মার্কিন মিডিয়ায় নির্বাচনের রাজনীতি

 

 

রিপাবলিকান দলের সমর্থনকারী হোন কিংবা ডেমোক্র্যাটিক দলের অনুসারী হোন,  এবারের জেনারেল ইলেকশন সম্পর্কে সংখ্যাতীত আমেরিকানদের সরাসরি অভিমত হলো - ২০১৬ এর নির্বাচনী প্রচারণায় মিডিয়ার সংবাদ বৈচিত্র্য মানুষের মনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করায় যাকে বলে সাক্ষাৎ ‘ধন্বন্তরী’। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নির্বাচনের ইতিহাসে এমন অবাঞ্ছিত পরিস্থিতি এর আগে কখনো তৈরী হয়নি। সত্যিই তাই। এবারের দুই প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প আর হিলারি ক্লিন্টনের কার্যকলাপ কিংবা মন্তব্য নিয়ে বেশীরভাগ মিডিয়া যে ধরনের দ্বিচারিতা করছে,  সমাজ মানসে তার প্রতিফলন কোনোভাবেই সুখকর নয়।

ওদিকে সাধারণ মানুষের মনে স্ট্রেস তৈরী করায় ট্রাম্প এবং ক্লিন্টন দুজনেই যাকে বলে উপযুক্ত মালমশলায় ঠাসা। ট্রাম্প যেমন মিসেস হিলারি ক্লিন্টনকে বলছেন- ‘ক্রুকেড এবং মিথ্যেবাদী’, হিলারিও তেমনি বলছেন - মিস্টার ট্রাম্প হচ্ছেন প্রেসিডেন্ট পুটিনের হাতের পুতুল! পুটিন যেমন নাচাচ্ছেন তিনিও সেভাবেই নেচে চলেছেন! এবং এই অক্ষমতার কারণেই টাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হবার পক্ষে একান্ত অনুপযুক্ত! এছাড়াও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নারীসমাজকে উত্তেজিত করে তুলতে অনেক নারীঘটিত গল্পকাহিনীও তৈরী করেছেন হিলারি।  প্রিন্ট মিডিয়া থেকে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় সারাক্ষণই যেগুলো প্রচারণা পাচ্ছে। জবাবে ট্রাম্পও জানিয়েছেন, করাপ্ট মিডিয়ার সব অভিযোগই সর্বৈব মিথ্যা। এবং যেসব নারীরা মিথ্যে অভিযোগে  তাঁর বিজয়লাভের পথকে বাধাগ্রস্ত করতে চাইছে, তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই তিনি মামলা করবেন কোর্টে!

অর্থাৎ ট্রাম্প তাঁর বাক্যালাপের দ্বারা যেমন বিরক্তি উৎপাদন করে চলেছেন, আমেরিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার শপথ নিয়ে বারবার অবৈধ অভিবাসীদের অন্তরে ঝড়ের তুফান তুলছেন,  হিলারিও তেমনি নিজের মিথ্যাচিারিতা আর দুর্নীতির দ্বারা বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছেন।  তিনি সেক্রেটারি অফ স্টেট  থাকাকালীন সময়ে বহু ভুল পদক্ষেপ গ্রহণ করে মাতৃভূমির  নিরাপত্তার বর্মকে বিঘ্নিত করেছেন বারবার। জঙ্গী সমর্থক রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক সুযোগ সুবিধে পাইয়ে দিতে নির্দ্বিধায় তাদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করেছেন। যার কারণে দেশপ্রেমিক আমেরিকানদের মনে জন্ম হচ্ছে সংশয় আর বিরক্তির।  কিন্তু  তারপরও আশ্চর্য ব্যাপার হলো,  রিপাবলিকান দলের বাঘা বাঘা নীতিনির্ধারক নেতাদের ঘোরতর বিরোধিতা সত্ত্বেও প্রাইমারি পর্যায়ের নির্বাচনী লড়াইয়ে ষোলো জন প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পই আগাগোড়া জনপ্রিয়। জনতার কাছে সর্বাধিক আকর্ষণীয় তিনি। ওদিকে ডেমোক্র্যাট দলের উপযুক্ত নেতা স্যাণ্ডার্সের প্রতি আস্থার যথেষ্ট কারণ থাকা সত্ত্বেও দলীয় প্রতিযোগিতায় হিলারি ক্লিন্টনই লাভ করেছেন নমিনেশন প্রাপ্তির  গৌরব।

তবে এবার সাধারণ নির্বাচনের রাজনীতিতে মিডিয়ার কার্যকলাপ ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে সচেতন মানুষের চেতনায়। ইলেকশন কভারেজ নিয়ে আমেরিকান সাংবাদিকতায় যে কালো অধ্যায়ের সূচনা এবার হয়েছে, অনেকের কাছেই তা সমালোচিত হচ্ছে তীব্রভাবে। সাংবাদিকতায় এমন পরিস্থিতি এর আগে নাকি তারা দেখেননি। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির কারণ সর্ম্পকে অভিজ্ঞজনেরা নানা বিরূপ মন্তব্যের শেষে বলেছেন -  বর্তমান মার্কিন মিডিয়ার আশি পার্সেন্টই  রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত। তারা পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে অভিযুক্ত। কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি নিজস্ব বিশ্বাসে কারুর ব্যক্তিগত পছন্দের দিকটি থাকতেই পারে। সেটা আগেও ছিল। কিন্তু অবজেকটিভ সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে এদেশের সংবাদ মিডিয়ায় যে সত্যনিষ্ঠা আর সততা সুদীর্ঘকাল ধরে প্রতিষ্ঠিত ছিল,  বর্তমানে তার অভাব সব পর্যায়েই অপ্রত্যাশিতভাবে লক্ষ্যণীয়।

বলা বাহুল্য এমন মন্তব্যও অনেকে করেছেন - ক্রমাগতভাবে আমেরিকার মিডিয়া দখল করে নিচ্ছেন ইমিগ্র্যান্ট জনতার দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় প্রজন্ম। সঙ্গত কারণে ডেমোক্র্যাটিক দলের আগাগোড়া সমর্থক তারা। যে কারণে হিলারির সব ধরণের বিচ্যুতিকে আড়ালে ঢেকে যেমন তাঁর ইতিবাচক দিকগুলোকেই এরা প্রচার করায় ব্যস্ত, তেমনি ব্যস্ত - ডোনাল্ড ট্রাম্পের উল্লেখযোগ্য ভালো দিকগুলোকে আলোচনায় না এনে শুধুমাত্র ত্রুটিবিচ্যুতিকে  উপস্থিত করায়। যাতে ট্রাম্পের সমর্থকদের মনেও তাঁর সম্পর্কে ঘৃণা এবং বিতৃষ্ণার উদ্রেক হয়। যারা এসব কথা বলছেন, তাদের  সিংহভাগই ককেশিয়ান ভোটার এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাপোর্টার। সঙ্গত কারণেই তারা চান না, আমেরিকার সংস্কৃতি এবং সমাজব্যবস্থা ইমিগ্র্যান্টদের দ্বারা নীতিহীনভাবে প্রভাবিত হয়।

নিউজ মিডিয়া সম্পর্কে ট্রাম্পের ভক্তদের অভিযোগের তালিকা তাই দীর্ঘ। কারণ সম্পর্কে উদাহরণ স্বরূপ অনেক ঘটনার কথাই এরা উল্লেখ করেছেন। দৃষ্টান্ত হিসেবে কদিন আগের  ট্রাম্পের শিকাগো র‌্যালি‌তে ভায়োলেন্সের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।  শিকাগোতে ট্যাম্পের র‌্যালি আক্রান্ত হলে রিপোর্টাররা বলেছিলেন,  এই আক্রমণ হিলারির দলের কেউ নন,  স্বয়ং ট্রাম্পের ক্যাম্পইনাররাই করেছেন ডেমোক্র্যাটিক দলকে বাইরের বিশ্বে হেয় প্রতিপন্ন করার অভিপ্রায়ে। পরে অবশ্য প্রমাণ হিসেবে ভিডিও টেপে ধরা  পড়ে,  ডেমোক্র্যাটিক দলের যে ব্যক্তির উদ্যোগে এই হিংসাত্মক ঘটনার জন্ম, ১৬০০ ডলারের বিনিময়ে তাকে এই কাজে নিযুক্ত করা হয়েছিল সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্টের কর্মস্থল এবং অফিসিয়্যাল রেসিডেন্স হোয়াইট হাউজ থেকে।  আক্রমণ করার আগে  ওই ব্যক্তি প্রায় তিনশোবার হোয়াইট হাউজে গিয়েছিলেন।

কিন্তু এই সংবাদ হিলারির সমর্থনকারী কোনো মিডিয়াতেই প্রকাশিত না হওয়ায় ট্রাম্প আরও একবার অগ্নি উদগীরণ করেছেন নিউজ মিডিয়ার বিরুদ্ধে। তিনি আর্লি ভোটিং-এর ফলাফল নিয়েও সংশয়গ্রস্ত হচ্ছেন। ২০১৬ এর আগষ্ট মাসে কয়েকবারই টুইটারে তিনি জানিয়েছেন - ইলেকটোরাল সিস্টেমকেও তাঁর বিরুদ্ধে এখন কাজে লাগানো হচ্ছে! যেখানে পলিটিক্যাল সিস্টেমকেই উল্টে দেবার পাঁয়তারা শুরু হয়েছে, সেখানে ইলেকটোরাল কলেজ সিস্টেমও যে রিগ করা হবে, তাতে আর অবাক হবার কী আছে! এমন অভিযোগের বিরুদ্ধে হুঙ্কার ছেড়েছেন প্রেসিডেন্ট বারেক হোসেন ওবামা। বলেছেন -দীর্ঘ অভিযোগের নাকিকান্না এবার বন্ধু করুন আপনি! সিএনএনসহ উল্লেখযোগ্য টিভি চ্যানেলগুলোও তাঁর বিরুদ্ধে আবারও তীব্র সমালোচনায় মুখরিত। কিন্তু যখন টেক্সাসের আর্লি ভোটিং-এ স্বয়ং ভোটারদের অভিযোগেই প্রত্যক্ষভাবে প্রমাণিত হলো ট্রাম্পের অভিযোগ সম্পূর্ণ সত্য, তখন ট্রাম্পবিরোধী চ্যানেলে এবারও কোনো উচ্চবাচ্য হলো না দেখে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ট্রাম্প রোজই র‌্যালিতে রূঢ় বাক্যের অগ্নিমিসাইল উড়িয়েই চলেছেন।

তবে সবচেয়ে বেশি তাজ্জব ব্যাপার হলো,  এই বিরাট  অভিযোগ প্রমাণিত হবার পরেও রিপাবলিকান দলের বহু প্রতিষ্ঠিত নেতারাই মুখে কুলুপ এঁটে রয়েছেন। এঁরা ট্রাম্পের ছোট খাটো বিচ্যুতি নিয়েও বিরোধিতায় মুখিয়ে উঠছেন থেকে থেকে।  কিন্তু হিলারির সব রকম বিচ্যুতি সম্পর্কেই নীরবতায় এঁরা মৌন।  এমন অলৌলিক বাস্তবতা অতীতের কোনো ঘটনাতেই নাকি দেখতে পাননি আমেরিকান জনতা। ভক্তদের তাই বিশ্বাস, ট্রাম্পের অতি জনপ্রিয়তার কারণেই রিপাবলিকান দলের কয়েকজন বাঘা রাজনীতিবিদ ঈর্ষার আগুনে জ্বলছেন! তাঁরা চান না,  এই অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তাঁদের পছন্দের  প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করলেও প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিজয়ী হোন।  বরং তাঁর পরিবর্তে এককালের ফার্স্ট লেডি হিলারির বিজয়লাভ হলেই  তাঁদের মানসম্মান সুরক্ষিত হয়।

রিপাবলিকান জনতা তাই ক্ষুব্ধ তাঁদের ওপরে। তারা বলেছেন - পরবর্তীতে এসব রিপাবলিকান নেতাদের তারা দেখে নেবেন।  এমনকি তারা অভিযোগ তুলেছেন - দুই প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীর জনমত জরিপের যে সংখ্যাগুলো প্রচার করা হচ্ছে, সেটাও এক ভয়াবহ মিথ্যাচার। এটা এই জন্যই করা হচ্ছে যাতে রিপাবলিকান দলের সমর্থনকারীরা সর্বতোভাবে নিরাশ হয়ে ৮ই নভেম্বর ভোটদান থেকে বিরত থাকেন। যাতে যেনতেন প্রকারে হিলারি ক্লিন্টনকে বিজয়ের মুকুট পরানো চলে। স্পষ্টভাষী, সরাসরি রূঢ় কথা বলায় ওস্তাদ মিস্টার ট্রাম্প নিজ দলের অনেক বৃহৎ নেতাদের ওপরে প্রথম থেকেই ক্ষিপ্ত। তার ওপর  মিডিয়ার রোজকার আচরণে দস্তুরমতো মারণচণ্ডী হয়ে এবার এক শমনই জারি করে বসেছেন। স্পষ্টতই জানিয়ে দিয়েছেন তাঁর অভিমত -  ‘Media is already rigged, and this corrupt media should be put on trial for its 2016 coverage'!    

২০১৬ এর নির্বাচন নিয়ে বিরাট সংশয়, অবিশ্বাস আর অভূতপূর্ব ইতিহাস সৃষ্টির পেছনে সিংহভাগ মিডিয়ারই দায়বদ্ধতা অনেকখানি সেটা জনতার কাছে স্পষ্ট। তবে নির্বাচনী জোয়ারে ভেসে কে পরবেন বিজয়ের মুকুট সেটা বোধকরি এখনো সুস্পষ্ট নয়। এ কথা ঠিক বিপুল সংখ্যক ইমিগ্র্যান্ট জনতার ক্রমবৃদ্ধিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক চেহারা বদলে গিয়েছে অনেকখানি এবং তাদের সমর্থন মিসেস ক্লিন্টনের দিকেই থাকবে। কেননা হিলারি ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের রুদ্ধদ্বার কক্ষে ডোনারদের সঙ্গে আলোচনায় বসে জানিয়েছিলেন - ওপেন বর্ডার পলিসিকেই তিনি সমর্থন করেন এবং করবেন। অবৈধ ইমিগ্র্যান্টদের তিনি বিপদে ফেলবেন না কখনো।

ওদিকে ট্রাম্পের সমর্থকদের বক্তব্য, আমাদের প্রেসিডেনশিয়াল ক্যাণ্ডিডেট দুজন দু’রকম।  ট্রাম্প ক্রুড,  ক্লিন্টন আপাদমস্তক করাপ্ট। হিলারি রুদ্ধদ্বার কক্ষে বসে যে কথা বলেন, সর্বসমক্ষে প্রকাশ্যে বলেন তার চেয়ে ভিন্ন কথা! তবে - মানুষ নীতিহীন ব্যক্তির চেয়ে ট্রাম্পের মতো অমার্জিত ব্যক্তিকেই তাদের পছন্দের তালিকায় রাখতে আগ্রহী। কারণ, ‘People prefer crude over corrupt'!       

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com