ভাইফোঁটা না যমের পুজো?

 

 

যমের বোন যমী চেয়েছিল ভাই তার গর্ভে সন্তান দিক। যম তা প্রত্যাখ্যান করে প্রথম মরণশীল মানুষ থেকে দেবতা হলেন, যমী রইলেন উপেক্ষিতা। সমাজে শ্লীলতার এক নতুন চেতনা এল। বোনেরা তাই পালন করেন ভাইফোটায়…

 

ঋকবেদের যম-যমী সংবাদ-এ বলা হয়েছে, যমী বার বার নানা ভাবে যমকে বোঝাতে চাইছেন তার কামার্ত শরীরের কথা, তার অভিলাষের কথা। তিনি এক পুরুষ ও এক নারীর স্বাভাবিক সম্পর্কের উদাহরণ দিচ্ছেন। কখনও মনে করিয়েছেন যে, যম বীর, যমী এক নারী হিসাবে তার কাছে আর্তি নিয়ে এসেছেন। বীর এর ধর্ম তা রক্ষা করা। এ-কথাও বলছেন, “সে কিসের ভ্রাতা, যদি সে থাকতেও ভগিনী অনাথা? সে কিসের ভগিনী যদি সেই ভগিনী সত্ত্বেও ভ্রাতার দুঃখ দূর না হয়? আমি আভিলাষে মূর্চ্ছিতা হয়ে এত করে বলছি, তোমার শরীরের সঙ্গে আমার শরীর মিলতে দাও।“ কিন্তু শেষ পর্যন্ত যম নিজের অবস্থানেই রইলেন। অন্য কাউকে পতি হিসাবে নির্বাচন করে নিতে বলেন। এই কারণেই যমের এই নিজেকে ধরে রাখার গুঙ্কে বলা হল ‘সংযম’। পুরান মতে, এই সংযমের কারণেই যমকে দেবত্ব দেওয়া হল। কিন্তু, দেবী হলেন না কামার্ত যমুনা, বলরামের হলের টানে নদী হয়ে গেলেন। ঋকবেদের মত নৃসিংহপুরাণেও যম-যমীর কাহিনী আছে। ব্যসদেব এই কাহিনী শোনাচ্ছেন ‘পুণ্য পাপহরা কথা’ হিসাবে।

 

অথচ, সেই সময়ে দাঁড়িয়ে যমীর যুক্তি খুব অপ্রাসঙ্গিক ছিল না। আদি যুগে ভাই-বোনের বিবাহ প্রচলিত ও সিদ্ধ। ঊভয়ের যুক্তির দ্বন্দ্বে স্পষ্ট হয়েছে তা হল, সৃষ্টির শুরুতে আদিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে রক্তের সম্পর্কে যুক্ত মানুষদের মধ্যে দেহমিলন প্রচলিত ছিল। মাতা-পুত্র, পিতা-কন্যা, ভাই-বোনের মধ্যে গম্যতা ছিল। কারণ, ‘পরিবার’ এই বিষয়টির অস্তিত্বই ছিল না। সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে শ্লীল-অশ্লীলতার চেতনাপুষ্ট হয়ে নানা সামাজিক বিধি-নিষেধের নিগড়ে তৈরী হল শৃঙ্খলাবদ্ধ সমাজ। মুক্ত সমাজের জৈবিক প্রয়োজনে ভাইয়ের প্রতি বোনের যৌনাকাঙ্খা শৃঙ্খলাবদ্ধ সমাজে ‘নিষিদ্ধ’ গণ্য হল। যম হলেন দেবতা, যমী পড়লেন পিছনের সারিতে।

 

বাংলার সমাজ, ভাই-বোনের অগম্যতার সম্পর্ককে চিরস্থায়ী করার তাগিদ থেকেই কার্তিকের কৃষ্ণ পক্ষে ভাইফোটার সময় বোনের হাত দিয়ে যমের দুয়ারে কাঁটা দেওয়ার রীতি চালু করে। ছড়া বাঁধা হয়—

‘দ্বিতীয়াতে (কোনও কোনও ক্ষেত্রে ‘প্রথমাতে) দিয়া ফোটা

তৃতীয়াতে (কোনও কোনও ক্ষেত্রে ‘দ্বিতীয়াতে’) দিয়া নিতা

বোন বলে ভাই আমার

যমদুয়ারে পড়ল কাঁটা

যমুনা দেয় যমকে ফোটা

আমি দেই আমার ভাইকে ফোঁটা।।‘

 

একদিকে ভাইয়ের দীর্ঘায়ু কামনা, আন্যদিকে সম্পর্কের পবিত্রতার ঘোষণাই এসেছে এই ছড়ায়। এমনই আরেকটি ছড়ায় যমকে কার্যত চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বলে হয়েছে –

“ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা

যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা

ফোঁটা যেন নড়ে না,

ভাই যেন মরে না।”

 

 

 

আজ ভ্রাতৃদ্বিতীয়া অর্থাৎ, সেই যমপুজোর দিন। অবিভক্ত বাংলার গ্রামে গ্রামে এই দিনেই ঘটা করেই যম পুজো হয়, পালিত হয় নানা যমপুকুর ব্রত। লোকসাহিত্যে তার বহু উদাহরণ আছে। গোটা কার্তিক মাসেই মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত নানা পুজোপার্বন হয়। এই মাসেই হয় কালীপুজো, যাকে প্রেত, নরক, শ্মশান-সংহারের দেবী হিসাবে কল্পনা করা হয়েছে। কালীপুজোর আগের রাতটিকে বলা হয়েছে ‘ভূত চতুর্দশী’র রাত। এই মাসে প্রয়াতদের পথ চলার সুবিধার্থে ছাদে ‘আকাশবাতি’ দেওয়ার রেওয়াজ আছে। অনেক বাড়িতে এই সময় ‘অলক্ষ্মী’ বিদায় করে কালীপুজোর রাতে লক্ষ্মীর পুজো হয়। এই ভাবনাও আসলে ভুত-প্রেত জাতীয় ‘অলক্ষ্মী’ বিদায়ের রীতি, খানিকটা তন্ত্র-জাদুর দ্বারা প্রভাবিত।

 

কালীপুজোর পর দিন থেকেই গ্রাম বাংলায় শুরু হয় ‘যমপুকুর ব্রত’। বিহারে ও হিন্দীভাষী এলাকায়  ভ্রাতৃদ্বিতীয়ার চার দিন পর পালিত হয় ছট পুজো। ‘ছট’ এর অর্থ ষট বা ছয়, পুজো হয় ষষ্ঠী তিথিতে। অস্তমিত সূর্যকে দেখে ছটের ব্রত পালন শুরু করেন ব্রতীরা, উদীয়মান সূর্যকে প্রণাম করে ব্রত ভাঙ্গেন। আর, সূর্যের পুত্রই যম। সাধারণত গ্রাম বাংলার কুমারীরা এই ব্রত করেন।

 

গবেষিকা রীতা ঘোষ জানিয়েছেন, বাড়ির উঠোনে এক হাত পরিমান চৌকো পুকুর কেটে বা চিত্র এঁকে তার চারদিকে চারটি ঘাট বানিয়ে, দক্ষিণ দিকে যমকে বসিয়ে ব্রত পালিত হয়। যমের সঙ্গে থাকেন যমরানি এবং যমের মাসী। অন্য ঘাটগুলিতে (উত্তরে) থাকেন জেলে-জেলেনী, (পুর্বে) ধোপা-ধোপানী, শাকওয়ালা-ওয়ালী, পশ্চিমে কাক, বক, হাঙ্গর ও কচ্ছপ। নানা জীবজন্তু রেখে ‘বৈতরণী’ পার করার মত কঠিন কাজের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। পুকুরে রাখা হয় বা আঁকা হয় কলমি, হিংচে, কচু, ও হলুদ গাছের চারা। তারপর পুকুরে জল ঢেলে ব্রত শেষ করার আগে মন্ত্র বা ছড়া পড়া হয় --

“শুষনি-কলমি ল-ল করে

রাজার ব্যাটা পক্ষী মারে

মারণ পক্ষী শুকায় বিল,

সোনার কৌটা রূপার খিল

খিল খুলতে লাগলো ছড়

আমার বাপ-ভাই হোক লক্ষেশ্বর।“

 

-- পরের বার “শুষনি-কলমি ল-ল করে’’-র বদলে বলা হয় “কালো কচু, সাদা কচু”। বাপ-ভাই কে লক্ষেশ্বর করার কামনা করার পর শেষে বলেন – “লক্ষ লক্ষ দিলে বর/ ধনে পুত্রে বাড়ুক ঘর।“ অর্থাৎ, কেবল ধনী করাই নয়, যমের কাছে সন্তান-সন্ততিও কামনা করেন তারা। আর এখানেই যম কেবল মৃত্যুর দেবতা না থেকে হয়ে যান জীবনের দেবতা – যিনি না চাইলে কারও মৃত্যু হবে না।

 

ভবিষ্যপুরাণ মতে, মৃত্যুভয় দূর করতে স্বয়ং যমরাজই নাকি এই ব্রত পালনের কথাবলেছেন। সর্বদা পতিপরায়না রানি চন্দ্ররেখাদেবীকে মৃত্যুর পর যমদূতেরা যমের সামনে হাজির করলে তিনি ভীতা হন। কিন্তু যমরাজ তার প্রতি প্রসন্নছিলেন, তাই বর দিতে চাইলেন। চন্দ্ররেখাদেবী মৃত্যুভয় দূর করার উপায় বর হিসাবে চাইলে যমই নাকি ‘যমপুকুর ব্রত’-র পরামর্শ দেন। রীতা ঘোষ জানিয়েছেন, এই ব্রত আসলে পৌরাণিক বুধাষ্টমী ব্রতের হুবহু নকল।

 

যম আবার খুব পপুলার তিব্বতে।যমপুকুর ব্রতের আরও নানা কাহিনী আছে লোকমানসে। আদিবাসীদের মধ্যেও যমকে নিয়ে নানা কাহিনী আছে। এর প্রতিটিই দারুন সুন্দর, আকর্ষণীয়ও। অন্য কোনও আলোচনার অবসরে ফের এই নিয়ে গল্প বলা যাবে।

 

 

 

 

 

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com