এক দলিত পরিবারের ধর্ষিতা মেয়ের নির্মম কাহিনি

 

 

ধর্ষণ ও খুন হওয়া জয়ন্তী রাজবংশীর বিচার পেতে তার বাবাকে কেন পথে পথে ঘুরতে হচ্ছে? দলিত বলে? নির্মম ঘটনাটি তুলে ধরা হল - :

 

   স্বাধীনতার ৭৩ বছর পার হয়ে গেল অথচ এখনো ভারতবর্ষে ন্যায় বিচার পেতে জাতপাতের হিসেব দেখা হয়, এমন কি ধর্ষিতা নারীর ক্ষেত্রেও ন্যায় বিচার পেতে জাতপাতের অঙ্ক মেলানো হয়। কারণ, প্রশাসনিক উচ্চপদে রয়েছে তথাকথিত উচ্চবর্ণের লোক। তারা অধিকাংশই SC/ST/OBC মা-বোনের ইজ্জত, সম্মানকে বড় চোখে দেখে না --- এটাই ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থা। দিল্লির নির্ভয়া কাণ্ডে কিংবা মহারাষ্ট্রের তানিয়া কাণ্ডে সারা দেশ উত্তাল হয়ে ওঠে, বুদ্ধিজীবীরা রাস্তায় নামে, মোমবাতি জ্বালানো হয়, পত্র-পত্রিকা, ইলেকট্রনিক মিডিয়া, লেখক-লেখিকারা পাতার পর পাতা কাগজ খরচ করে --- কারন নির্ভয়া ও তানিয়া তথাকথিত উচ্চবর্ণের (ব্রাহ্মণ) মেয়ে। ফলে তাদের প্রতি সহানুভূতি ঝরে পড়ে ভদ্র সমাজের। অথচ প্রতি বছর শত শত দলিত মূলনিবাসী, বহুজন ( sc/st/obc) সমাজের নারীরা খুন-ধর্ষিতা হয়ে চলেছেন, কালে ভদ্রে দু-একজনের মৃদু প্রতিবাদ হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সমাজ থাকে নীরব, ন্যূনতম বিচারটুকু তারা পায় না, প্রশাসন যে কত নির্মম ও নির্লজ্জ হতে পারে সেটা শুধু ধর্ষিতার পরিবারই বুঝতে পারে। অসহায় বুক ফাটা কান্না আর চোখের জল ছাড়া তাদের আর কিছু উপায় থাকে না। তেমনি এক দলিত পরিবারের ধর্ষিতা মেয়ের নির্মম কাহিনী তুলে ধরা হলো ---

 

   জয়ন্তী রাজবংশী B.A. কলা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। অজগ্রামের অত্যন্ত হৃত-দরিদ্র পরিবারের সুশ্রী এই মেধাবী ছাত্রীটি দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে নিজের লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে শত বাধা বিপত্তিকে অতিক্রম করে। বাবা অনুপ রাজবংশী একজন সহায় সম্বলহীন কৃষক, জাতিতে তফসিলি। গ্রাম - কাঁদোয়া, পোঃ-বহুতালী, থানা-: সুতি, জেলা-- মুর্শিদাবাদ।। চার সন্তানের বড় ও মেধাবী হওয়ার জন্য জয়ন্তীর উপর সমস্ত আশা ভরসা ও স্বপ্ন রয়েছে মা-বাবার। জয়ন্তী জঙ্গিপুর কলেজে পড়ে। বাড়ি থেকে কলেজের দূরত্ব ২৫ কিমি। প্রতিদিন বহুতালী থেকে রঘুনাথগঞ্জ রুটে সকাল ৯টার বাসে সে কলেজে যায়। ফেরে ৪.৩০ মিনিটের বাসে। অন্যান্য দিনের মতো গত ২০/৫/১৯ তারিখে ৯টার বাসে বাড়ি থেকে কলেজে বেরয় সে। এইদিন কলেজে দ্বিতীয় বর্ষের ফর্ম ফিল আপ ছিল তার। বিকাল পাঁচটা বাজে, ছটা বাজে কিন্তু মেয়ে বাড়ি ফিরছে না দেখে দুশ্চিন্তা বাড়তে থাকে মা-বাবার। প্রথমে জয়ন্তীর কাছে ফোন করে বাবা। কিন্তু মোবাইলের সুইজ বন্ধ পায়। ফলে মা,বাবার দুশ্চিন্তা আরো বেড়ে যায়। অবশেষে তারা সমস্ত আত্মীয়ের বাড়ি ফোন করতে শুরু করে। কিন্তু কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে তারা সন্ধান না পেয়ে পরের দিন ২১/৫/২০১৯ তারিখ অনুপবাবু তার ছোট মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ভোরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান অন্যান্য আত্মীয়ের বাড়িতে খোঁজ নিতে। এরপর কয়েকটা আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়ার পর শেষে জঙ্গিপুর মহাকুমা হাসপাতালেও খোঁজ নেয় অনুপ বাবু এই ভেবে যে, মেয়ে কোনো কারণে অসুস্থ হয়ে হয়তো বা হাসপাতালে ভর্তি হতে পারে।কিন্তু হাসপাতালের সমস্ত বেডে বেডে খুঁজেও যখন মেয়েকে পায় না, তখন হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আশার সময় বাড়ি থেকে ফোন আসে যে, অজগর পাড়ার মোড়ে ফাঁকা জায়গায় রাস্তার পাশে অচৈতন্য অবস্থায় মেয়ে পড়ে আছে --তখন সকাল ১১টা। সেই মতো অনুপ বাবু ও তার ছোট মেয়ে অজগর-পাড়া মোড়ে যায় এবং গিয়ে শুনতে পায় যে, ঐ এলাকার কিছু মানুষ মেয়েকে অহিরন প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে গিয়েছে। একথা শুনে অনুপ বাবু তৎক্ষনাৎ ঐ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গিয়ে দেখে যে মেয়ে অচৈতন্য অবস্থায় বেডে পড়ে আছে। ডাক্তার বাবু তাকে বলেন যে, এখনই আপনার মেয়েকে জঙ্গিপুর হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক। তৎক্ষনাৎ অনুপ বাবু মেয়েকে জঙ্গিপুর হাসপাতালে নিয়ে গেলে জঙ্গিপুর হাসপাতালে ভর্ত্তির সময় জয়ন্তী মারা যায়।


   এরপর দেহ ময়না তদন্ত করে রাতে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। রাত বেশি হওয়ার দরুন পরের দিন অর্থাৎ ২২/৫/২০১৯ তারিখ সকালে সুতি থানায় FIR করা হয়। তিন-চারদিনের মধ্যে সুতি থানার কোনো রূপ ভূমিকা না দেখে শোকার্ত-মর্মাহত অবস্থায় জয়ন্তীর বাবা অনুপ বাবু সুতি থানায় গিয়ে খোঁজ-খবর নিলে ওসি বলেন যে, আপনার মেয়ের ঘটনাটা আমাদের এলাকায় হয়নি, রঘুনাথগঞ্জ থানা এলাকায় হয়েছে। তাই রঘুনাথগঞ্জ থানা এই কেসের তদন্তভার নেবে। একথা শুনে অনুপ বাবু ২৬/৫/২০১৯ তারিখ থানায় গিয়ে ওসির সঙ্গে দেখা করলে ওসি তাকে বলেন যে, আমাদের থানায় এখন খুব কাজের চাপ, আপনি কিছু দিন পরে আসুন।এরপর আরো কিছু দিন পরে গেলে অনুপ বাবুকে থানা থেকে ঐ একই কথা বলেন। এভাবে দেড় মাস পার হয়ে গেল কিন্তু গরিব অসহায় পিতা মেয়ের ন্যায্য বিচার পাচ্ছেন না। একদিকে মেয়ের শোক, অপর দিকে চারিদিকে তাকে ছুটে বেড়াতে হচ্ছে। ফলে মানসিক ও শারীরিকভাবে তিনি দারুন ভেঙ্গে পড়েছেন। তার উপর আবার বেশ কয়েকদিন কাজ করতে না পেরে আর্থিক অবস্থা তলানিতে ঠেকেছে।মেয়ের ময়নাতদন্তের রিপোর্ট থানায় বার বার চেয়েও না পেয়ে, অবশেষে টাকা খরচ করে কোর্ট থেকে বের করেছেন। ডাক্তার প্রাথমিক ভাবে ধর্ষণ বলে অনুমান করে ফরেন্সিক তদন্তের জন্য পাঠিয়েছেন। কিন্তু থানা থেকে কোনোরূপ ব্যবস্থা না নেওয়ার ফলে ফরেন্সিক রিপোর্ট এখনো অধরাই রয়ে গিয়েছে। 


   জয়ন্তীর পরিবার ও পাড়া-প্রতিবেশীদের সন্দেহ, কলেজ থেকে ফেরার সময় তাকে জোর করে তুলে নিয়ে সারারাত পৈশাচিক অত্যাচার করে মৃত্যপ্রায় অবস্থায় ভোর বেলা রাস্তার পাশে ফাঁকা জায়গায় ফেলে দিয়ে গিয়েছে। একজন ব্যক্তির উপর তাদের গভীর সন্দেহ রয়েছে।মাঝে মাঝেই সে মেধাবী- নিরীহ জয়ন্তীর পিছনে লাগতো। কিন্তু জয়ন্তীর জোরালো প্রতিবাদে সে পিছু হটতে বাধ্য হতো। তথাকথিত উচ্চবর্ণের এই লোকটি বকে যাওয়া বাজে ছেলে বলে পাড়ায় পরিচিত। ফলে তার প্রভাব রয়েছে যথেষ্ট। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে জয়ন্তীর প্যান্টে বীর্যের দাগ পাওয়া গিয়েছে। তাই ফরেন্সিক রিপোর্ট পাওয়া গেলে এই বীর্যের নমুনা দিয়ে অতি সহজে অপরাধীকে ধরা সম্ভব হবে। তাছাড়া জয়ন্তীর সঙ্গে থাকা যে মোবাইলটি খোঁয়া গিয়েছে, সেটির কল লিস্ট বের করে তদন্ত করলেও এটা জানা যাবে যে, ঐ সময় কে বা কারা তার সঙ্গে কথা বলেছে -- যা তদন্তের কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু এসবই প্রশাসনিক প্রহসনে পরিনত হয়েছে, যা সহায়সম্বলহীন, দিন দরিদ্র পিতার পক্ষে নীরব দর্শক হয়ে দেখা ছাড়া কিছু উপায় নেই। একজন দলিত পিতা তার মেয়ের ধর্ষন ও খুনের ন্যায্য বিচার পেতে সকলের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন কিন্তু কোনো বিচার তিনি পাচ্ছেন না। এই অসহায় পিতার মুখে এরকম মর্মান্তিক ঘটনা শুনে চোখের জল চেপে রাখতে পারিনি। তাঁকে কথা দিয়েছি --"যদি আপনার মেয়ে ন্যায্য বিচার না পায়, তাহলে গণ-আন্দোলনে পথে নামবো, থানা ঘেরাও হবে, এসডিও অফিস, ডিএম অফিস ঘেরাও হবে" -- জানিনা সঙ্গে কটা সংগঠন ও কতজন বন্ধু পাব !

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com