শিক্ষার অঙ্গনে আছে ছাত্র-ছাত্রী বান্ধব পরিবেশ ?

 

সম্প্রতি  ঘটে যাওয়া একটি দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের স্কুল ছাত্র – ছাত্রীদের অভিবাবক মহলে শোরগোল উঠেছে।

দিন সাতেক আগে লিলুয়ার একটি স্কুলে একটি দুর্ঘটনায় পড়ে এক দশম শ্রেণির ছাত্রী। ওই ছাত্রী পিঠে ভারী ব্যাগ নিয়ে নামতে গিয়ে পা পিছলে যায়। আর পড়েও যায়। পড়ে গিয়ে শিরদাঁড়ায় গুরুতর আঘাত পায় বেলুড়ের বাসিন্দা ওই কিশোরী। প্রিয়াঙ্কা ভঞ্জ চৌধুরী নামের ওই কিশোরীর শিরদাঁড়ায় অস্ত্রপোচারও করতে হয়।ছাত্রীটির অবস্থার উন্নতি হয়েছে। এই দুর্ঘটনা আমাদের শহর কলকাতার সরকারি ও বেসরকারি স্কুল্গুলির পরিবেশ ও কতটা ছাত্র-ছাত্রী বান্ধব, সেই বিষয়টি নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে বিভিন্ন মহলে।

স্কুলের ব্যাগের ওজন কমানর বিষয়ে ইতিমধ্যেই নানা বিষয় কেন্দ্রীয় আইন মোতাবেক বেশ স্কুলে চালু হয়ে গেছে। কিন্তু সেই ব্যাগ নিয়ে প্রতিদিন পাঁচতলা থেকে একতলা , আবার একতলা থেকে পাচতলা পর্যন্ত উঠতে হয় প্রত্যেকটি ছাত্র ছাত্রীদের। বেসরকারি বহু স্কুলে লিফট আছে। কিন্তু সেই লিফটে ছাত্র ছাত্রিদের প্রবেশাধিকার নিষেধ। সেটির ব্যবহার করতে পারবেন শুধু মাত্র শিক্ষক-শিক্ষিকা ও স্কুলের অশিক্ষক কর্মচারীরা। অথচ দুধের শিশুদের যাওয়ার জন্য কোন অনুমতি নেই।  ভারী ব্যাগ নিয়ে শিশু থেকে বালক/বালিকাদের পর্যন্ত পুরো সিড়ি ভেঙ্গে ওপরে উঠে নিজের ক্লাশে পৌছাতে হবে। এমনটাই নিয়ম। এক্ষেত্রে দেখা গেছে , শারীরিক ভাবে সুস্থ নয় এবং অক্ষম বেশ কিছু শিশুকেও এই সিড়ি ভেঙ্গে উঠতে হচ্ছে উপরে।

২০০৬ সালে আইন বলে ছাত্র ছাত্রীদের বই এর ব্যাগের ওজন কমানোর ফতোয়া জারি হলেও , এখনও শহরের বহু স্কুলে গেলে যে কেউ দেখতে পাবেন ভারি ব্যাগ নিয়ে ছাত্র ছাত্রীদের আনা গোনা। স্কুল কতৃপক্ষের সাফাই , সামান্য রুটিন অনুযায়ী যতটুকু বই আনা দরকার ততটুকুই ওরা আনে। কিন্তু ক্লাশ অনুযায়ী বই আর খাতা মিলিয়ে যে ওজন হয় , তার সাথে টিফিন , জলের বোতল ব্যাগের নিজস্ব ওজন মিলিয়ে কতটা ওজন হয় , সেটি একবার প্রতিটি স্কুলের কতৃপক্ষকে মেপে দেখতে বললেই দেখতে পাবেন কতটা হয়।

শিশুর শিক্ষার অধিকার রক্ষা আইনে অনেক কথা বলা হয়েছে। সেখানে যেমন আনন্দ পাঠের কথা বলা হয়েছে , তেমনি পরিবেশ বান্ধবের কথাও বলা হয়েছে। কোন বিষয়কে শিশুটির ওপর চাপিয়ে দেওয়া বা বাধ্য বাধকতার বিসয়টির দিকেও লক্ষ্য রাখতে বলা হচ্ছে বারে বারে। কেন বলা হচ্ছে ? তার কারণ আর কিছুই নয় , যাতে স্কুল একটি ছাত্রের কাছে ভয়ের না হয়ে ওঠে। আর ছাত্র-ছাত্রীর স্বাস্থের পক্ষে ক্ষতি হয় এমন কোন কাজও না করার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে বারে বারে। তাস্ত্বেও বেশ কয়েকটি স্কুলে এই চলতে থাকা গরমের সময়, ঠা ঠা রোদে দাঁড় করিয়ে প্রার্থণা করাতেও পিছপা হচ্ছেন না শিক্ষকরা। অথচ দেখা গেছে সেই সব স্কুলে অধিকাংশ শিক্ষক গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন আর ছাত্ররা রৌদ্রে।

পানীয় জলের ব্যাপারে এখন প্রায় সব স্কুলেই পিউরিফায়ার লাগানো হয়েছে। কিন্তু সচল আছে কয়টা ? একবার কেনা হলেও সার্ভিসিং কি নিয়মিত হয় ? বেশ কিছু স্কুলে আবার এই পিউরিফায়ারের জল আবার শিক্ষকদের জন্য নির্দিষ্ট করা থাকে। ছাত্র বা ছাত্রীরা জল খায় ট্যাঙ্কের। মানে রিজার্ভার থেকে তোলা ওপরের ট্যাংকের জল। সেখানে পরিশুদ্ধতার বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা অবান্তর।

শহরের সরকারি প্রাথমিক স্কুল গুলির ছাত্র-ছাত্রী বান্ধব পরিবেশ নিয়ে বলতে গেলে বেশ কয়েকটি কথা সামনে চলে আসে। শহরের এখনও সিংহ ভাগ স্কুলে নেই কোন চতুর্থ শ্রেণির কর্মী। ফলে শ্রেণিকক্ষ থেকে বাথরুম , সবটাই পরিস্কারের দায়িত্ব থাকে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ওপর। তাঁরা সেটা কর থাকেন। কিন্তু সব স্কুলে কি সেটা হয় ? শহরের এখনও অনেক স্কুল চলে ভাড়া বাড়িতে, সেখানে আবার সংস্কার করার সুযোগ একেবারেই নেই। ফলে দেখা গেছে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে ছাত্র-ছাত্রীরা এসে পঠন পাঠন করছে। অন্য দিকে শহরের অনেক স্কুলের সমস্যার জায়গায় এক সুত্রে বাঁধা একটা সমস্যা আছে। সেটা আশ্রিতের সমস্যা। প্রাথমিক স্কুলটি যদি উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের , বা উচ্চ বিদ্যালয়ের সঙ্গে একসাথে থাকে ,তাহলে উচ্চ বিদ্যালয়টির কাছে আশ্রিতের মর্যাদা পেয়ে থাকে। আর সেখানে সব ক্ষেত্রে স্কুলের উন্নয়ের কাজ করতে গেলে প্রতি পদে বাঁধা দেওয়াটা উচ্চ বিদ্যালয়ের কাছে একটা অভ্যাসের পর্যায়ে চলে যায়। প্রাথমিক স্কুল্টির না থাকে আলাদা অফিস রুম, না থাকে আলাদা ভাবে কাজ করার জায়গা। দেখা গেছে , একটি হল ঘরের মধ্যে বাধ্য করা হচ্ছে প্রাথমিক শ্রেণির পঠন পাঠন চালিয়ে যেতে। স্কুলে ছাত্র- ছাত্রী সংখ্যা কম থাকলেও , এক্ষেত্রে প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রীদের আলাদা করে নজর দেওয়ার ক্ষেত্রে একটা প্রতিবন্ধকতা এসেই যায়।

শহরের বেসরকারি স্কুলগুলিতে বহু ছাত্র-ছাত্রী পঠন-পাঠন করে থাকে। সরকারি স্কুলের মত বেসরকারি অধিকাংশ স্কুলেই নেই একটি খেলাধুলার জায়গা। ফলে ছাত্র বা ছাত্রীটি খেলা ধুলা থেকে দূরেই থাকে। যদিও নিয়ম মাফিক ক্লাশ রুটিনে খেলাধুলার পিরিয়ড থাকে।

এবার আসি অন্য আরেকটি প্রসঙ্গে। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে এই সমস্যার জন্য কোন ব্যবস্থাই থাকেনা কোন স্কুলে। ঋতুকালীন সময়ে অনেক ছাত্রী এখনও স্কুলে অনুপস্থিত থাকে।কেননা তাদের ক্ষেত্রে নানা অসুবিধা থাকে এই সময়। বাথরুমের সমস্যা থেকে প্যাড বদলাবার সমস্যা। এই প্রসঙ্গে বিশেষ করে মেয়েদের স্কুলে বা কো-এড স্কুলে, শিক্ষিকাদের নিয়ে একটি কমিটি করে এই সমস্যার সমাধান করা যেতেই পারে। একটা প্যাড কর্নার করে , সেটির দায়িত্ব কোন শিক্ষিকা নিলেন।প্রয়োজন মত ছাত্রীদের সাহায্য করবেন তিনি। আর এভাবেই সমাধান হতে পারে এই সমস্যার। এখন ১০ বছর বয়েস থেকেই এই সমস্যা দেখা দিচ্ছে। ফলে শহরের প্রাথমিক স্কুল গুলিতেও নিতে হবে এই উদ্যোগ।

এবার আসি প্রতিটি স্কুলের প্রাথমিক চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়ে। শহরের সব স্কুলে ফার্স্ট এইড বক্স থাকলেও , আপতকালীন অবস্থায় প্রয়োজনীয় ওষুধটি খুঁজে পাওয়া যায় না। আবার পাওয়া গেলেও সেটি হয়ত দেখা যাবে এক্সপায়ারি হয়ে গেছে। থাকেনা লুকপ্লাস্ট, এমনকি তুলো। ফলে নামেই আছে বক্স কিন্তু কোন কাজে আসে না। এই বিষয়টা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে সমাধান করে ,  প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য সমস্ত রকম সুবিধা সমেত একটা কাজের বাক্স রাখতে হবে। আর এক্ষেত্রেও বক্সে থাকা সব জিনিসগুলি পরীক্ষা করতে হবে নিয়মিত।

স্কুলগুলিতে নীল সাদা রঙের প্রলেপ পড়েছে বাইরে। কিন্তু অনেক স্কুলের ভিতরের ছবি পাল্টায়নি একটুকুও। একদিকে নানা ঝাঁ চক চকে একটা পরিবেশ বেসরকারি স্কুলে। আর সেই হাতছানির টানে একটু পয়সা হলেই ছুটছে সবাই সেখানে। অথচ সরকারি স্কুলগুলিতে সেই চমকটা ভিতরে না থাকায় কমে যাচ্ছে ছাত্র-ছাত্রী। সেই একই কথা উঠে আসছে ছাত্র বান্ধব পরিবেশ। এই আলোচনায় অনেক বিষয় উহ্য রাখা হল। বিশেষ করে শিক্ষকদের স্কুলের প্রতি ভালোবাসার ক্ষেত্রটি, বা শিক্ষকরা কতটা ছাত্রদের বন্ধু হয়ে উঠতে পারছেন , সেই বিষয়টিও ।

আজকের শিক্ষা যখন পণ্যে রূপ নিয়েছে। পরিবেশ থেকে শিক্ষাদান সেই পন্যের মাশুলের ওপর নির্ভর করেই চলবে এটাই স্বভাবিক। কিন্তু আজো সরকারি স্কুলে ৮৭ শতাংশ ছাত্র-ছাত্রী পড়াশোনা করে। তাই যে কোন সরকারের পক্ষে তাদের জন্য উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশ রচনা করা দরকার। যে পরিবেশে থাকবে মন্দিরের মত পবিত্রতার গন্ধ।

 

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com