সাংসারিক বন্ধনের মধ্যে সুরক্ষিত বোধ করে! মেয়েরা অসহায় তাই

শ্রীময়ী নামে টেলভিশন সিরিয়ালটি বর্তমানে খুবই জনপ্রিয়। সেখানে নায়কের চাকুরীরত প্রেমিকার সঙ্গে সংসার সামলানো স্ত্রীর সংঘাত দেখানো হয়েছে।

এক উচ্চাকাঙ্খী পুরুষ, তার উচ্চাকাঙ্খাহীন, স্ত্রীর প্রতি উদাসীন। কেননা তাঁর স্ত্রী গেঁও। অশিক্ষিত। পরিপাটি করে সংসার সামলানো ছাড়া কোন গুণই তাঁর স্ত্রী শ্রীময়ীর নেই। ফলে অফিসের কলিগ জুনের প্রতি আকৃষ্ট  হয় সে। স্ত্রীর শুধুমাত্র ঘর সামলানোর মতো গুণ মানিয়ে নিতে না পেরে শেষমেশ বিবাহবিচ্ছেদের পথে এগোয়।  এই কাহিনীর মোড়কের ভেতরে রয়েছে  সেই ভাবনা যা মেয়েরা পছন্দ করে।  শ্রীময়ীর কাহিনী যত এগোচ্ছে তাতে শ্রীময়ীর পরিবারের চরিত্ররা আস্তে আস্তে দর্শককে বোঝাচ্ছে একটি মেয়ের কাছে সংসারের মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব ঠিক কতখানি! ঠিক কতটা আপোষ এবং ত্যাগ করতে হয় একটি মেয়েকে সংসার টিকিয়ে রাখতে গেলে। চাকরি করা প্রেমিকা জুনের পক্ষে সংসার সামলানো সম্ভব নয়। কেননা জুনের হাতে সময় নেই। এদিকে শ্রীময়ীর হাতে অঢেল সময়। কেননা সে চাকরি করে না। মহিলা দর্শকরা শ্রীময়ীর দিকেই। কেননা বেশিভাগ মহিলাই মনে করেন মেয়েদের প্রধান কাজ সংসারকে ফুলেফলে ভরিয়ে তোলা। ইনটারনেট যুগেও মূল ভাবনাটা কিন্তু একই জায়গায়  থেকে গেছে! মেয়েদের কাছে স্বামী ও সংসারের কনসেপ্ট আসলে মজ্জাগত। ফলে শ্রীময়ীতেও জুন-শ্রীময়ীর দ্বন্দ্বে  স্বামীর সেবা আর সংসারকেই  গ্লোরিফাই করা হয়েছে। এর কারণ আর কিছুই না, 'সংসার' শব্দটার প্রতি মানুষের, আরও নির্দিষ্ট করে বললে, মেয়েদের বিশ্বাস আর অবস্থান এখনও সংসারের ভালমন্দের মধ্যে নিজেকে আটকে রাখা। চাকুরিরতা জুন কখনই সংসারের আদর্শ বউ হয়ে উঠতে পারবে না।

আজও, এই একবিংশ শতকে দাঁড়িয়েও অধিকাংশ মেয়েই বিবাহোত্তর সংসারকেই জীবনযাপনের এক ও একমাত্র অবলম্বন বলে মনে করে বা তাদের মজ্জায় তা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। যে মেয়েটির গায়ের রঙ কালো বা যে মেয়েটি সমাজের চোখে সুন্দরী নয়, তার মাথায় মেয়েবেলা থেকেই ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, তাকে পাত্রস্থ করার জন্য টাকা জমাতে শুরু করেছে বাবা--মা। বিয়ে নিয়ে পরিবারের এই ভাবনাকে বেশির ভাগ মেয়েই কিন্তু মেনে নেয়। অনেকে বলবেন

 

মেনে নেয়। সব সময় কিন্তু অসহায় বলে মেনে নেওয়া হয় তা নয়। আসলে মেয়েরা বিয়ে নামক বন্ধনে আবদ্ধ হতে চায়। আমাদের সমাজে বিয়ের মূলভিত্তি ভরপোষনের সঙ্গে জড়িত। মেয়ের বাবা অর্থ সহযোগে মেয়েকে তুলে দেয় একটি পুরুষের হাতে, যাতে সেই পুরুষটি মেয়েটির ভরপোষণের দায়িত্ব নেয়। ফলে ,যে মেয়েটি পুরোপুরি স্বামীর উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল, নিজের ভরণপোষণের বিনিময়ে সে সংসার নামক স্বেচ্ছাদাসত্ব মাথা পেতে নেয় বা নিতে বাধ্য হয়। আবার এই রকম অনেক মেয়েই আছে যারা বেশ বিত্তবান বা বিয়েতে যে পরিমান অর্থ বিনিয়োগ করেছে তার পরিবার তা দিয়ে সে সহজেই জীবনযাপন করতে পারত সাংসারিক দাসত্ব ছাড়াই। অথচ তারা এই সাংসারিক দাসত্বকে মেনে নেয়। তাদের মানসিক গঠনই এই কাজটি করতে উদ্বুদ্ধ করে। আর্থিকভাবে সাবলম্বি অনেক মেয়েই এখনও মনে করে বিয়ে ও সংসারই শ্রেষ্ট আশ্রয়।    এর মূল কারণ সংসারের মোহ! সংসারই তার জগৎ। সেটাই তার পরিচয়, আইডেন্টিটি! সেখান থেকে বেরিয়ে এলে সে জিরো? সাংসারিক বন্ধনের মধ্যে নিজেকে সুরক্ষিত বোধ করে! মেয়েদের এই বোধ ও ভাবনা যে সর্বনাশা তা মেয়েরা যেদিন বুঝবে সেইদিনই পুরুষের আধিপত্য থেকে মুক্ত হতে পারবে।

 

বেশিভাগ মেয়েই মনে করে বিয়েই তার মানসিক আধার। বিয়ের পরে সংসার সামলানোর দায়িত্ব তার।  কারণ একটাই, স্বামী, সংসার ও পরবর্তীতে সন্তান পালন – এর বাইরে মেয়েদের ভূমিকা নিয়ে মেয়েরা নিজেরাই আত্মবিশ্বাসী নয়। এমনকি অনেক চাকুরিরতা বা আর্থিকভাবে সাবলম্বি মেয়েও সংসারের মধ্যেই তাদের সুখ খোঁজেন। পুরুষের আধিপত্য স্বেচ্ছায় মেনে নেয়। সংসারকে কেন্দ্র করেই তাঁদের যাবতীয় ভাবনাচিন্তা এবং তাঁর বাইরের জগৎ গৌণ। কারণ তাঁরা নিজেরাই বিশ্বাস করেন তাঁদের স্বামীর রোজগারটাই আসল, তাঁদেরটা অতিরিক্ত, না হলেও চলে

 

আবার অনেক সময় অনেক মেয়েকে আক্ষেপ করেন সংসারের চাপে নিজেদের প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে পারেননি। এই ধরণের অনুযোগও নিতান্তই অজুহাত বই কী!  এসব ক্ষেত্রে তাঁরা যে আসলে নিজেদের গুণের জোরে পরিচিত হওয়ার চেয়ে সংসারে পাঁচজনের একজন হতে চাওয়াকেই বেশি মূল্যবান মনে করেছেন সে বিষয়ে কোনও দ্বিমত নেই।

ব্যতিক্রম যে নেই, তা তো নয়! প্রচুর মহিলা আছেন যাঁরা এই রকম ছাঁচে ঢালা নন। তবুও, কোনও সুউপায়ী, স্বাবলম্বী, আত্মনির্ভর বিবাহবিচ্ছিন্না নারীকে যখন দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার বিয়ে করতে দেখা যায়, তখন বিয়ে যে শুধু স্থায়ী পুরুষসঙ্গী এবং তথাকথিত 'রক্ষক'-এর মিথ নয়, সংসারই সুখের আধার এই ভাবনায় জারিত হওয়াই মেয়েদের একমাত্র মোহ সেটা ভাবা বোধকরি খুব অস্বাভাবিক না! এখানে নিজস্ব পরিচয় নয়, সাংসারিক অবলম্বনটাই যে প্রধান।

অন্যদিকে, অবিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে সামাজিক ভাবনার অভিমুখও সংসারকেই গ্লোরিফাই করে। অবিবাহিত মেয়েরা উৎশৃঙ্খল বিপথগামী এই তকমা অনেকসময় তাদের গায়ে সেঁটে দেওয়া হয়। তার জন্য সমাজ তাঁদের বিয়ে না হওয়াকেই দায়ী করেন। আর এই ভাবনাকে মেয়েরাই বেশি সাপোর্ট করে। আবার এমনও কেউ কেউ আছেন, যাঁরা স্বামী, সন্তান, শ্বশুর, শাশুড়ী সহ নিজের একটি সংসার কল্পনা করে নেন এবং সবার সঙ্গে সেই কাল্পনিক সংসারের গল্প খুব স্বাভাবিক ভাবেই করেন যাতে কেউ তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা না ভাবে। অর্থাৎ, বিবাহোত্তর সংসার সমাজের একটি প্রয়োজনীয় উপাদানও বটে! সংসার যে কেবলমাত্র পারস্পরিক সহাবস্থানের বিশেষ একটি পদ্ধতি, জীবনধারণের অবলম্বন নয় এই বোধ যতদিন না মেয়েদের মধ্যে ঢুকবে ততদিন পর্যন্ত সাংসারিক জাঁতাকল থেকে মেয়েদের মুক্তি নেই। বিয়ের চেয়ে উপার্জনশীল হওয়াটা যে মেয়েদের জন্য বেশি জরুরী, মেয়েরা যতদিন না নিজেরা বুঝছে, ততদিন স্বামী-স্ত্রী সমান অধিকার শুধু কথার কথাই থেকে যাবে।

ReplyForward

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com