স্বামিজীর বেদান্তে আলোকিত আমেরিকা

 

 

২০১৮ এর ১১ই সেপ্টেম্বর, শিকাগো ধর্ম মহাসভার ১২৫ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। মানব সভ্যতায় বিশ্বের সর্বপ্রথম আলোড়ন সৃষ্টিকারী আন্তঃধর্মীয় সংলাপের(interfaith Dialogue)ইতিহাস হিসেবে সমস্ত বিশ্বের কাছেই বছরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কথা সত্যি, প্রত্যেক ধর্মের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য স্থাপনের ক্ষেত্রে Interfaith Seminar যাতে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়, তার জন্য ১৮৯৩ সালের পর থেকে প্রতি বছরই নানা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে, নানা সেমিনারের নামে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন সময়ে আন্তঃধর্ম সংলাপের আয়োজন দুই শতাব্দী ধরেই বিরামহীনভাবে চলছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার পরে অনুষ্ঠিত হয়েছে ক্যামব্রিজে ১৯২৪ সালে। ১৯৩৬ খ্রীষ্টাব্দে লণ্ডনে অধিবেশন হয়েছে The World congress of Faiths অর্গাইজেশনের অধীনে। ১৯৪৯ সালে ব্যাপক আকারে মুসলিম, ইহুদী, খ্রীষ্টান আর বিভিন্ন আদীবাসী ধর্মসম্প্রদায়ের ধর্মসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। যাতে নিজের ধর্ম এবং অন্যের ধর্মবিশ্বাসের প্রতি সহনশীলতা আর শ্রদ্ধাপূর্ণ মানসিকতা সৃষ্টি হয়। ১৯৫২য় আমস্টারডামে ‘The International Humanist and Ethical Union' শিরোনামে মুক্ত আলোচনা আহ্বান করা হয়েছে নাস্তিক, আস্তিক, আদর্শবাদী, মানবতাবাদী, নীতিবাদী, যুক্তিবাদী, সবার মিলিত সম্মিলনে। যাতে আলাপ আলোচনার ফলে একে অপরের সম্পর্কে জানতে পারে। যাতে সহনশীলতার মাধ্যমে পারস্পরিক সহমর্মিতা অর্জিত হয়। অতএব মানবজাতির আধ্যাত্মিক এবং মানবিক বিশ্বাসের সমন্বয় সাধনের প্রচেষ্টা কুড়ি থেকে একুশ শতক অবধি অজস্রবার গ্রহণ করা হয়েছে। ২০১৬-য় অনুষ্ঠিত হয়েছে আমেরিকার মিলাউকিতে। ২০১৭-য় ভারতের পুনে শহরে। ২০১৮-য় অনুষ্ঠিত হলো কানাডার এডমন্টনে। বিষয়বস্তু - ‘Pilgrimage: Journeys of Self-Discovery’.                                                                                                          

 

   রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক আর ধর্মীয় জটিলতার সংঘাতে মানবসমাজে অস্থিরতা এবং অবিশ্বাস যত বেড়ে চলেছে, এই ধরনের অধিবেশন অনুষ্ঠিত করার প্রয়োজনও ততোই বৃদ্ধি পাচ্ছে বিশ্বব্যাপি। তবে ১৮৯৩ খ্রীষ্টাব্দে স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর উপস্থিতিতে যে অনন্যসাধারণ সমন্বয় সাধন করেছিলেন হাজার হাজার শ্রোতার মনে চিন্তাচেতনার জোয়ার তুলে, তার তুলনা বিশ্ব ইতিহাসের অন্য কোথাও মেলে না। আমেরিকার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের বেদান্ত সোসাইটি কর্তৃপক্ষ, স্বামীজির স্মরণে শতাব্দীর সেই ইতিহাসকে তাই নানাভাবে স্মরণীয় করার উদ্যোগ নিয়েছেন। বিশেষ করে শিকাগোর ‘বিবেকানন্দ বেদান্ত সোসাইটি’ (১৯৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত) ৮ই সেপ্টেম্বর স্বামীজির প্রতি শ্রদ্ধা এবং কৃতজ্ঞতা জানাতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান উদযাপন করেছেন। কেননা, একশো পঁচিশ বছর আগে যখন পাশ্চাত্যের মানুষের পার্লামেন্ট অফ রিলিজিয়ন সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না, নিরেট বস্তুবাদী জাগতিক সভ্যতার ধারাবাহিকতা অনুসরণ করেই যখন বিংশ শতাব্দীর ঊষালগ্ন সভ্যতার দুয়ারে উপস্থিত, তখন আধ্যাত্মিক পথের দিকে অগ্রসর হওয়ার এই অবিস্মরণীয় পদক্ষেপ এক নতুন সহস্রাব্দ শতাব্দীরই সূচনা করেছিল। ১৮৯৩ খ্রীষ্টাব্দের শিকাগোর ধর্মসভা যেমন ছিল অভিনব, তেমনই ছিল মানব সভ্যতায় ধর্মীয় বিশ্বায়নের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচনের অনন্য দিশারি।    

 

   ১৮৯৩ খ্রীষ্টাব্দ। ক্রিস্টোফার কলাম্বাসের নতুন বিশ্ব(আমেরিকা ১২ই অক্টোবর ১৪৯২)আবিষ্কারের ৪০০ বছর বছর পূর্ণ হয়েছে। সেই উপলক্ষে ছ’মাস ধরে শিকাগো শহরে শুরু হয়েছে ‘The World's Columbian Exposition-এর ব্যাপক বিশাল আয়োজন মেলা। সংক্ষেপে যার অফিশিয়্যাল নাম ‘World's Fair’ কিংবা ‘Chicago World's Fair’। সমুদ্রসমান লেক মিশিগানের তীরে ৬০০ একর জায়গার ওপর ২০০ বিল্ডিং-এর ভেতর জমে উঠেছে শিকাগোর বিশ্বমেলা। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের হাজার হাজার দর্শকের সমাগমে প্রতিদিনই মুখরিত হচ্ছে লেক মিশিগানের তীরভূমি। জড়বিজ্ঞানসভ্য মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করে, বিশেষভাবে এমন জিনিষই সেখানে প্রদর্শন করা হয়েছে। কী নেই এই বিশ্ব মিলনমেলার বিচিত্র সমাবেশে? মিউজিয়াম থেকে মেডিসিন, মিউজিক থেকে পোশাকশিল্প, পিকচার থেকে ফার্নিচার, রসায়ণ থেকে নৃতত্ত্ব, দর্শন থেকে পদার্থবিদ্যা, ভাস্কর্য থেকে স্থাপত্যশিল্প, বিজ্ঞান থেকে সাহিত্য, লাইব্রেরি থেকে ইলেকট্রিক্যাল কিচেন স্টোভ, সবকিছু নিয়েই রয়েছে প্রদর্শনী আর আলোচনা-সেমিনার। এমনকি স্যানিটেশনসহ ফেরির চাকার নিদর্শনও উপস্থিত করা হয়েছে এই সত্য জানাতে যে, প্রতীচ্যের বস্তুবাদী সভ্যতায় উন্নয়নের কত বিরাট বিপ্লব ঘটে গেছে কুড়ি শতকের প্রত্যুষকালে। এবং শিকাগো শহর সেই বিরাট উন্নয়নের সবটুকুই সমারোহ করে দেখাতে চায়। যাতে তার ভাবমূর্তি শ্রদ্ধার আসনে প্রতিষ্ঠা পায়।  

 

   অতএব মেডিসিন-শল্যচিকিৎসা, শিল্পকারখানা, ব্যবসাবানিজ্য, অর্থনীতি, আধুনিক মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি, এমনকি সমাজ-সাহিত্য-বিজ্ঞানের সঙ্গে নারীসমাজের অগ্রগতির দৃষ্টান্তও যেখানে তুলে ধরা হয়েছে, সেখানে ধর্মের বিষয়টাই বা আর বাকী থাকে কেন? সভ্যতায় সবকিছুর সমন্বয় ঘটাতে গেলে বিশ্বমেলায় ধর্মীয় সেমিনারও উপস্থিত করা চাই। সুতরাং মানবজাতির আত্মিক মুক্তির জন্য যাঁরা উদ্বেলিত, যাঁরা গভীরভাবে বিশ্বজননীতায় বিশ্বাসী, মানুষের নৈতিক উন্নয়ন যাঁদের কাম্য, তাঁদের এসোসিয়েশন থেকে বিশ্বমেলার অংশ হিসেবে ‘The world Parliament of Religions' শিরোনামে একটি ধর্মীয় মহাসভাও আহ্বান করা হলো। তারিখটা ১১ থেকে ২৭শে সেপ্টেম্বর। উদ্দেশ্য, হিংসায় জর্জরিত পৃথিবীর অস্থিরতা কমিয়ে সহনশীল মানসিকতার উন্মোচন। যে সমস্ত কারণে সামাজিক সংঘাত, অনভিপ্রেত বিপ্লব, যুদ্ধ, বিদ্রোহ, বৈষম্য, সমাজ সংস্কৃতির দ্বন্দ্ব এবং ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে অহিনকুল সম্পর্ক সৃষ্টি হয়, তার অবসান ঘটানো। ধর্মে-ধর্মে উদার সম্বন্ধ স্থাপন করে সবার জন্য সবার অন্তরে ভ্রাতৃত্ববোধের জাগরণ।

 

 

 

   ‘The Congress of Religions’, কিংবা `The world Parliament of Religions' ‘The World's Congress Auxiliary of the Columbian Exposition' এরই একটি শাখা কমিটি। এর উদ্ভাবক, শিকাগোর বিখ্যাত আইনজীবি (জাজ) শিক্ষক এবং লেখক, চার্লস ক্যারল বনি। ১৮৯০ এর ৩০শে অক্টোবর তাঁর সভাপতিত্বে এর কমিটির সদস্যরা নির্বাচিত হয়েছেন। কমিটির চেয়ারম্যান নিযুক্ত হয়েছেন রেভারেণ্ড, ডক্টর জন হেনরি ব্যারোস। ডক্টর হেনরি আমেরিকার প্রথম ‘প্রেসবিটেরিয়ান’ চার্চের প্রধান। তিনি চেয়ারম্যান নিযুক্ত হয়েই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের কর্তৃপক্ষকে আমন্ত্রণলিপি পাঠিয়েছেন, শিকাগোর ধর্মসভায় প্রতিনিধি পাঠানোর জন্য। স্বামীজিও এ সম্পর্কে জানতে পেরেছেন ১৮৯১ এর শেষ কিংবা ১৮৯২ এর প্রথমদিকে। স্বামীজি তখন পরিব্রাজক সন্ন্যাসী হিসেবে ভারতর্ষের পশ্চিম থেকে উত্তর, উত্তর থেকে দক্ষিণ সর্বত্র পদব্রজে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাঁর বলিষ্ঠ আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, ভারতবাসীর প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসা এবং অগাধ পাণ্ডিত্য ততোদিনে মুগ্ধ এবং বিস্মিত অনেক উচ্চশিক্ষিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ। অনেকের সঙ্গেই গড়ে উঠেছে তাঁর বন্ধুত্বের নিবিড় সম্পর্ক। যেমন গুজরাটের জুনাগাধ, রাজস্থানের অজিত সিং, মহীশূরের মহারাজ, মাদ্রাজের রাজা রামন্দ, প্রমুখ। রাজস্থানের অজিত সিং স্বামীজির নামকরণ করেছেন, ‘বিবেকানন্দ’।

 

   তাঁদের অনেকেই এই সংবাদে আশাবাদী হয়ে স্বামীজিকে অনুরোধ জানিয়েছেন- শিকাগোর আলোচনাসভায় যোগ দিয়ে মূল্যবান বক্তব্য রাখতে। বন্ধুদের পক্ষ থেকে সেজন্য অর্থ আনুকূল্য এসেছে। বিশেষভাবে মহারাজ অজিত সিংহের পক্ষ থেকে। সবকিছু গুছিয়ে তিনি যাত্রা শুরু করলেন, ১৮৯৩ খ্রীষ্টাব্দের ৩১শে মে। বম্বে থেকে জাহাজে চড়ে শিকাগোর উদ্দেশ্যে স্বদেশ ছাড়লেন ত্রিশ বছরের বেদান্ত সন্ন্যাসী। অজস্র চড়াই উৎরাই পেরিয়ে প্রায় পুরো পৃথিবীখানাই পাড়ি দিতে হলো তাঁকে। কলম্বো থেকে পেনাং, সিঙ্গাপুর, হংকং, নাগাসাকি, ওসাকা, কিয়োটা, টোকিও, কোবে, ইয়োকোহোমা হয়ে কানাডার ভ্যাংকুভারে পৌঁছুলেন ২৫শে জুলাই। সেখান থেকে ‘কানাডিয়ান প্যাসিফিক রেলওয়ে ট্রেনের’ টিকেট কেটে অবশেষে ৩০শে জুলাই বিধ্বস্ত অবস্থায় গন্তব্যস্থল শিকাগোতে। এসে দেখলেন, বিশ্বমেলা তিন মাস আগেই শুরু হয়ে গিয়েছে। ধর্মসভার কর্তারাও চাহিদা অনুসারে সব ধর্মের প্রতিনিধিদেরই পেয়ে গিয়েছেন ততোদিনে। সভার বক্তা হিসেবে রেজিস্ট্রেশনের সময়ও অনেক আগেই অতিক্রান্ত। এছাড়া রেজিস্টারের জন্য প্রয়োজন রয়েছে যোগ্যতার সত্যায়িত প্রমাণপত্র।  এমন পরিস্থিতিতে কী করবেন স্বামী বিবেকানন্দ?

 

   অর্থাভাবে ব্যয়বহুল শিকাগো শহরে তাঁর টিকে থাকার সম্ভাবনা ক্রমে ক্ষীণতর হয়ে আসছিল। নিরাশাব্যঞ্জক পরিস্থিতি সত্ত্বেও কিন্তু সম্পূর্ণ প্রত্যাশা ছাড়লেন না সন্ন্যাসী। আধুনিক বিজ্ঞানসভ্যতার প্রতি আকর্ষণ ছিল তাঁর। কাজেই বিশ্বমেলা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে আরও বারো দিন থেকে গেলেন শিকাগো শহরে। মেলা দেখা শেষ করে একদিন বস্টনের উদ্দেশ্যে উঠে বসলেন ট্রেনে। তিনি চলেছেন কেটি স্যানবর্নের ম্যাসেসুসেটসের খামার বাড়িতে আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে। এই বয়স্কা ভদ্রমহিলার সঙ্গে স্বামীজির পরিচয় হয়েছিল ভ্যাংকুভার থেকে শিকাগো আসার দীর্ঘ পথে। কেট স্যানবর্ণ কলেজ শিক্ষক, কবি, কৃষক এবং মানবতাবাদী। তিনি স্বামীজির কাছে আমেরিকায় আসার উদ্দেশ্য সম্বন্ধে বিস্তারিত শুনে আগ্রহসহকারে নিজেই কার্ড দিয়ে আমন্ত্রণ জানিয়ে বলেছিলেন- সাহায্যের প্রয়োজন হলে অবশ্যই কেট বাড়িয়ে দেবেন তাঁর সহযোগিতার হাত। তরুণ স্বামীজির প্রবল ব্যক্তিত্ব শ্রদ্ধা জাগিয়েছিল তাঁর মনে। এ সম্পর্কে কেট পরবর্তীকালে লিখেছেন -‘But most of all I was impressed by the monk, a magnificent Specimen of manhood-six feet two, as handsome as Salvini (a then famous Italian actor)at his best with lordly, imposing stride, as if he ruled the universe and soft dark eyes that could flash fire if roused’ [১].

 

   অবশ্য কেবল স্বামীজির বাইরের বলিষ্ঠ দৈহিক সৌন্দর্য্ কিংবা রাজকীয় পদক্ষেপ ফেলার বর্ণনা দিয়েই কেট তাঁর প্রশংসা সমাপ্ত করেননি। তাঁর বিস্মিত মুগ্ধতার কারণ হিসেবে পোশাকের বিস্তারিত বর্ণনা শেষ করে পরে লিখেছেন, এই তরুণ ভারতীয় সন্ন্যাসীর এমনই অসাধারণ পাণ্ডিত্য যে, তিনি অনায়াসে এবং অনর্গল শেক্সপীয়ার, ডারউইন, টেনিসন, টিন্ডল, মুলার থেকে উদ্ধৃতি দিতে পারেন! আমাদের বাইবেলের কোন পৃষ্ঠার কোথায় কী লেখা আছে, সে সম্পর্কেও রয়েছে বিস্তারিত জ্ঞান। এবং সবার ওপরে, সমস্ত ধর্মের জন্য রয়েছে এক আশ্চর্য্ মনোমুগ্ধকর সহনশীলতা! স্বামীজির বলার ভঙ্গি অসাধারণ এবং ‘He spoke better English than I did’ [১].            

   স্বামীজি নিজের অবস্থা সম্বন্ধে, প্রয়োজন সম্পর্কে এরই মধ্যে চিঠিতে বিস্তৃত জানিয়েছেন কেটি স্যানবর্নকে। কেটের খামার বাড়িতে তিনি তাই অতিথি হয়ে এলেন ১৫ই আগষ্ট। কেট তাঁর চিঠির ব্যবস্থা আগেই করে রেখেছিলেন হার্ভার্ড ইউনির্ভাসিটির প্রফেসর জন হেনরি রাইটের সঙ্গে কথা বলে। স্বামীজির সঙ্গে প্রফসরের পরিচয় হলো। তিনিও তরুণ সন্ন্যাসীর সঙ্গে ক্লাসিক দর্শন নিয়ে আলাপচারিতার পরে বিবেকানন্দর প্রতিভায় কেটির মতোই মুগ্ধ, বিস্মিত। ‘Congress of Religions’ এর কর্তাব্যক্তিদের স্বামীজি সম্পর্কে প্রফেসর হেনরি রাইট লিখলেন -‘Here is a man, who is superbly well-qualified delegate one. Who is more learned than all our learned professors put together and Who is like the Sun, with no need of credentials in order to shine’[২]. হার্ভার্ড ইউনিভর্সিটির ক্লাসিক ফিলোসফির প্রফেসর জন রাইট নিজেই স্বামীজির শিকাগো ফিরে আসার টিকেট কিনে দিলেন। স্বামীজি ৮ই সেপ্টেম্বর ফিরে এলেন শিকাগো শহরে। কিন্তু তখনো তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবন্ধকতার প্রবল বাধা। তিনি ‘Parliament of Religions' এর ঠিকানা হারিয়ে ফেলেছেন। ওদিকে কাউকে জিজ্ঞেস করেও ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। স্বদেশে থাকাকালীন যে দৈব নির্দেশনা পেয়েছিলেন বিশ্বসভায় যোগদানের জন্য, তার ইঙ্গিত কি তাহলে অসফলই থেকে যাবে শেষ অবধি?

 

 

 

   কিন্তু এর পরের দিন একটি আশ্চর্য্ ঘটনা ঘটে গেলো তাঁর জীবনে। মাঝখানে ধর্ম মহাসভা অনুষ্ঠানের আর মাত্র একদিন বাকী। অর্থাভাবে আশ্রয় এবং আহার কোনোটাই জোটেনি তাঁর ভাগ্যে। ক্ষুধার্ত অসহায় অবস্থায় রেললাইনের বক্সকারের ভেতর রাত কাটিয়েছেন কোনোমতে। সকালবেলায় ঈশ্বরের ইচ্ছার কাছে নিজেকে সঁপে দিয়ে ৫৪০ নম্বর ডিয়ারবর্ণ স্ট্রিটে বড় একটি পাথরের ওপর ক্লান্তভাবে বসে ছিলেন স্বামীজি। হঠাৎ বিপরীত দিকের ৫৪১ নম্বর বাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন কেতাদুরস্ত এক ভদ্রমহিলা।সন্ন্যাসীর দিকে চোখ পড়তে  মুহূর্তের জন্য কিছু ভাবলেন হয়তো বা। তারপরই এগিয়ে এলেন স্নেহভরে - আপনি কি ওয়ার্ল্ড পার্লামেন্টে যোগ দিতে এসেছেন?                                 

 

   স্বামীজির জবাব শুনে তিনি নিশ্চিত হলেন অনুমান মিথ্যে নয় তাঁর। ভদ্রমহিলার নাম, ইলেন ডে হেল। পড়াশুনো করেছেন ‘পেইন্টিং’ বিষয়ের ওপরে। প্রথমে বস্টন এবং ফিলাডেলফিয়ায়। তারপর প্যারিসে গিয়ে। স্বামীর নাম জর্জ হেল। যুক্তরাষ্ট্রে যাঁদের সাহায্য ছাড়া বিবেকানন্দের কর্মধারা কোনোদিনই বাস্তবতা পেত না, তাঁদের মধ্যে সর্বাগ্রে নাম করতে হয় শিকাগো শহরের জর্জ এবং ইলেন হেল দম্পতির। মিসেস হেল তাঁকে নিজের বাড়িতে নিয়ে এলেন। স্বামীজিকে জলখাবার খাইয়ে সঙ্গে করে নিয়ে এলেন পার্লামেন্টের শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে। পরের দিন সভা শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক ঘন্টা আগে ১০ই সেপ্টেম্বর পার্লামেন্ট অফ রিলিজিয়নের ডেলিগেট হিসেবে অফিসিয়্যালি তাঁর নাম রেকর্ডভুক্ত করা হলো। তখনই সবাই প্রথম জানতে পারলেন, ভারত থেকে বিবেকানন্দ নামে এক হিন্দু সন্ন্যাসী এসেছেন, শিকাগোর বিশ্ব ধর্মসভায় তাঁর বক্তব্য শোনাতে।

 

   স্বামীজি আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, এই মহামানবসভায় যোগদান করে যুক্তিবাদী আমেরিকার মানুষকে তিনি বেদান্তের কথা শোনাবেন। যেখানে রয়েছে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বকালের মানবজাতির জন্য অবিচ্ছিন্ন, অভ্রান্ত, চির অম্লান এক অন্তহীন সত্যের অনুসন্ধান। ১৮৯৩ খ্রীষ্টাব্দের ১১ই সেপ্টেম্বর। শিকাগোর ‘পার্মানেন্ট মেমোরিয়াল আর্ট প্যালেসে’(বর্তমান নাম-শিকাগো আর্ট ইন্সটিটিউট) তখন উপচে পড়ছে আট সহস্র জিজ্ঞাসু শ্রোতার ভিড়। ডায়াসের ওপর উঠে দাঁড়িয়েছেন গৈরিক বসনধারী বেদান্তিক সন্ন্যাসী। স্ফিত বক্ষ। ভরাট চোখের তারায় গভীর আত্মবিশ্বাসের সুদৃঢ় প্রত্যয়। হাজার হাজার দৃষ্টির উল্লাস মুহূর্তেই আছড়ে পড়েছে তাঁর অঙ্গ ঘিরে। নমস্কার জানিয়ে হৃদয়জয়ী কণ্ঠস্বরে সবাইকে শিহরিত করে হঠাৎই তরুণ সন্ন্যাসী বলে উঠলেন -‘Sisters and Brothers of America'....! আন্তরিকতার বিদ্যুৎতরঙ্গে মুহূর্তেই আলোড়িত হলেন উপস্থিত শ্রোতারা। মুগ্ধবিস্ময়ে বিদ্যুৎবেগে সবাই উঠে দাঁড়ালেন চেয়ার ছেড়ে। তাদের সহস্র হাতের বিরমাহীন করতালিতে উত্তাল হলো পুরো গ্যালারি। যেন প্রবল প্রাণাবেগে উচ্ছ্বসিত হয়েছে হঠাৎই কোনো ঝড়ের রোমাঞ্চ। ছড়িয়ে পড়েছে তরঙ্গ থেকে তরঙ্গায়িত হতে হতে। তিন মিনিট পরে বন্ধ হলো সেই প্রাণস্পন্দিত করতালি। যখন দর্শকশ্রোতাদের স্মরণে এলো- স্বামীজির বক্তব্য, আরম্ভ হয়নি এখনো।

 

   স্বামীজি এবার বললেন, আপনাদের উষ্ণ আন্তরিকতার এই অভিনন্দন অবর্ণনীয় আনন্দে পূর্ণ করেছে আমার অন্তর! আপনাদের প্রত্যেককে ধন্যবাদ জানাই, প্রাচীনতম কাল থেকে আজ অবধি পৃথিবীর সব প্রান্তের সাধুসন্তদের নামে! ধন্যবাদ জানাই, সমস্ত ধর্মমতের নামে। এবং ধন্যবাদ জানাই সব শ্রেনী এবং সম্প্রদায়ের লক্ষ লক্ষ হিন্দু জনতার পক্ষ থেকে। ইতিহাস আমাদের জানিয়েছে, সাম্প্রদায়িকতা আর ধর্মান্ধতার ভয়ংকর পরিণতিতে কতবার সহিংস উন্মত্ততার জন্ম হয়েছে পৃথিবীতে। কতবার সাম্প্রদায়িক হানাহানিতে ধ্বংস হয়েছে মানবসভ্যতা। রক্তস্নাত হয়েছে সুন্দর এই বসুন্ধরা! নিরাশার অন্ধকারে নিমগ্ন হয়েছে মানবজাতি! কিন্তু সনাতন ধর্মের ইতিহাস অন্য রকম!

 

 

 

   সুদূর অতীতকাল থেকে ভারত তার দু বাহু বাড়িয়ে আশ্রয় দিয়েছে বিশ্বের যে কোনো প্রান্তের নির্যাতিত, অত্যাচারিত মানবজাতিকে! সবাইকেই সে গ্রহণ করেছে পরমাত্মীয়ের মতো। কারণ সনাতন ধর্ম আমাদের শিখিয়েছে -‘Help and not Fight, Assimilation and not Destruction, Harmony and Peace and not Dissension. I am proud to belong to a religion which taught the world both, tolerance and universal acceptance. We believe not only in universal toleration, but we accept all religions as true', [৩]. হিন্দু ধর্ম আমাদের শিখিয়েছে, যুদ্ধ নয়, সহযোগিতার হাত বাড়াও। কাউকে ধ্বংস করো না, আপনার ভেবে আত্মীকরণ করে নাও। সংঘাতে-সংঘাতে মতান্তর সৃষ্টি করো না। সবার সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের শিক্ষা নাও। তাই সনাতন ধর্মের মানুষ সবাইকে কেবল সহ্যই করেন না, সমস্ত ধর্মকে তাঁরা সত্য বলেও মানেন। যে ধর্ম জগতকে এমন সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতার শিক্ষা দেয়, সহশীলতার মর্মবাণী উপলব্ধি করতে শেখায়, সেই ধর্মের একজন হতে পেরে আমি গর্ব অনুভব করি।

 

   শিকাগোর ধর্মসভায় কয়েকদিনের বিস্তৃত বক্তব্যে সন্ন্যাসী বিবেকানন্দ এক অভূতপূর্ব সার্বজনীন ভ্রাতৃত্বের কথা বললেন। এক ‍বিশ্বজনীন একাত্মতার কথা ঘোষণা করলেন। হাজার হাজার বছর আগে ভারতবর্ষের সত্যদ্রষ্টা ঋষিপণ্ডিতরা যে সুগভীর জটিল দর্শনের বিষয়ে বলেছিলেন -‘শৃণ্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রঃ’, স্বামীজি তাকেই নিজের মতো করে পরিবেশন করে বললেন- ‘Unity is knowledge, diversity is ignorance’. সবার সঙ্গে একাত্ম হতে পারাই জ্ঞান। আর ভেদাভেদের যে ধারণা, সেটাই অজ্ঞানতা। মানুষ যখন উপলব্ধি করে প্রত্যেক মানুষ উত্তরাধিকার সূত্রে এক ঈশ্বরের সন্তান এবং তাঁর সন্তান হওয়ায় সবাই তাঁরই অংশ, তখন সব ভেদাভেদই ঘুচে যায়। এই একাত্মতা অনুভবের জন্য খ্রীষ্টানদের হিন্দু কিংবা বুদ্ধিস্ট হওয়ার প্রয়োজন নেই। হিন্দু এবং বুদ্ধিস্টেরও প্রয়োজন নেই খ্রীষ্টান হওয়ার। এরপরে একাত্মতার সুন্দর উদাহরণ দিতে গিয়ে স্বামীজি উদ্ধৃতি টানলেন গীতা থেকে, যেমন বিভিন্ন জলস্রোত হাজার হাজার উসৎ থেকে সৃষ্টি হয়ে ভিন্ন ভিন্ন পথ পেরিয়েও একই মহাসাগরে গিয়ে মিলিত হয়।

 

   গ্যালারির সহস্র সহস্র মানুষ স্থিরভাবে তাঁর বক্তব্য গভীর মনোযোগে শুনলেন। সন্তুষ্টির পূর্ণতা চুঁইয়ে পড়লো তাদের সুগভীর মনোযোগিতা থেকে। এই অনন্যসাধারণ বিশ্বসভায় পৃথিবীর আরও দশটি উল্লেখযোগ্য ধর্মের প্রতিনিধিরা বক্তব্য রেখেছেন কয়েক দিন ধরে। জরোয়াসট্রিয়ান, ইসলাম, ইহুদী, জৈন, বৌদ্ধ, হিন্দু, তাইয়ো, ক্যাথলিক, শিনোটো এবং প্রোটেস্ট্যান্ট মতের বাছাইকৃত সব বক্তারা প্রত্যেকে যাঁর যাঁর ক্ষেত্র থেকে উঁচুদরের পণ্ডিত। কিন্তু তারপরও ‘নিউ ইয়র্ক হেরল্ড’ সম্পাদকীয়তে লিখলো -‘Vivekananda is undoubtedly the greatest figure in the Parliament of Religions. After hearing him we feel how foolish it is to send missionaries to this learned nation'. কবি হ্যারিয়েট মনরো সেই বক্তৃতা শুনে তাঁর আত্মজীবনীতে লিখলেন-‘It was Swami Vivekananda, the magnificent, who stole the show and captured the town. His personality is dominant, magnetic. His voice is rich as a bronze bell, the controlled fervor of his feeling, the beauty of this message to the western World it was human eloquence at its highest pitch [৪].

 

   কিন্তু কেন তরুণ স্বামীজির বক্তৃতা এভাবে প্রশংসিত হলো সর্বত্র? কী কারণে বিশ্বসভায় সবার মাথা ছাড়িয়ে তিনিই হয়ে উঠলেন উন্নতশির? তাঁর আকর্ষণীয় বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব কেমন করে কব্জা করলো পুরো শহরটাকে? এর উত্তর, বিবেকানন্দ ছিলেন এমনই এক পরিব্যাপ্তির আধার, যিনি ‘Unity is knowledge’ বেদান্তের এই অমোঘ সত্যকে স্বক্ষেত্রে ধারণ করেছিলেন। বিস্তৃত বিষয়ে তাঁর পড়াশুনো ছিল। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে একমাত্র তিনিই প্রথম বিভাগে এন্ট্রান্স পাস করেছেন। স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে ব্যাচেলর ডিগ্রীলাভ করেছেন। তার চেয়েও বড় কথা, ভারতীয় ধর্ম, দর্শন, সাহিত্য, ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গে তিনি সমান্তরাল পাঠ করেছেন, ওয়েস্টার্ন ইতিহাস, লজিক, দর্শন, বিজ্ঞান, সাহিত্য। সংস্কৃত, বাংলা, ইংরেজি সবেতেই তিনি সমান পারদর্শী। তাঁর অসাধারণ স্মৃতিশক্তি এবং মেধা সম্বন্ধে ‘ক্যালকাটা ক্রিস্টিয়ান কলেজের’ প্রিন্সিপাল উইলিয়ম হেস্টির বিস্ময়ের অবধি ছিল না। তিনি নিয়মিত শরীর চর্চা করতেন। খেলাধূলায় ছিল সক্রিয় অংশগ্রহণ। নিজে সুগায়ক ছিলেন এবং সঙ্গীতে ছিল তাঁর সুগভীর জ্ঞান। মহাভারত, রামায়ণ, গীতা, উপনিষদ, পুরাণ, বেদ যেমন গভীর আগ্রহে তিনি আত্মস্থ করে নিয়েছিলেন, তেমনি হিউম, কান্ট, স্পিনোজা, হেগেল, শোপেনহাওয়ারও পড়েছিলেন জীবন জিজ্ঞাসার অজস্র জবাব খুঁজে পেতে। যে মানুষটি ব্রাহ্মসমাজে যোগ দিয়েছিলেন, তিনিই আবার ভগবান শ্রী রামকৃষ্ণের সান্নিধ্যলাভের জন্য আকুল হয়ে উঠেছিলেন।

 

   বিবেকানন্দ বেদান্তকে এভাবেই তাঁর অস্তিত্বে ধারণ করেছিলেন। সব ধর্ম, সব শাস্ত্র, সব জ্ঞান, সব মতবাদ  সকল সমাজ এবং সবকিছুর একজন হয়েই একাত্ম হয়ে উঠেছিলেন সবার সঙ্গে। তিনি ভারতবাসীকে যেমন নিঃশর্তভাবে ভালোবেসেছেন, তেমনি বিশ্ববাসীকে ভালোবেসেও পরম আত্মীয়তা অনুভব করে জগৎ সত্যকে জেনেছেন। তাই তিনি বলতে পেরেছেন -‘‘Unity is knowledge, diversity is ignorance’। আর এভাবেই সনাতন ধর্ম ও হিন্দু দর্শনকে তিনি প্রথম পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন ওয়েস্টার্ন জগতের সঙ্গে। তাই বেদান্তের ব্যাখ্যায় তিনি যখন বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বে, চমৎকার উচ্চারণে আমেরিকানদের জানালেন -‘Vedanta is compatible with the core American democratic values of equality and freedom’, কিংবা আশ্বস্ত করলেন-‘ Man is not innately sinful but divine’ [৫]. তখন আমেরিকা এক নতুন আলোর সন্ধান পেয়ে সাজুয্য খুঁজতে চাইলো বেদান্ত সন্ন্যাসীর বক্তব্যে। তরুণ স্বামীজি পাশ্চাত্যের মননশীলতার প্রতিনিধিত্ব করে নতুন আলোর বিস্ফোরণ ঘটালেন বিস্তীর্ণ আমেরিকার অজস্র মননে।  

 

   জুডিও-ক্রিশ্চান, ইসলামী সমাজের মানুষ শৈশব থেকেই শুনে আসছেন, মানুষ মূলত পাপী এবং অপবিত্র। ঈশ্বরের কাছে পাপের জন্য জীবনভর বারবার তাদের ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। সর্বদা ভয়ে ভীত হয়ে থাকতে হবে পাপী হওয়ার অপরাধে। সেই সমাজ যখন বেদান্ত সন্ন্যাসীর মুখে শুনতে পেলো- You are all Gods. You are pure and divine being. Divinity is your real nature, তখন এই সমাজমানস এক অভূতপূর্ব মুক্তির পথ খুঁজে পেলো প্রত্যেক মানুষের ভবিষ্যতের জন্য। এ সম্বন্ধে পরবর্তীকালে বিবেকানন্দর এক আমেরিকান শিষ্য লিখলেন -‘Here is hope, here is strength, that every man can become divine by realizing his own divinity'.

 

 

 

   এ কথা ঠিক, প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম-সংস্কৃতির আবরণ থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে জড়সভ্যতার দ্বৈতবাদের ধারণায় মানুষ তার স্বর্গীয় সত্তা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় না। তবে বাস্তবতা হলো, তখনকার বিজ্ঞানসভ্য যুক্তিবাদী ওয়েস্টার্ন সমাজ, চার্চের ধর্মগুরুদের প্রচারিত বক্তব্য সম্বন্ধে যথেষ্ট সন্দিহান ছিল। অতএব বৈদিক   চেতনার নতুন করে জন্মলাভের জন্য প্রতীচ্য ছিল যথার্থ উর্বর ভূমি। আমেরিকান জনতার আদর্শিক মূল্যবোধের যে চেতনা, অর্থাৎ প্রত্যেক ব্যক্তির সমঅধিকার এবং মুক্তি আর স্বাধীনতা সম্পর্কে যে ধারণা, বেদান্তের ‘একাত্মতাবোধের’ সঙ্গে সাজুয্য ছিল তার। উপনিষদের অনন্ত জ্ঞানভাণ্ডার থেকে পাশ্চাত্যের জন্য এটাই ছিল বেদান্ত সন্ন্যাসীর প্রধানতম বার্তা। এই বার্তা তিনি ধর্মের বাতাবরণে ছড়িয়ে দেননি। ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তাঁর পৌরুষময় উদাত্ত কণ্ঠস্বরে। রাজকীয় ব্যক্তিত্বের বলিষ্ঠ আকর্ষণে। সর্ব বিষয়ে তাঁর সুগভীর পাণ্ডিত্যের অপ্রতিরোধ্যতায়। তারুণ্যের দৃপ্ত নেতৃত্বে। এবং সবার ওপরে আমেরিকার মাটিতে, আমেরিকার ভাষায়, আমেরিকানদেরই একজন হিসেবে কথা বলে। এই বিজয়ে তাঁর সব ধরনের শক্তির মহিমাই প্রস্ফুটিত হয়েছিল। তখনকার প্রেস তাঁকে তাই আখ্যায়িত করেছিল-‘The Cyclonic monk from India' বলে।

 

   শিকাগো ধর্মসভায় সাড়া জাগানোর পরে ১৮৯৩ থেকে ১৮৯৬ পর্য্ন্ত শিকাগো, ডেট্রোয়িট, বস্টন, মিশিগান, নিউ ইয়র্কসহ আমেরিকার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য এবং ইউরোপে(বিশেষত ইউনাইটেড কিংডমে)আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে শত শত লেকচার ট্যুর নিয়েছেন স্বামীজি। কখনো প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে বিরাট জনসভায়। কখনো বা  ব্যক্তিগত আমন্ত্রণে ঘরোয়া পরিবেশে। ১৮৯৫ তে আমেরিকা থেকে প্রথম ইউনাইটেড কিংডমে যান ভাষণ দেওয়ার জন্য এবং তখনই নভেম্বর মাসে আইরিশ তরুণী মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেলের সঙ্গে (পরবর্তীতে ভগ্নি নিবেদিতা)সাক্ষাৎ ঘটে স্বামীজির। যিনি মনেপ্রাণে ভারতীয় হয়ে স্বাধীনতার জন্য, নারী শিক্ষা প্রসারের জন্য আত্মনিবেদন করেছেন। ১৮৯৬ সালে আমেরিকা থেকে দ্বিতীয়বার যুক্তরাজ্যে যাওয়ার পরে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ইণ্ডোলজির প্রফেসর (ভারতীয় সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কিত সাবজেক্ট) ম্যাক্স মুলারের সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। জার্মান ইণ্ডোলজিস্ট পল ডিউসেনের সঙ্গেও ১৮৯৬ সালেই সাক্ষাৎ ঘটেছিল স্বামীজির। বেদান্ত সন্ন্যাসীর সুগভীর জ্ঞান এবং ভাষণ আমেরিকা, ইউরোপের হাজার হাজার মানব অন্তরকে তুমুল আলোড়নে আলোড়িত করেছিল বারবার। বিজ্ঞানবিশ্বাসী সুশিক্ষিত মানুষের সামনে ধর্ম এবং জীবনের ধারণা সম্পর্কে তিনি যে অর্থবহ যুক্তিসম্মত দিগন্তের উন্মোচন ঘটিয়েছিলেন, তাতে তিনি পাশ্চাত্যে পরিচিতি লাভ করেছিলেন-‘Global communicator’ হিসেবে। হার্ভার্ড এবং কলাম্বিয়া ইউনির্ভাসিটি তাঁকে একাডেমিক পজিশন প্রদান করেছিল। কিন্তু সন্ন্যাসী বিবেকানন্দর পক্ষে সন্ন্যাস জীবন এবং স্বদেশপ্রেমিক হিসেবে নির্দিষ্ট শর্ত আর অভিপ্রায় থাকায় সে প্রস্তাব গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি কখনো।

 
   স্বামীজি সুদীর্ঘ সময় ধরে থাকতে পারেননি প্রতীচ্যে। অত্যন্ত স্বল্পায়ু হওয়ায় জগতও তাঁকে পরিপূর্ণ করে পায়নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও ১২৫ বছর আগে তাঁর পাশ্চাত্যে আগমনের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারি। তাঁর অসংখ্য রচনার নির্যাস পান করে মানুষ অমৃতবারিতে অভিস্নাত হয়েছে যুগ যুগ ধরে। একুশ শতাব্দীর মধ্যপাদে এসে যার বিস্তৃতিকে আরও বেশি প্রসারিত দেখতে পাই ইউরোপ এবং আমেরিকার জনমানসে। কারণ ঐতিহ্যবাহী হিন্দুধর্মের আধ্যাত্মিকতাকে সমাজদর্শনের আদর্শবাদী মানবতাবাদ হিসেবে বিশ্বধর্মরূপে উপস্থাপিত করেছিলেন এই তরুণ সন্ন্যাসী। তিনি বলেছিলেন-‘I do not come to convert you to a new belief. I want you to keep your own belief. I want to make the Methodist a better Methodist, the Presbyterian a better Presbyterian, the Uniterian a better Uniterian. I want to teach you to live in the truth, to reveal the light within your own soul’ [৬]. এমন অমৃতময় দর্শনের কথা, জীবনের এত বড় প্রত্যাশার কথা এর আগে কে কবে শুনেছে কার মুখে? 
 
   এই প্রত্যাশাপূর্ণ আশ্বাস বাণী ছড়িয়ে দিতেই ১৮৯৪ এর নভেম্বরে নিউ ইয়র্কে প্রথম বেদান্ত সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন স্বামীজি। ১৮৯৯ তে দ্বিতীয়বার আমেরিকায় আগমনের পরে ১৯০০ এর জুন মাসে বেদান্ত সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন সানফ্রানসিসকোতে। তিনি যখনই যেখানে উপস্থিত হয়েছেন, সেখানেই মানুষ মাতৃদুগ্ধ পানের জন্য তৃষ্ণার্ত শাবকের মতো ছুটে গেছে তাঁর পিছে। মুগ্ধ হয়েছে তাঁর কথায়। তাঁর গুণমুগ্ধ ভক্তদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছিলো ক্রমাগত। জোসেফিন ম্যাকলিয়ড, রবার্ট জি ইগনরসোল, উইলিয়ম জেমস, হারম্যান লাডউইগ, এলা হুয়িলার উইলকক্স, স্যারা বার্নহার্ড, যশোয়াহ রয়েস, ইমা ক্যালভ, নিকোলা টেসলা, হ্যারিয়েট মনরো, সিস্টার ক্রিস্টিনা, মিস স্পেন্সার, আলবার্টসহ অসংখ্য ভক্তশিষ্যরা তাঁর শিক্ষাকে ছড়িয়ে দেবার ব্রত গ্রহণ করেছিলেন।
সন্ন্যাসধর্মেও কয়েকজনকে দীক্ষা দিয়েছিলেন স্বামীজি। বেদান্ত সোসাইটির ভবিষ্যৎ কর্মভার যাতে তাঁরাই বহন করে এগিয়ে নিতে পারেন। এঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য স্বামী অভয়ানন্দ(ম্যারি লুইস, ফ্রেঞ্চ রমনী) এবং স্বামী কৃপানন্দ (লিয়ন ল্যাণ্ডসবার্গ)।স্বামীজির সেই বিজয়লাভের স্বীকৃতিতে, লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁর আদর্শের কথা শুনলেন। যখন আমেরিকা থেকে ফিরে এলেন ভারতে তখন আর একা নন, মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল, লিয়া বার্গ, ওলি বুল, ডক্টর স্ট্রিট, ডক্টর এ্যালেন ডে, মিস ওয়ালডো, মিস্টার এণ্ড মিসেস ল্যাগেটসহ আরও অনেকেই তাঁর সঙ্গে ভারতবর্ষকে জানতে। এঁরা এলেন সেই ভারত সম্পর্কে জানতে, যে ভারতে এমন গৌরবরত্ন জন্ম নিয়েছেন তার শিক্ষাসংস্কৃতিতে অভিস্নাত হয়ে।           
 
   পরবর্তীকালে আমেরিকার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বেদান্ত সোসাইটি। যেমন, বেদান্ত সোসাইটি অফ শিকাগো। বেদান্ত সোসাইটি অফ টেক্সাস। বেদান্ত সোসাইটি অফ মিশিগান। বেদান্ত সোসাইটি অফ সিয়াটেল।    বেদান্ত সোসাইটি অফ হলিউড, ম্যাসেসুসেটস, অ্যারিজোনা, নর্দ্যান ক্যালিফোর্নিয়া, পোর্টল্যাণ্ড, বার্কলে প্রভৃতি। আমেরিকার বারোটি উল্লেখযোগ্য বেদান্ত সোসাইটির মধ্যে সবচেয়ে বৃহত্তম, হলিউড বেদান্ত সোসাইটি। এখানে একটি বেদান্ত প্রেস রয়েছে। যেখান থেকে বেদান্ত এবং অন্যান্য হিন্দুশাস্ত্র সম্পর্কীয় লেখা ইংরেজি ভাষায় নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয়। এসব নন প্রফিট প্রতিষ্ঠানে শুধু ভারতীয়রা নন, আমেরিকা এবং ইউরোপের বহু অনুসারীরাও রয়েছেন। যারা স্বামীজির লেখা পড়ে তাঁর শিক্ষা থেকে, উপদেশ থেকে, আদর্শ থেকে, জীবন এবং ধর্ম সম্পর্কীয় ব্যাখ্যা থেকে নতুন প্রত্যাশার অনুসন্ধান পেয়েছেন। যার প্রভাব প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে আজ গভীরভাবে শেকড় ছড়িয়েছে সমাজ থেকে সংস্কৃতিতে। দর্শন থেকে বিজ্ঞানে। এমনই এক দৃষ্টান্ত বিখ্যাত আমেরিকান পেইন্টিং চিত্রশিল্পী, স্টিফেন ন্যাপ।      
 
   স্টিফেন ন্যাপের জন্ম, ১৯৪৭ সালে ওয়রচেস্টার, ম্যাসাসুসেট-এর খ্রীষ্টান পরিবারে। ধর্মবিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য কৈশর থেকেই প্রবল আগ্রহে বাইবেল পড়তে শুরু করেছিলেন। পড়তে পড়তে জুডাইজম এবং বাইবেলের সঙ্গে বৈদিক সংস্কৃতির সংযোগসূত্র আবিষ্কার করে ভারতীয় ইতিহাস, দর্শন, বৈদিক সংস্কৃতির প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন। ২০০৯ সালে তাঁর একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় ‘The Bible Teaches Chanting God's name' নামে। সেখানে তিনি লিখেছেন -‘The Old Testament, Which is also extremely important in christianity, teaches many of the same principles of spritual development as found in the Vedic system. We can especially find similarities in the processes of Bhakti-yoga, Mantra-yoga and Sankirtana. The teachings in the Bible about the holliness of the name of God and the need to congregationally sing God's name and praises are quite evident. This applies as much to the essential Jewish forms of worship and meditation as it does to the Christian and almost every religious tradition’ [৭].
 
   স্টিফেন ন্যাপ তাঁর প্রবন্ধের উপসংহারে লিখেছেন - ওল্ড টেস্টামেন্ট এবং বাইবেলসহ অন্যান্য ধর্মের সঙ্গে বৈদিক ধর্মসংস্কৃতির প্রচুর সাজুয্য রয়েছে ঠিক কথা, কিন্তু বৈদিক ঋষিদের বক্তব্য আর ব্যাখ্যায় তাঁদের দার্শনিক ভাবনাগুলো আরও বেশি পরিপূর্ণ। তাঁদের আধ্যাত্মিক অনুভূতির কথা অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন করে উপস্থাপন করা হয়েছে। ‘But the Vedic culture that are more complete in their philosophy and spritual understanding'. অতএব ইহুদী এবং খ্রীষ্টান ধর্মকে ভালো করে বোঝার জন্যই বৈদিক ঋষিদের বেদ, পুরান এবং বিভিন্ন স্মৃতিশাস্ত্রগুলো আমাদের আরও বেশি করে অধ্যয়ন করা উচিৎ। স্বামীজিও তাই বলেছিলেন, আমি তোমাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিবর্তন ঘটাতে আসিনি। বরং একজন মেথোডিস্ট যাতে আরও ভালো মেথোডিস্ট, একজন প্রেসবিটেরিয়ান যাতে আরও ভালো প্রেসবিটেরিয়ান এবং একজন একেশ্বরবাদী যাতে আরও ভালো একেশ্বরবাদী হয়ে উঠতে পারেন, সেই সম্পর্কেই কথা বলতে এসেছি।
 
   কুড়ি শতকের প্রত্যুষে যুক্তরাষ্ট্রে বেদান্ত সোসাইটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে এখন একুশ শতকের মধ্যপাদে এসে যে প্রসঙ্গটি যৌক্তিকভাবেই উঠে আসা স্বাভাবিক সেটি হলো, ১২৫ বছর পরে বিবেকানন্দের বেদান্তের প্রভাব আমেরিকান মানসে কতখানি বিস্তৃত হয়েছে? বৈদিক সংস্কৃতির প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় সংস্কৃতিতে কোথায় কিভাবে প্রতিফলিত হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর দেবার আগে আগে প্রথমেই জানা দরকার বেদান্ত সোসাইটির উদ্দেশ্য কী? এর উদ্দেশ্য প্রধানত তিনটি -(১)সব আত্মাই প্রকৃতপক্ষে স্বর্গীয়, এ সত্য সম্পর্কে শিক্ষা দান।  (২)নিজের ঈশ্বরত্ব উপলব্ধি করাই মানব জীবনের লক্ষ্য, কর্ম যোগ, জ্ঞান যোগ, রাজ যোগ এবং ভক্তি যোগ আলোচনার মাধ্যমে এ সম্বন্ধে সচেতন করা।(৩) ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়, তিনিই সবকিছু হয়েছেন, বিশ্বসৃষ্টির সবকিছুতে তিনি বিরাজিত, এই জ্ঞান সঞ্চারিত করে বিভিন্ন ধর্মের সমন্বয় সাধন। যাতে সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা ভুলে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান মানুষের পক্ষে সম্ভব হয়।
 
   এই সহাবসস্থানের কথা, একাত্মতার কথা, আত্মদর্শন আর আত্মোপলব্ধির কথাই নানাভাবে ঘোষিত হয়েছে সনাতন ধর্মের বিভিন্ন শাস্ত্রে। স্বামীজি তাই বলেছিলেন-আমাদের উপনিষদ, বিভিন্ন ধর্মশাস্ত্র এবং পুরাণসমূহের মধ্যে যে অসাধারণ সত্যগুলো বন্দী অবস্থায় রয়ে গেছে, আমাদের প্রথম কাজই হবে তাদের মুক্ত করে এনে তাবৎ পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া। ‘The first work that demands our attention is that the most wonderful truths confined in our Upanishads, in our Scriptures, in our Purans must be brought out from the books and scattered broadcast all over the Land’ [৮].
 
 
 
   বেদান্ত সোসাইটি এই কাজটিই সুচারুভাবে সম্পন্ন করে চলেছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সাধারণভাবে চার্চ, মসজিদ অথবা অন্যান্য জড় প্রতিষ্ঠানের মতো পাশ্চাত্যের মাটিতে এদের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে বৃহৎ গাণিতিক নাম্বারে। প্রতীচ্যে স্বামী বিবেকানন্দের মিশনের সে উদ্দেশ্যই ছিল না। মানব অন্তরকে তিনি আলোকিত করতে চেয়েছিলেন বেদান্তের ধারণায় অভিস্নাত করে। কারণ তিনি চেয়েছিলেন, প্রত্যেক মানুষ তাদের নিজস্ব ধর্মের সত্যকে ভালো করে জানুক, বুঝুক। সব ধর্মমত যে একই সত্যের কথা জানাতে চেয়েছে, এই বিশ্বাস তাদের অন্তরে দৃঢ় থেকে সুদৃঢ় হোক। যাতে সম্প্রদায় থাকলেও সাম্প্রদায়িকতা দূরীভূত হয়। যাতে ধর্মবিশ্বাস থেকে কখনো ধর্মান্ধতার জন্ম না হয়। সেদিক থেকে এমন কথা বললে অতিরঞ্জিত হবে না যে, খ্রীষ্টান মিশনারিরা শতাব্দীকাল ধরে বাইবেলের যে ধরনের অ্যাধ্যাত্মিক ব্যাখা দান করেছিলেন এবং ঈশ্বর সম্বন্ধে মানুষের মনে ধারণার জন্ম দিয়েছিলেন, বেদান্ত শিক্ষার ভূমিকা সেখানে এক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে। যে পরিবর্তনের সম্ভাবনা ধারণার বাইরে ছিল।
 
   চল্লিশ পঞ্চাশ বছর আগেও সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে সাধারণ বাইবেল অনুসারীদের ধারণা ছিল, স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। মহাশক্তিধর ব্যক্তি হিসেবে মহাকাশের কোনো এক সুনির্দিষ্ট স্থানে তিনি বসবাস করেন এবং সেখানে থেকেই জগৎ শাসন করেন। কিন্তু সম্প্রতিকালে বাইবেলের বিভিন্ন উদ্ধৃতির ব্যাখ্যা দিয়ে স্রষ্টা আর সৃষ্টি সম্বন্ধে যে নতুন নতুন বই কিংবা প্রবন্ধসমূহ প্রকাশিত হচ্ছে, সেখানে অহরহোই প্রতিফলন ঘটছে নতুন চেতনার। নতুন ভাবনার। উদাহরণ হিসেবে বেদান্ত শিক্ষিত ব্রিটিশ দার্শনিক এ্যালান ওয়াটসের মন্তব্যের দৃষ্টান্ত এখানে তুলে ধরা যেতে পারে। তিনি বলেছেন, বেদান্তকে না জানলে যিশাসের বক্তব্যের অর্থ বুঝতে পারা পাশ্চাত্যের অধ্যত্মবাদীদের পক্ষে সম্ভব নয়। ‘Without understanding Advaita, Christans don't have a clue What Jesus was talking about' [৯].
 
   কারণ যিশু বেদান্তিক ছিলেন। নিজেকে তিনি ঈশ্বরপুত্র বলেছেন বারবার। বলেছেন, ‘Whoever sheds the blood of a man, by man His blood will be shed; for in His own image God has made mankind' [১০]. অর্থাৎ যে কেউ মানুষের রক্ত ঝরালে তাতে(মানুষের দ্বারা)ঈশ্বরেরই রক্তপাত করানো হয়।কারণ ঈশ্বরই তো মানুষ হয়েছেন(তিনি নিজের ইমেজে মানুষ গড়েছেন)। এই উক্তিই প্রমাণ করে অদ্বৈতবাদই ছিল প্রভু যিশুর বক্তব্যের মূল কথা। পাশ্চাত্যের অধ্যত্মবাদীরা সেটা বুঝতে পারেননি বলেই বাইবেলের বিভিন্ন উদ্ধৃতির এমন সব ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছেন, বিজ্ঞানের যুক্তিতে যা ধোপে টেকে না। তাঁরা তাঁকে গল্পপুরাণের এক নায়ক হিসেবেই উপস্থিত করতে চেয়েছেন। সেই কারণেই খ্রীষ্টধর্ম পাশ্চাত্যে শিক্ষিত মানসিকতায় বাস্তবতা পায়নি।
 
   শক্তির প্রতিমূর্তি সন্ন্যাসী বিবেকানন্দ ১২৫ বছর আগে আমেরিকার মাটিতে দাঁড়িয়ে যখন তাঁর সার্বজনীন একাত্মতাবোধের ঘোষণা দিয়েছিলেন, অবিশ্বাস্য মুগ্ধতায় সহস্র সহস্র মানুষ শুনেছিলেন সেই উচ্চারিত শব্দগুচ্ছ। তাঁর সুউন্নত ব্যক্তিত্ব, আত্মিক শক্তির বলিষ্ঠতা, রসবোধের ঔজ্জ্বল্য, প্রতিটি বিষয়ে সুগভীর পাণ্ডিত্য, উপস্থিত বুদ্ধির প্রখরতা, কণ্ঠস্বরের মিউজিক্যাল তরঙ্গ এবং তাঁর সর্ব বিষয়ের চমৎকারিত্ব  শ্রেতাদের বিমুগ্ধ বিস্ময়ে বিবশ করে দিয়েছে বারবার। তাঁর কথা শুনতে শুনতে অবিশ্বাস্য মুগ্ধতায় সহস্র মানুষের মনে হয়েছিল, সে বক্তব্য মানুষ থেকে নয়, উচ্চারিত হয়ে আসছে স্বর্গীয় ঈশ্বরের মুখনিঃসৃত বাণী হয়ে। সিস্টার ক্রিস্টিন লিখলেন -তাঁর বক্তব্য এত স্বচ্ছ, চিন্তা এত পরিচ্ছন্ন, অর্থ এমনই অভাবনীয় ও সুগভীর, বলার ভঙ্গিমা এতটাই অসাধারণ যে মনে হতো কথাগুলো যেন কোনো দেহধারী মানুষের থেকে নয়, উত্থিত হয়ে আসছে দেহাতীত এক অতীন্দ্রিয় সত্তা থেকে।
 
   আমেরিকার সহস্র সহস্র মানুষ বিভিন্ন সময়ে তাদের স্মৃতিচারণে, নানান বক্তৃতা বিবৃতিতে, লেখনীতে যাঁকে এমনভাবে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেছেন অর্ধশত বছর ধরে, তাঁর মূল্যবান উপস্থিতি অমিলন রেখে দিতে শিকাগো, ক্যালিফোর্নিয়া, নিউ ইয়র্ক, ওয়াশিংটন ডি সিসহ অনেক স্থানে নানাভাবে রক্ষা করা হয়েছে তাঁর সংস্পর্শের স্মৃতিগুলো। শিকাগো হিন্দু মন্দিরের ক্যাম্পাসে দশ ফুট উচ্চতার ব্রোঞ্জ মূর্তি স্থাপিত হয়েছে ১৯৯৮ এর ১২ই জুলাই। ১৯০০ খ্রীস্টাব্দে ক্যালিফোর্ণিয়ার যে বাড়িতে স্বামীজি ছ’ সপ্তাহের জন্য বসবাস করেছিলেন, সেটি বহু বছর আগে থেকেই ‘বিবেকানন্দ হাউজ’ হিসেবে পরিচিত। স্বামীজির নামে পোস্টকার্ড তৈরী করা হয়েছিল ডেট্রোয়িটে। কিন্তু সব ছাপিয়ে ভারতের বিশ্বজনীন গৌরব বোধকরি সংরক্ষিত হয়েছে বেদান্ত সন্ন্যাসীর অনন্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে প্রতীচ্যের মানসে বেদান্তের গ্রহণযোগ্যতায়। সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কে হাজার হাজার বছর আগে স্পষ্ট উচ্চারণে ভারতের প্রাচীন মুনিঋষিরা অনাদিকালের যে সত্যকে ঘোষণা করেছিলেন, সেই সত্যেরই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আজ আধুনিক যুগের বিজ্ঞানও। তাঁরা বলেছিলেন, এই অনন্ত অলৌকিক বিশ্বব্রহ্মাণ্ড একই মহাচৈতন্যের প্রকাশিত রূপ। আমাদের সবার উৎপত্তির মূলে যে পরমসত্তা, তিনি বোধের অতীত। বাক্যে যাঁকে বর্ণনা করা যায় না, তিনিই স্রষ্টা এবং বিশ্বসৃষ্টি।      
 
   এখনকার বিজ্ঞানীরাও বলছেন -‘Whether one looks out at the mysteries of a vast cosmos or narrows the view to the counterintutive behavior of a subatomic particle, I would not be alone in maintaining that nonduality is the basic principle that explains the Whole-“Sprit”, of what is ‘manifest in the Laws of the Universe'. While our comprehension has only been recent, that has been the message of Sages throughout the human history’ [১১]. অর্থাৎ এই বিরাট বিশ্বের রহস্যের দিকগুলোই হোক কিংবা ছোট ছোট অণুপরমাণুর ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়ার সহজাত আচরণবিধিই হোক, এ সম্পর্কে আমি কেবল একা নই, অন্যরাও এটাই বলতে থাকবেন, এদের বুদ্ধিবৃত্তির মৌলিক প্রকৃতি একই অবিচ্ছেদ্য সত্তার অংশ। অর্থাৎ একই চেতনার দ্বারা তারা পরিচালিত এটাই সৃষ্টিতত্ত্বের ব্যাখ্যা। এবং ওই একই চেতনা বিশ্বসৃষ্টি প্রকাশের অন্তর্নিহিত আইন। কিন্তু আমরা সম্প্রতিকালে যা অনুধাবন করতে পেরেছি, ঐতিহাসিক কাল ধরে মানবজাতির জন্য সেটাই ছিল মুনিঋষিদের বার্তা (ম্যাসেজ)।          
 
   পরিশেষে বলতে হয়, পাশ্চাত্যে বেদান্ত পাঠকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে ক্রমাগত। সমাজের অভ্যন্তরে নতুন চেতনার প্রলেপ পড়ছে। ইউরোপ আমেরিকার বিজ্ঞানবিশ্বাসী সুশিক্ষিত মানুষ অদ্বৈত বেদান্তের ব্যাখ্যায় Quantam mechanics-এর প্রতিফলন দেখতে পেয়ে বড় নিশ্চিন্ত তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে। পরিতৃপ্ত এই ভেবে, স্বামীজির বেদান্তের আলোকেই আলোকিত হয়ে উঠবে আমেরিকা। প্রত্যাশা, সার্বজনীন একাত্মতার উপলব্ধিই হয়তো ফিরিয়ে আনবে পৃথিবীর শান্তি।      

 

 

 

 

 

 

 

 

 

তথ্য নির্দেশনা:

১. Abandoning and Adopted Farm by Kate Sanborn.                                      

২. Vivekananda Vedanta Society of Chicago.

৩. Swami Vivekananda's Speech at the Parliament of Religion, https//indianexpress.com.

৪. A poet's life by Harriet Monroe.

৫. Full Text of Swami Vivekananda's Chicago Speech of 1893, hptts://www.business- ‍                                         standard.com.

৬.  The life of the Swami Vivekananda by Swami Virajananda (Lecture tours in UK&US).
৭. The Bible Teaches Chanting God's name by Stephen Knapp.
৮. ‘From Colombo to Almora’, Seventeen Lectures by Swami Vivekananda.

৯. Jesus and Advaita Vedanta by Alan Watts.                                            

১০. Genesis 9:6. New American Standard Bible.                                         

১১. Science of the Sages (Scientist Encountering Nonduality from Quantum Physics to                   cosmology to Consciousness)by Robert Wolfe.

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com