ভয়তাড়িত সমাজ (পঞ্চম পর্ব)

এগারো

 

   তাহলে, আত্মধ্বংস, ধর্মযুদ্ধ-কি শ্রেণীযুদ্ধ— এসবেরই প্রচলিত ‘কার্য-কারণ’কে আমাদের প্রস্তাবিত ‘মহাকারণ’-এর নিরিখে দেখতে হবে— এই প্রস্তাব কি আমরা রাখতে পারি?

 

   না। কারণ, আমাদের প্রস্তাবিত ‘মহাকারণ’-এর ‘কার্য-কারণ’ সম্বন্ধে কোনও স্পষ্ট ধারণা রাখা হয়নি। আমরা ‘যৌনতা’র ‘কারণ’ খানিকটা আন্দাজ করা গেছে। ‘অর্থ’কে সম্পর্কের(গৌরবার্থে ‘ঘটনা’র, প্রকৃত প্রস্তাবে তা সংস্কৃতির)চালিকা শক্তি রূপে দেখার অভ্যাসে ‘মহাকারণ’ বলেই মনে হয়, যদিও তা খণ্ড সত্য হিসাবে আমরা গ্রহণ করেছি। কিন্তু এই বিষয়-দুটিকে যতক্ষণ না সামাজিক পরিসরে ‘থিসিস-অ্যান্টিথিসিস’ আকারে উপস্থাপন করা যাচ্ছে, ততক্ষণ ওই প্রস্তাব রাখা উচিত হবে না। বরং সমাজের সংজ্ঞা মনে রেখে ওই বিষয়-দুটির সাপেক্ষে সমাজবিশ্লেষণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে এবং বিশ্লেষণ(analysis) অবশ্যই সংশ্লেষাত্মক হবে, যদি সংশ্লেষণ(synthesis)স্পষ্ট হয়, তাহলে দুটি তত্ত্ব পাওয়া সম্ভব।

 

   কিন্ত এই কাজটি একটি গবেষণার পরিসর দাবি করে এবং তা সময় সাপেক্ষ। এর কোনওটিই আমাদের ক্ষেত্রে/পক্ষে provide করা সম্ভব হবে না। যোগ্য জনেরা তা করবেন এমন আশা রেখে আমরা বরং শিল্প-সাহিত্য থেকে ধর্ম ও নারী, ধর্ম ও অর্থ সম্পর্কে যে সব ‘বয়ান’ জেনেছি, সে সব যথাসম্ভব মনে রেখে, প্রয়োজনে বই-পত্র দেখে, এমনকি ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইস্তাহার’ থেকেও ‘চিন্তা’ নিয়ে ধর্ম ও যৌনতা বিষয়ে একটি সন্দর্ভ রচনা করা যায় কি না তা ভাবতে পারি।

 

   কিন্তু সেটাও এই আলোচনার ক্ষেত্রে সংগতিপূর্ণ হবে না। কারণ ধর্ম বিষয়ে একটি বিস্তৃত আলোচনা রাখতে হবে। তবে ধর্ম বিষয়ে দু-একটি কথা বলা যেতে পারে— আমরা জানি যে, ‘কার্য-কারণ’ সূত্র আমাদের অস্তিত্বের ধ্বংস বা বিদ্যমানতার ‘মহাকারণ’ হিসাবে আবিষ্কার করেছে এক ‘রহস্যময়শক্তি’— তা-ই মানবজীবনকে নিয়ন্ত্রণ করছে... সমাজবিবর্তনের ক্রমানুসারে টোটেম > দেবতা > ঈশ্বর > রাষ্ট্র... এ সব আমরা কমবেশি জানি।

 

   কিন্তু মনে রাখতে হবে সমাজ-সংস্কৃতিতে একই সঙ্গে সবগুলির প্রভাব আজও রয়েছে। সব ‘রহস্যময়শক্তি’র ধর্মগ্রন্থ আছে। রাষ্ট্রের ‘ধর্মগ্রন্থ’— সংবিধান থাকা সত্ত্বেও সেগুলি ‘চর্চিত’ হয়, তুলনায় ‘সংবিধান’-চর্চা খুবই কম। ধর্মে ধর্মে সংঘাত বেশি। এই অনুষঙ্গে ধর্ম সম্বন্ধে বহুশ্রুত কার্ল মার্ক্সের উক্তি ‘ধর্ম জনসাধারণের আফিম’— কথাটি যে আলোচনা থেকে সিদ্ধান্ত বাক্যের রূপ পেয়েছে তার পূর্ণ বয়ানটি এখানে আমরা উল্লেখ করব :

 
   “ফয়েরবাখের নজরে পড়েনি যে, পার্থিব জগতে আত্মবিচ্ছেদ ও আত্মবিরোধ আছে বলেই পার্থিব ভিত্তিটা নিজের থেকে বিচ্ছিন্ন করে ঊর্ধ্বলোকে একটা স্বতন্ত্র রাজ্যরূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে। সুতরাং ধর্মের নিরাকরণের জন্য জগতের স্ব-বিরোধগুলো বুঝতে হবে। সেগুলি দূরীকরণের দ্বারা জগতের বিপ্লবী রূপান্তর সাধিত হবে। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, যতদিন প্রকৃতি মানুষের বুদ্ধিগম্য না হয় এবং মানব সমাজ নিজেই নিজের ভাগ্যনিয়ন্তা না হয় ততদিন ধর্ম জগতের সাধারণ তত্ত্বরূপে থেকে যাবে।
 
   “এই রাষ্ট্র এই সমাজই সৃষ্টি করে ধর্ম। এক বিপরীত ধরনের জগতের চেতনা। ধর্ম ঐ জগতের সার্বিক এবং সাধারণ তত্ত্ব, তার সর্বজনবোধ্য লজিক, তার আধ্যাত্মিক মর্যাদাস্থল, তার পরমোৎসাহ, তার নৈতিক অনুমোদন, তার পবিত্র পূর্ণতা, তার সান্ত্বনা ও যাথার্থ্য বিধানের ভিত্তি। ধর্ম মানবিক মর্মবস্তুর এক উদ্ভট আত্মসিদ্ধি, যেহেতু সত্যকার বস্তুজগতের মানবিক মর্মবস্তু অপ্রতিষ্ঠিত(The essence of man is not established)। ধর্মীয় আর্তি যুগপত প্রকৃত আর্তির প্রকাশ—আবার তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ধর্ম নিপীড়িত জীবের দীর্ঘশ্বাস, হৃদয়হীন জগতের হৃদয়, নিষ্প্রাণ অবস্থার প্রাণ, ধর্ম জনসাধারণের আফিম।”

 

   ধর্ম সম্বন্ধে মার্ক্সের এই চিন্তা ‘মানবজগৎ’কে তত্ত্ব হিসাবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে।

 

   অর্থাৎ মানবজগৎ বস্তু ও ভাব— এই দুই তত্ত্বের ‘নির্মাণ’। 

 

   অথবা এভাবেও বলা যায় যে, মানবজগৎ প্রকৃতি ও শিল্পকৃতির দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে সদা নির্মীয়মাণ।

 

   উভয় ক্ষেত্রে ‘নির্মাণ’কে তত্ত্ব হিসাবে দেখতে হবে, তাহলে তার বিপরীত তত্ত্ব— ‘ধ্বংস’, এটাও মনে রাখতে হবে। কেননা ‘আত্মধ্বংস’ বোঝার ক্ষেত্রে ‘ধ্বংস-নির্মাণ’তত্ত্ব কাজে লাগতে পারে।

 

   তাহলে ‘কাঠুয়াকাণ্ড’ মনে রেখে মানবজগতের সংজ্ঞা এরকমও হতে পারে : মানবজগৎ হল ভূমি ও ধর্মের সংঘর্ষক্ষেত্র।

 

   তাহলে এ কথাও বলা যেতে পারে যে, নারী ও ধর্মের সংঘর্ষক্ষেত্র হল মানবজগৎ। এর তাৎপর্য হল : ধর্ম পুরুষবাচক।

 

   অতএব, নারী— বস্তুবাচক, এটা স্বীকার করতে হচ্ছে!

 

   এবং আমাদের মনে রাখতে হবে, বস্তু মানেই শক্তির ঘনীভূত রূপ। এই ‘শক্তি’-অনুষঙ্গ আমাদের আলোচনায় আর-একটি অভিমুখ এনে দিতে পারে এবং তা যে প্রাসঙ্গিক থাকবে না, তা নয়; কিন্তু এই আলোচনার মূল অভিমুখের সঙ্গে তাকে মিলিয়ে দেওয়া মুশকিল হবে। এই বিবেচনায় ‘শক্তি-খনন’ থেকে সরে এসে আমরা এই সত্যে স্থিত হচ্ছি যে,  বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে মানবজগৎ তৈরি হয়েছে নারী ও পুরুষ সত্তার পরস্পর অভিন্ন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য।

 

   অতএব, তাবৎ মানবীয় ঘটনার ‘কার্য-কারণ’ বুঝতে হবে ‘যৌনতা ও অর্থনৈতিকতা’র নিরিখে— এই প্রস্তাব আমরা রাখতেই পারি এবং এর পাশাপাশি মনে রাখতে বলব যে, ‘সৃষ্টি-লালন-লয়’— প্রকৃতির এই নিয়ম ও মানবীয় তত্ত্ব— ‘ধ্বংস ও নির্মাণ’, এক নয়।

 

বারো

 

   প্রকৃতির ‘সৃষ্টি-লালন-লয়’ ও মানুষের ‘ধ্বংস-নির্মাণ’— এই বিষয়-দুটি, তত্ত্বের যে বাইনারি নিয়মের কথা বলা হয়েছে, তার সঙ্গে মিলেও যেন মেলে না। যেমন, একটি মানবশিশুর জন্ম(< যৌনতা) থেকে (স্বাভাবিক)মৃত্যু পর্যন্ত ব্যাপ্ত যে জীবন সেখানে প্রকৃতির ওই ‘নিয়ম’ বুঝতে অসুবিধা নেই। কিন্তু যে যুবক, যুবতীও হতে পারে কিংবা যে কোনও বয়সের মানুষ, যে আত্মহত্যা করেছে, আসলে তো সে তার মৃত্যুকে নির্মাণ করছে— এটা প্রাকৃতিক নয়!মৃত্যুকে নির্মাণ করার অর্থই হল ধ্বংসকে নির্মাণ করা— একটি সচেতন প্রয়াস।

 

   অতএব, ধ্বংস ও নির্মাণ— এরা পরস্পর বিপরীত হতে পারে না, বরং পরস্পরের সহযোগী। অর্থাৎ ‘ধ্বংস-নির্মাণ’—           তত্ত্ব  হিসাবে গ্রহণীয় নয়। এই সূত্রে মনে রাখতে হবে যে, প্রকৃতিজগৎ ও মনুষ্যজগৎ পরস্পরের বিপরীত নয় বরং মনুষ্যজগৎ প্রকৃতিজগতের অংশ। এবং এই অংশ হিসাবে সে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছে। আমাদের উদ্ধৃত ‘ধর্মতত্ত্ব’-এ মার্ক্স যে ‘আত্মবিচ্ছেদ ও আত্মবিরোধ’-এর কথা বলেছেন মনুষ্যজগতে তা এসেছে ওই প্রকৃতি-বিচ্ছিন্নতা থেকে। এমনকি সমাজ থেকে রাষ্ট্রের যে বিচ্ছিন্নতার কথা বলা হয়েছে মার্ক্সীয় রাষ্ট্রতত্ত্বে, তারও ‘কারণ’ নিহিত রয়েছে প্রকৃতি-বিচ্ছিন্নতার মধ্যে।

 

   প্রসঙ্গত কারও মনে পড়তে পারে, ‘প্রকৃতি’র দার্শনিক অর্থ, ‘চৈতন্যময় পুরুষের বিপরীত অজ্ঞানময় জড়’ আর অন্যান্য অর্থের একটি হল ‘নারী’ এবং এর থেকে যে সরল সমীকরণ হতে পারে তা হল ...অজ্ঞানময় জড় = প্রকৃতি = নারী; আর দর্শনগতভাবে আমরা এ কথা বলতেই পারি যে, ‘চৈতন্যময় পুরুষে’র দৃষ্টিতে ‘অজ্ঞানময় জড়’ মানে রহস্যময় বস্তু = রহস্যময়ী নারী— ‘নারীচরিত্র দেবঃ ন জানন্তি’। এর অর্থ এই যে, পুরুষ-চৈতন্য নারী-চৈতন্য-পাঠে কৃতবিদ্য নয়। অতএব,  প্রকৃতি-বিচ্ছিন্নতার আর-এক তাৎপর্য এই যে,  নারী  থেকে পুরুষ পরস্পর চেতনাগতভাবেই  বিচ্ছিন্ন।

 

   এর থেকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় যে, এই মানবজগৎ ‘পুরুষ-প্রকৃতির লীলা’র মাধ্যমে আজও রূপ পেয়ে চলেছে এবং তার সম্বন্ধে যে সব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও রাজনীতি তা মূলত প্রকৃতি-বিচ্ছিন্নতার অবস্থান থেকেই হয়েছে। এবং তা প্রকৃতির বিরুদ্ধেও বটে!

 

   এই যে মানবজগৎ ‘রূপ পেয়ে চলেছে’— তা কি ‘বদলানো’ নয়?

 

   অবশ্যই তা সমাজবিবর্তনের অংশ কিন্তু বদলানোটা যে অর্থে-তাৎপর্যে ব্যবহার করা হয় তার অন্তঃসারে রয়েছে ‘সুখসমৃদ্ধি ও কল্যাণ’— অর্থাৎ বদলানোটাকে হতে হবে অন্যের দুঃখের কারণ না-হয়ে ‘আত্মসুখ ও সমৃদ্ধি’ এবং অন্যের কল্যাণের সঙ্গে বিরোধহীন ‘স্বকল্যাণ’। কিন্তু তা হয়নি। কেন হয়নি? এর দু’রকম উত্তর হতে পারে; এক, ‘প্রতিকল্প’টিই অবাস্তব অর্থাৎ ‘সুখি ন্যায়পরায়ণ সমাজ’ গঠন সম্ভব নয়, কারণ এ প্রকৃতির নিয়ম বিরোধী; দুই, কারণ সেই ‘মহাকারণ’— ধনতন্ত্র।

 

   এ এক আশ্চর্য ব্যাপার— দুঃখের কারণ ধনতন্ত্র, দুঃখ নিবারণের উপায় যে সমাজতন্ত্র তার উদ্ভব-কারণ ধনতন্ত্র, সমাজতন্ত্র অসফল— কারণ ধনতন্ত্র। ‘মহাকারণ’-ই বটে! কিন্তু মনে রাখতে হবে, বদলটা সব সময়তে ‘ধনিক সমাজ’-এর অনুকূলে ঘটে চলেছে।

 

   শেষ পর্যন্ত বদলটা তো সেই ‘পুরুষ-প্রকৃতির লীলা’র মাধ্যমে ঘটছে— এই ‘লীলা’র কারণও কি সেই ধনতন্ত্র নয়?

তত্ত্বগতভাবে তা-কিন্তু নয়। কারণ, আক্ষরিক অর্থে ধনের উৎস প্রকৃতি— এই প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন মানবপ্রজাতির একটি অংশ নারী ‘প্রকৃতি’ আখ্যা পেয়েছে, অতএব, সেও ধনের উৎস— ‘খনন’-এর বিষয়। খনন মানে উৎপাদনের উপকরণ সংগহ। অতএব, এ পর্যন্ত মানবজগৎ যত রকমের বদলের মধ্য দিয়ে এসেছে তা প্রকৃতি-খননের মাধ্যমে— এই সিদ্ধান্তের সপক্ষে আমরা ‘কমিউনিস্ট ইস্তাহার’ থেকে একটি তত্ত্ব দাখিল করব : ‘উৎপাদনের উপকরণে অবিরাম বৈপ্লবিক পরিবর্তন না ঘটিয়ে এবং তাতে করে উৎপাদন-সম্পর্ক ও সেইসঙ্গে সমগ্র সমাজ-সম্পর্কের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন না ঘটিয়ে বুর্জোয়া শ্রেণী বাঁচতে পারে না।’ কেবল বুর্জোয়া যুগ সম্বন্ধেই এটা সত্য— এমন মনে হতে পারে, কিন্তু মনে রাখতে হবে সমাজের স্বাভাবিক পরিবর্তনের কথা(অটোকোর্স) আর বুর্জোয়া সমাজই যে কেবল ‘ধনতান্ত্রিক’ তা নয়, এই সমাজের পূর্ববর্তী যত সমাজ ছিল বা আছে সবই ধন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে এসেছে বা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে যুগ নিরপেক্ষভাবে তত্ত্বটি এরকম হতে পারে : উৎপাদনের উপকরণে অবিরাম পরিবর্তন ঘটিয়ে এই মানবজগৎ চলমান। কেবল মনে রাখার বিষয়, নারী একাধারে উৎপাদক ও উৎপাদনের উপকরণ।  

 

   এই ‘খনন-সংস্কৃতি’র নানান অভিজ্ঞান রয়েছে শিল্প-সাহিত্যে, তা থেকে ‘প্রকৃতি’ কীভাবে নির্মিত হয়ে এসেছে, তার একটা বিবরণ উল্লেখ করা যায়। ইতিপূর্বে আমরা তা করেছি। সভ্যযুগের প্রথম থেকে পুরুষের দৃষ্টিকোণ কীভাবে নারীসত্তাকে তত্ত্বায়িত করেছে তা এখানে অংশত ‘কপি-পেস্ট’ করা যেতে পারে।

 

নারীসত্তা > ক্রীতদাস, শূদ্র, পশু (সূত্র অ্যারিস্টটল, মনু)।

নারীসত্তা > স্ত্রী(পুত্রলাভের জন্য), উপপত্নী(কামসুখের জন্য), গণিকা(আত্মার সুখের জন্য) (প্রচলিত)।

নারীসত্তা > নৈতিক দুর্বলতাগ্রস্ত সত্তা( শেক্সপেয়ার)।

নারীসত্তা > দৈহিকভাবে দুর্বল(প্রচলিত)।

নারীসত্তা > অমৃতভাষিণী গোপন শত্রু।শিকারীর ফাঁদের চেয়েও বিপজ্জনক ফাঁদ(সুত্র অন্যচোখ ৫ম বরস/১৪১১)।

নারীসত্তা > পবিত্র মাতৃত্ব, দেবী...(প্রচলিত)।

নারীসত্তা > প্রেরণা, প্রকৃতি(সাহিত্য, দর্শন)।

নারীসত্তা > নরকের দ্বার(প্রচলিত)।

নারীসত্তা > স্ত্রীলোক— স্ত্রীলোক স্বভাবতই রতিপ্রিয়া। উপযাচক পুরুষের অভাবে এবং পরিজনদের ভয়েই নারীরা পতির বশে থাকে। তাদের অগম্য কেউ নেই, পুরুষের বয়স বা রূপ তারা বিচার করে না। পুরুষ না-পেলে তারা পরস্পরের সঙ্গে কামনা পূরণ করে। সুরূপ পুরুষ দেখলেই তাদের ইন্দ্রিয়বিকার হয়। যম পবন মৃত্যু পাতাল বড়বানল ক্ষুরধারা বিষ সর্প ও অগ্নি— এই সমস্তই একাধারে নারীতে বর্তমান।[মহাভারত(মহাভারতে এই কথাগুলি এক গণিকার মুখ দিয়ে বলানো হয়েছে।) অনুশাসনপর্ব/৯]।

 

   এই তত্ত্ব, তত্ত্ববীজগুলি থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, এগুলির অধিকাংশের ভিত্তি—‘যৌনতা’, স্থানিক পরিসর—‘পরিবার’(> যৌনতা ভিত্তিক সংস্কৃতি), পরিবার ব্যাপ্ত হয়েছে ‘সমাজ’-এ(> শিল্প-সাহিত্য)...

                                                        (...মানবিক সমাজের দিকে পৃঃ ৭২)।

 

   অতএব, আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত তৈরি করেছে যৌনতা(< যৌন নৈতিকতা) ও অর্থনৈতিকতা— এবিষয়ে কোনও সংশয় থাকতে পারে না। আমরা যদি ‘সমজ থেকে সমাজ’ এই তত্ত্বটা মনে রাখি তাহলে পশুজগতের জনন ও খাদ্য আহরণ থেকে মনুষ্যজগতের যৌনতা ও অর্থ আহরণ বদলে গিয়েও ‘সমাজ’-এর মধ্যে ‘সমজ’ কীভাবে রয়ে গেছে তা দেখা যাবে। অবশ্য ইতিপূর্বেই আমরা দেখেছি, যৌনতা মানবিক হয়ে ওঠেনি। এবং অর্থনীতি ‘শিকারি সমাজের কৃতকৌশল’ ব্যবহার করে বলে তা আজও ‘পাশবিক’ অর্থাৎ অর্থনীতি মানবিক হতে পারেনি।

 

   তাহলে অমানবিক যৌনতা ও ‘পাশবিক’ অর্থনীতি সম্মিলিতভাবে যে সব রাজনৈতিক তত্ত্ব ও তার ব্যবহারিক প্রয়োগ ঘটিয়ে চলেছে, বস্তুত রক্তাক্ত সমাজ-বদল— একটি ‘নিত্যসত্য’ ব্যাপার হয়ে আছে, মানবজগৎ সংঘর্ষময় রণক্ষেত্র— এই তাত্ত্বিক পরিসরে ‘নিজেকে বদলাও দুনিয়াকে বদলাও!’— এই বাণীর রাজনৈতিক তাৎপর্য-কিন্তু যথেষ্ট ঝাপসা! যেমন, ধরা যাক, একজন অবসাদগ্রস্ত মানুষকে বলা হল ওই কথা, তা কার্যকর করার ক্ষেত্রে সেই মানুষটির ‘mode of action’ কী হবে, তা কিন্তু আমাদের অজানা। একা মানুষ(auto) নিজেকে কীভাবে বদলাবে, যা একই সঙ্গে ‘দুনিয়াকে’ও বদলে দেবে? ‘দুনিয়া বদল’ ও তার লক্ষণসূত্র সম্বন্ধে কোনও ধারণা না থাকায় তার অবসাদ কি আরও গাঢ় হবে না?— এই প্রশ্নের উত্তর ‘না’ হওয়া অসম্ভব; আর প্রথম প্রশ্নের উত্তর আমাদের কাছে নেই।

 

   তাহলে কি কথাটা কথার কথা?

 

   আমাদের মনে রাখতে হবে, কোনও ‘বাক্য’ তাৎপর্যহীন নয়। তার মধ্যে ‘কার্য-কারণ’ সম্বন্ধ রয়েছে। কোথাও সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া সম্ভব। সেক্ষেত্রে বাক্যাংশকে ‘কথার কথা’ মনে হতে পারে। বা তা অন্য তাৎপর্যবহ হয়ে উঠতে পারে। যেমন, ‘ধর্ম জনসাধারণের আফিম’-কথাটা...  

 

   ‘নিজেকে বদলাও দুনিয়াকে বদলাও’-কথাটার ক্ষেত্রেও তেমন কিছু ঘটে থাকতে পারে। কিন্তু সীমিত পড়াশুনোর স্মৃতিতে আমরা তার হদিশ পাচ্ছি না। তবে কথাটার আগে আর-একটা টুকরো কথা বসানো যেতে পারে—  ‘নিজেকে জানো! ’  কথাটা ‘রাজা অয়াদিপাউস’ নাটকে এক মন্দিরের প্রবেশদ্বারে লিপিবদ্ধ ছিল বলে উল্লেখ আছে। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের এক নাটকে যা উল্লেখ করা হচ্ছে, তার প্রাচীনত্ব সম্বন্ধে সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু সংশয় না রেখে একথা বলা যায় যে, কথাটা দার্শনিক—ধর্ম-দর্শনের কথা। উপনিষদেও নিজেকে জানার কথা বলা হয়েছে।

 

   প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে, ‘নিজেকে জানা’র প্রথম ধাপ একটি প্রশ্ন, আত্মজিজ্ঞাসা, ‘আমি কে?’ এটাই দর্শনের মৌলিক প্রশ্ন। কিন্তু প্রশ্নটা সামাজিকও বটে। অতএব, ‘আমি’ মানে, পুনরুল্লেখ করে বলা যায়, ‘আমি’ মানে এক জৈবসত্তা যে নানান সামাজিক সত্তায় ব্যক্ত হয়ে আছে বা ব্যক্ত হবে। দর্শন নিশ্চয়ই এই সত্তাগুলিকে অস্বীকার করবে না!

 

   তাহলে একথা বলা যাবে যে, ‘নিজেকে জানা’র বিষয় দুটি— ‘জৈবসত্তা’কে জানতে হবে, জানতে হবে প্রতিটি সামাজিক সত্তাকে। এবং জানার উদ্দেশ্য হবে ‘নিজেকে বদলানো’— এই বদলানোর ক্ষেত্রে নিশ্চয় কোনও ‘আদর্শ’ থাকবে যা ‘আমার’ মধ্যে নেই, তাকে প্রতিষ্ঠা দিতে হবে। কিন্তু ‘আমি’-ব্যক্তিটি তো সমাজের আরও সব ব্যক্তির সামাজিক সত্তার সঙ্গে জড়িয়ে আছি। ‘আমরা’ প্রত্যেকেই ‘স্বতন্ত্র’ হয়েও অন্যনিরপেক্ষ নই। এর অর্থ, ‘নিজেকে জানা’ মানেই ‘আমার’ মধ্যে নিহিত ও সঙ্গে বিজড়িত বিপরীত সত্তাগুলিকেও জানা! এর আর-এক অর্থ— যেহেতু ‘আমি’-ব্যক্তিটি এক সামাজিক নির্মাণ সেহেতু ‘আমার’ জানার বিষয়ও সমাজ(< সমজ)।

 

   সন্দেহ নেই যে, আমাদের চিন্তাপ্রবাহ এক ঘূর্ণিপাকে পড়েছে। বারবার ‘সমজ’-এ ফিরে যেতে হচ্ছে বা ‘সমজ’ আসছে ফিরে ফিরে। ‘সমজ’ থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন হতে পারছি না। এর তাৎপর্য কি তবে এই যে, ‘সমজ’-এর মধ্যেই ‘আমি’ আছি বা ‘আমার’ই মধ্যে ‘সমজ’ রয়েছে?

 

   তা যদি হয়— তাহলে এই কথা বলা যায় যে, ‘নিজেকে জানা’র উদ্দেশ্য হল ‘আমার’ মধ্যে নিহিত ‘পশুত্ব’কে জানা, ‘নিজেকে বদলানো’র অর্থ ‘মানবিক’ হওয়া, আর মানবিক ‘আমি’ই পারি সমাজ থেকে ‘সমজ’কে উৎসাদন করে এক নতুন সমাজ গড়তে... মনে রাখতে হবে, এই ‘আমি’-কিন্তু একা নই, স্বতন্ত্র নই— ‘আমার’ সমস্ত সামাজিক সম্পর্ক মিলেই ‘আমি’।

 

   আমরা বোধহয় পাক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার একটা অবলম্বন পেলাম— নিজেকে জানো/ নিজেকে বদলাও/ দুনিয়াকে বদলে দাও! কথাটিকে একটি রাজনৈতিক বচন হিসাবে দেখা যেতে পারে। অর্থাৎ রাজনীতিটা হল ‘দুনিয়াকে বদলানো’— ব্যভিচার-ভ্রষ্টাচারে জর্জরিত এই পৃথিবীকে বদলানোর এক কর্মসূচি। বলা যেতে পারে শুদ্ধিকরণ কর্মসূচি। বাইবেল বা আদিবাসী সৃষ্টিতত্ত্বে— এমনকি মহাভারতেও এ ধরনের উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। সংহারের মাধ্যমে পৃথিবীকে শুদ্ধ করা।

 

   তবু, ব্যভিচার-ভ্রষ্টাচার, দুষ্কৃতীর পুনর্জন্ম ঘটেই চলেছে। সেই সঙ্গে ‘দুনিয়া বদলানো’র ভাবনাটাও রয়েছে। আধুনিক কালে ‘ইসলামিক স্টেট’ ধারণার মধ্যেও ধ্বংসের মাধ্যমে ‘শুদ্ধিকরণ’ ব্যাপারটা যেন ফিরে এসেছে। ‘মহাপ্লাবন’ বা ‘অগ্নিবৃষ্টি’র মতো সন্ত্রাস-প্রতিসন্ত্রাস ভয়ংকর এক ধ্বংস নিয়ে আসছে। একই সঙ্গে হাজার হাজার বছর আগে বলা কথা এখনও বলা হচ্ছে। প্রশ্ন জাগতে পারে, সত্যিই কি কেউ বলছে? আমরা বলব, ইন্টারনেট সার্চ করুন  Know Thyself— কত কথা পাওয়া যাবে! সেসব জানার পর, অনিবার্য প্রশ্ন— কিছুই কি বদলাল?  এক কথায় উত্তর, না হওয়াই উচিত কিন্তু আমরা বলব, আমাদের আকাঙ্ক্ষিত বদল প্রক্রিয়া তত্ত্বগতভাবেই চলছে। কারণ, ‘নিজেকে জানো’— এখনও রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসাবে মানুষের চর্চার বিষয় করা হয়নি। ‘নিজেকে জানা’র উদ্দেশ্য (যা বলা হয়েছে) মনে রেখে বলা যায়, বিষয়টি রাষ্ট্রের শিক্ষানীতির বিষয়।

 

   এর অর্থ, ‘নিজেকে জানা’র উদ্যোগ রাষ্ট্রকে নিতে হবে! রূপায়ন হবে কি ‘পি পি পি মডেল’-এ?

 

   এই কথাটার মধ্যে ‘সংশয়’ ‘অসম্ভব’ ‘ব্যঙ্গ’— এরকম কিছু মনোভাব থাকতে পারে। তবে প্রশ্নটার গুরুত্ব রয়েছে। আমাদের উত্তর ‘হ্যাঁ’— সেক্ষেত্রে একটি ‘পি’র অর্থ ‘পার্সন’ ধরে নিতে হবে। আর ‘সংশয়’ নিরসনের জন্য একটি তাত্ত্বিক উদ্যোগ মনে করিয়ে দেব, কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’— এই সূত্রেই ‘অসম্ভব’-ব্যাপারটা অবশ্য আরও জোরাল হবে— দু’হাজার বছরে যা হয়নি তাকে আবার রাজনৈতিক ব্যবহারে আনা কি ‘মৌলবাদী’ ভাবনা নয়? সেক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য এই যে, তত্ত্বের ব্যবহারিক প্রয়োগে রাষ্ট্র যত্নবান হয়নি। তৎকালীন ‘ধনতন্ত্র’ তা করতে দেয়নি। কিন্তু ‘রাষ্ট্রের উৎপত্তি’-তত্ত্ব মনে রেখে আমরা বলতে পারি, কৌটিল্য যেমন বলেছেন, ‘শিক্ষাজাত বিনয়ের দ্বারাই ষড়রিপু দমন সম্ভব’।

 

   প্রসঙ্গত, আমাদের মনে রাখতে হবে যে, প্রায় ২৩০০ বছর আগে যে ধননিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্য থেকে ‘রিপু দমন’ তত্ত্ব তৈরি করা হয়েছিল সেখানে নারীর কোনও প্রাকৃতিক অধিকার ছিল না, কোনও সন্দেহ নেই, ‘অর্থশাস্ত্র’-এর রাজনীতি পুরুষতান্ত্রিক হওয়ায় সেখানে ‘যৌনতা’ অমানবিক হবে— এটা স্বতসিদ্ধ কিন্তু মনুষ্যসমাজে অমানবিক যৌনতা ধ্বংসাত্মক, এই প্রত্যয় থেকেই কৌটিল্য ওই তত্ত্ব নির্মাণ করেছিলেন বলে আমাদের অনুমান। পাশাপাশি তাঁর ‘অর্থনীতি’র অন্তঃপ্রেরণা এসেছে পশুজগৎ থেকে— অতএব, অমানবিক যৌনতা ও পাশবিক অর্থনীতির পরিসরে রাষ্ট্রকে ‘রিপুবর্জন-নীতি’ গ্রহণের উপদেশ দেওয়া নিঃসন্দেহে ‘বৈপ্লবিক’ ছিল।

 

   কিন্তু সেই ‘বিপ্লব’ অসমাপ্ত থেকে গেছে— প্রতিবিপ্লব ঘটা সম্ভব নইলে গ্রন্থটির লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যাওয়ার আর কী কারণ থাকতে পারে! প্রায় ১২০০ বছর পর ১৯০৫ সালে বইটি আবিষ্কৃত হয়েছে— এটা আমরা অনেকেই জানি।

 

   এবং একথা বলা অসংগত হবে না যে, ওই ‘রিপুবর্জন-নীতি’ বাদ দিয়ে পাশবিক অর্থনীতি চর্চার ক্ষেত্রে বইটি আজও প্রাসঙ্গিক। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক ‘ধনতন্ত্র’(অন্তত তার অ্যান্টিথিসিস) তার জনকল্যাণমুখী কর্মসূচির নিরিখে ‘রিপুবর্জন-নীতি’কে ভিত্তি করে একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক, পশুজগতে জনন-সঙ্গি নির্বাচনে এক ধরনের ‘গন্ধে’র ব্যবহার আছে, মনুষ্যজগতে তারই অনুকরণে যৌন-আবেদনপূর্ণ গন্ধের বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে, আমরা অনেকেই তা দেখে থাকব, বর্ণনা আর না-ই বা করলাম। এটা অমানবিক যৌনতার উদাহরণ। অর্থাৎ ধনতান্ত্রিক যৌননৈতিকতার বিকৃতির উদাহরণ। এই ‘বিকৃতি’ অবশ্য ধনতান্ত্রিক সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য।

 

   অতএব, একথা বলা যায় যে, ‘ধনতান্ত্রিক দুনিয়া’ বদলানোর কর্মসূচিতে অর্থশাস্ত্রের ‘রিপুবর্জন-নীতি’র অন্তর্ভুক্তিকরণ এক জরুরি কার্যক্রম হওয়া জরুরী।

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com