোষক-নিপীড়কের হয়ে যারা যুদ্ধ করেন, তাঁরাও কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে ‘শহীদের মৃত্যুবরণ’ করেন!

 

   প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় যে, সেনাবাহিনীতে-পুলিশে মানসিক অবসাদ ও আত্মহত্যার প্রবণতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে— এই মৃত্যুগুলি  স্রেফ ‘আত্মধ্বংস’। আর এক্ষেত্রে অবসাদের অধিকাংশ কারণ-কিন্তু নিহিত রয়েছে ‘যৌনতা’য়।

আমরা ‘হাঁটছি’ কিন্তু কোথাও ‘পৌঁছাচ্ছি’ বলে মনে হচ্ছে না—

 

   এটাই তো হওয়ার কথা! আপাতভাবে মনে হচ্ছে দিশাশূন্যতা। আসলে কার্য-কারণ অনুসারী হওয়ার এটাই পরিণাম। কিন্তু তা চূড়ান্ত নয়, আবার ‘চূড়ান্ত’টি যে কী, তাও আমরা জানি না। ‘আমরা’ কেবল ‘আমাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য’কেই চূড়ান্ত মনে করে ‘কর্মসূচি’ গ্রহণ করি। এবং তা রূপায়ণের ক্ষেত্রে প্রায়শই দেখা যায় নানান অসংগতি— এর একটা পরিচিত উদাহরণ, ‘দারিদ্র্য দূরীকরণ’ কর্মসূচি...

 

   এই উদাহরণের সঙ্গে সঙ্গে দারিদ্র্য দূরীকরণের ‘কার্য-কারণ’-এ যে অর্থনীতির প্রভাব রয়েছে— এটা প্রকাশ্যে এল। এবং তা অর্থনৈতিক কার্যকলাপের ‘কার্য-কারণ’-এর সঙ্গে যুক্ত— এটাও আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না, আর সেই কারণে   অর্থকে ‘মহাকারণ’ জানার অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের নৈরাশ্যের কবলেও পড়তে হতে পারে। আর তা যদি হয়, সেক্ষেত্রে অবসাদ অনিবার্য।

 

দশ    

 

অবসাদের কার্যকারণে ‘ভয়’ একটা ফ্যাক্টর হয়ে আছে। অর্থাৎ নিরাপত্তার অভাব(< ভয়) থেকে অবসাদ। এসব কথা  আবারও বলা হচ্ছে এ কারণে যে, একটি প্রশ্ন রয়েছে আমাদের মনে, রাষ্ট্রীয় জীব হিসাবে ব্যক্তি রাষ্ট্রের কাছ থেকে নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকারী কিন্তু সাধারণ নাগরিক থেকে সেনা, নিরাপত্তারক্ষী, এমনকি ‘রেস্পেক্টেড’ বিজ্ঞানী-বুদ্ধিজীবী-মহাজন— সব রকমের মানুষকেই অবসাদে আক্রন্ত হতে দেখা যাচ্ছে— ‘ভয়’টা ঠিক কোথায়, কেন?

 

   এক কথায় ‘ভয়’ রয়েছে ব্যক্তির ‘স্মৃতি’(বা মন) ও সামাজিক অবস্থানের পরিপার্শ্বে। যেমন, শুঁয়োপোকা দেখে তিনিই ভয় পাবেন যার শুঁয়োপোকাজনিত ভয়ংকর ‘স্মৃতি’(অভিজ্ঞতা) আছে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে যে যার মতো উদাহরণ চয়নের পাশাপাশি আমরা মনে রাখব যে, ‘ভয়’ জীব দেহের বিপাকীয় কাজকর্ম(রাসায়নিক রূপান্তর) ও তার আচরণের পরিবর্তন ঘটায়। এটা মনে রাখতে হবে এই কারণে যে, ব্যক্তিসত্তা থেকে পাওয়া ‘ভয়’-এর ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার ঘটবে।

 

   আমাদের বোধহয় উদাহরণ হিসাবে ‘শুঁয়োপোকা’ না রেখে ‘ব্যক্তি’কে রাখা উচিত। তাহলে ‘হারানোর ভয়’ থেকে অবসাদ কীভাবে আসে, বোঝা সহজ হতে পারে।

 

   এক্ষেত্রে ‘সম্পর্ক’-এর সংজ্ঞা মনে রেখে আমরা মৌল সম্পর্কে(যৌনতার স্বার্থে রচিত সম্পর্ক)উপস্থিত সত্তা দুটিকে উদাহরণ হিসাবে বিশ্লেষণ করতে পারি। ধরা যাক একটি নারী সত্তা X ও একটি পুরুষ সত্তা Y— বৃদ্ধি-বিকাশের নিয়মে(প্রাকৃতিক নিয়ম) তারা সঙ্গী খুঁজবে... প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ ও সাহিত্য পাঠ থেকে(অ্যা বয় মিটস অ্যা গার্ল) আমরা এই খোঁজের স্বরূপ অনুমান করে নিতে পারব। মনে রাখতে হবে, একই সঙ্গে তাদের খাদ্যও খুঁজতে হবে(জীবিকা)। বিশেষ করে Y-কে কারণ, সঙ্গী পাওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষকে উপার্জনশীল হতে হয়— এটাই পুরুষশাসিত সমাজের নিয়ম। ধরা যাক X ও Y পরস্পরকে খুঁজে পেয়েছে। প্রকৃতিগতভাবে একটি সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে, সামাজিক প্রশ্রয়ও সেখানে আছে। এবার একটা ক্লিশে গল্প— একদিন X জানাল যে, তার বিয়ের কথা ভাবছে পরিবার। Y তার যোগ্যতা অনুসারে কোনও জীবিকার  সন্ধান তখনও পায়নি। এই জীবিকা না পাওয়ায় Y-র মনে মেয়েটিকে যৌনসঙ্গী হিসাবে না পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। সে সময় চাইবে। দেখাসাক্ষাৎ কমে যাবে। উভয় সত্তায় অবসাদ দেখা দিতে পারে। যা থেকে Y ‘দেবদাস’ হয়ে যেতে পারে, হত্যা-আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটতে পারে। এমনকি ‘অ্যাসিড-আক্রান্ত’ হতে পারে X ।

 

   কিন্তু অন্য কোনও সামাজিক মন যদি অবসাদগ্রস্ত মনকে লড়িয়ে দিতে পারে অর্থাৎ সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ‘কার্য-কারণ’ উপলব্ধি করাতে পারে তাহলে অন্য কিছু, ক্রিয়েটিভ কিছু ঘটা সম্ভব— শিল্প থেকে বিপ্লব।

 

   এর অর্থ অবসাদ থেকে হত্যা-আত্মহত্যা-শিল্প-বিপ্লব যা-ই ঘটুক না কেন, সব ক্ষেত্রেই— বুনিয়াদি উপাদান অর্থনৈতিক কার্যকলাপ। আরও স্পষ্ট করে বলা যায় যে, মানুষের আদি সম্পর্কের ভিত্তি আর ‘জনন’(> ‘যৌনতা’) নয়, অর্থ।

 

   যদি এটা সিদ্ধান্ত হয়, এই ভাবনায় বিভ্রম থাকতে পারে অথবা ভাবনাটা অসম্পূর্ণ। ব্যাপারটা বোঝা যেতে পারে এই ভাবে-- ধরা যাক, আজ কোথাও নারী-পুরুষের এক বিবাহ অনুষ্ঠান ঘটছে, সামাজিকভাবে, বা আইনিভাবে— এই বিবাহের অন্তঃপ্রেরণা যে ‘যৌনতা’— তা কি অস্বীকার করা যাবে? অথবা, এই মুহূর্তে দুজন প্রেমিক-প্রেমিকা অর্থের বিনিময়ে পাওয়া কোনও আপাত নিরাপদ ‘আশ্রয়’-এ একান্তে কিছুটা সময় কাটাচ্ছে— এই সম্পর্কের মধ্যে ‘যৌনতা’ নেই— এমন ভাবনা বাড়াবাড়ি রকমের ‘প্লেটনিক’ হয়ে যাবে না কি? বা, এই মুহূর্তে যে মেয়েটি বা মহিলাটি অর্থের বিনিময়ে ‘সারোগেট মা’ হওয়ার জন্য চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করছেন, তা কি ‘যৌনতা’ বহির্ভূত? তা যদি না হয়, তাহলে ওই সম্পর্কগুলি থেকে আর যে সব সামাজিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে বা হবে, সেই সব সম্পর্ক যে ‘যৌনতা’(< যোনি) থেকে এসেছে, এবিষয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। কিন্তু এটা আমরা মনে রাখি না।

অর্থাৎ সমাজ-ভাবনার ক্ষেত্রে ‘সম্পর্ক’ মনে না রাখলে যে কোনও ঘটনার বুনিয়াদি উপাদান অর্থনৈতিক কার্যকলাপ— এটা মনে হবে। তবে একে বিভ্রান্তি না বলে বলা ভালো একদেশদর্শনজাত সত্য— সত্য একারণে যে, মানবপ্রজাতি অর্থনৈতিক জীব হিসাবেও সংজ্ঞায়িত হয়েছে, এই সংজ্ঞা অনুসারে ‘ঘটনা’র ভিত্তি(base)-তে অর্থনীতি রয়েছে, এই ভাষ্য ‘বিভ্রম’ নয়। সত্যের অংশমাত্র। অর্ধেক সত্যও বলা যেতে পারে।

তাহলে তো আর-অর্ধেক সত্য— ওই সংজ্ঞার মধ্যেই রয়েছে!

 

   এক্সাক্টলি, সংজ্ঞা তত্ত্বও বটে! ‘জীব’ শব্দটির মধ্যেই তা রয়েছে। জীব প্রকৃতির নিয়মেই ‘সম্পর্ক’ তৈরি করে। আমরা যদি ‘ব্যক্তি’র সংজ্ঞা ফিরে দেখি তা হলে একথা অস্বীকার করা যাবে না যে, ‘জৈবসত্তা’টির জন্ম ‘যৌনতা’য় ও সে প্রথম যে ‘সম্পর্ক’ তৈরি করে তা মন নিরপেক্ষ ‘যৌন তাড়না’ থেকে, প্রকৃতিগতভাবে যা প্রজনন উস্কানি। এই ‘সম্পর্ক’ রচনাই ব্যক্তির জৈব-জীবনে ঘটা ‘আদি ঘটনা’।

 

   তাহলে তত্ত্বের নিয়মানুসারে আমরা বলতে পারি : ঘটনার ( কার্য-কারণ ) বুনিয়াদি উপাদান যৌনতা ও অর্থনৈতিক কার্যকলাপ।  

 

    কিন্তু প্রশ্ন হল যৌনতা ও অর্থনীতি— এরা কি পরস্পর বিপরীত?

 

   সমজ > সমাজ— এটা মনে রেখে ও সমাজবিবর্তনের ইতিহাস অনুসরণ করে একথা অনায়াসে বলা যায় যে, ‘যৌনতা’(< যোনি) নারীবাচক আর ‘অর্থনীতি’তে যেহেতু পুরুষ প্রাধান্য, তাকে ‘পুরুষ’ ভাবা যেতেই পারে! অর্থাৎ তত্ত্ব হিসাবে বাক্যটি গ্রহণযোগ্য। অতএব, আমরা বলতে পারি যে, ‘যৌনতা ও অর্থনৈতিকতা’র পরস্পরিক সম্বন্ধ হল  তাবৎ  মানবীয় ঘটনাপ্রবাহের  ‘মহাকারণ’!

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com