বড় একা লাগে


 

 

 

ভোরের দিকে হঠাৎই জোরে এক পশলা বৃষ্টি হওয়ায় ঘুমটা বেশ গাঢ় হয়ে উঠেছিল নিখিলেশের। আর তখনই আবারও সেই স্বপ্নটা দেখলেন। এক অচেনা তরুণীর হাত ধরে ছোট্ট নদীর তীর ছুঁয়ে ছুটতে ছুটতে সামনের অফুরন্ত সাগরের ওপর দিয়ে ভেসে চলেছেন অবাধে। মাঝখানে আর কোনো ঘটনা নেই। আর কোনো বাক্যালাপ নেই। আর কোনো দৃশ্যপাটও নেই। শুধুই সংক্ষিপ্ত সময়ের ওই ছোট্ট এক টুকরো ঘটনা ছাড়া। তিনবার স্বপ্নটা দেখার পরে তরুণীর মুখখানা চেনা হয়ে গিয়েছিল। পরিচিত জনের ভিড়ে কোনোদিন দেখেছেন বলে মনে পড়ে না। নিজেকেও দেখেছিলেন নিখিলেশ। মোটেই ষাট পেরুনো বৃদ্ধ নন। রীতিমতো ঝকঝকে। প্রাণবন্ত এক সতেজ তরুণ।

 

মানুষ জীবনে বার বার একই স্বপ্ন দেখে নাকি কখনো? দ্বিতীয়বার স্বপ্ন দেখেই প্রশ্ন জেগেছিল মনে। আর তখনই বিশেষজ্ঞদের কথা মনে পড়েছিল তার। স্বপ্নবিশেষজ্ঞরা বলেন - মানুষ একই স্বপ্ন বার বার তখনই দেখে, জীবনে যখন স্বপ্নের বিষয়টা অপূর্ণ থেকে যায়। মেডিক্যাল সায়েন্সের ব্যাখ্যায় - স্বপ্ন হচ্ছে গল্পের এমন সব ভাবমূর্তি, যা ঘুমের মধ্যে মানুষের মন অবাধে সৃষ্টি করে। কিন্তু এতকিছু ব্যাখ্যার পরেও মনোবিজ্ঞানের ডাক্তারদের জবাব হলো - মন এমন কাজ কেন করে তার উত্তর আমাদের জানা নেই। কথাটা মনে হতেই নিখিলেশ উঠে বসেছিলেন বিছানায়। ভারী বিরক্ত হয়ে উচ্চারণ করেছিলেন – এই বয়সে দাঁড়িয়ে মনের এমন সৃষ্টিকর্মের কোনো মানে হয় নাকি? নাকি স্বপ্নবিশেষজ্ঞদের এমন ব্যাখ্যারই কিছু মানে আছে ছাই!

 

কিন্তু আজ তৃতীয়বার স্বপ্ন দেখে বিরক্তির বদলে এক অচেনা ভালোলাগার পরশ নিখিলেশ অনুভব করলেন বুকের অতলে। উঠে গিয়ে জানালা খুলতেই এক ঝলক ঠাণ্ডা হাওয়া ছুটে এসে তাকে ছুঁয়ে দিলো। চোখে পড়লো, রাস্তা দিয়ে দ্রুতগতিতে সব রকম গাড়ি ছুটছে। নানা বয়সের মানুষ ছুটছে। চীৎকার করে হকার ছুটছে। ফুলওয়ালা, ফলওয়ালা সবাই ছুটছে জীবনের স্বপ্ন পূরণের প্রয়োজনে। দেখতে দেখতে তারও ভারি ইচ্ছে হলো, সদ্য দেখা স্বপ্নের মায়াজালে আপাদমস্তক জড়িয়ে অন্য সবার সঙ্গে ছুটতে ছুটতে তিনিও জীবনের প্রয়োজনের ভেতর হারিয়ে যান। হারাতে হারাতে সাধারণদের ভিড়ে মিলেমিশে তিনিও সাধারণ হয়ে ওঠেন।

আর সে রকম মনে হতেই প্রথম কিংবা দ্বিতীয়বার যেমন অর্থহীন ভেবে স্বপ্নটাকে উড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন, আজ আর সেটা সম্ভব হলো না। শিক্ষিত মানুষ নিখিলেশ বিষয়টাকে মনের ভিত্তিহীন সৃষ্টি জেনেও স্বপ্নটার জন্য কেমন এক মমত্ব অনুভব করে বড় অবাক হলেন মনে মনে।

 

নিখিলেশ জীবনে কোনোদিন প্রেমে পড়েননি। কোনো তরুণীর সঙ্গে গোপনে কখনো নিভৃত আলাপ জমেনি তার। সংসারধর্ম পালন করে ছেলেপুলে নিয়ে সুখী হবার তীব্র সাধ বা সুযোগও কোনোদিন ছিল না। শৈশবে পিতৃমাতৃহীন হয়ে মামা-মামীর কাছে কোনোভাবে দায়সারাগোছে বড় হয়েছিলেন। কেননা, তাদের নিজেদেরও চারটি পুত্র-কন্যা ছিল। তাদের ছেলেমেয়েরা বিয়ে করে সংসারে সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে দু’তিনটে কন্যার অনুসন্ধান অবশ্য মামা-মামী নিখিলেশের জন্য এনেছিলেন। কিন্তু সবটাই মুখে মুখে। জোরাজুরি করে বিয়ে দেবার গরজ সেখানে ছিল না।

 

বিয়ের কথা উত্থাপন করে মামী বরং বলেছিলেন - দেখো বাপু আমরা বলছি বলেই যে তোমায় বিয়ে করতে হবে, সে রকমটা কিন্তু ভেবো না। তোমার ইচ্ছে হলে করবে, না হলে করবে না। জগতে চিরকুমারের অভাব নেই। এসব ব্যক্তিগত বিষয় তাই জোর করে কারুর ওপর চাপিয়ে দিতে নেই! দেওয়া উচিতই নয়! তার ফল কখনো ভালো হয় না! আমাদের এতটা বয়সে সেসব দৃষ্টান্ত ঢের দেখেছি বলেই বলছি নিখিলেশ!

 

মামীর এত কথার উত্তরে নিখিলেশ সঙ্গে সঙ্গে কিছু বলতে পারেননি। মামা ফস করে জিজ্ঞেস করেছিলেন - কী রে? আমরা আর এগুবো, নাকি এখানেই থাকবে তাহলে?

 

নিখিলেশ একেবারে কিছু না ভেবে বলেছিলেন - আপাতত থাক মামা। মাত্র তো চার পাঁচ বছর হলো নতুন চাকরিতে ঢুকেছি।

 

সেই ভালো! আগের চাকরিতে টাকা যা পেতে তাতে তো আজকালকার দিনে একজনেরই পেট চালানো দায়!

 

এখানে টাকা পয়সা বরং ভালোভাবে জমিয়ে নাও, তারপরে দেখা যাবে! বিয়ে তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না! মামা নিশ্চিন্ত হয়ে মন্তব্য করেছিলেন।

 

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিখিলেশের জীবন থেকে বিয়ে সত্যিই পালিয়ে গেলো।। মামা-মামীর ছেলেমেয়েরা একে একে সংসার জীবনের বহুবিধ ব্যস্ততা দেখালো। খরচের অজুহাত দেখিয়ে তাদের জনক জননীকে তার কাঁধে নিশ্চিন্তে ছেড়ে দিয়ে বহু দূর দূরান্তে ছড়িয়ে পড়লো একসময়। দু’চার বছরে পৈতৃক বাড়িতে দু’চার দিনের জন্য ছুটিছাটায় তারা দর্শন দেয়। ভালোবাসা আর কর্তব্যের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে যায়। ঝুড়ি ঝুড়ি উপদেশ বাণী শুনিয়ে নিখিলেশকে দায়িত্ব কর্তব্য সম্বন্ধে আরও বেশি সচেতন হতে বলে। শুনতে শুনতে মামা-মামী সন্তুষ্টিতে বিগলিত হন। সন্তানদের সুশিক্ষা নিয়ে অনাবশ্যক মুখরতায় ধন্য ধন্য করেন।

 

দুজন বুড়োবুড়ির নিরন্তর সান্নিধ্যে নিখিলেশ এরপরে কখন জীবন নিয়ে স্বপ্ন দেখতে ভুলে গেলেন। ধরাবাঁধা জীবনে তার স্বপ্ন অবশ্য কোনোদিনই মনের কূল ছাপাতে পারেনি। তারপরেও ছিঁটেফোটা যতটুকু বাকী ছিল, তার সবটুকু রস নিঙড়ে নিয়েই এক স্বপ্নহীন মানুষ বানিয়ে তাকে ছেড়ে দিলেন মামা-মামী। এরপর জনক- জনকীর পরপর গত হওয়ার সংবাদে সব ভাইবোনেরাই একসঙ্গে এসে জুটেছিল। আর এসেই সব বিক্রীবাটার ব্যবস্থা করে নিখিলেশকে বলেছিল - এবার নিজের আশ্রয়ের একটা ব্যবস্থা করে নে নিখিলেশ। পুরনো বাড়িতে টাকা খরচা করে কী লাভ? তুই বরং নতুন একখানা বাড়ি দেখে...।

 

হ্যাঁ সে তো নিতেই হবে! নিখিলেশ শোকের জ্বালা সরিয়ে সংক্ষেপে বলেছিলেন।

 

তাহলে আর দেরি করিসনে। ভালো খদ্দের পাওয়া গেছে, আমরা চাইছি...! অদ্দূর থেকে বার বার আমাদের পক্ষে ছুটে আসা তো সম্ভব নয়, তাই...।

 

কিন্তু কিছুদিন সময় তো লাগবেই! টাকাকড়ির যোগাড় করতে হবে তো!

 

সে কী রে? কুড়ি বছরের ওপর চাকরি করছিস! টাকাকড়ি কিছু নেই, কী বলছিস?

 

কিছু নেই তাতো বলিনি বড়দা! সংসারে এদ্দিন খরচা ছিল! বাড়ি কিনতে গেলে...!

 

তাহলে ভাড়াটে বাড়িতেই না হয় উঠে যা!

 

সংসারের স্বার্থপর চেহারা মামা-মামী অনেক আগেই তার সমানে প্রকট করেছিলেন। এবার তাদের সন্তানেরা সেই চেহারার ভয়াবহরূপ বিকীর্ণ করে দিলো। নিখিলেশ আজীবনের আশ্রয় ছেড়ে ভাঙা মন নিয়ে একটি কম ভাড়ার বাড়িতে গিয়ে উঠলেন। মামা-মামী চলে যাওয়ার পরে ব্যাংক ব্যালান্স, নিজের একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট সবই অবশ্য জুটে গেলো ধীরে ধীরে। কিন্তু সংসারজীবনে প্রবেশের সুযোগ কোনোদিনই এলো না। নিখিলেশ পঁয়তাল্লিশ পেরিয়ে পঞ্চাশ, পঞ্চাশ পেরিয়ে কখন ষাটে এসে পড়লেন। তার নতুন বাড়িতে আতিথ্যের লোভে বন্ধুবান্ধবেরা সপরিবারে বেড়াতে আসেন। দু’চার দিনের জন্য হৈহুল্লোড় করে থেকে যান। নিখিলেশ তাদের নির্বিঘ্ন চিত্তে আতিথ্য দান করেন। কিন্তু শত সন্তুষ্টির পরেও কেউ কখনো বলেন না- অনেক তো হলো, এবার তুই বিয়ে করে সাধারণের মতো হয়ে ওঠ নিখিলেশ! একা কি আর জীবন চলে? আমরা সবাই ব্যবস্থা করি!

 

তারপর হঠাৎ একদিন কী হলো কে জানে। নিখিলেশ সত্যিই বড় নিঃসঙ্গ হয়ে গেলেন জীবনে। চাকরি থেকে অবসরের পর জীবনের আদ্যপান্ত জুড়ে বিরাট শূন্যতা ছাড়া আর কিছু রইলো না তার! ফাঁকটা ক্রমশ বড় হতে হতে কখন গ্রাস করলো তাকে। শূন্যতা থেকে আরও বড় শূন্যতার জন্ম হতে হতে কখন মনে স্বপ্নবীজ রোপিত হলো, জানেন না নিখিলেশ। এটাও জানেন না শূন্যতার ফাঁক ফুঁড়ে স্বপ্ন সৃষ্টির যে মানসিকতা যাকে স্বপ্নবিজ্ঞানীরা ইনিয়ে বিনিয়ে নানাভাবে ব্যাখ্যা করেন, সেটাই সত্যিকারের ব্যাখ্যা কিনা! অন্তত তার ক্ষেত্রে যে নয়, সেটাই তার বিশ্বাস করেন। তারপরও জানালা থেকে ফিরে এসে একলা ঘরে একা বসে মনে মনে তিনি লজ্জিত হয়েই বললেন - কিন্তু তাই বলে এমন স্বপ্ন কেউ দেখে নাকি এই বয়সে? আমি তো এর জন্য সত্যিই কখনো কাঙাল হইনি!

তাহলে মন কেন করবে এমন কাঙালপনার কাজ?

 

নিঃসঙ্গ একঘেঁয়ে জীবন যেমন করে কাটছিল তেমনি করে আরও অনেকগুলো দিন কেটে গেলো নিখলেশের।

 

কিন্তু অবাক ব্যাপার হলো সেই দুর্বোধ্য স্বপ্নটা এরপরে অনুরাগ সত্ত্বেও আর কোনোদিনও দেখেননি নিখিলেশ। অবাধ্য মন কাজহীন মুহূর্তে কতবার নাড়াচাড়া করে দেখেছে তাকে। কতবার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করতে চেয়েছে স্বপ্নের গূঢ় অর্থের তাৎপর্য্টুকু। কিন্তু সেই অচেনা তরুণীর হাত ধরে তরুণ নিখিলেশ নদীর তীর ছুঁয়ে ছুটতে ছুটতে সাগরের অন্তহীন শূন্যতায় আর কক্ষনো অবাধে উড়ে যেতে পারেননি। আর কক্ষনো তার কামনার ডানায় ডানায় রোমান্সের শিহরণ ওঠেনি। অথচ নিখিলশের জীবনে এইটুকুইতো প্রেম! এইটুকুই তার সংসার জীবনের রোমাঞ্চকর মুহূর্ত। সম্ভবত সে জন্য অজান্তেই তিনি তরুণীর নাম ধরেও ডাকতে শুরু করেছিলেন। নাম দিয়েছিলেন, ‘অনন্যা’।

 

আজ সারাদিন বড় অসহ্য গরম ছিল। হঠাৎ কোথা থেকে সন্ধ্যার পরে নীরব বাতাস মৃদু নিঃশ্বাসের মতো বইতে শুরু করলো ধীরে ধীরে। স্বস্তি পেয়ে বারান্দার কোণে রাখা চেয়ারে এসে বসলেন নিখিলেশ। স্বপ্নটাও যেন হঠাৎই আঁচল ছড়িয়ে শিহরণ তুললো শরৎ মেঘের মতো। তার স্পর্শে বড় খেঁদে তার মনে হলো - সত্যি, কী অর্থহীন জীবনই না কেটে গেলো এতকাল! একটি আস্ত মানবজীবন কত নিষ্ফলভাবেই না চলে গেলো!

 

এরপর জীবনের এত বছর পরে প্রৌঢ়ত্বের শেষ সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে একটি অবিশ্বাস্য কাজ তিনি করে বসলেন। নিস্তব্ধ অন্ধকারে বসে থেকে জেগে জেগেই স্বপ্নটাকে নতুন করে দেখতে আরম্ভ করলেন নিখিলেশ। তরুণীর হাত ধরে তরুণ নিখিলেশ ছুটতে ছুটতে ভেসে গেলেন কূলহীন সাগরের অন্তহীন পরপারে। তার দু’চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো উদ্বেল অশ্রুর উষ্ণ ধারা। অস্ফুটে বললেন - তোমাকে আমি জানি না অনন্যা! তবুও বলছি, আজ থেকে দুজনে রোজ এভাবেই ভেসে যাবো পথহীন পথ ধরে! তুমি থাকবে তো পাশে? নইলে যে বড় অর্থহীন মনে হবে নিঃসঙ্গ জীবনটাকে! যে নিঃসঙ্গতায় বড় যন্ত্রনা লাগে! বেশি একা লাগে আমার!

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com