ভবেশের  শোক

 


 

গণেশ দুয়ারির চল্লিশ বছরের ছেলে ভবেশ দুয়ারি। ভারি সাদাসিধে মানুষ। সবাই জানে, জীবনের বড়
ভাব, জটিল বিষয় কোনোকালেই তার ভাবনায় ঠাঁই পায় না। সংসারে বুড়ো বাপ, চার ছেলেমেয়ে, স্ত্রী
তরণী আর সে। ভবেশ অবস্থাসম্পন্ন কৃষক নয়। মাত্রই দু’ তিন বিঘে পৈতৃক সম্পত্তি আর গোয়ালের তিন
চারটে গরুই সারা বছরের অন্নের সংস্থান। সংসারে নিত্য অভাব। মুখরা বউয়ের চিৎকার হৈহুল্লোড়। তাতে
অবশ্য তার সাদাসরল জীবন উত্তেজনায় কোনোদিনও উতরোল হয়নি। কিন্তু কাল সন্ধের পরে হাট থেকে
সে ঘরে ফিরলো একেবারেই অন্যরকম চেহারা নিয়ে। গাঁয়ের মানুষ তো বটেই, এমনকি তরণীও এমন
চেহারার সঙ্গে পরিচিত ছিল না।
তাই রাতেই বিরাট শোরগোল তুলে তরণী পাড়াসুদ্ধ লোককে নিজের বাড়িতে টেনে এনেছিল। পড়শিরা বড়
অবাক হয়েছিল ভবেশের চেহারাছবি দেখে। তার হাবভাব, আচরণ বড় অচেনা হয়ে গেছে। একদিনেই সম্পূর্ণ
বোবা হয়ে গেছে মানুষটা। তবে সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছিল, তার শোকস্তব্ধ মূর্তি দেখে। ভবেশ চুপচাপ
বারান্দায় বসেছিল একখানা জরাজীর্ণ ধুতি ধড়াচেূড়োর মতো পাকিয়ে গলায় ঝুলিয়ে রেখে। যেমন বাপমায়ের
মৃত্যু হলে শাস্ত্র মেনে মানুষ পরে। কয়েকদিনের না কামানো গোঁফদাড়ি ছেঁটে ফেলা ঘাসের মতো সারা মুখে
তখন ছোট কাঁটার ঝোপ তুলেছে। চোখের দৃষ্টি রক্তজবার মতো লাল।
পড়শিদের দেখেই খ্যানখ্যানে গলা উচুঁ করেছিল তরণী -
এই দেখো শরৎ জ্যেঠা, ওর ভাবখান একবার দেখো সবাই! ওর কি বাপ মরেছে যে গলায় অমন শোকের
ধড়াচূড়ো পরে বসে আছে? কাঁহাতক এসব ভড়ং মানষের সহ্যি হয় বলো দিকি? এত করে বলছি সারাদিন
কিছু খাওয়া হয়নি, এবার দুটি মুখে দাও! তো কে কার কথা শোনে! এই ঢঙ ধরে, মুখে কুলুপ এঁটে সেই
সন্ধে থেকে বসে রয়েছে!
তরণীর অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলো। ভবেশ পড়শিদের একটি প্রশ্নেরও উত্তর না দিয়ে এবং কারুর দিকেই
না তাকিয়ে শূন্য দৃষ্টি মেলে বসে রইলো নিঃশব্দে। সব বুঝেসুঝে তরণী কাঁদতে শুরু করলো ঝরঝরিয়ে-
হে ভগমান, এবার আমার কী হবে গো! কেন মানুষটা হঠাৎ এমুন ধারা হয়ে গেলো? আমার কোন শত্তুরে
এমুন দশা করলো তার!
এ গাঁয়ে শরৎ মণ্ডল সবচাইতে বয়োবৃদ্ধ। বুদ্ধিতেও যথেষ্ট অগ্রগামী। গাঁয়ের মানুষ এ যুগেও তাই তার কথা
মান্যি করে। তরণীর কান্না থামাতে শরৎ মণ্ডল বললো-
এভাবে কেঁদে কী হবে তরণী! ব্যাপারখান আমারে আগে বুঝতি দে ভালো করে! তুই তো বলছিস, নক্কীরে
হাটে বেচে দিয়ে বাড়ি ফিরার পরে এই দশা হয়েছে! আমি ভাবছি, নক্কীর জন্যে ওর মন এমুন উতলা হয়
নাই তো? কে জানে, ও হয়তো শাস্তরের নিয়ম আচার পালন করার জন্যেই...!
কিসের শাস্তর শরৎ জ্যেঠা? হাটে গরু বেচার কাজ কি সে নতুন কিছু করছে? আমি তো ভাবছি মাথাখান
ঠিক আছে, নাকি কোনো বিকার ব্যামোতে ধরেছে?
না রে তরণী, ব্যামো নয়! পরাণে শোকের ঢল না নামলে মানুষ কি আর এসব অমনি অমনি পরে? এর
আগে এমুন কখনো দেখেছিস?

কিন্তু নক্কীর ওপর অত দরদ কার কবে ছিল জ্যেঠা? এই সংসারে এসে ইস্তক দেখছি, নক্কীর থেকে গোয়ালে
যত গরু হয়েছে, তাদের বেচেই রোজকার সংসার চলছে! নক্কী বড় বুড়ো হয়েছিল, তাই তারে বেচে দিতে
হলো। তাহলে?
কিন্তু সংসারের সব মানুষই কি আর চেরকাল একই ধারার থাকে মা? নেত্য দেখা মানুষও হঠাৎ চোখের
সামনে পাল্টে যায়! ভালো মানুষ মন্দ হয়! মন্দ মানুষও ভালো হয় কখনো!
শরৎ জ্যেঠা যাই বলুক, তরণীর বিশ্বাস হয়নি শোকের আবেগে ভবেশ দুয়ারি স্তব্ধ হয়ে গেছে। স্বামীর দশায়
প্রথমটায় সে ভড়কে গিয়েছিল। তাই চেঁচিয়ে, কেঁদে-কেটে লোক জড়ো করেছিল বাড়িতে। তারপর ভবেশের
জেদ যত বেড়েছিল, চোখের দৃষ্টি যত প্রখর হয়েছিল, তরণী ততোই কঠোর হয়েছিল তার ওপরে। অনেক
রাতে ঠেলেঠুলে কোনোমতে তাকে ঘরে ঢুকিয়ে দিতে দিতে জ্বলে উঠেছিল বারুদ হয়ে। বুকের আগুনে তখন
সে শ্বশুরকেও পুড়িয়ে মারতে ছাড়েনি -
দেখো বুড়ো, কী কুলাঙ্গার সন্তানের জম্ম দিয়েছিলে, দেখো একবার! রাত্তির নিশুতি হলো! গাঁয়ের সব মানুষ
বিছানায় শুয়ে সুখের ঘুম ঘুমুচ্ছে! আর তোমার ছেলে? শ্মশানের মরা হয়ে সেই সন্ধে থেকে এক ঠাঁই পড়ে
আছে!
খবদ্দার তরণী, ওসব অলুক্ষণে কথা এক্কেবারে বলবিনে বলে দিচ্ছি! ভালো হবে না! গণেশ দুয়ারি সঙ্গে সঙ্গে
তেড়েফুঁড়ে উঠেছিল।
আহা দরদ কত! যেমন বাপ, তার তেমনি ছেলে! সংসার চালানোর মুরোদ নেই, তায় শোকের ভড়ং ধরে
বোবা সাজা হয়েছে! তোমাদের চালাকি আমি বুঝি না ভেবেছো? দাঁড়িয়ে দেখছো কী? ঠেলেঠুলে ঘরে নিতি
পারছো না?
সাধ্যি থাকলে তোরে আর মিনতি করি!
কবে কোন সাধ্যি ছিল তোমার? অমন লম্বা বাঁশের মতো ঠ্যাঙা শাউড়ি ছিল আমার, তারেও কোনোদিন
ভালো একখান কাপড় দিতে পারো নাই! এমনই খেটো কাপড়, যে তার গোড়ালিও কোনোদিন ঢাকা পড়ে
নাই তাতে!
না পড়ুক! তবু সংসারে তখন সুখশান্তি ছিল! বাপ-ছেলেতে মিলে ভালো ছিলাম! আর এখন তো সারাক্ষণই
তোর কাকের রা রা চিৎকার! শুনলেই দুই কান ঝালাফালা করে! আজ যদি ভবার ভালোমন্দ একটা কিছু
হয়ে যায় তরণী, তাহলে তোরে কিন্তু ছেড়ে কথা কইবো না!
সে আর তুমি কবে কয়েছো পাজি বুড়ো!
পরের দিন দুপুরবেলা পুকুরঘাট থেকে স্নান করে ভিজে কাপড়ে ঘরে ফিরলো তরণী। রোজকার অভ্যাসমতো
জলের বালতি উঠোনে নামিয়ে ভারি চুলের গোছা গামছায় জড়িয়ে উঁচু করে খোঁপা বাঁধলো। তারপর ঘরে
ঢুকে ভিজে জামাকাপড় ছেড়ে বালতির জলে ধুতে ধুতে আড়চোখে বারান্দার দিকে তাকালো একবার। ভবেশ
তখনো এক ঠাঁই বসেছিল। তার গলায় আগের মতোই ধড়াচূড়ো। এমনভাবে বসে রয়েছে, যেন শরীর জুড়ে
অনুশোচনা আর স্তব্ধ শোকের ঢল নামছে। অসহ্য মনে হলেও গাঁয়ের বৃদ্ধ মানুষ শরৎ মণ্ডলের কথা শুনেই
তরণী সকাল থেকে সংযত হয়ে ছিল। কিন্তু এবার ধৈর্য ভাঙলো ভবেশের নির্জীব, শোকগ্রস্ত, তলহীন চেহারা
দেখে।
ভিজে কাপড় উঠোনের দড়িতে আছড়ে ফেলে দাঁতে দাঁত ঘষলো সে -
বলি, শোকের ভড়ং কাটতে আর কদ্দিন লাগবে? ঘরে চাল, ডাল, তেল, নুন বাড়ন্ত, সে খবর জানা নাই?
এবার কি মানষের দুয়ারে ভিক্কে করতি বেরুবো নাকি?
উত্তর না পেয়ে রাগে অভিমানে উঠোন ছেড়ে সে একলাফে উঠে এলো বারান্দায়। ভবেশের গায়ে বড় একটা

ধাক্কা মেরে বললো -
শোকতাপে বুলি না হয় ফুটছে না মুখে! কিন্তু ওই সঙ্গে কানের ছ্যাঁদাও কি বন্ধ হয়েছে নাকি? শুনতি
পাচ্ছো না কথাগুলোন?
ঠিক সেই মুহূর্তেই বাড়ি ঢুকেছিল গণেশ দুয়ারি। তরণীর হাঁকডাক লাফলাফি তার চোখের সামনেই ঘটছিল
একের পরে এক। ছেলের আচরণে সেও বিস্মিত। তবে তরণীর মতো বুকের তলায় বারুদের আগুন নয়,
দুশ্চিন্তার দরিয়া ছুটছিল কাল সন্ধে থেকে। সারা রাত ঘুম হয়নি। ভোর রাতে বেরিয়েছিল মনের গুমোট
ঘোচাতে। শেষে মাঠে-ঘাটে সমস্ত সকালটা ঘুরেফিরে শরৎ মণ্ডলের বাড়ি গিয়েছিল আশ্বস্ত হতে। বুদ্ধিমান
হলেও শরৎ মণ্ডল গণেশ দুয়ারিকে সান্ত্বনার বাক্য শোনাতে পারেনি। সে তো আর ডাক্তার বৈদ্য নয়। কী
করে আশ্বস্ত করবে আকুল পিতার অন্তরকে? গণেশ দুয়ারির বুকখানা তাই চারপাশের বৃষ্টিহীন মাঠের মতোই
কাঠ হচ্ছিলো জ্বলেপুড়ে।
তরণীর রুদ্রমূর্তি দেখে সেও চেঁচালো জোরে জোরে -
খবদ্দার তরণী, বেশি বাড়াবাড়ি করবি তো তোর কুলোপনা চক্কর ভেঙ্গে ফেলবো রাক্ষুসি! সরে যা ওর
সামনে থেকে! সরে যা বলছি! কাল থেকে অনেক সয়েছি! বলেই সে উঠোন থেকে একখানা বাঁশ তুলে
নিয়ে ছুটে এলো পুত্রবধূর দিকে।
তরণীও উত্তরে বিষধর সাপের মতো লাফিয়ে নামলো বারান্দা থেকে।
আজ অবধি শ্বশুর কোনোদিনই পুত্রবধূকে তোয়াক্কা করে চলেনি। তরণী যদি সামনে এসে দাঁড়ায় তো, সেও
সোজা হয়ে চোখ পাকিয়ে চায়। কিছু সময় পরে চিৎকার, হৈহুল্লোড়ে পড়শিদের ভিড় জমে ওঠে। তারপর
সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে আসে। তরণী সংসারের নিত্যকাজে ব্যস্ত হয়। শ্বশুর আপন মনে মাঠের কাজে যায়।
যাবার আগে ছেলেকে অভ্যাসমতো পুরনো কথাটা মনে করিয়ে দিতে ছাড়ে না -
তুই অমন ধারার বলেই বউয়ের এত কুলোপনা চক্কর ভবা! ব্যাটাচ্ছেলে যদি হয়ে থাকিস তো মেরে একদিন
ওর হাড় গুঁড়িয়ে দে! দেখবি, চেরকাল নলের মতো সোজা হয়ে থাকবে!
তরণী উত্তরে ফোঁস করে ওঠে -
খবদ্দার পাজি বুড়ো! ছেলেরে কোনো বদ উপদেশ দিয়ো না বলছি! নারী নিয্যাতনের মামলা করে উঠোনে
ঘুঘু চড়িয়ে ছাড়বো!
চড়ালে চড়াবি! আমি কি তাতে ডরাই নাকি? পারলে তোরে খুণ করে বাপব্যাটাতে মিলেই না হয় ফাঁসির
কাঠে ঝুলবো! তবু তোর চক্কর একদিন ভাঙবোই ভাঙবো, দেখে নিস!
ভবেশের নির্জীব পরিস্থিতি তরণীকে রাগে অভিমানে সারাক্ষণ উথালপাথাল করে দিচ্ছিল। বিষজর্জর সাপিনীর
মতো বারান্দা থেকে ছুটে এসেই জলসুদ্ধ বালতিখানা সে বাগিয়ে ধরলো হাতে -
বুকে সাহস থাকে তো আয় বুড়ো! আজ ভূতের সাথে তার বাপেরও ছেরাদ্দ করে ছাড়বো! সংসারের নেত্য
অশান্তি আর সহ্যি করা যায় না! ছেলের ভূত আর আর তোর ভূত একসঙ্গে যদি না ছাড়াই তো আমার
নামও তরণী নয়!
দুজনের রণমূর্তি খুব কাছাকাছি দেখেই ভবেশ দুয়ারির চেতনা ফিরলো কিনা কে জানে। সে হঠাৎই সবেগে
উঠে দাঁড়িয়ে চোখের নিমেষে বারান্দা থেকে লাফিয়ে নামলো। তারপর গোঁ গোঁ শব্দে শ্বশুর-পুত্রবধূর চোখের
সামনে মূর্ছিত হয়ে পড়লো। তরণী নিষ্পলক হয়ে দেখলো, সাদাসিধে ভালো মানুষটার মুখ থেকে গ্যাঁজলার
মতো ফেনা গড়িয়ে পড়ছে।

দুদিন বাদে চেতনা ফিরলো ভবেশের। শরৎ মণ্ডল কানের কাছে নরম গলায় বললো -
কী হয়েছে বাপ? নক্কীর জন্যে মন কেমুন করছে?
ভবেশ সাড়া দিলো। তবে বাক্যে নয়। চোখের জলে। তার চোখের কোল বেয়ে অবিশ্রাম অশ্রুর ধারা
গড়িয়ে পড়তে লাগলো।
শরৎ জ্যেঠা বললো -
বুঝেছি বাপ! তোর বুকের ব্যথাখান জ্যেঠার মনেও লেগেছে যে! আমি তাই সব বুঝেছি!
এরপর বহু সময় পরে ভবেশ কথা বললো কান্নাজড়িত ভাঙা গলায় -
নক্কীরে যে আমি চোখের সামনে খুণ হতে দেখেছি শরৎ জ্যেঠা! সে বড় মিনতি করেছিল, শুনি নাই! মুখ
দিয়ে ফেনা ঝরেছিল, যখন ঝালু কসাই তারে কিনে নিয়েই...! আঃ আঃ আঃ!
মাঝখানে দুটো বছর পেরিয়ে গেছে। ভবেশ দুয়ারি আর কখনো গোয়ালের গরু বিক্রি করেনি। তার গোয়াল
এখন লক্ষ্মীর সন্তানসন্ততিতে পরিপূর্ণ। তরণী মাঝে মাঝেই অভিমানে ফোঁস করে ওঠে -
আচ্ছা, নক্কীরে না হয় ঝালু কসাই কেটেছিল। কিন্তু সবাই কি আর তাই করে? তাহলে কেন গোয়ালের গরু
তুমি বিকরি করতি চাচ্ছো না?
ভবেশ অকারণেই চেঁচিয়ে ওঠে এ সময় -
কেন এসব কথা বলছিস তরণী? আমাদের কি আর আগের মতো অভাব আছে? মুদিখানা চালিয়ে সংসার
তো দিব্যি চলছে! বাপব্যাটায় মিলে মাঠে খাটছি! তাহলে?
সে না হয় চলছে! টাকা রোজগারের বুদ্ধি যে তোমার হয়েছে তাতে আমি অনেক খুশি! কিন্তু এসব গরু
গোয়ালে রেখে লাভ কি হচ্ছে বলতি পারো?
লাভ লোকসানের হিসেব সবার একরকম থাকে তরণী? গরু নিয়ে কক্ষনো কথা বলবিনে তুই! আমার বাপ,
তুই, আমি সংসারে থেকে একদিন যেমন মরবো, ওরাও সেভাবেই মরবে! তোদের মতো ওরাও সংসারেরই
একজন! বাড়াবাড়ি করবি তো ফের সেই দশা হবে!
তরণী এই ইঙ্গিতের মানে বোঝে। পূর্বস্মৃতি মনে আজও ক্ষুরধার। স্বামীর বিরুদ্ধে এ বিষয়ে তীব্র মতবিরোধ
তাই তৈরি করতে চায় না। তার মেজাজও এখন অনেকখানি পরিণত। সংসারে নিত্য অভাব ঘুচে যাওয়ায়
মন আগের চেয়ে প্রশান্ত। শ্বশুর-পুত্রবধূর রোজকার ঝগড়াযুদ্ধ তাই নেই। তবে এককালের সাদাসিধে ভালো
মানুষ ভবেশ দুয়ারির রূপান্তর নিয়ে মন্তব্য করতে গাঁয়ের অনেকেই আজকাল ছাড়ে না। সেদিন সদন মোহন্ত
তার গোয়ালে এসেছিল বেচাকেনার দরদাম করতে। মাঠ থেকে ফিরে বিকেলবেলা খেয়েদেয়ে ভবেশ যাচ্ছিলো
মুদিখানার দিকে। চোখে পড়তেই অচল হয়ে গিয়েছিল পা জোড়া।
কড়া গলায় জিজ্ঞেস করেছিল -
কী চাই?
তোমার বড় বকনা বাছুরটারে বেচবে নাকি ভবেশদা?
না!
ভালো দাম পাবে!
কে কিনবে? তুমি?
না গো! আমার সাধ্যি কী! ওই রাঙাহাটির দলিল কসাই....!
ভবেশ মাঝপথেই উত্তেজিত হয়েছিল -
অন্যের জন্য দালালি করতে লজ্জা করে না? জানো না, ভবেশ দুয়ারির গোয়ালের দিকে কেউ কখনো হাত
বাড়ালে ...!

তুমি কি পাগল হয়েছো নাকি গো? মানুষ গোয়ালের গরুছাগল আজীবন পুষে রাখে, এমুন আজব কথা তো
কোনোদিন শুনি নাই!
না শুনলে এখন শুনে নাও! যাও! এখানে কোনোরকম বিকরিবাটা হবে না!
সদন মোহন্ত হাতের নাগালের বাইরে গিয়ে পরিহাসভরে চেঁচিয়েছিল -
লোকে ঠিক কথাই বলে ভবেশদা! তুমি আগে ছিলে বোকা গাধা! আর এখন হয়েছো পাগলা ভবা!
ভবেশ অবশ্য এই পরিহাসে রাগ করে না। তার ঠোঁটের কোণে বরং প্রশান্তির নরম হাসি ফোটে। ফিরে এসে
গোয়ালে গিয়ে দাঁড়ায়। অন্তরের আকুতিতে সংসারের সদস্যদের গায়ে মাথায় আদরের হাত বুলিয়ে দেয়।
চোখের কোলে অশ্রু জমে। অবেগে অস্ফুট কোমল গলায় বলে -
ভয় নেই রে! আমি বেঁচে থাকতে ভয় নেই! কেউ হাত ছোঁয়াবে না তোদের গায়ে!
তারপর বেরিয়ে এসে দোকানের দিকে দ্রুত পা চালায়। নিজের মনেই বলে ওঠে -
এককালে তোরে আমি কসাইয়ের হাতে তুলে দিয়েছিলাম নক্কী! মনে ভয় ছিল সেই অভিশাপে বুঝি জীবনখান
ছারখার হয়ে যাবে! কিন্তু তুই যে আমারে আশিব্বাদ করেছিলি! তাইতেই তো বোকা থেকে পাগল হতে
পারলাম! আর পাগল বলেই বেঁচে গেলাম! নইলে তরণী কি আজ আর আমারে ছেড়ে দিতো?

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com