NPR থেকে NRIC:ফ্যাসিবাদের নতুন সন্ত্রাস

 

 

 

ভারতকে NRC শব্দটা শিখিয়েছিল আসাম। প্রথম শিখিয়েছিল ১৯৫০ সালে। আর আবার তার নতুন পাঠ নিতে শুরু করল ২০১৬ সালে। দু বছরের মধ্যেই NRC নিয়ে ভীতি ছড়ানো আর NRC-র ভয়ে রাতের ঘুম চলে যাওয়া, পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারত মোটামুটি এই দুটো ক্যাম্পে ভেঙে গেছে। মাঝখানে অবশ্য নির্বিকল্প ব্রহ্মচৈতন্য স্বরূপ একটা বড় অংশ আছে, যাদের কোনো কিছুতেই হেলদোল হয় না। আসামের ক্ষেত্রে যার নাম NRC, অবশিষ্ট ভারতের ক্ষেত্রে তার নাম হল NRIC। নাগরিকত্ব আইনে ২০০৩ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে এই শব্দ বা ধারণাটাকে ঢোকানো হয়েছিল। কেন্দ্রে তখন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী। প্রায় ১৫ বছর এই নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য না হলেও সাম্প্রতিক নির্বাচনের সময়ই আবার এই শব্দটি বাজারে ভেসে উঠল। কারণ বা প্রেক্ষাপট পরে আলোচনা করা যাবে। আপাতত দেশজুড়ে যে হট্টগোল শুরু হয়েছে, সেদিকেই তাকানো যাক।

আসামের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই সেই আগামী NRCI-এর ক্ষেত্রে কী হতে পারে, সেটা আগাম আন্দাজ করা যায়। একটা দেশের সরকারের কাছে তার সমস্ত অধিবাসীর প্রাথমিক কিছু তথ্য থাকবে, সেটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু মাথায় রাখতে হবে দেশটার নাম ভারতবর্ষ। যেখানে ব্যাঙ্কে টাকা রেখে লোকে দুশ্চিন্তায় মরে। আর ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে এক পয়সা শোধ না করে লাইন দিয়ে ব্যবসায়ীরা বিদেশে পালিয়ে যায়। সরকার বা তার বিবিধ এজেন্সির ঘুম ভাঙে তারা পালিয়ে যাবার পর। আধার কার্ডের তথ্য অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের হাত তুলে দেবার অভিযোগ প্রমাণিত। কাজেই NRICI-র তথ্যের ক্ষেত্রেও যে তেমনটা হবে না, তার গ্যারান্টি নেই।

সে যাই হোক, যারা দেশের অর্থনীতি বেচে দেয়, তারা জনগণের তথ্য বেচে দিতেই পারে। সেটা নিয়ে ভেবে লাভ নেই। জনগণের কী কী সমস্যা হতে পারে, সেটাই দেখা যাক। NRIC-র মূল লক্ষ্য নাকি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করা। তাহলে ভারতবর্ষে সম্ভাব্য অনুপ্রবেশকারী কারা হতে পারেন, আগে দেখে নেওয়া যাক।

অনুপ্রবেশঃ বাস্তব চিত্র

১৯৪৭ সাল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত ভারতে দলেদলে মানুষ অনুপ্রবেশ করেছেন। এদের মূলত তিনটি স্তরে ভাগ করা যায় –

১/ বাংলাদেশ থেকে মূলত হিন্দু বাঙালী ও মারোয়ারি, আর তুলনায় কম মুসলিম বাঙালী।
২/ পাকিস্তান থেকে শিখ, হিন্দু পাঞ্জাবী, জাঠ, সিন্ধ্রি, রাজপুত, গুজরাটি, মারোয়ারি এবং আহমদিয়ামুসলিম।
৩/ নেপাল থেকে গোর্খারা, যদিও ১৯৫০ সালের ভারত-নেপাল চুক্তির বলে নেপালের নাগরিকরা এমনিতেই ভারতে বাস ও উপার্জন করতে পারেন। লেপচাদের বাসভূমি দার্জিলিং এর মাধ্যমেই গোর্খা-অধ্যুষিত হয়ে গেছে যেখানে লেপচারাই সংখ্যালঘু।

এছাড়াও শ্রীলঙ্কার জাফনা অঞ্চল থেকে তামিল অনুপ্রবেশও হয়েছিল। সাম্প্রতিককালে আফগানিস্তান থেকে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ই অনুপ্রবেশ করেছেন। আর অতি সম্প্রতি বার্মা থেকে এসেছেন কিছু রোহিঙ্গা মুসলিম।

বিভিন্ন দেশ থেকে চলে আসা এইসব জনগোষ্ঠীর মধ্যে গুজরাটি, সিন্ধ্রি বা মারোয়ারিদের নিয়ে যে কেউ প্রশ্ন তুলবে না, বর্তমান ভারতের রাজনৈতিক আবহাওয়ায় সেটা নিশ্চিত। আসামের NRC থেকে বাদ পড়া সাড়ে ছয় লক্ষ অবাঙালীকে যে ডিটেনশন ক্যাম্পে যেতে হবে না, আসাম সরকার সেটা ইতিমধ্যেই বলে দিয়েছেন। যুক্তি হিসাবে বলা হয়েছে বৈধ নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে না পারলেও এরা ভারতেরই বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যে আসামে এসেছিলেন, সেটা নিশ্চিত। অতএব NRIC-র ক্ষেত্রেও বাঙালীদেরই যে সবথেকে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হবে, সেটা আগে থেকেই বলে দেওয়া যায়।

আসামের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বলা যায় একই অঞ্চলের প্রচুর মানুষকে অনুপ্রবেশকারী বলে চিহ্নিত করা হবে না। একটি মহল্লা বা পাড়ায় হাতগুনতি কয়েকজনকেই এমন তকমা দেওয়া হবে। এমনকি একই পরিবারের মধ্যেও বাকিদের বৈধ নাগরিক বলে স্বীকার করে হয়তো একজন বা দুজনকে অনুপ্রবেশকারী বলা হবে। কেন! মূল কারণটা হল প্রথমেই দুটো ক্যাম্প করে দেওয়া। যাদের সপরিবারে নাম উঠবে, তারা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলবেন। ভবিষ্যতে যাতে উটকো ঝামেলায় পড়তে না হয়, তাই সেই অনুপ্রবেশকারী পাড়াতুতো কাকা, জ্যাঠা বা ভাইয়ের পাশে দাঁড়াবেন না। যার বিপদ, তিনি বাস্তবতই একলা পড়ে যাবেন। মোট সংখ্যাটা যাই হোক না কেন, প্রত্যেককেই নিজের লড়াই আলাদাভাবেই লড়তে হবে। আসামের অভিজ্ঞতা শুধু মাথায় রাখুন।

অন্যান্য যাবতীয় আইনি কুটক্যাচাল নিয়ে কথা পরে হবে। একটা বিষয় শুধু খেয়াল রাখুন। নোটবন্দীই হোক আর দেশিয় অর্থনীতির শ্রাদ্ধ, তার দায় কমবেশি সবাইকেই একইরকম বইতে হয়। কিন্তু অনুপ্রবেশকারী বলে যারা চিহ্নিত হবেন, তাদের ঝামেলা অন্য কেউ চাইলেও বহন করতে পারবেন না। আসামের তেজপুরে দুলাল রায়ের মৃত্যুর ঘটনা সেটাই চোখে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দিচ্ছে। সমাজের মধ্যে মুহূর্তে আপনি একা, বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবেন। নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ নিয়ে আপনাকেই নানান জায়গায় দৌড়তে হবে।

আসামে NRC করানোর পিছনে মূল চালিকাশক্তি ছিল বাঙালীবিদ্বেষ। সারা ভারতেই বাঙালীদের এবং পশ্চিমবঙ্গের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ব্যাপকহারে চালানো হচ্ছে। হিন্দু-মুসলিম বিভাজন তো ছিলই, এখন মুছে যাওয়া ঘটি-বাঙাল দ্বন্দ্বকে আবার খুঁচিয়ে তোলা হচ্ছে। সবথেকে বড় কথা হল, NRIC-র কাজ যারা করবেন, তারা কেউ মঙ্গলগ্রহ থেকে আসবেন না। চিরাচরিত ঢঙে তারা NRIC-র কাজকেও গোয়াল ভরানোর মওকা হিসাবেই দেখবেন। আসামে এমন অনেক উদাহরণ আছে, গোটা পরিবারের নাম আছে, বাদ পড়েছেন একজন। কখনো তিনি দুলাল পালের মত পরিবারের কর্তা, আবার কখনো সদ্যজাত শিশু। জানি, চোনাজীবিরা আপত্তি করবেন, এতবড় কাজে কিছু ভুল হতেই পারে। হ্যাঁ, একটা গোটা পরিবারের নাম বাদ যাওয়াটা ভুল হতে পারে। একজনের নামের ক্ষেত্রে সেই ওজর চলবে না। এটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সম্ভবত জলখাবারের দাবী মেটাতে না পারার বদলা। এমন যে ঘটবেই, চোখ বুঁজে বলে দেওয়া যায়।

পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত রাজনৈতিক দলই কোনো না কোনো সময়ে অবৈধ রেশনকার্ড, ভোটার লিস্টে নাম তুলে দেওয়া ইত্যাদির অভিযোগ করেছেন। যদি সত্যি হয়, কিসের বিনিময়ে হয়েছে এগুলো? ঘুষের বিনিময়ে, রাজনৈতিক আনুগত্যের বিনিময়ে। বিপরীত দিক থেকে কেউ কেউ যে অন্যায্য ভাবে বঞ্চিতও হয়েছেন, সেই অভিযোগও নানান সময়ে উঠেছে। NRIC-র সময়ে এইসব সরকারী কর্মচারী এবং রাজনৈতিক শক্তি রাতারাতি সৎ ও বিবেকবান হয়ে উঠবেন? নোটবন্দীর সময়ে যারা কালো টাকা বরবাদ হয়ে যাবার স্বপ্ন দেখে পেটে গামছা বেঁধে ছিলেন, তারা হয়তো এখনো বিশ্বাস রাখবেন। অধিকাংশ মানুষই রাখবেন না।

একটা বিশেষ সমস্যার কথা বলে এই পর্যায়টা শেষ করা যাক। নিশ্চয়ই জানেন, খান বা শেখের মত কিছু উৎপত্তিবাচক শব্দ ছাড়া মুসলিমদের পদবী বলে কিছু হয় না। কাজেই বাবা আর ছেলের পদবির মিল থাকার প্রশ্ন নেই। শরিফুল আলমের ছেলের নাম মোনাজাত হোসেন হতেই পারে। এমন গ্রামীণ মুসলিমরা এই নিয়ে খুব সমস্যায় পড়েছেন। চাষের জমি ছিল বাবার নামে। তিন ভাই চাষ করে, কিন্তু ওয়ারিশন করা নেই। কীভাবে প্রমাণ করবেন তারা ঐ বাপেরই সন্তান? এখন তারা ভিড় জমাচ্ছেন কোর্টে, ওয়ারিশন সার্টিফিকেটের দরখাস্ত নিয়ে। সাধারণত হাজার টাকার মধ্যে যে কাজ মিটে যাবার কথা, তার দর উঠেছে চার থেকে পাঁচ হাজার। গণতন্ত্র যে এভাবেও ফলন দেবে, কে ভেবেছিল!

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com