এক ঢিলে দুই পাখি মারতে পারবেন না অমিত শাহ

 

 

বাংলা ভাষার সংকট নিয়ে অনেকেই নানা কথা বলছেন। সোচ্চার হয়েছেন বহু মানুষ। লক্ষ্যণীয়, গত সাত দশকের বেশি সময় ধরে বাঙালির ইতিহাসকে গুলিয়ে দিয়ে, অন্ধকারে চেপে রেখে বাংলা ভাষার লড়াইকেই ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। ১৯১২ থেকে ১৯৬১ সাল ও তার পরেও বাঙালিদের মাতৃভাষার জন্য এই দেশে বার বার আন্দোলন করতে হয়েছে, যা অন্য কোনও রাজ্যকে করতে হয়নি। সর্বশেষ বিদ্রোহ করেছিলেন আসামের বরাক উপত্যকার মানুষ। সেই এলাকায় বাংলা ভাষাকেও সরকারি ভাষার মর্যাদা দিতে বাধ্য হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। এখন ফের বাঙালি-বিদ্বেষকে উস্কে দিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, আসামের রাজ্য ভাষা হবে বাংলা।

কেন এই ঘোষণা, বোঝা দরকার। বিজেপির ইস্যু একটি-ই। হিন্দুত্ব। কাশ্মীর, পাকিস্তান, নমামি গঙ্গে, আসামে বিদেশি খেদাও থেনে এনআরসি --- সবই তাদের হিন্দুত্বের সওয়াল। এখন যে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল (ক্যাব) আনা হচ্ছে, সেখানেও লক্ষ্য মুসলমানদের ‘বিদেশি’ ছাপ মারা। কিন্তু, ভারতের মতো বহুজাতিক দেশে এমন একপ্রস্তরীভূত পথ আখেরে সফল হতে পারে না। একারণেই আসামে ১৯ লক্ষ এনআরসি-ছুটের মধ্যে ১২ লক্ষই হিন্দুর নাম। যাদের নাম বাদ গিয়েছে, যারা ডিটেনশন ক্যাম্পে আছে, তারা অধিকাংশই নিন্মবর্ণের হিন্দু, যাদের সঙ্গে বিজেপি-র ব্রাহ্মণ্যবাদী রাজনীতির বিরোধ। কিন্তু, এর ব্যাকল্যাশ হতে শুরু করেছে অন্যত্রও। হিন্দু ভোটে টান পড়ছে। বিশেষত, সুস্থবুদ্ধির হিন্দুরা বিজেপির এই নীতি মানতে পারছেন না। অমুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের নাগরিকত্ব দেওয়া হলে আসামে ফের উদ্বাস্তুদের বস্নো হবে, এই আশঙ্কায় অসমিয়ারাও বিজেপির বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমে গিয়েছে। সেই আন্দোলনকে ভাঙতে অমিত শাহ কবর থেকে তুলে এনেছেন আসামে আসামী ভাষা হবে রাজ্য ভাষার প্রসঙ্গ।

কবরে যাওয়ার আগে কিন্তু আসামে অসমিয়া ভাষাকে ‘রাজ্য ভাষা’ বলা হয়নি। ১৯৬০ সালে মুখ্যমন্ত্রী বিমলাপ্রসাদ চালিহা বলেছিলেন, অসমিয়াই হবে রাজ্যের সরকারি কাজকর্মের ভাষা। কিন্তু, অমিত শাহ বলতে চান, রাজ্য ভাষা। ফারাকটা কোথায়? ফারাক হল, ভারতের সংবিধানে রাজ্য ভাষা, রাষ্ট্র ভাষা বলেকিছু নেই। আছে, সরকারি ভাষা অর্থাৎ সরকার স্বীকৃত কাজের ভাষা। শুরুতে ১৪টি ভাষা ছিল এই তালিকায়, এখন বেড়ে বেড়ে ২১টি। রাজ্য হিসাবেও এভাবেই রয়েছে রাজ্যের সরকারি কাজের ভাষা। এখন তাকেই ‘রাজ্যভাষা’ বানানো গেলে এবং তা মান্যতা পেলে  বিজেপির পক্ষে ‘রাষ্ট্রভাষা’ শব্দটাও গিলিয়ে দেওয়া সহজ হয়। একদিকে বাঙালি-অসমিয়া বিরোধ লাগিয়ে এনআরসি এবং ক্যাব-এর ধাক্কায় বিজেপি-র বিরুদ্ধে বিদ্রোহকে এবং অর্থনীতি থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে ব্যর্থতাকে আড়াল করার পথ পাওয়া যাবে। এক ঢিলে অনেক পাখি মারতেই এই সময়ে আসামে ভাষাগত ঝামেলা তৈরির এই অপচেষ্টা।

কিন্তু এই সময়েই আরেকটি ঘটনা বাংলা ভাষার জয়যাত্রাকে সূচিত করেছে, এবং তা আন্তর্জাতিক স্তরে। লন্ডনে সরকারিভাবে দ্বিতীয় ভাষার মর্যাদা পেয়েছে বাংলা। ইংরেজির পরেই সেই দেশে মর্যাদা পেয়েছে বাংলা। এই সিদ্ধান্ত হয়েছে সিটি লিট নামে সরকারি একটি সমীক্ষার ভিত্তিতে। জানা গিয়েছে, লন্ডনের ৩ লক্ষ ১১ হাজার ২১০ জন বাসিন্দা ইংরেজি ছাড়াও কোনও না কোনও বিদেশি ভাষায় কথা বলেন। তাঁর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ কথা বলেন বাংলায়। তাদের সংখ্যা ৭১ হাজার ৬০৯ জন। তাঁরা স্বচ্ছন্দে বাংলা বলতে ও লিখতে পারেন। তার পরে আছে পোলিশ এবং তুর্কিভাষী মানুষ।

বাংলাদেশ রাষ্ট্র হওয়ার পর বাংলা ভাষা এখন রাষ্ট্রসঙ্ঘে স্বীকৃত। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসও বাংলা ভাষার শহিদ  দিবসকেই ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু, হিন্দি আজও সেই সম্মান পায়নি। সেই গাত্রাদাহ সঙ্ঘবাদীদের আজও তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে।

কিন্তু, সততার দ্বারা যা সম্ভব, তা তো চালাকির দ্বারা সম্ভব নয়। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, “চালাকির দ্বারা কোনও মহত কাজ হয় না।”

 

 

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com