এনআরসি; উত্তর দেওয়ার দায় এখন সরকারের

 

 

এনআরসি নিয়ে একটি স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া অতি অবিলম্বে জরুরি হয়ে পড়েছে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে একটি বিতর্ক কে কেন্দ্র করে যে এনআরসি প্রক্রিয়া সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে চালু হয়েছিল তার তার চূড়ান্ত ঘোষণা হয়েছে। কিন্তু  পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। ফলে এনআরসির খসড়া তালিকা প্রকাশের পর আসামের যে সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পক্ষে কথা বলছিল সেই সমস্ত দল চূড়ান্ত রায় ঘোষণার পরে রাতারাতি তাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। কেন ?

 

 

আজকে আসু বা অসমে বিজেপির রাজ্য শাখা এর বিরোধিতা করছে। মনে রাখা যেতে পারে এই আসু বা আসাম বিজেপি বিদেশি প্রশ্নে  বাংলাদেশি খেদা নোর জন্য এত কাল আন্দোলন করেছে ।।আজ তারাই এনআরসি চূড়ান্ত রায় কে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। কেন?

 

 

এনআরসি নিয়ে প্রথমে ভাবা হয়েছিল যে কেবলমাত্র বাংলাদেশ থেকে আগতদের ই চিহ্নিত  করে তাদেরকে এ দেশ থেকে ফেরত পাঠানো যাবে। এমন একটি ভাবনা নিয়ে কাজটা শুরু হওয়ার পর দেখা গেল পরিস্থিতি টা বদলে যাচ্ছে। তথাকথিত  বাংলাদেশি বলে যাদের চিহ্নিত করা হচ্ছিল এবং খসড়া তালিকায় নাম ছিল তাদের মধ্যে কমপক্ষে চার লাখের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না । চূড়ান্ত তালিকায় তারা গেল কোথায়,?  ভাবা হচ্ছে এরা ভারতবর্ষে বিভিন্ন প্রান্তে হয়তো বিভিন্ন রাজ্যের জনগোষ্ঠীর মধ্যে মিশে গেছে ।এখন তাদের খুঁজে বার করতে গেলে এনআরসি করতে হয় দেশজুড়ে যার জন্য বিজেপির কোন কোন নেতাও মন্ত্রী দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এনআরসি চালু করার লক্ষ্যে দাবি জানাচ্ছেন। কিন্তু তাঁরা বুঝতে  পারছেন না, ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হয়ে যাবে। অসন্তোষের আগুনে না পুড়ে যায় গোটা দেশ।

 

 

আসলে এনআরসি কী করে তৈরি করা হবে এই ভাবনার মধ্যেই গোলমাল আছে। যতই সেটা সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তৈরি করা হোক এখন সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে  বিষয়টিকে দেখা দরকার যাতে একটি ও ভারতীয় নাগরিক তার নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত না হয়। আজ এই কথাটা বলতে হচ্ছে এই কারনে যে দীর্ঘ দিন ধরে বছরের পর বছর নানা প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যে লিস্ট তৈরি করা হলো তার মধ্যে রয়ে গেছে চূড়ান্ত অসঙ্গতি। শুধু নাম তোলার ক্ষেত্রেই নয় , যে ভিত্তিতে নাগরিকত্বের বিচার হয়েছে সেই  মানদন্ডটি প্রশ্নের মুখে।অসমের  অধিবাসী বিন্যাসের পিছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস ।স্বাধীনতার পর বা তারও আগে থেকে আসাম নানাবিধ প্রাকৃতিক সম্পদে পূর্ণ একটি রাজ্য অথচ মানুষ নেই সেখানে ব্রিটিশ আমল থেকেই সেইসব প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগানোর জন্য বিশেষত চা বাগানের শ্রমিক হিসেবে বিভিন্ন রাজ্য থেকে সেখানে মানুষ দেখে আনা হয়েছিল মানুষ এসেছিল জীবিকার কারণে হলে অর্থনৈতিক গঠনের উদ্দেশ্যে ও  আসামের পূর্ণ বিকাশের উদ্দেশ্যে একটা সময় বাঙালি বিহারী ভোজপুরি অন্যান্য বিভিন্ন রাজ্যের মানুষ কে সেখানে  ডেকে ডেকে আনা হয়। তারা যাতে এসে থাকতে পারে তার জন্য এক কথায় বলা যেতে পারে রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক ভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়।আজ আসামের ভূমিপুত্র খুঁজতে গেলে কাদের নিয়ে  বিচার হবে ? মানবিক এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কীভাবে এর বিচার করা চলছে সেটা নিয়ে ভাবা দরকার। এক সময় আসাম পুনর্গঠন এর জন্য যাদের প্রয়োজন হয়েছিল তাদের নাম আজ এই লিস্টের মধ্যে নেই কেন? এর উত্তর দেওয়ার দায় তো সরকারের।

 

 

এবার আসা যাক প্রক্রিয়াগত ত্রুটির কথায়। একই বাড়ি র একটি সন্তানের নাম আছে,আরেকটি  সন্তানের নাম নেই। এরকম বহু উদাহরণ রয়েছে। স্বামী স্ত্রী র মধ্যে একজন এদেশের অন্যজন বাংলাদেশী হতে পারে কিন্তু একটি সন্তান এদেশের অন্য সন্তানটি ভিনদেশের, এমনটা তো হতে পারে না। কিন্তু এমনটাই হয়েছে অসংখ্য। তাই এই তালিকা নিয়ে আসাম জুড়ে দিকে দিকে অসন্তোষ।অদ্ভুত কান্ড দেশের গর্ব চন্দ্রায়ন এর উপদেষ্টা নিজামীর নাম এনআরসি তালিকায় নেই। বাদ গেছে কারগিল যুদ্ধের সেনা থেকে শুরু করে প্রাক্তন বিধায়ক ।নাম বাতিল হয়েছে আরো বহু বিশিষ্টজনের। এগুলো কি জাতীয় নাগরিক পঞ্জী তৈরি করবার দক্ষতার নমুনা? আশ্চর্য লাগে ভাবতে এবং বলতে যে জাতীয় নাগরিকপঞ্জির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কে নিয়ে হাজার কোটি হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে লক্ষ লক্ষ মানুষকে যেভাবে তাদের সঙ্গে অমানবিক অবর্ণনীয় জীবনে ফেলে দেওয়া হচ্ছে শুধুমাত্র বিচার প্রক্রিয়ায় মানদণ্ডে নৈতিক ও দক্ষতার অভাবে সারা বিশ্বের ইতিহাসে অমানবিক কাজের দৃষ্টান্ত হিসেবে তা  উল্লেখযোগ্য হয়ে থাকবে। এভাবে নাগরিকপঞ্জি বানানোর পর দেখা যাচ্ছে দেশের প্রকৃত নাগরিকরাই বিপন্ন। এখন সেটা বুঝতে পারছে অসম সরকার। রাজ্য বিজেপির সংগঠনও। এমনকি আসামের অন্যান্য রাজনৈতিক সংগঠন ও আসু । তাই তাদের আহবানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসামে আসছেন। কিন্তু অমিত শাহর

সামনে রয়েছে কতগুলি কঠিন প্রশ্ন:

 

 

প্রকৃত নাগরিকপঞ্জি বানানোর মতো আদৌ কাঠামো সরকারের আছে কি?

 

 

এই নাগরিক পঞ্জি থেকে বাদ দেওয়া হল যাদের তাদের অনেকেরই নথি হারিয়েছে সরকারের হেফাজত থেকেই। মানুষ সেগুলি আর সরকারের কাছ থেকেই পাচ্ছেনা। সরকার স্বীকার করেছে তারা হারিয়েছে। এরকম  নানারকম কারণে এবং প্রাকৃতিক বিপর্যইয়ের শিকার  করা তাদের ক্ষেত্রে কি  হবে?

 

 

অমিত শাহ বারবার বলেছেন নাগরিকপঞ্জি হচ্ছে কেবলমাত্র সেই সব বাংলাদেশি মুসলমানদেরকে চিহ্নিত করার জন্য, যারা হাজার ১৯৭১ এর পর এ দেশে এসেছেন বাংলাদেশ থেকে। প্রশ্নটা এইখানে । সরকার এদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে কিন্তু ফেরত পাঠাবার জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে কোনদিন আজও কোনো সরকারি স্তরেই আজও পর্যন্ত  কোনো সরকার ই কথা বলে নি। এই এনআরসি প্রক্রিয়ার শুরু তে  মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে আর শেষে মানুষকে চরম সংকটে ফেলা হচ্ছে। এই হল এনআরসি প্রক্রিয়া শুরু ও শেষ যার মাঝখানে রয়েছে অসংখ্য ভুল এবং অমানবিক ভাবনা, ধারণা ও কর্মপদ্ধতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা নাগরিক অধিকার হরণের এ টু জেড। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে অমিত শাহ কে এই প্রশ্নগুলি উত্তর খুঁজতে হবে। তার ওপরই নির্ভর করছে আসাম ও বাঙালির ভবিষ্যৎ কারণ যে লক্ষ লক্ষ বাদ যাওয়া মানুষ তার মধ্যেও প্রায় 19 লক্ষ বাঙালি। কী হবে এই মানুষগুলোর? তারা যাবে কোথায়,? জেলখানার মতন তাদেরকে ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখা হবে নাকি শেষ পর্যন্ত তাদের নামটি নাগরিক তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেশের মধ্যে অধিকারহীন অভিবাসী ও  শ্রমিকে পরিণত করা হবে যারা শেষ পর্যন্ত  এদেশে থেকে যাবে পরবাসে  বাস করার মতোই। 

 

 

এই প্রশ্নের উপরেই নির্ভর করছে বিজেপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও। দেরিতে হলেও সেটা সর্বস্তরের বিজেপি নেতৃবৃন্দের কাছে উপলব্ধি হয়েছে। আশা করা যায়  এনআরসি নিয়ে সরকার একটি সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত আসবেন ।প্রয়োজনে নতুন আইন করবেন।  চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর সংশোধনের জন্য একশো কুড়ি দিনের সময়সীমা আছে। তার মধ্যেই সমাধানের একটা রূপালী রেখা খুঁজে নিতে হবে সরকারকে। চ্যালেঞ্জটা এখন সরকারের সামনেই।

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com