আধুনিকতার স্বরূপ

 

 

সব থেকে সংগঠিত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক আগ্রাসনের নাম আধুনিকতা।  দেশে দেশে অঞ্চলে অঞ্চলে যে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র‍্য, তাকে ধ্বংস করে সারা পৃথিবীকে ইউরোপের ছাঁচে গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছিল শিল্পবিপ্লবের আগে থেকেই, বিশ্বায়নে তা আরও বেড়ে গেছে। রেনেসাঁসের গর্বে দাম্ভিক ইউরোপিয়ানরা আধুনিকতার দোহাই দিয়ে উত্তর, দক্ষিণ আমেরিকা, ওশিয়ানিয়ায় নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়েছে, আফ্রিকায় মানুষকে ক্রীতদাস বানিয়ে সমুদ্র পেরিয়ে বিক্রি করেছে অন্য দেশে, সারা দুনিয়ায় সাম্রাজ্য তৈরি করে প্রকৃতিকে লুঠ করেছে নির্বিচারে। এখনও সেই লুঠ চালাচ্ছে কর্পোরেটরা, আধুনিক জাতিরাষ্ট্রগুলোর মদতে। 

 

আধুনিকতা পৃথিবীকে উপহার দিয়েছে পুঁজিবাদ, ফ্যাসিবাদ, বিশ্বযুদ্ধ, আণবিক বোমা আর পরিবেশ দূষণ। বিশ্ব পুঁজির নিয়ন্ত্রকরা নিজেদের স্বার্থে তালিবান বানিয়েছে, আল-কায়দা, ইসলামিক স্টেট বানিয়েছে, হিন্দুরাষ্ট্রের আগ্রাসনে অর্থ জুগিয়েছে৷ আধুনিকতাই জন্ম দিয়েছে হিটলার, ইদি আমিন, স্ট্যালিনের মতো একনায়কদের। 

 

আধুনিক বিজ্ঞান সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের অন্যতম হাতিয়ার। আমরা দেখেছি, পুঁজিপতিরা কীভাবে বিজ্ঞানকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করছে, কীভাবে রাষ্ট্রশক্তি বিজ্ঞানের সাহায্যে নিজের ক্ষমতা নিরংকুশ করছে। উন্নয়নের নামে মানুষকে উচ্ছেদ করেছে, প্রকৃতিকে ধ্বংস করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত রাশিয়া, গণপ্রজাতন্ত্রী চিন, সৌদি আরব, ভারত, বাংলাদেশ -- সব রাষ্ট্রই। 

 

ইতিহাস সাক্ষী আছে, আধুনিক রাষ্ট্র যেভাবে প্রযুক্তির সাহায্যে জনগণের ওপর নজরদারি চালায়, প্রাগাধুনিক সমাজে তা ছিল না। এমনকি, আমাদের দক্ষিণ এশিয়ায়, রাজশক্তি গ্রামীণ সমাজে হস্তক্ষেপ করতে খুব বেশি সাহস পেত না, আদিবাসীরাও নিজেদের মতো থাকতেন। প্রকৃতি-পরিবেশ তখন বিষাক্ত হয়ে যায়নি, রোগ-বালাই ছিল অনেক কম। চিকিৎসাব্যবস্থা তখন পণ্য ছিল না --- প্রাগাধুনিক চিকিৎসা সবার কাছেই সহজলভ্য ছিল৷ সেই চিকিৎসার সাহায্যেই মানুষ ছিল অনেক সুস্থ, বলশালী ও প্রাণবন্ত। নৃতত্ত্ববিদরা দেখিয়েছেন, বিভিন্ন আদিবাদী সমাজে ওঝা বা পুরোহিতরা এমন সব ভেষজ ওষুধ জানেন, আধুনিক চিকিৎসকদের কাছে যা অজানা। ধর্মবিশ্বাসে নামে অনেক নিপীড়ন হয়েছে, অত্যাচার হয়েছে হাজার হাজার বছর ধরে, আবার ধর্মের মধ্যেই তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ উঠে এসেছে। অন্যদিকে, মাত্র কয়েকশো বছরে উন্নয়নের নামে যেভাবে ধ্বংস করা হয়েছে প্রকৃতিকে, যেভাবে মানুষের কারণে গোটা পৃথিবী মৃত্যুর মুখে এসে দাঁড়িয়েছে, এরকম সংকট আধুনিকতার আগে কেউ দেখেনি।  

 

মানব সমাজে আদিকাল থেকেই রয়েছে অনেক রকম বিশ্বাস। আধুনিক বিজ্ঞান দিয়ে সেগুলোকে ব্যাখ্যা করা যাবে না। প্রয়োজনও নেই। সবাইকে যে একই ধাঁচে চিন্তা করতে হবে,  ইউরোপের বাইরে এই মৌলবাদ আধুনিকতার আগে শাখা প্রশাখা ছড়ায়নি। মধ্যযুগের ইউরোপে যেভাবে চার্চের সর্বগ্রাসী দাপট দেখেছি, যেভাবে সাম্প্রদায়িকতা, ইসলাম-বিদ্বেষ, ইহুদি-বিদ্বেষ দেখেছি, পৃথিবীর বাকি দেশগুলোতে তা ছিল অজানা৷ সেই সব বিদ্বেষ আর ঘৃণা এখন প্রগতিশীলতার মুখোশ পরে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। এখন যারা অন্য রকম বিশ্বাস নিয়ে চলতে চায়, তাদেরকে দেগে দেওয়া হয় বিজ্ঞানের শত্রু বলে, উন্নয়নের শত্রু বলে, এমনকি দেশদ্রোহী বলেও। তারপর তাদেরকে হেনস্থা করা হয়, নিকেশ করা হয়, প্রয়োজনে রাষ্ট্রশক্তিকে ব্যবহার করে। এই তো

 

। 

 

বিজ্ঞান থাকুক, তার সঙ্গে অন্য বিশ্বাসগুলোও থাকুক, তাদের প্রচারগুলোও থাকুক। বেঁচে থাকুক যুক্তিবাদ, প্রশ্ন, অবিশ্বাস, ধর্মবিশ্বাস, জাদুবিশ্বাস -- সবাই। সেটাই বহুস্বর। সেটাই গণতন্ত্র। বৈচিত্র‍্য ছাড়া পৃথিবীটা বড়ো ফ্যাকাসে হয়ে যায়, মৌলবাদী হয়ে যায়।

 

 

 

 

https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=2542659022630292&id=100006586564634

 

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com