নির্বাচিত সত্য

 

গাড়ির বনেটের সঙ্গে হাত পা বেঁধে প্রকৃত সত্যকে ঘোরান হচ্ছে গাটা গ্রাম। আর 'পাথর ছোঁড়া হাত' নামক নির্বাচিত সত্যের ফাঁদে ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছে একটা ভূখণ্ড...। হ্যাঁ, আমার, আপনার, আমাদের সকলের ভারতবর্ষ।  
চলুন, প্রকৃত সত্য আর নির্বাচিত সত্যের সমান্তরাল রাজপথে বিকেলের মৃদুমন্দ হাওয়ায় কিছুক্ষণ পায়চারি করে আসি।

              মানুষ তার জন্মের পর থেকেই মিথ্যাকে বিশ্বাস করতে ভালোবাসে।  আর এই বিশ্বাস  কল্পনার ডানায় ভর করে গোটা পৃথিবীর নানা দেশে নানা জাতীয় পুরাণের বহু আজগুবি গপ্পোকে যুগে যুগে মানুষ সত্য বলে স্বীকার করেছে। তেমনই চীন বা সোভেয়েত রাশিয়ার রঙিন বিজ্ঞাপনে ভুলে  তাকে স্বপ্নের দেশে পরিনত করে। এভাবেই একবিংশ শতাব্দীতে সামাজিক রূপান্তরের এক নতুন স্তর এসে উপস্থিত হয়েছে। তার নাম নির্বাচিত সত্য।

                    প্রকৃত সত্যের চেয়েও ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে এই নির্বাচিত সত্য। যেন সিনেমার মধ্যে সিনেমা চলছে। যেমন আমাদের দেশ মানে এই ভারতবর্ষের  গরীব মানুষ গ্রামে লেখাপড়া শিখছে। কম্পিউটার শিখছে। ওয়াই- ফাই আওতায় বেকাররা চাকরীর প্রস্তুতি নিচ্ছে। সকলেরই রয়েছে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট।  আধার কার্ড। চাষের মাঠে ইউরিয়া। তারা কেউ আত্মহত্যা করে না। সরকারি সাহায্যে খুশি। ক্রমশ স্বাবলম্বী হয়ে তারা এগিয়ে যাচ্ছে ডিজিটাল ইন্ডিয়ার দিকে। আর আমরা সকলেই একটু একটু করে অভ্যস্ত হচ্ছি বাস্তবতায় নয়, মায়া বাস্তবতার স্বপ্নে বাঁচতে।

                 প্রথমেই বলে নেওয়া ভাল, এই নির্বাচিত সত্যেরও কিছু দাবী থাকে। সে তৈরি করে নেয় তার পছন্দমতো  পরিমণ্ডল  এবং পায়ের তলার মাটি। তাই রজনীগন্ধা ফুলের সমালোচনা করবার জন্য বাক স্বাধীনতার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু সরকারের সমালোচনা করবার জন্য বাক্স্বাধীনতার প্রয়োজন আছে - এই সরল সত্যটি মসনদে থাকা শাসক গোষ্ঠী  আজ বিস্মৃত হয়েছে। আর এই বিস্মৃতিই ফ্যাসিবাদের ঘন্টা বাজায়। তাই দেখি শাসকই রাষ্ট্র  এবং শাসকের বিরোধিতাকে রাষ্ট্রবিরোধী তকমা দেওয়ার এক ফ্যাসিবাদী উৎসবের উদযাপন।

             আজ ভারত রাষ্ট্র  শোনায় তার ' মন কি বাত'। কিন্তু যে মানুষগুলো রাষ্ট্রের শেখানো বুলি শুনতে চায় না, শাসকের পায়ে নিঃশর্ত আনুগত্য প্রকাশ করে না, তখন মায়াবাস্তবতার পর্দা ছিঁড়ে রাষ্ট্র তার দাঁত নখ বার করে। এটা ঠিক রাষ্ট্রের সঙ্গে মানবধিকার কর্মীদের সম্পর্ক সবসময়ই গোলমেলে। ভারতেও তাই। কিন্তু মেধাজীবী ও সমাজকর্মীদের গ্রেপ্তার করার মধ্যে একটা সুস্পষ্ট বার্তা আছে। তাদের গ্রেপ্তার করলে বাকি মানুষের শিরঃদাঁড়ার মধ্যে একটা ঠাণ্ডা স্রোত বইয়ে দেওয়া যাবে। বিশেষ করে লিবারাল আর মুক্তচিন্তার মানুষদের বুঝিয়ে দেওয়া গেল- সবার ওপরে রাষ্ট্র সত্য, অর্থাৎ রাষ্ট্রের বিরোধীতা করলে- যে কোন মুহূর্তে তাদেরও...। তার চেয়ে চোখ বন্ধ করে মন দিয়ে শোন, রাষ্ট্র কতৃক সম্প্রচারিত নির্বাচিত সত্য ' মন কি বাত'।

             নির্বাচিত সত্য দেখতে অনেকটা সত্যের মতো মনে হলেও, আসলে সে প্রকৃত সত্য নয়। তার ফাঁদ বড় ভয়ঙ্কর।
উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি বৃহত হিন্দুত্বের কথা বলে। ধর্মের পরিসরে কেউ ছোট কেউ বড় তা তারা মানে না। ফলে সূক্ষ আলোর আভাস পেয়ে বহু দলিত ও আদিবাসী এসেছে তাদের শাখায় গত কয়েক দশক ধরে। তাহলে সমস্যাটা ঠিক কোথায়? গভীরে, বোধহয় অনেক গভীরে। অনগ্রসর শ্রেণীর মানুষদের জায়গা থেকে দেখলে,  দুটো সমান্তরাল দুনিয়া তাদের সামনে। একটা শাখার ভিতরে আর একটা হল শাখার বাইরের উন্মুক্ত দুনিয়া। শাখার ভিতরে রয়েছে সেই মায়াবাস্তবতার কাজল। কিন্তু বাইরের পৃথিবীটা তাদের জন্য রুক্ষ কঠিন কর্কশ।  সেখানে হিমালয়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে অসাম্য। শাখার ভিতরে থেকে বাইরের সেই অসাম্যের প্রতিকার চাওয়া যায় না। সংরক্ষনের দাবী জানাবার উপায় থাকে না। কারন উগ্র হিন্দুত্ববাদী নাগপুরের যুক্তি মানলে বৃহত হিন্দুরাষ্ট্রে আর হিন্দুদের বিভাজন মানা যায় না। অভিন্ন হিন্দুত্বের গালভারি গল্পে দলিতদের ন্যায্য দাবি হিমালয়ের নীচে অক্সিজেনের অভাবে ধুঁকতে থাকে। বিপদ ঠিক এখানেই। প্রান্তিক খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ আর প্রশ্ন করতে পারে না- যদি অভিন্ন হিন্দুত্ব শ্রেণীশোষণের কথাই স্বীকার না করে তাহলে হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলেও শ্রমিকের আর কি যায় আসে! এভাবেই অভিন্ন হিন্দুত্ব শাখার বাইরের জগতে পা রাখা মাত্রই প্রকৃত সমস্যাগুলোকে গিলে ফেলে এবং মায়াবাস্তবতা ও নির্বাচিত সত্যের মুখোশ  পড়ে নেয় মুহূর্তমধ্যে।

            যদিও সঙ্কট সেখানেও অব্যাহত। জাতির নামে রাজনীতি করতে গেলে জাত নামক বিষয়টি মধ্যিখানে কণ্টকশয্যাই শুধু বিছিয়ে দেয়। হিন্দু জাতির ঐক্য প্রতিষ্ঠা তথা এক জাতি তত্বের তুরুপের তাসও আজ তাদের কাছে শাঁখের করাতে পরিনত হয়েছে। অভিন্ন হিন্দু জাতি তত্বের অন্দরে কন্দরে মাথা তুলছে অন্তজ নিম্নবর্ণের বিক্ষুব্ধ বিদ্রোহী সত্তা। তাদের চোখ থেকে ক্রমশ সরে যাচ্ছে মায়াবাস্তবতার কাজল। তাই ভোটের হিসেব মেলানোর জন্য যখন শাসকগোষ্ঠী তাদের গোসা সামলাতে মাঠে নামে তখন অন্যদিকে উচ্চবর্ণের হিন্দুরা ক্ষোভে ফেটে পড়ছে। এই দুই পক্ষের সংঘর্ষ, পারস্পরিক অবিশ্বাসের শিকড় এত গভীর প্রসারী  ও সুদূরগামী যে আইডেন্টিটির রাজনীতিতে দুই পক্ষকে একই সঙ্গে খুশি রাখা এক অসম্ভব ব্যাপার হয়ে উঠেছে। এখনও পর্যন্ত দাঁড়িপাল্লার দুই দিককে ভারসাম্যে আনবার মন্ত্র হিন্দুত্বের চৌকিদাররা জোগাড় করে উঠতে পারেনি। এ মুহূর্তে গৃহবন্দি কবি ভারভারা রাওয়ের গভীর ব্যঞ্জনাময় 'নামকরণ' কবিতাটি কিভাবে যেন মনের ভিতর পর্যন্ত নাড়িয়ে দেয়-
" হঠাত এলো বুনোফুলের গন্ধবিধুর হাওয়া/
বইল আমার মনের ভিতর, এইটুকু তো পাওয়া/
এখন বাতাস যেন লাগছে পাহাড়চূড়ায়/
আকাশ যেন ধনুক হয়ে লাগছে বনের গায়ে/
পারলে তুমি বণিক ডেকে গোধূলি দাও বেচে/
গোদাবরীও শুকিয়ে যাবে, থাকবে না কেউ বেঁচে।"

              এতো গেল গোড়ার কথা। হিন্দুত্বের ভিতর হিন্দুত্বের খেলা আর তার আত্মঘাতী  গোল। এরপরেও খালি পড়ে আছে মাঠের অর্ধেকেরও বেশি অংশ। তাহলে আর কি? একের পর এক খেলোয়ারকে মাঠে দাঁড় করিয়ে দেওয়া যাক- কাশ্মীর, সেনাবাহিনী, পাকিস্থান,  মধ্যযুগীয় ইতিহাস, গরু, রামমন্দির, এন আর সি, লাভ জেহাদ, চুপচাপ দাঙ্গা, তারকাখচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষকদের দেগে দেওয়া বিরুদ্ধ স্বর। ২০১৯ যে  আর বেশি দেরি নেই...!!

          এটা ঠিক যে ভয় প্রদর্শনের কৌশল কোন বিশেষ দল বা রাজনীতির একচেটিয়া নয়। তবু নিঃসন্দেহে বলা যায়, বর্তমান ভারতের হিন্দুত্ববাদী সরকার ভয় প্রদর্শনের কৌশলটিকে প্রায় শিল্পের পর্যায় নিয়ে গেছে। নাগরিক মানসে ভয় ঢুকিয়ে দিতে পারলে সহজেই বিরোধীতার পরিসরটিকে সঙ্কুচিত করে ফেলা যায়। বলা ভাল, গণতন্ত্রের কাঠামোর মধ্যে থেকে নিরন্তর গণতন্ত্রকে ধ্বংস করবার যে মোক্ষম অস্ত্র তৈরি করা হচ্ছে- তার নাম ভয়।

             আসলে কোন রাষ্ট্রব্যবস্থা ও নাগরিক সমাজ চায় না তাদের সম্পদে, জমিতে, আর্থিক বন্টনে বাইরের কেউ এসে ভাগ বসাক। এই ভিতর- বাইরের অঙ্ক, ভূমিসন্তান বনাম বহিরাগত হিসেব এখন পৃথিবীজোড়া সঙ্কট। কে কীভাবে তার সমাধান করছে, তাতেই তার পরিচয়। ২০১৯ এর আগে হিন্দুত্ববাদী ভারত শুধু বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীর জুজু দেখিয়েই হিন্দু মুসলমান মেরুকরণের উৎকৃষ্ট নমুনা তৈরি করেছে। ' সবকা সাথ, সবকা বিকাশ' বিজ্ঞাপনের ধ্বজাধারীরা  নাগরিকপঞ্জীতে নাম না ওঠা চল্লিশ লাখ মানুষকে ভিটেছাড়া করেই ক্ষান্ত নন্। তাদের পরিকল্পনা আরো সুদূরগামী। সবাইকে তাড়ানোর দরকার নেই। সবাইকে অনুপ্রবেশকারী বলে দেগে দেওয়ারও প্রয়োজন নেই। দরকার শুধু এই ধারনাটুকু তৈরি করে দেওয়া যে বাঙালি মুসলমান মানেই তার নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন আছে। এভাবেই মুসলমানদের মধ্যে ভয়ের বাতাবরণ তৈরি করার সুন্দর ব্যবস্থা, এক চমৎকার রাষ্ট্রীয়  কৌশল! যা নির্বাচিত সত্যেরই এক বর্ণময় ছটা।

         " আখলাক ঘটার সময়ও আমরা জিতেছি, বিশিষ্ট ব্যক্তিরা যখন প্রতিবাদে সরকারি পুরষ্কার ফিরিয়ে দিলেন তখনও জিতেছি" - এই সরল স্বীকারোক্তি যখন প্রথমসারির নেতার মুখে শোনা যায়, তখন বুঝতে অসুবিধে হয় না যে সুস্থতা বা শান্তিস্থাপন  নয়, ভোটে জয় এবং ক্ষমতায়নই এখন ভারতের ভাগ্য। বৈষম্যমূলক আদর্শের উপরেই দাঁড়িয়ে আছে ভারতের রাজনৈতিক অদৃষ্ট। সংখ্যাগুরুর দৃষ্টির সামনে সংখ্যালঘুরা যা ইচ্ছে তাই করবে - এ তো হতে পারে না। কীভাবে তা মেনে নেবে সংখ্যাগুরুর আধিপত্যবাদ। তারা মনে করে- খাওয়ার ক্ষেত্রে গোমাংস যা ইচ্ছে তাই।  বিবাহের ক্ষেত্রে  ভিনধর্মের সঙ্গী নির্বাচন। শিল্পকলার ক্ষেত্রে তাজমহলের মতো সৌধ নির্মাণ।  চলচিত্রের ক্ষেত্রে মুসলমান গৌরব নির্ভর সিনেমা বানান। আর প্রতিবেশির ক্ষেত্রে পাকিস্থান। এইসব সংখ্যালঘুপনা যদি ঠেকানো না যায় তাহলে হিন্দুরাষ্ট্র তৈরির স্বপ্ন কিভাবে চনমনে রাখবে আধিপত্যবাদকে! তাই আপাতত ২০১৯ এর রণকৌশল একটাই- প্রাত্যহিক সাম্প্রদায়িকতা। বড় কোন দাঙ্গা নয়। মুসলিম এলাকাতেও অতিসক্রিয়তা নয়। গোটা দেশ জুড়ে শুধু সাধারণ মানুষের মধ্যে সংখ্যালঘু বিরোধী  প্রচার চালান। পাকিস্থান আর হিন্দুবিরোদীদের সবক শেখাতে পারে একমাত্র শাসক রাষ্ট্র আর নাগপুরের চৌকিদাররাই। অন্যদলগুলি তো ওদের মাথায় তুলে রেখেছে। ব্যস, এটুকুই যথেষ্ট। এই ' এভরি ডে ' সাম্প্রদায়িকতাই হয়ত ২০১৯ শে হয়ে উঠবে জয় অথবা ব্যর্থতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ  কারিগর।

               জার্মানিতে রাজনীতি বিশারদরা বলেছিলেন - গণতন্ত্র আছে,  নির্বাচন আছে,  সংবিধান আছে। হিটলারকে নিয়ে এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তারপর ১৯৩৩ এল। বার্লিনের এক সাংবাদিকের ভাষায়,  " প্রথমে রাইখস্ট্যাগ পুড়ল,  তারপর বই,  তারপর সিনাগগ। তারপর আগুন লাগলো জার্মানিতে, ইংল্যাণ্ডে, ফ্রান্সে, রাশিয়ায়...।" জার্মানির মানুষ সেদিন ভবিষ্যত অনুমান করতে পারেনি। তাই ইতিহাসবিদ বেঞ্জামিন কার্টার হেট তার বইতে বলেছেন, " আমরা পরে এসেছি, তাই জার্মানির সেই মানুষদের তুলনায় আমাদের সুবিধে হল,  তাদের দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে আছে।"
সেই দৃষ্টান্তের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কেন আমরা পারবো না, নির্ভীক বলিষ্ঠ পদক্ষেপে তরতরিয়ে এগিয়ে যাওয়া নির্বাচিত সত্যের কন্ঠরোধ করতে??

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com