ঋকবেদের ‘নিঋতি’-ই আমাদের মহাকালী

 

 

দীপাবলী বা দেওয়ালি যে নামেই ডাক না কেন, বাঙালির কাছে সেটি কালীপুজো। মহাকালের শক্তিরূপিনী কালী বা মহাকালীর আরাধনার উৎসব। সেদিন দীপের আলোয় উদ্ভাসিত হয় ঘরগেরস্তি। বাঙালি বলে দীপাবলি, হিন্দীভাষীরা বলেন দেওয়ালি। সেই রাতে নাকি জুয়া খেলে ফতুর হয়ে যেতে হয়। ‘দিওয়ালা হো যাতা হ্যায়’ বলেই নাকি দেওয়ালি। বাঙালি মনন জুয়া খেলে না, কালীকে নিয়ে গান বাঁধে, কার্তিকের অমানিশায় আলোর সন্ধান দেয়। বাঙালি একদিন আগে থেকেই সন্ধ্যায় আলোকমালায় সাজায় ঘরদুয়ার। এটি তাদের কাছে আলোর উৎসব। দীপালিকা। “ঘরে ঘরে ডাক পাঠালো, দীপালিকায় জ্বালাও আলো, জ্বালাও আলো, আপন আলো, সাজাও আলোয় ধরিত্রীরে।”

 

দীপাবলিই হোক আর দেওয়ালি, যে নামেই ডাকুন, আজ কালীপুজো। কারও কারও মতে অবশ্য লক্ষ্মীপুজো। ভুত চতুর্দশীর দিন অলক্ষ্মীকে বিদায় করে লক্ষ্মীর পুজো। যাই বলুন, ওই মা লক্ষ্মীই মা কালী, আর মা কালীই মা লক্ষ্মী। প্লিজ, এই নিয়ে আপত্তি করবেন না। বরং, যদি না জেনে থাকেন, তবে জেনে নিন, এই কার্তিকের অমাবস্যায় কালীঘাটের মন্দিরে কালীর পুজো হয় না, হয় মহালক্ষ্মীর পুজো। তারাপীঠেও লক্ষ্মীরই পুজো হয়। আরও জানুন, অকালীপুরে মহারাজ নন্দকুমার প্রতিষ্ঠিত গুহ্যকালীর মন্দিরের মূল পুজো হয় আশ্বিনের পূর্ণিমায়, যেদিন আমার আপনার ঘরে লক্ষ্মীপুজো। তাহলেই বুঝুন, মা লক্ষ্মী আর কালী আসলে একজনই। এই রূপে লক্ষ্মী, তো আরেকরূপে কালী।

 

 

 

এই রূপের বিভায় রূপান্তরী মহাকালীকে বলা হয় মহাকালের ঘরণী। মহাকাল অর্থে শিব, শিবজায়া মহাকালী। মহাকালী প্রাগার্য সময় থেকেই নগ্না। শ্মশানচারিণী, সশস্ত্র, নগ্নিকা। বাংলায় নানা দেবদেবীর মধ্যে এই দেবীর জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি। প্রাগার্য এবং আদিবাসী অর্থাৎ ‘অনার্যা’। প্রসঙ্গত, তাঁকে অনার্য আর আদিবাসী বললে কেউ কেউ হয়তো আপত্তি জানাবেন। বলে রাখা ভাল, আমি এক বিশিষ্ট সাহিত্যিকের মতো অপশব্দ অর্থে আদিবাসী বলছিনি। বলছি, নানা পুরাণে ও আধ্যাত্মের গ্রন্থের উৎস সন্ধান করেই। কোনও আর্য-উন্নাসিকতার প্রকাশ ঘটানো উদ্দেশ্য নয়। আদিবাসীদের আরাধ্যা দেবী কালী কিভাবে উচ্চবর্ণের ও ব্রাহ্মণ্যবাদীদের দেবী হলেন, সে অন্য বিষয়। এই নিয়ে নানা মুনির নানা মত। তবে, প্রাগার্য সাহিত্য থেকে বৌদ্ধ যুগ ও আর্য-পরবর্তী সাহিত্যে তাঁর উল্লেখ পাওয়া যায়।

 

ভারতীয় সভ্যতার আদিগ্রন্থ বলে ধরে নেওয়া হয় ঋকবেদকে। ঋকে কালী নেই, দুর্গাও নেই। আছেন একমাত্র সরস্বতী দেবী। বাকিদের কেউ মাতৃকা, কেউ স্বাধ্বী ইত্যাদি। তেমনই এক ‘ঘোর’ ‘কৃষ্ণবর্ণা’ ‘পাশহস্তা’ মাতৃকা আছেন, যার নাম নিঋতি। একেই কালীর আদিরূপ বলে গণ্য করা হয়। ভারতীয় জ্যোতিষবিদ্যায় নিঋতির সঙ্গে কেতুর সম্পর্ক রয়েছে। কালী ও ধূমাবতীর সঙ্গে তাঁর ভীষণ সাযুজ্য। এই নিঋতি মাতৃকার নামেই কিন্তু দশদিকের মধ্যে নৈঋত বা দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের নামকরণ। বজ্রযানী বৌদ্ধদের মতে, দেবীর আরেক নাম ‘নৈরাত্মা’। তৈতেরেয় ব্রাহ্মণ-এও দেবী ‘পাশহস্তা’। আবার ঋকবেদেই এখানে অগ্নির সাত-সাতটি জিহ্বা। তার একটির নাম কালী --লেলিহান, করালী, কালী হল অগ্নিজিহ্বাদের একেক নাম।

 

 

 

রামায়ণে এই দেবীর নাম কোকামুখা। বাঙলায় কোকামুখার একমাত্র মূর্তিটি পাওয়া গিয়েছে বগুড়ার মহাস্থানগড়ে। কোকা অর্থে নেকড়ে, হায়না জাতীয় প্রাণি। তার মত মুখ, অর্থাৎ করালদংস্ট্রা ভয়ঙ্কর মুখব্যদানের রূপ। মহাভারতের পরিশিষ্ট ‘হরিবংশ’-তে পাহাড়ের কন্দরে, জঙ্গলে, গুহায় বিচরণকারী পত্রবসনহীন কৃষ্ণবর্ণা এক দেবী আছেন। বর্ণনা অনুযায়ী, দেবী থাকেন পাহাড়ের গুহায়, জঙ্গলে। তাঁর চারপাশে ঘিরে থাকে হিংস্র শ্বাপদেরা। বজ্রপাত ও প্রবল ঝড়ের মধ্যে ঘন্টাধ্বনীতে শবর, পুলিন্দ, কিরাত ও তষ্করেরা তাঁর পুজো করেন। তিনি মহাদেবী ‘বিন্ধ্যবাসিনী’।

 

এই বিন্ধ্যবাসিনী দেবী অনার্যা আদিবাসী শবরদের পূজিতা নগ্নশবরী দেবী। তিনি শুধু কৃষ্ণবর্ণাই নন, মুখব্যদানকারী, নগ্নিকা। মহাকালীর রূপের সঙ্গেই একমাত্র তার রূপ মেলে। যে নামেই ডাকুন, গোলাপ যেমন গোলাপই, তেমনই নগ্নশবরী বা কালীদাসের ‘অপর্ণা’-ই মহাকালী। পর্ণ অর্থে পাতা। অপর্ণা অর্থে পাতার পোশাকহীন দেবী, যিনি পরে পর্ণশবরদের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হলে হয়ে যান পর্ণশবরী এবং ‘সর্বশবরানাং ভগবতী’। সেই শবরদেবীই মহাকালী।

 

বজ্রযানী বৌদ্ধদের মতে, মূল পাঁচ ‘জ্ঞানীবুদ্ধ’-র অন্যতম অক্ষোভ্যর স্ত্রী-সন্ততিদের প্রায় সকলেই ঘোর নীল অথবা কৃষ্ণবর্ণ। তাদের গায়ে হাড়ের পোষাক ও গয়না, গলায় মুণ্ডমালা, শরীরে শোভা পায় সাপ, বাঘছাল। ধারণ করে থাকেন নানা অস্ত্রশস্ত্র, করালদংষ্ট্রা, ত্রিনয়ন -- এই সবই অক্ষোভ্য-র বংশধরদের বিশেষত্ব। এরা প্রায় সবাই শবদেহের উপর দাঁড়িয়ে বা বসে থাকেন। এই মতে প্রধান পাঁচ দেবী হলেন মহাচিনতারা, জাঙ্গুলী, একজটা, বসুধারা ও বজ্রচর্চিকা বা পর্ণশবরী। এদের মধ্যে চতুর্ভূজা, শবাসনা অস্ত্রধারী একজটা এবং বজ্রচর্চিকার সঙ্গে কালীর অনেক মিল। একজটার রূপ ভয়ঙ্করী নয়, অনেকটা পরবর্তীকালে শাড়ি পরিহিতা ভদ্রকালীর মত। আর বজ্রচর্চিকার শরীর অস্থিময়, গলায় মুণ্ডমালা, ছয় হাতে খড়্গ-চক্র-বজ্রাদি নিয়ে শবদেহের উপর নৃত্যরতা। বজ্রযানীদের নৈরাত্মা ছাড়াও আছেন ধ্বজাগ্রকেয়ুরা, জ্ঞানডাকিনী, বজ্রবিদারণী দেবীরা-- সবাই ভীষণদর্শনা, শবাসনা, বহুহাতে অস্ত্রশস্ত্রধারী।

 

পুরাণ মতে কি বলছে? প্রায় সব পুরাণেই কালী হলেন ভয়াল ভয়ঙ্করী ও শ্মশানবাসিনী, ভুত-পিশাচ পরিবৃতা। ভারি অদ্ভূত! কালিকাপুরাণের দেবী উগ্রচণ্ডী, কাজলের মতন কালো, হাতে গদা ও সুরাপুর্ণ পাত্র, গলায় মুণ্ডমালা। কিন্তু তিনি ১৮টি হাতের অধিশ্বরী--- অষ্টাদশভুজা, সিংহবাহিনী এবং মহিষাসুরের নিয়ন্তা।আমরা তো ১০ হাতে এনাকেই চিনি ‘দুর্গা’ বলে! ১৮ হাত হলে তাঁকে বলি ‘পাতালভৈরবী’!

 

বামনপুরাণ, স্কন্দপুরাণেও তিনি চামুণ্ডা-- কোটরাগত চোখ, মাংসহীন মুখ, অস্থিসার, উর্দ্ধকেশ, ক্ষীণকটি, পীনপয়োধরা, ব্যাঘ্রচর্মপরিহিতা, নানা শানিত অস্ত্রে শোভিতা হয়ে শ্বারুঢ়া। বৃহদ্ধর্ম্মপুরাণে অবশ্য মহাকালী অতটা ভয়ঙ্করী নন। পীনোন্নত-পয়োধরা, বিবস্ত্রা ও মুক্তকেশী দেবী শিবের সাধনা করতে করতে কৃষ্ণবর্ণা হয়েছেন। শিবকে অগ্রাহ্য করে যৌবনমদমত্তা দেবী বিশাল দেহ নিয়ে পাহাড় কাঁপিয়ে পদ্মলোচনা হয়েছিলেন।

 

 

 

ষষ্ঠ শতকের গমদাপুরাণ ও অগ্নিপুরাণে কালী কৃশকায়া, ক্ষুধার্ত, লোলজিহ্বা, অট্টহাস্যকারী, নৃমুণ্ডমালিনী, নৃত্যরতা উন্মাদিনী। ভাগবৎপুরাণে নররক্তে তৃপ্তা দেবী কালী যুদ্ধ এবং সন্তান প্রজননের দেবী৷ নানা পুরাণে তিনি নানা নামে অভিহিতা - কৌশিকি, কাত্যায়নী, বিন্ধ্যবাসিনী, রক্তদন্তিকা, শতাব্দী, শাকম্ভরী, ভীমা, ভ্রামরী। তাঁর হাতে নিহত অসুরদের তালিকাও দীর্ঘ। সেখানে আছে বেত্রাসুর, কলিঙ্গ দৈত্য, অন্ধকাসুর, শুম্ভ-নিশুম্ভ, রক্তবীজ এবং আরও অনেকের নাম। কেবল মহিষাসুরকে তিনি চামুণ্ডা দুর্গা রূপে বিনাশ করেছেন।

 

সপ্তম শতকে ভবভূতির ’কাদম্বরী’ মতে ‘দেবী শবরদের দ্বারা গভীর জঙ্গলে পূজিতা’৷ ভবভূতিরই ‘মালতীমাধব’ নাটকে কালী হলেন শ্মশানবাসিনী চামুণ্ডা৷ তিনি পিশাচ-পরিবৃতা, নৃমুণ্ডমালাধারিণী৷ তার লজ্জাস্থান গোপন করেছে সর্পমণ্ডলী। অষ্টম শতকের বাকপতির ‘গৌড়বাহ’-তে ইনি শক্তি ও যুদ্ধের দেবী ‘সর্বশবরানাং ভগবতী’ ও ‘বিন্ধ্যবাসিনী’। সোমশেখরের লেখা একাদশ-দ্বাদশ শতকের ‘যশতিলক’-এ দেবীর ব্যাখ্যাত রূপ বলে দেয় যে, তিনি মহাকালীই এবং আরও বেশি ভয়ঙ্করী। আর, ‘মনসরা শিল্পশাস্ত্র’ বলছে, শ্মশান বা সংলগ্ন চণ্ডালপল্লীর কাছাকাছি এলাকাই মহাকালীর মন্দির গড়ার জন্য প্রশস্ত স্থান।

 

বাঙালির সবচেয়ে প্রিয় দেবী ‘অসুরদলনী’ দুর্গা হলেও, পুরাণ বলছে, চণ্ড-মুণ্ড বধে, শুম্ভ-নিশুম্ভ দমনে, রক্তবীজ নিধনে দুর্গাকেও বার বার কালীরই শরণাপন্ন হতে হয়েছে৷ চণ্ড-মুণ্ডর অতর্কিত আক্রমণে বিব্রত দুর্গা রাগে কৃষ্ণবর্ণা হলে তাঁর ত্রিনয়ন থেকে এক “তমসাবর্ণ ব্যাঘ্রাম্বর-পরিহিতা নৃমুণ্ডমালাধারিণী দেবী” আবির্ভূতা হন। তিনিই কালিকা৷ আবার দুর্গার আহ্বানে মহাকালী ছিন্নমস্তা রূপে রক্তবীজবধ করে তার রক্ত পান করছেন, যাতে ফের আরও রক্তবীজের জন্ম না হয়। লিঙ্গপুরাণ বলছে, নারী ছাড়া কেউ দারুকা রাক্ষসকে বধ করতে পারবে না বলে মহাদেব দারুকাবধের ভার দিলেন স্ত্রীকে। শিবজায়া তখন শিবের কণ্ঠস্হ গরল পান করে কৃষ্ণবর্ণা অর্থাৎ কালী হয়ে দারুকাকে বধ করেছেন।

 

ঋকের সেই নিঋতিই যে আজকের কালী, এমনটাই গবেষকদের ধারণা।

(চিত্র পরিচিতি -

১) নিঋতি

২) জাঙ্গুলটারা

৩) একজটা

৪) পর্ণশবরী (বৌদ্ধ)

৫) পর্ণশবরী (প্রাচীন ভারত)

 

 

 

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com