ভয়তাড়িত সমাজ (ষষ্ঠ পর্ব)

তেরো

 

পশুজগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার শুরুতেই টিকে থাকার প্রশ্নে মানুষ তার নিজের মধ্যে প্রথম যে শত্রুকে আবিষ্কার করেছিল, তা হল ঈর্ষা। তারপর লোভ, লোভ থেকে ক্রোধ; তারপর মোহ, মদ— এই আবেগগুলির আত্মধ্বংসের শক্তি দেখে, অনুমান করা যায়, জ্ঞানী মানুষেরা এদের শত্রু হিসাবে শনাক্ত করেছিলেন ও বাইরের শত্রু থেকে পৃথক করার জন্য এদের নাম হয়েছে ‘রিপু’— মনুষ্যত্ববিরোধী ছ’ছটি রিপুশাসনে মানুষকে বাঁচতে হয়। কাম ক্রোধ লোভ মোহ মদ মাৎসর্যের বিরুদ্ধে ব্যক্তিমানুষের লড়াই, একক ও যৌথ, কমবেশি আছে। কোনও উদাহরণ না রেখে বলা যায় এই লড়াইয়ের

 

   ‘হাতিয়ার’ নৈতিকতা ও আইন। সম্পর্কের পরিসরে ‘নৈতিকতা’ (কেননা সে সামাজিক জীব) আর সমাজের পরিসরে ‘আইন’(কেননা সে রাষ্ট্রীয় জীব)। এই অনুষঙ্গে এ কথা বলা অসংগত হবে না যে, মানুষ হয়ে-ওঠার জৈবিক লডাই তথা মানুষ হয়ে টিকে থাকার লড়াইয়ের পাশাপাশি মনুষ্যত্ব অর্জনের লড়াইও মানব-প্রজাতিকে জারি রাখতে হয়েছে। বলাবাহুল্য জান্তব লড়াইয়ে ‘রিপু’ তার সহযোগী।

 

   এবং রাষ্ট্র— দার্শনিক দৃষ্টিতে ‘সর্বোচ্চ নৈতিক প্রতিষ্ঠান’ হওয়া সত্ত্বেও, বিশেষ করে আধুনিক ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্র ‘রিপু’-চর্চার প্রেক্ষিত তৈরি করে দিয়েছে। রাষ্ট্রচরিত্রেও ‘রিপু’র প্রভাব যথেষ্ট। যে কারণে আধুনিক রাষ্ট্রকে ‘সন্ত্রাসবাদী’ বলে মনে হয়।

 

   তাহলে, ‘শোষণ-নিপীড়নের যন্ত্র’ থেকে আধুনিক রাষ্ট্র ‘সন্ত্রাসবাদী’— এই ‘সন্ত্রাসী’ হয়ে-ওঠার কারণ কী?

 

    এক কথায় এর উত্তর ‘ভয়’। এবং লক্ষণীয় বিষয়, ব্যক্তির অবসাদ থেকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস— সব কিছুরই উৎসে রয়েছে এক সাধারণ জীব বৈশিষ্ট্য ‘ভয়’! অথচ ‘শ্রেষ্ঠ জীব’ হিসাবে ‘ভয়’কে জয় করার পদ্ধতি আবিষ্কার করা মানুষের পক্ষেই সম্ভব।

 

   আমরা অন্তত তিন রকমের মানুষের কথা ইতিপূর্বে জেনেছি, তাদের মধ্যে প্রকৃত মানুষের পক্ষে অর্থাৎ যিনি মনুষ্যত্ব অর্জন করেছেন তাঁর পক্ষেই সম্ভব ভয়কে জয় করা। কিন্তু যারা শোষিত নিপীড়িত, এ পৃথিবীর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তাঁদের মুক্তির কথা যদি তাঁদের মতো করেই ভাবেন, শোষক-নিপীড়কের কাছে তা আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করবে আর তার প্রতিক্রিয়া— জান্তব হবে, এটাই স্বাভাবিক। প্রসঙ্গত, এই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াকে ইতিহাসের পটে বিশ্লেষণ করে মার্ক্স একে তত্ত্বায়িত করেছেন ‘শ্রেণী সংগ্রাম’ নামে। এবং আমরা জানি, শ্রমিকমুক্তির ইস্তাহারের প্রথম অনুচ্ছেদেই ফুটে উঠেছে ‘শোষক-নিপীড়ক’ শ্রেণীর আতঙ্ক(ব্যক্তিগত সম্পত্তি হারানোর ভয়) ও দমন-পীড়নের প্রস্তুতির(সম্পত্তি রক্ষার প্রস্তুতি) কথা। অতএব, ‘কুরুক্ষেত্র’র আয়োজন। সমস্ত পৃথিবী জুড়ে। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে শুরু হয়ে দু’দুটো বিশ্বযুদ্ধের পরও ‘কুরুক্ষেত্র’ ব্যাপ্ত হয়ে আছে সমস্ত চরাচরে— সিনেমার পর্দায়, টিভি স্ক্রিনে, গল্প-উপন্যাসে, ভিডিও গেম-এ। আবারও চক্রবাক দোষ ঘটিয়ে বলা যাক, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলমান!

 

   অথচ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল ‘যুদ্ধবিরোধী ঘোষণা’ আর ‘পরবর্তী প্রজন্মসমূহকে যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে রক্ষা করা’র অঙ্গীকার!

 

   আমরা কি ‘আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ’-এর কথা বলছি?

 

   হ্যাঁ, কিন্তু কেউ বলতেই পারেন, ওটা তো যুদ্ধের ‘বাই প্রোডাক্ট’, উপজাত— হ্যাঁ, এরকম কথা আমরা অনেকেই শুনেছি, এটা মনে রেখেই আমরা বলব, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিরুদ্ধে এটাই এখনও পর্যন্ত অনন্য রাজনৈতিক সম্ভাবনা। অর্থাৎ ‘মানবাধিকার সনদ’ একটি রাজনৈতিক ইস্তাহার। আমরা অন্যত্র(মানবাধিকার-রাজনীতি # উবুদশ)তত্ত্বগতভাবে প্রমাণ করতে সচেষ্ট হয়েছি যে, ‘সনদ’টি ‘রাষ্ট্রপ্রভুদের নৈতিক বিচ্যুতির প্রতিরোধ-প্রস্তাবনা’ও বটে!

 

   এই সূত্রে আমরা অবসাদের কারণ ‘সম্পর্ক’-এর নৈতিক বিচ্যুতি বা বিকৃতি— এটা মনে রেখে বলব, সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে যে বিচ্ছিন্নতা তা মূলত সমাজের নৈতিক বিশৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রের নৈতিক বিচ্যুতি— পুনরুল্লেখ করে বলা যায় যে, সমাজের নৈতিক বিশৃঙ্খলাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করার তাগিদ থেকেই যে রাষ্ট্রের উৎপত্তি, তাকে ও সমাজকে নৈতিকভাবে সংলগ্ন করা সম্ভব।

 

   প্রসঙ্গত, আমরা আরও একবার অ্যারিস্টটলের ‘পলিটিক্স’ ও কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’র কথা বলব, আমাদের অনুমান, রাষ্ট্র- প্রভুদের নৈতিক বিচ্যুতি ঘটতে পারে এমন অনুমান করেই একজন ‘ষড়রিপু দমন রাজার অবশ্য কর্তব্য’ বলে ঘোষণা করেছিলেন, আর একজনের ‘নির্দেশ’ ছিল, ‘মানুষকে উপযুক্তভাবে আইনের প্রভাবে শিক্ষিত করা’র। লক্ষণীয় যে, তৎকালীন বিদ্যমান রাষ্ট্রকে ‘আদর্শ’ রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তোলার যে প্রস্তাবনা তার মধ্যে-কিন্তু ‘রক্তাক্ত রাজনীতি’র কোনও আভাস নেই। তবে শিক্ষার মাধ্যমে ‘রিপুজয়’ ও ‘আইনের শাসন’— এই দুটি করণীয় ‘নিজের সঙ্গে লড়াই’-এর বিষয়— অবশ্যই তা রাজনৈতিক প্রস্তাবনা। সুখী-ন্যায়পরায়ণ সমাজের জন্য যা আবশ্যিক। কিন্তু রাজনীতিগতভাবে তা রূপায়িত হয়নি, তবু ‘সুখী-ন্যায়পরায়ণ সমাজ’-এর ‘স্বপ্ন’ টমাস মুরের ‘ইউটোপিয়া’ থেকে মার্ক্সের ‘সমাজতন্ত্র’ পর্যন্ত নানান তত্ত্বের জন্ম দিয়েছে; উনিশ শতক থেকে ‘সুখী-ন্যায়পরায়ণ সমাজ’-এর প্রতিশব্দ হয়ে উঠেছে ‘সমাজতন্ত্র’— সেই কারণে অনেকেই ‘সমাজতন্ত্রের পতন’-কে ‘ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ’ আখ্যা দিয়েছেন।

 

   কিন্তু আমরা মনে করিয়ে দেব, সমাজতন্ত্রের পতন ঘটেছে তথাকথিত ‘ঠাণ্ডা লড়াই’য়ের প্রকৃত প্রস্তাবে যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ‘এক্সটেনডেড ফর্ম’— স্নায়ুযুদ্ধর(war of nerves)অবসানে। আক্ষরিক অর্থে স্নায়ুযুদ্ধ— ব্যক্তির নিজের ‘কাম-ক্রোধ-লোভ’ ইত্যাদির বিরুদ্ধে লড়াই, এই লড়াইয়ে ‘সমাজতান্ত্রিক মানুষ’ হেরে গেছে। এবং এই হারের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ— এই যুদ্ধের বৈশিষ্ট্য ১। ‘সাংস্কৃতিক আক্রমণ’ যা ‘রিপু’র ‘বন্ধু’ হয়ে ব্যক্তির নৈতিক শক্তিকে দুর্বল করে দেয়, তার মানবিক গুণগুলিকে ধ্বংস করে তাকে চূড়ান্ত আত্মকেন্দ্রিক ও রিপুসর্বস্ব করে তোলে; ২। ধ্বংসাত্মক অপরত্ব ধারণা তৈরি করে(আমাদের মনে পড়বে ‘মেষশাবক ও নেকড়ে’র গল্প, সাদ্দাম হুসেন, এমনকি মহঃ ইকলাখ-কেও মনে পড়তে পারে)সশস্ত্র আক্রমণ। সার্বিক এই যুদ্ধ-রাজনীতির(politics with blood) আর-একটি বৈশিষ্ট্য রাজনৈতিকভাবে অপরত্ব তৈরির ক্ষেত্রে ‘ধর্মে’র ব্যবহার। মার্ক্সের ‘ধর্মতত্ত্ব’ অনুসারে এর তাৎপর্য এই যে, যে-পার্থিব ভিত্তিটা নিজের থেকে বিচ্ছিন্ন করে  নিজেকে স্বতন্ত্র রাজ্যরূপে প্রতিষ্ঠা করেছে ‘ঊর্ধ্বলোকে’ তাকেও বাস্তব পৃথিবীতে নামিয়ে নিয়ে এসে ‘ক্রুসেড’ তৈরি করা। সার্বিক এই পরিস্থিতিতে কারও মনে হতে পারে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ অপ্রতিহত, অমীমাংসেয় ‘শ্রেণীযুদ্ধে’র বা ‘ধর্মযুদ্ধে’র এ এক উন্নততর রূপ। সকলেই ‘ভয়’ তাড়িত। সকলের দিকেই ছুটে যাচ্ছে ‘বুলেট’। কে বলতে পারে এর থেকে সমাজ এক উন্নত রূপ পাবে না?

 

   খুব বিনীতভাবে আমরা বলব, উন্নয়নের ‘প্যারামিটার’ কী? হলফ করে বলা যায়, শ্রেণীযুদ্ধ বা ধর্মযুদ্ধের মাধ্যমে বিকাশমান সভ্যতার কাছে তেমন কোনও ‘মাপক’ নেই। চিন্তার আকর গ্রন্থগুলিতে তা থাকলেও যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রনায়কগণ তা অনুশীলনের বিষয় করেননি। এমনকি যুদ্ধের বিরুদ্ধে শপথ নিয়েও তা কার্যকর করার ক্ষেত্রে যথার্থ উদ্যোগের অভাব রয়েছে। এই অনুষঙ্গে আমরা বলব, সার্বিক যে অবক্ষয় ও আত্মধ্বংসী ঘটনা প্রবাহের মধ্যে আমাদের বাস করতে হচ্ছে, তা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কোনও পথ নেই। কারণ, আমাদের জন্য কোনও অরাষ্ট্রীয় পরিসর নেই।

 

   কিন্তু আমাদের কাছে ‘মানবাধিকার সনদ’ আছে। মানবাধিকার সনদ অনুসারে রাষ্ট্র আইন তৈরি করেছে, মানবাধিকার কমিশন আছে— রাষ্ট্র নৈতিকভাবেই আর একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে বা তার নাগরিকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হতে পারে না! মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রের নৈতিক বিচ্যুতি ‘রিপেয়ার’ করা সম্ভব, ‘গণতন্ত্র’কে ‘আদর্শ’ করেই তা সম্ভব— দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই জারি আছে এবং নারীর প্রতি অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধেও রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করছে...

 

   এর থেক এটা মনে হতে পারে যে, রাষ্ট্র নিজের অজান্তেই যেন ‘রিপু দমন’ কর্মসূচি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে! কিন্ত তাতে কি নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কোনও পরিবর্তন এসেছে? না। আসেনি। এমনকি পরিবর্তনের জন্য কোনও সদর্থক পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে?— এটাই মানবাধিকারের প্রশ্ন। সামাজিক মূল্যবোধে নারী পুরুষ— একক সত্তা হিসাবে একই মর্যাদা সম্পন্ন— এই দাবিতে সামাজিক আন্দোলনের প্রেক্ষিত রচনা করা ‘মানবাধিকার সনদ’-এ স্বাক্ষর করা দেশের আশু কর্তব্য। একজন ‘নির্বাচক’ হিসাবে নাগরিকের কর্তব্য সরকারকে ওই ‘আশু কর্তব্য’ সম্পর্কে সচেতন করা। যাতে নারী-পুরুষ সম মান-মর্যাদায় সমাজে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে।

 

   কিন্তু মনে রাখতে হবে, এটাই সব চেয়ে কঠিন মানবাধিকার কৃত্য— কারণ, মানবাধিকার আসলে আধুনিক ‘মানবমুক্তি’র ধারণা, মুক্তি মানে মানুষে-মানুষে শিকার-শিকারির যে সম্বন্ধ তা থেকে নিজে মুক্ত হওয়া(< নিজেকে জানো),অন্যকে মুক্ত করা(< দুনিয়া বদলাও)— গৌরবার্থে মানবকে মুক্ত করা।

কীভাবে সম্ভব?

 

   এক কথায় পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রের যৌথ রাজনৈতিক উদ্যোগে এটা সম্ভব হতে পারে। সন্দেহ নেই, এ হল নারী ও পুরুষের এক ‘বৈপ্লবিক রূপান্তর’-এর কাজ! যৌথ অভিযান মানবিক সমাজের দিকে...

 

সম্ভাবনার ‘কার্য-কারণ’ অনুমান ‘মোমবাতি মিছিল’ থেকে শুরু হতে পারে।

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com