এই বিধায়ক কেনা বেচার যুগে এখনও বিক্রি হন না বিনোদ নিকলেরা

27.11.2019

 

 

বিধায়ক বড় সস্তা, কিনে, পুষিয়ে নিলে পারতো।

মহারাষ্ট্রের সিপিআই(এম) বিধায়ক বিনোদ নিকোলে কে দেখেছেন? কি হাভাতে টাইপস দেখতে, তাই না? শ্যামলা গায়ের রং, মাথায় চুল নেই, ভাঁজ করা জামা নেই, পালিশ করা জুতো নেই। গতকাল মহারাষ্ট্রে যখন গেম অফ থ্রোন্সের থ্রিলার ঘড়ির কাটার জ্যামিতির সাথে সাথে রং বদলাচ্ছে, সুপ্রিম কোর্টের এজলাসে যখন শুনানির নামে গণতন্ত্রের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান হচ্ছে, নিউজ চ্যানেলের অ্যাঙ্কাররা যখন স্টুডিওর ফ্ল্যাশলাইট গায়ে মেখে টিআরপি’র জন্য বে-আব্রু প্রজাতন্ত্রের রক্ত চুষে খাচ্ছে; ঠিক তখন ঐ রাজ্যেরই আদিবাসী প্রধান প্রান্তিক ধানু বিধানসভা কেন্দ্রে নির্বাচিত সিপিআই(এম)’র একমাত্র বিধায়ক বিনোদ নিকোলে ব্যস্ত ছিলেন সাব ডিভিশেনাল অফিসের সামনে হাজার হাজার কৃষকদের বিক্ষোভ সমাবেশে নেতৃত্ব দিতে। কেন জানেন? মহারাষ্ট্রের পালগড় জেলায় অসময়োচিত বৃষ্টি তে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ফসলের ন্যায্য ক্ষতিপূরণের দাবি তে। 

সেই কৃষক, সেই ফসল, সেই বিক্ষোভ, সেই ক্ষতিপূরণ! সেই বস্তাপচা ইস্যু। সেই বোকা বোকা রাজনীতি। ধুর, কোন SWAG -ই নেই সিপিআই(এম)’র। কনটেম্পোরারি রাজনীতি তে SWAG মানে, ভোটের পরে কেনা-বেচার জন্য ২-৪টা ডাগর ঘোড়া, ফটো ফিনিশের ফ্লোর টেস্টের ভয়ে পদত্যাগের ড্রামা। SWAG মানে রাস্তায় বেরোলে দাদা-দিদির ১৫ফুটের হোর্ডিং, পাতা জোড়া বিজ্ঞাপনে হাল্লা রাজা লাফিং। SWAG মানে সেলেব একটা ব্র্যান্ড-অ্যাম্বেসেডার,  চার্টার্ড বিমান চেপে নির্বাচনী প্রচার। SWAG মানে পেট ভরে দু-মুঠো ঘুষ খাওয়ার স্টিং অপারেশন, ঘুরপথে পার্টি ফান্ডে ভুরি ভুরি কর্পোরেট ডোনেশেন।

দেখুন না, বিজেপির ‘অপারেশন লোটাসে’ বিক্রি হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে এনসিপি নিজেদের বিধায়কদের গ্যারেজ করেছিল মুম্বাইর পোয়াই-র রেনেসাঁ হোটেলে। প্রতিদিনের ভাড়া ১৬হাজার/রুম। শিবসেনা গ্যারেজ করেছিল এয়ারপোর্ট লাগোয়া দি ললিত হোটেলে। প্রতিদিনের ভাড়া ১৭হাজার/রুম। কংগ্রেস জুহু বিচের হোটেল ম্যারিয়টে। প্রতি দিনের ভাড়া ১৮হাজার/রুম। আর নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া তথ্য অনুসারে সিপিআই(এম)’র বিধায়ক বিনোদ নিকোলের সারাজীবনের সঞ্চিত মোট সম্পদ ৫১হাজার ৮২টাকা। জাস্ট, একজন বিধায়ক কে বিজেপির কাছে বিক্রি হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে ঐ তিন দলের একদিনে যা খরচা হচ্ছে সেটাই বিনোদ নিকোলের ৪৮ বছরের জীবনের মোট সঞ্চয়। 

উচ্চবর্ণের জমিদারের জমিতে বেগার খেতে বাপ বিনোদ নিকোলের কলেজের বি-কম পড়ার খরচা জোগাতে পারেননি। ক্লাস টুয়েলভ ড্রপ-আউট বিনোদ নিকোলে তাই পড়াশুনার পাঠ শিকেয় তুলে বড়া-পাওয়ের দোকান খুলে বসেন কৈশোরেই। ঘটনাচক্রে সেই দোকানের খদ্দের হিসেবেই প্রথম মহারাষ্ট্রের বর্ষীয়ান কমিউনিস্ট নেতা এল বি ধাঙরের সান্নিধ্যে আসেন বিনোদ নিকোলে। ২০০৫-এ নিমরাজি বিনোদ নিকোলে যেদিন কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী হিসেবে লাল ঝাণ্ডা কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, সেদিন পার্টি থেকে তাঁর মাসিক ভাতা ধার্য হয়েছিল ৫০০ টাকা। সমাজ পরিবর্তনের লড়াই লড়তে গিয়ে আজ সেটা বেড়ে হয়েছে ৫০০০। আর এবারের মহারাষ্ট্রের বিধানসভা নির্বাচনে নির্বাচিত ২৮৮জন বিধায়কদের গড় সম্পদ ১০.৮৭ কোটি। বিনোদ নিকোলের মাসিক ভাতার ২২হাজার গুণ। আবার গতকাল অবধি সেই বিধায়কদেরই কেনা-বেচাতে বিজেপি তরফ থেকে দর উঠছিল ৮০-১০০ কোটি। বিনোদ নিকোলের মাসিক ভাতার ১লক্ষ ৮০ হাজার গুণ। বিজেপির ঘোড়া কেনা-বেচা থেকে বাঁচতে ৫তারা হোটেলে থাকা সহ বিভিন্ন চটকদার প্রস্তাবের ফোন গিয়েছিল বিনোদ নিকোলের কাছেও। বিনীত ভাবেই তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন “বিজেপি আমাকে কিনতে পারবে না। আর তার জন্য আমার কোন ৫তারা হোটেলে লুকিয়ে থাকার প্রয়োজন নেই।” 

গণতন্ত্র বড্ড নরম, কেটে, ছড়িয়ে দিলে পারতো।

ইলেক্টরাল বণ্ডের আড়ালে গরীবরে রক্ত চোষা আম্বানি-আদানির টাকা কর্পোরেট ডোনেশেনর নামে পার্টি ফান্ডে ঢুকিয়ে, সেই টাকায় বিধায়ক কেনা-বেচার অঙ্কে সরকার ভাঙ্গা-গড়ার নাজুক, নরম গণতন্ত্র। মিডিয়ার ভাষায় ‘মাস্টারস্ট্রোক’। আর নোট বাতিলে আমেদাবাদে নিজের সমবায় ব্যাঙ্কের সর্বাধিক বাতিল নোট জমা হওয়ার রেকর্ড গড়ে, ছেলের কোম্পানির রেভিনিউ একবছরে ১৬হাজার গুণ বাড়িয়ে নিয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত বাপ মিডিয়ার ভাষায় ‘চাণক্য’। ডিয়ার মিডিয়া, দেশের কোন অঙ্গরাজ্যের নির্বাচিত সরকার কে স্রেফ টাকার জোরে ভাঙ্গা-গড়ার খেলা যদি ‘মাস্টারস্ট্রোক’ হয়; রাতের অন্ধকারে গৃহপালিত রাজ্যপাল, সরীসৃপ রাষ্ট্রপতির অঙ্গুলিহেলনে, কাকভোরে মুখ্যমন্ত্রীর শপথ নেওয়ানো যদি ‘চাণক্য নীতি’ হয়; তাহলে এমন ‘মাস্টারস্ট্রোকে’ আমি থুতু দিই, এমন ‘চাণক্য নীতি’ কে আমি ঘেন্না করি। আমার সীমিত ক্ষমতায় এই রাজনীতির বিরোধিতা করি। 

আধুনিক রাজনীতির ইতিহাসে ১৯৯৬-এ জ্যোতি বসুর প্রধানমন্ত্রীত্ব, ২০০৮ নিউক্লিয়ার ডিল, কিম্বা হালফিলের ২০১৮ পার্টি কংগ্রেস -কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে বিতর্ক নেহাত কম হয়নি। আড়াআড়ি মতানৈক্য হয়েছে, স্পিকার পদের মর্যাদা রক্ষা করতে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় কে পার্টি থেকে বহিষ্কৃত হতে হয়েছে, সিংহাসন গেছে, রাজ্যপাট গেছে, সংসদীয় রাজনীতির পাটিগণিতেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, কিন্তু একটা জিনিস কমিউনিস্ট পার্টির কাছ থেকে কেউ কোনদিন কেড়ে নিতে পারেনি; সেটা হল শৃঙ্খলা। আদর্শবোধে সম্পৃক্ত শৃঙ্খলা।

তাই অন্য দলগুলোর কাছে বিনোদ নিকোলেরা ব্যতিক্রম হতেই পারেন, কিন্তু বামপন্থীদের কাছে বিনোদ নিকোলেরাই প্রত্যাশিত। বামপন্থীদের কাছে বিনোদ নিকোলেরাই সম্বল।বিনোদ নিকোলেরাই সম্পদ। আজকের বলবান পুনিয়ারা কিম্বা সেদিনের মকর টুডু, জলেশ্বর হাঁসদারা, বহমান আনিসুর রহমান, দেবলীনা হেম্বব্রমরা কিম্বা মহীরুহ বিমান বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যরা, এমনকি স্মৃতির অতলে চলে যাওয়া অসংখ্য মহঃ ইলিয়াসরা -কই ৩৪ বছরে কোন ম্যাথু স্যামুয়েলদের হিম্মত হয়নি তো আলিমুদ্দিনের ভেতরে ছোট-মাঝারি-বড় হার্মাদ গুলোর উপরে একটা স্টিং অপারেশন করার। অমিত শাহর বাপ-ঠাকুরদা, চৌদ্দ-পুরুষদের সাহস হয়নি তো আম্বানি-আদানির মালাই চেটে চর্বি জমিয়ে বাজারের থলি হাতে বিনোদ নিকোলে’দের কাছে ঘোড়া কেনা-বেচার আবদার করার। 

এই যাঁদের আদর্শ আজও পয়সার বিনিময়ে মার্কেটে বিক্রি হয় না, ফ্লোর টেস্টে জেতার জন্য যাদের কে বিলাসবহুল হোটেলে গ্যারেজ করতে হয় না, নোট বাতিলে যাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফুলে ফেঁপে ওঠেনা, যারা পেটে গামছা বেঁধে আজও নিঃস্বার্থে রাজনীতিটা করেন, রোদে পুড়ে, জলে ভিজে পার্টির ডাইরেক্টিভস অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেন, যাদের কোনদিন একটা স্টিং হয়নি, মিডিয়া ফুটেজ দেয়নি, ঘণ্টাখানেক চামচাগিরি করেনি, সোশ্যাল মিডিয়া দেওয়ালে ঘুঁটে লেপেনি -এনারাই আসলে এই দেশের স্বচ্ছ রাজনীতির মুখ। আমাদের মাস্টারস্ট্রোক। আমাদের চাণক্য। আমাদের SWAG

 

 

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com