CAB 2019 ও বাস্তবতা

 

 

বন্ধু, জানি প্রবল উল্লসিত আপনি। জীবন অথবা জীবিকার দায়ে চিরাচরিত বাসভূমি থেকে চলে আসতে বাধ্য হয়েছেন। নতুন করে বিছিয়েছেন নিজেকে আর পরিবারকে। জীবনের আশ্বাস মিলেছে ঠিকই, মেলেনি পূর্ণ মর্যাদা। কারণ নাগরিকত্ব পাননি আপনি। প্রতি মুহূর্তে তাই আশঙ্কায় থাকতে হয় আপনাকে, এই বুঝি পিছনে লাগল কেউ। এই বুঝি রাতের অন্ধকারে পুলিশ এসে আপনাকে টেনে নিয়ে গেল। রেশন কার্ড থেকে শুরু করে যাবতীয় রাষ্ট্রীয় কার্ডের সহজ সন্ধানের জন্য আপনি তাই লাইন লাগিয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের সদর দরজায়। তাদের কথামত উঠেছেন, তাদের আঙুলের ইশারায় বসেছেন। সবটাই আপনি করেছেন বেঁচে থাকার দায়ে। কিন্তু তাতেও আপনার ক্ষুধা কেটেনি। নাগরিকত্ব আপনি পাননি। তাই CAB 2019 আপনাকে আশ্বস্ত করেছে। এইবারে নাগরকিত্ব আপনি পেয়ে যাবেন। মাথা উঁচু করে বাঁচবেন ভারতের মাটিতে।

 

আপনার ভিতরের যন্ত্রণা বুঝব না, এতটা অমানুষ আমি নই। ১৯৪৭ আমারও পূর্বজদের মাটিকে কেড়ে নিয়েছে আমার প্রত্যক্ষ স্পর্শ থেকে। হ্যাঁ, সেই অর্থে উদ্বাস্তু হয়তো বলা যাবে না। কিন্তু যে মাটিতে আমার পূর্বপুরুষের অস্থিভষ্ম মিশে আছে, সেটা আমার কাছে বিদেশ। আর তাই প্রতি মুহূর্তে অনুভব করতে পারি আপনাদের অসহায়তা। এখন আপনি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছেন। নাগরিকত্ব আইনের সাম্প্রতিক সংশোধনীর বলে আপনি এবার নাগরিকের তকমা পেয়ে যাবেন। কারণ আপনি হিন্দু, আর আপনি পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন বাংলাদেশ থেকে। আর কী চাই! আপনার বাড়ির দরজায় এসে আপনার হাতে এবার তুলে দেওয়া হবে নাগরিকত্বের সার্টিফিকেট। উল্লাস! উল্লাস!!

 

দাঁড়ান বন্ধু। এত দ্রুত উচ্ছ্বসিত হবেন না। একটু শুনে যান। আপনারই কাজে লাগবে। আপনি শুনেছেন বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আসা হিন্দুরা এই সংশোধনীর বলে নাগরিকত্ব পাবেন। ঠিকই শুনেছেন, তবে কতগুলো শব্দ বাদে। তাহলে আসুন, সাম্প্রতিক সংশোধনীর বয়ানটা একবার পড়ে দেখা যাক। হ্যাঁ, মূল ইংরেজি বয়ান আর তার বাংলা অনুবাদ দুটোই দেখে নেওয়া যাক। এই সংশোধনীর দ্বিতীয় ধারায় বলা হয়েছে –

 

‘In the Citizenship Act, 1955 (hereinafter referred to as the principal Act), in section 2, in sub-section (1), in clause (b), the following proviso shall be inserted, namely:—

 

"Provided that any person belonging to Hindu, Sikh, Buddhist, Jain, Parsi or Christian community from Afghanistan, Bangladesh or Pakistan, who entered into India on or before the 31st day of December, 2014 and who has been exempted by the Central Government by or under clause (c) of sub-section (2) of section 3 of the Passport (Entry into India) Act, 1920 or from the application of the provisions of the Foreigners Act, 1946 or any rule or order made thereunder, shall not be treated as illegal migrant for the purposes of this Act;”’

 

অর্থ কী দাঁড়াল? নাগরিকত্ব আইনের দ্বিতীয় ধারার প্রথম উপধারার অন্তর্গত দ্বিতীয় দফায় “illegal migrant” অর্থাৎ অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। সেই দফায় বর্তমান সংশোধনীর বলে সেই সমস্ত মানুষদের অব্যাহতি দেবার কথা বলা হল -

 

 ক) যারা ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৪ তারিখের আগে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ অথবা পাকিস্তান থেকে ভারতে প্রবেশ করেছেন এবং হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি অথবা খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী

 

এবং

 

খ) পাসপোর্ট (ভারতে প্রবেশ) আইন, ১৯২০-র তৃতীয় ধারার দ্বিতীয় উপধারার তৃতীয় দফায় যাদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে

 

এবং

 

গ) বিদেশী আইন, ১৯৪৬ কিংবা তার অধীনে রচিত বিধি কিংবা কোনো প্রশাসনিক নির্দেশে যাদের সেই আইনের পরিধি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে

 

 আপনি শুধু প্রথম অংশটাই শুনেছেন। কিন্তু পড়তে হবে সবটা মিলিয়ে। তিনটি শর্তই আপনাকে পূরণ করতে হবে। এবারে দ্বিতীয়টা নিয়ে শুনুন। ১৯২০ সালের পাসপোর্ট আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় স্পষ্ট ভাষায় কিছু না বলে বিধি-র উপর সমস্ত দায়িত্ব অর্পণ করেছে। তাহলে সেই বিধির সংশ্লিষ্ট অংশটা একবার দেখা যাক।

 

১৯৮০-র সংশোধনীর পরে এই বিধির চতুর্থ অনুচ্ছেদে পাসপোর্ট ও ভিসা ছাড়া ভারতে প্রবেশের অধিকার আছে শুধু এদেরই –

 

১/ ভারতের স্থল, নৌ এবং বিমান বাহিনীর কোনো কর্মী যদি সরকারি কাজের প্রয়োজনে ভারতে আসেন এবং তার পরিবারের সদস্যরা যদি তার সঙ্গে থাকেন এবং সরকারি পরিবহনে যাতায়াত করেন।

 

২/ ভারতে বসবাসকারী কোনো মানুষ যদি নেপাল কিংবা ভুটানের সঙ্গে ভারতের সীমান্তকে স্থলপথ অথবা আকাশপথে অতিক্রম করে ভারতে আসেন

 

৩/ কোন নেপালি অথবা ভুটানি যদি নেপাল কিংবা ভুটানের সঙ্গে ভারতের সীমান্তকে স্থলপথ অথবা আকাশপথে অতিক্রম করে ভারতে আসেন

 

৪/ কোনো ভারতে বসবাসকারী মুসলিম তীর্থযাত্রী যদি জেড্ডা অথবা বসরা থেকে দেশে ফেরেন

 

২০১৫ সালে এই বিধিতে সংশোধনী এনে ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৪-র আগে বাংলাদেশ আর পাকিস্তান থেকে ধর্মীয় উৎপীড়নের কারণে কিংবা ধর্মীয় উৎপীড়নের ভয়ে  হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি অথবা খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী যে সমস্ত মানুষ ভারতে প্রবেশ করেছেন, তাদেরও ছাড় দেওয়া হয়েছে। একইভাবে ২০১৫ সালের নোটিফিকেশনের মাধ্যমে বিদেশী আইন, ১৯৪৬ থেকেও এদের রেহাই দেওয়া হয়েছে। আর এখানেই রয়েছে আদত সমস্যা। 

 

আপনি বাংলাদেশ বা পাকিস্তান থেকে ভারতে এসেছেন নির্ধারিত তারিখের আগেই। বেশ। কিন্তু তাহলেই কি আপনি পাসপোর্ট আইন বা বিদেশী আইনের প্রকোপ থেকে ছাড় পাচ্ছেন? না। আপনাকে জানাতে হবে যে ধর্মীয় উৎপীড়নের কারণে অথবা সেই ভয়ে আপনি চলে এসেছেন। ঘোষণা করে দিতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু প্রমাণ করবেন কীভাবে?

 

ধরা যাক তসলিমা নাসরিনের কথা। বাংলাদেশ সরকার তাঁর নাগরিকত্ব খারিজ করে দিয়েছিলেন। তিনি স্বচ্ছন্দে প্রমাণ করতে পারবেন। এতদসত্ত্বেও বারবার আবেদন করেও তিনি কিন্তু ভারতীয় নাগরিকত্ব পাননি। দীর্ঘকালীন ভিসায় তাঁকে ভারতে থাকার অনুমতি দেওয়া, এই মাত্র।  আপনি যে ধর্মীয় উৎপীড়নের কারনেই বা সেই ভয়েই পালিয়ে এসেছেন, তার এক ও একমাত্র প্রমাণ হল আপনি যে সেই দেশের পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছেন, তার লিখিত নিদর্শন। কিংবা সেই দেশের সংবাদ মাধ্যমে আপনার উপর অত্যাচার নিয়ে সংবাদ প্রকাশ পেয়েছে, সেটাও একটা নথি হতে পারে। প্রশ্ন হল, এগুলো কি আছে আপনার কাছে? সম্ভবত নেই। বিশেষ করে সেই দেশের কোনো থানায় আপনার এমন অভিযোগ নেবে, এটা পাগলেও কল্পনা করবে না।

 

হয়তো আপনার বাড়িতে হামলা হয়েছে, কিংবা রাস্তায় আপনার উপর আক্রমণ হয়েছে, সেই অভিযোগ আপনি থানায় করেছিলেন। কিন্তু সেটা যে নিছক ধর্মীয় কারণেই হয়েছিল, তার প্রমাণ আছে? আপনি তো সাধারণ মানুষের সঙ্গে আর্থিক প্রতারণা করার কারণেও আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন। তাহলে? কিংবা আপনি তো কোনো অপরাধ করে শাস্তি পাবার ভয়েই পালিয়ে আসতে পারেন। তাহলে কি আপনি রেহাই পাবেন? পাবেন না, আইনের বয়ান অনুযায়ী পাবার কথা নয়। একমাত্র ধর্মীয় উৎপীড়ন অথবা তার আশঙ্কাই আপনার রক্ষাকবচ। এখনো পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট আইনদুটিতে এমন কোনো কথা যুক্ত হয়নি যার ভিত্তিতে বাংলাদেশ কিংবা পাকিস্তান থেকে কোনো হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি অথবা খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী ভারতে চলে এলেই তাকে ধর্মীয় উৎপীড়নের কারণে কিংবা সেই আশঙ্কায় পালিয়ে এসেছেন বলে গণ্য করা হবে।

 

লাফাচ্ছেন, লাফান। কিন্তু একটু ভেবেচিন্তে লাফান। অতিরিক্ত লাফাতে গেলে পড়ে গিয়ে আপনারই হাত-পা ভাঙার আশঙ্কা আছে। মাথায় রাখবেন, ইতিমধ্যে যেভাবেই হোক আপনি যদি রেশন কার্ড, ভোটার কার্ড, আধার কার্ডের বন্দোবস্ত করে ফেলে থাকেন (অবশ্যই ঘুরপথে) তাহলে কিন্তু আপনার বিরুদ্ধে সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে মিথ্যে তথ্য দেবার  অভিযোগ উঠতে পারে। যার জন্য আপনাকে শাস্তি পেতে হতে পারে। 

 

বাস্তবত আসামের NRC-তে নাম না থাকা ১৯ লক্ষ মানুষের সামনে আজ এই সমস্যা দেখা দিয়েছে। তারা যদি সাম্প্রতিক সংশোধনীর সুযোগ নিতে চান, তাহলে এতদিন তারা নিজেদের ভারতীয় নাগরিক হিসাবে যে সব প্রমাণ দাখিল করেছেন, সেগুলো হয়ে যাবে মিথ্যে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যে। আর সেই সুযোগে তাদের বিরুদ্ধে যে কেউ সরকারের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগ আনতেই পারেন। সেই অভিযোগের হাত থেকে কিন্তু রেহাই পাওয়া যাবে না। ডিটেনশন ক্যাম্পের বদলে সরাসরি জেলেই স্থান খুঁজে নিতে হবে। আর অ-নাগরিক হিসাবে আইন ভাঙার কারণে ভবিষ্যতে নাগরিকত্ব পাবার রাস্তাটাও চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।

 

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com