পুওর ইকোনমিকস: ভাবনায় রিচ, কাজের ক্ষেত্রে এখন সেটাই পুওর

 

 

এই বছরের অর্থনীতিতে নোবেল কমিটি পুরস্কার দিলেন দারিদ্র নিয়ে গবেষণা য়। যদিও এখনো কেউ মনে করে না এই পুরস্কারটির পিছনে লগ্নিপুঁজির লম্বা হাত আছে, তবুও একটা কথা পরিষ্কার , যাঁরা নোবেল পাচ্ছেন  তাঁদের গবেষণায় দারিদ্র দূরীকরণে অনেক কিছু বলা হচ্ছে। কিন্তু দারিদ্র্য থেকেই যাচ্ছে। তাহলে সমস্যাটা কোথায়?

 

  এবারের নোবেল পুরস্কার খানিকটা সেই দিকে তাকিয়েই! যেখান থেকে দারিদ্র দূরীকরণ কর্মসূচি গুলো শুরু হয় এবং শেষ হয় অনেকখানি অনিশ্চয়তা নিয়ে, বইটির মূল উপজীব্য ক্ষেত্র সেইখানে ই। দারিদ্র্য দূরীকরণের ক্ষেত্রে একটি নতুন অ্যাপ্রচ এর কথা

 

   ভাবা হয়েছে । অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ও এস্থার দুফ্লো   দুজনে মিলে ভেবে সেটা প্রকাশ করেছেন"  পুওর ইকোনমিক্স ' বই টিতে। বলা যেতে পারে এইভাবে আগে কেউ ভাবেনি তাই এ বইটি দারিদ্র্য দূরীকরণের নতুন পথ দেখাচ্ছে।

 

   আমার কিন্তু মনে হয়নি সেই কথা। আমার মনে হয়েছে, বইটিকে পুরস্কার দিয়ে নোবেল কমিটি বলতে চেয়েছেন দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য বরাদ্দ অর্থকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা হোক, নইলে দরিদ্র মানুষ যে তিমিরে ছিল সেখানেই থেকে যাবে। অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তার সহযোগী গবেষকের মৌলিক জায়গাটা এইখানেই।

 

   তারা দুজনেই বিশ্বের নানা প্রান্তে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষদের মধ্যে গবেষণা করে দেখেছেন যে হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও তারা তার সুফল পাচ্ছে না। কেন পাচ্ছে না? কারণ রাষ্ট্র নিজে, মধ্যবর্তী সহযোগী সংগঠনগুলোর বানিজ্যিক উদ্দেশ্য এবং অবশ্যই সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব। অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়রা চেষ্টা করেছেন প্রকৃত দরিদ্রদের কাছে সরকারি সুবিধা যাতে পৌঁছায় তার পথ খুঁজতে। কিন্তু এর মধ্যেও আছে একটি প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত। প্রাইভেট স্কুল কলেজ, রাষ্ট্রায়ত্ত পরিষেবার ক্ষেত্র কিংবা সরকারি উদ্যোগ যেখান থেকে শুরু হয়েছে তাতেও ব্যাপক পরিবর্তন আনা প্রয়োজন, নইলে দারিদ্র মুক্তি সম্ভব নয়।

 

   দারিদ্রতা কোথায় তাহলে?

 

   বলা যেতে পারে একটি  man is poor, because he is poor in thinking

 

   কিভাবে?

 

   গরীব মানুষ গরিব কারণ সে ভাবতে পারে না সঠিকভাবে তাঁর জীবন সম্পর্কে।সে ভুল তার ভিশনে। টাকা থাকুক না থাকুক পুজোর আগে বিগ বিলিয়ন আমাজন সেল দিলে দরকার হলে অন্যের  ক্রেডিট কার্ড ইউজ করে বা ধার করে কিছু না কিছু তো কিনতেই  হবে, অফারে সবচাইতে ভালো নতুন জেনারেশনের মোবাইল ফোন, হাল ফ্যাশনের ড্রেস, জুতো, ইয়ার ফোন, খুব ভালো।পারলে বাড়ির পর্দা বদল হবে।কিন্তু তারপর অসুখ হলে? তখন ক্রেডিট কার্ড থেকে বন্ধুর কাছে হাত পেতে টাকা নিতে হবে। নইলে অন্য কোথাও লোন। সঞ্চয় করে নিজের জীবনকে একটি শক্তিশালী মাটির উপর দাঁড়ানোর ভাবনাটাই সেখানে নেই। জীবন মানে তো এটা নয়। অথচ ভাবা হচ্ছে জীবন ত দুদিন, তাই যেভাবে পারো এনজয় করো। এর বাইরে কিছু না।

 

   আধুনিক মধ্যবিত্তের এই ভাবনাই যে তাকে গরীব করে দিচ্ছে নতুন করে,গরিব তারা হচ্ছে শুধু বাড়িতে কেউ হসপিটালে এক মাস থাকলেই।সমীক্ষা জানাচ্ছে, দেশের একটি বড় অংশের মানুষ শুধু চিকিৎসা ভারে গরিব হতে বাধ্য হচ্ছে। তাই শুধুমাত্র দিনে 100 টাকা রোজগার করতে পারে না  যারা এই বই তাদের কথা বলে না।

 

   আসলে গরিব পরিবারের লোকেরাই  যে গরিব, তা তো নয়। প্রতিদিন অর্থনীতির ওঠা নামায় মধ্যবিত্ত শ্রেণী  ভেতরে ভেতরে

 

   দুর্বল থেকে দুর্বলতর হচ্ছে,।lআমজনতার সঞ্চয়ের হার কমে যাওয়ায় দেশের মূলধন গঠন কমে যাচ্ছে । কি করে তাহলে দেশটা চলবে??  এইটুকু বোঝার জন্য বিশেষ পাণ্ডিত্য লাগেনা।  দেশের সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে জনসাধারণের কাছে তুলে ধরা হয় এক  একটা সার্বিক উন্নয়নের ভাবনা। অথচ এরই সঙ্গেএকটা বোধ থাকা দরকার যে সকলের ভালো করতে  দরকার একটা নিরপেক্ষ প্রশাসন নইলে ব্যক্তি সমাজ ও রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে যায়। সেটা না হলে দারিদ্র্য নীট অর্থে কমে না।

 

   অভিজিৎ ব্যানার্জি এবং আস্থার ডুফ্ল এই নিট দারিদ্র কমা বাড়ার ওপর  কাজটা করেছেন। তাদের কথায়,কোটি কোটি ডলার খরচ করছে বিভিন্ন সরকার ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী এন জি ও, কেউ তাদের বেশিরভাগ কাজই হয় একটা ধারণার ভিত্তিতে। অপরীক্ষিত সাধারণ ভাবনাচিন্তার ভিত্তিতে যেভাবে দারিদ্র্য দূরীকরণের কাজ চলছে তাতে ক্ষতিটাই বেশি হচ্ছে। অর্থাৎ দারিদ্র্য দূরীকরণের টাকাগুলো চলে যাচ্ছে হয় কারুর কারুর বা কোন কোন গোষ্ঠীর কাছে অথবা শুধুমাত্র অপচয় হচ্ছে। উন্নয়নশীল অর্থনীতির এই ধারায় বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে যেভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হয় তার জন্য প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক নমুনা বিশ্লেষণ ।সেই কাজ করার জন্য উনারা দুজনে মিলে গড়ে তোলেন পোভার্টি অ্যাকশন ল্যাব যাতে নিখুঁতভাবে প্রতিটি প্রকল্পের বাস্তবানুগ মূল্যায়ন হয় এবং সঠিকভাবে কতজন মানুষ কি কারনে কিভাবে উপকৃত হলেন কিংবা হলেন না সেটা জানা যায়। Poor economics হলো এমনই একটা বই যেই প্রশ্ন তুলছে যে একটি গরিব মানুষ কেন মেডিকেল না করে কিস্তিতে টিভি কিনবে?কেন সেই সচেতনতা তার মধ্যে তৈরি করতে পারছে না সমাজ ও রাষ্ট্র কেন গরিব মানুষকে বাজার অর্থনীতি শিকার হতে দিচ্ছে? এই বই প্রশ্ন তুলছে গরিব মানুষের ছেলে মেয়েরা যারা বিনামূল্যে স্কুলে পড়ছে তারা শিখছে না কেন কিছু? তাহলে এই খরচ করে স্কুল চালানোর কারণ কি? আর না শেখার পেছনে বা কারণ কি? কেন কেন গরিব মানুষ মনে করে যে অনেক অনেক বেশি বাচ্চা হলে তাদের জন্য সেটা খুব ভালো, তাতে অনেক আয় করবার সুযোগ তৈরি হয়। কেন গরিবরা গরিব? কেন সমস্ত ইচ্ছে এবং ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তাদেরকে অন্য একটা জীবন যাপন করতে হয়? অভিজিত বাবু এবং তার স্ত্রীর এই যৌথ গবেষণা র বেশিরভাগটাই হয়েছে ভারতে এবং পৃথিবীর অন্য দারিদ্র্যপীড়িত দেশগুলির বিভিন্ন অঞ্চলে। হলে মাটির তথ্য কে তারা বিশ্লেষণ করেছেন মৌলিক গবেষণার আধারে। এবং তারা যে কথাগুলি বইটিতে লিখেছেন সেটা হলো, দারিদ্র্যের উৎসমুখ খুঁজে সেখানে প্রতিকারের জন্য মানুষকে সচেতন করে তুলতে হবে  যাতে তারা রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন অংশের দারিদ্র দূরীকরণ কর্মসূচিতে এগিয়ে আসায় তৈরি হওয়া সাপোর্ট সিস্টেম কে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে। খুব চাঁছাছোলা ভাবে তারা লেখে ন, গরিব দেশ গুলি সম্পদ সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়েছে বলা হয়। তারা অদক্ষ বলে শুধুমাত্র গরিব তা নয়..." many of these failures have less to do with some grand conspiracy of the elites to maintain their hold on the economy and more to do with some avoidable flaw in in the detailed design of of policies and the ubiquitous three: ignorance, ideology and inertia."

 

   কিন্তু অভিজিত বাবু ও তাঁর সহ গবেষক স্ত্রী ভুলে যান যে দরিদ্র মানুষ দারিদ্রতা থেকে মুক্তি পায় না শুধুমাত্র রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে। এদেশের যত টাকা পুঁজিপতিদের কর ছাড় দিতে ব্যবহৃত হয় তার সামান্য অংশ দিয়ে গরীব কৃষকদের স্বনির্ভর করে তোলা যায়। রাজনীতি হয় গরিব কে গরিব লোক করে রাখার জন্যই। তাদের আর্থিক দুর্বলতা, অজ্ঞতা ও অসহায়তা না থাকলে রাজনৈতিক মহল ক্ষমতা দখলের রাজনীতি তে তাদেরকে ব্যবহার করতে পারবে না। তাই ভোট করবার জন্য দারিদ্র দূরীকরণে নামে যা বলা হবে ক্ষমতায় আসার পর সেটা করা হবে না। সুকৌশলে এই উন্নয়নশীল অর্থনীতিবিদরা দারিদ্র দূরীকরণের নামে পাজা পাজা গবেষণা লিখে বর্তমান ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে উন্নতির সুরাহা খোঁজেন, কিন্তু ব্যবস্থার মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের কথা বলেন না। অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ও এস্থার দুফ্ল  তার ব্যতিক্রম নন। তাই বেমালুম লেখেন," the good news if that is right expression is that it is possible to improve governance and policy without changing the existing social and political structures"(p.271)। এখানে বোঝেন না তা না।আসলে ফোর্ড ফাউন্ডেশনের টাকায় চাকরি করে থেকে বেশি সত্য কথা লেখা যায় না। নোবেল পুরস্কার হোক কিংবা যে পুরস্কারই হোক সত্যের চাইতে বড় আর কিছু নয়। 2011 সালে প্রকাশিত একটি অর্থনীতির বই,যে বই লেখা হয়েছে তার থেকে 15 বছর আগেকার সময়ের মধ্যবর্তী অভিজ্ঞতা নিয়ে, সেই বই আজকে বিশ্বায়ন পরবর্তী সময়ে দারিদ্র মুক্তিতে কতটা সহায়ক তথ্য বা পরামর্শ দিতে পারবে তা নিয়ে  প্রশ্ন তোলার  অবকাশ আছে। তার বাস্তবিক কারণ কি হলো এই যে তথ্য এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এনারা যে সিদ্ধান্ত গুলিতে উপনীত হয়েছেন, গত 8 বছরে তার আমূল পরিবর্তন হয়ে গেছে ভারতে কেনিয়াতে দক্ষিণ এশীয় দেশ গুলিতে এবং দারিদ্র্য মুক্তির কাজের পদ্ধতিতে। একটা ছোট্ট কথা বলি লেখা টি শেষ করছি, অভিজিৎ বাবুরা যখন কাজটি শুরু করেছিলেন এবং বইটি লেখা শেষ করেন তখন কিছু মানুষ রাষ্ট্রীয়  সুবিধা ও সুযোগ পাওয়ার জন্য অন্তত গরিব হলে লাভ হবে নিজেদের গরিব বলে পরিচয় দিতে চাইত, তাই অনেক বড় লোকের পরিবার এস টি এস সি স্টাইপেন্ড বা সস্তার মান্থলি ও খাবার নিতে রাজনৈতিক নেতাদের বাড়িতে ছুটতো। আর এখন? বস্তিতে বস্তিতে ফ্ল্যাট টিভি, ফ্রিজ, বিউটি প্রোডাক্ট!! হাল ফ্যাশন!! জন্মদিন পালন!! তারা তাদের ইচ্ছে ও ক্ষমতা মতো এগুলিকরেন। কখনো যদি তাদেরকে গরিব বলে কিছু দিতে চান, তারা উল্টে চোখে চোখ রেখে বলবে, কি আপনি  অপমান করছেন? এই হলো শহুরে গরিবের পরিস্থিতি। আর গ্রামে? চাষ করতে চাইছেনা গরিব রাও! মাঠে কাজ করার লোক পাওয়া যায় না!! অন্য জীবিকায় চলে যাচ্ছে!! তাই প্রত্যেকেই নিজেকে মধ্যবিত্ত বলেই ভাবছে!! বিশ্বায়ন পরবর্তী এই সময়ে সকলেই ফোরজি স্মার্টফোন প্রজন্ম হতে চায়, স্মার্টফোন থাকুক বা না থাকুক। এই গরিবানা এখন অন্য ভাবনায়। চিন্তায়। আত্মপ্রকাশে। পারা না পারার ক্ষমতার বিন্যাসে। গরিব মানুষ এখন বুঝে গেছে, তাদের জীবন চালানোর জন্য রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি অনেকই আছে, কিন্তু তাদের জীবন তাদের মত। এমন পরিস্থিতিতে এই বইয়ের কথাগুলি দারিদ্র মুক্তির ক্ষেত্রে কতখানি সঠিকভাবে কাজ করা যাবে তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন থাকছেই। তবু বলব, নতুনভাবে ভাবতে চেয়েছেন অভিজিৎবাবু ও স্থান ঢুকলো। তাই সাধুবাদ তারা পেতেই পারেন। নোবেল পুরস্কারের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক না রাখলেও চলতে পারে।

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com