ইউরোপিয়ান কমিউনিটি ছাড়তে কেন এত দোলাচল

 

 শেষ হল ব্রিটিশ জনতার বহু প্রতীক্ষিত ব্রেকজিট সফল করার পদক্ষেপ নিয়ে। ব্রেকজিট মানে (Britain+ Exit) ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের বাঁধন ছিঁড়ে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে আসার আইনি প্রক্রিয়া। এই বাঁধন ছেড়া যে কত কঠিন কাজ ছিল,  ২০১৬-য় প্রক্রিয়া শুরু হতেই বোঝা গিয়েছিল। কারণ ব্রেকজিট বিতর্কে পার্লোমেন্টের অভ্যন্তরীন দ্বন্দ্ব যেমন চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তেমনি দরকষাকষিতে EU-এর নেতাদের সঙ্গেও সৃষ্টি হয় জটিল পরিস্থিতির।

তবে ব্রেকজিটের শক্তিশালি প্রতিপক্ষ ছিল House of Commons-এর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাংসদরাই। যাঁরা যুক্তরাজ্যের থেকেও নিজের আঞ্চলিক, দলীয়, এমনকি ব্যক্তিগত ইস্যুকেও প্রাধান্য দিতে বেশি মরিয়া। যে কারণে ব্রেকজিট বাস্তবায়নের উদ্যোক্তা রক্ষণশীল দলের ডেভিড ক্যামেরনকে প্রধানমন্ত্রীত্ব ছাড়তে হয়েছে। তাঁর উত্তরসুরি হিসেবে পদত্যাগ করে মূল্য দিতে হয়েছে প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মেকে। ২০১৯-এর আগষ্টে বরিস জনসন রক্ষণশীল দলের সাংসদদের ভোটে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি ব্রেকজিটের কাণ্ডারি। ব্রেকজিট সমর্থকদের যুক্তি হলো, ভবিষ্যত জেনারেশনের কল্যাণের কথা ভেবেই তাঁদের ইউরোপিয় কমিউনিটি ছাড়া প্রয়োজন। কেননা তাহলেই ব্রিটেনের পক্ষে সম্ভব হবে ব্যবসাবানিজ্য, মাইগ্রেশন এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলোতে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ছাড়ার ভাবনা গোড়া থেকেই ইকোনমিক ইস্যু হয়ে ব্রিটেনের সামনে ঝুলে ছিল। ১৯৭২ সালে প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্থ হিথ (কনজারভেটিভ পার্টির) যখন ইউনিয়ন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন, অসন্তোষ ছড়িয়েছিল তখনই। লেবার পার্টির অনেক নেতারাই এর বিরোধিতা করেছিলেন। করজারভেটিভ দলের সব নেতারাও সন্তুষ্ট হতে পারেননি। কারণ ইউরোপের তিন নম্বর দরিদ্র দেশ হওয়া সত্ত্বেও তুলনামূলকভাবে EU-এর বাজেট তহবিলে বেশি অর্থ দিতে হয়েছিল ব্রিটেনকেই। সে নিয়ম আজও চলছে। ৭৪ সালে লেবার পার্টির হ্যারল্ড উইলসন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েই তাই গণভোট দিয়েছিলেন ৭৫-এর ৫ জুন। ৬৭% ভোট পড়েছিল কমিউনিটিতে থেকে যাওয়ার জন্য। রক্ষণশীলদের মতো বামদলের নেতারাও সেদিন চুক্তির পক্ষেই রায় দিয়েছিলেন। সম্ভবত পরপর দুটি বিশ্বযুদ্ধের কথা মনে রেখে আন্তর্জাতিকভাবে নিরাপত্তা পেতে, শক্তিশালি অর্থনীতির প্রয়োজনে ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত থাকাটা তখন জরুরি মনে হয়েছিল।    

যাইহোক, EU-এর বাজেটে বেশি অর্থ দান এবং আরও কিছু ইস্যু নিয়ে ৮৪-তে প্রথমবার লিখিতভাবে প্রতিবাদ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থেচার। কিন্তু তখনো তাঁর অতি উৎসাহে দলের ভেতর থেকেই (কনজারভেটিভ দল) চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল তাঁর ওপরে। ৯০-এর নভেম্বরে থেচার তাই পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। চিত্রটা এরপর পাল্টে গিয়েছিল ৯৭-তে লেবার পার্টির টনি ব্লেয়ার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে। নতুন বামপন্থী ঘরানায় স্বদেশবাসীর মানসিকতা বদলে দিয়েছিল। ব্লেয়ারের পরে লেবার পার্টি থেকে প্রধানমন্ত্রী হন গর্ডন ব্রাউন। EU-এর মেম্বারশিপ নিয়ে ২০১০ অবধি আর কোনো উচ্চবাচ্চই হয়নি যুক্তরাজ্যে। ২০১১-য় প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন ডেভিড ক্যামেরন। ততোদিনে বিশ্বরাজনীতির দিকদর্শন পাল্টে গিয়েছে EU-এর পলিসিমেকারদের বিভিন্ন আত্মঘাতি সিদ্ধান্তের কারণে। ২০১৫-য় ৬৫০টি সংসদীয় আসনের ৩৩১টি পেয়েই ক্যামেরন তাই ইউনিয়নের গ্রন্থি কেটে ফেলতে উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। ২০১৬-এর ২৩ জুন গণভোট অনুষ্ঠিত করেন। রায় যায় ব্রেকজিটের পক্ষেই। কিন্তু যুক্তরাজ্যের ইতিহাসও তখন থেকেই বন্দী হয়ে পড়ে জটিল চ্যালেঞ্জের মধ্যেও।             

ব্রেকজিট সিদ্ধান্তের পেছনে মূল ইস্যু চারটি। এক: National Sovereignty. দুই: Immigration Policy. তিন: Financial and Economic Regulation. চার: Competitiveness. নিচে সংক্ষেপে এ সমন্ধে আলোচনা করা যাক। 

জাতীয় সার্বভৌমত্ব: সাধারণত রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় জাতীয় সার্বভৌমত্ব বলতে বোঝায় স্বাধীন রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট সরকার এবং নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে অধিকার প্রতিষ্ঠা। অর্থাৎ কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ছাড়া জাতীয় পলিসি নিজ ইচ্ছানুসারে গ্রহণ এবং পরিচালনা করার স্বাধীনতা। ব্রেকজিটের ক্ষেত্রে সেটা নয়। যুক্তরাজ্য স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। ইউনিয়ন ছেড়ে বেরিয়ে আসার স্বাধীনতা তার রয়েছে। যেমন ১৯৬২-তে স্বাধীনতালাভের পরে আলজেরিয়া বেরিয়েছিল। ১৯৮৫-তে গ্রীনল্যাণ্ড বেরিয়েছে গণভোটের মাধ্যমে। ২০১২-য় সেইন্ট বার্থেলেমি(ফ্রেঞ্চ স্পিকিং ক্যারিবিয়ান আইল্যাণ্ড) সদস্যপদ ছেড়েছে। এখানে জাতীয় সার্বভৌমত্বের পক্ষে অন্তরায় হলো ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন কাউন্সিলের বিভিন্ন শর্ত এবং সদস্য রাষ্ট্রের ওপরে আরোপিত আইনকানুন। যা মানতে গেলে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক অধীনতা বেড়ে যায়। এ কারণেই  ব্রেকজিটকে মনে করা হচ্ছে, ‘Brexit is a fight for the very Sovereignty of our Nation. The Brexit calamity is a cautionary tale about the complexities of exercising national sovereignty in age of interdependence', (James Forsyth, Dec 15, 2018, The Spectator).                                                                                  

অভিবাসন নীতিমালা: EU-এর উদার অভিবাসন নীতির কারণে আশির দশক থেকেই ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোয় অতিরিক্ত মাইগ্রেশন ঘটেছে। বিশেষত যুক্তরাজ্য বৈধ-অবৈধ শরণার্থীদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে অনেক আগেই। EU-এর ইমিগ্রেশন পলিসিতে দুই ধরণের ইমিগ্র্যান্টদের জন্যই সামঞ্জস্যবিধানের আইনকানুন থাকায় আশ্রয়প্রার্থীদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ে মরক্কো, তুরস্ক, পাকিস্তান, আলবেনিয়া, মিশর, লিবিয়া, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়ার অভিবাসীদের ভিড়ে। ২০০৪ সালে EU-এর নাগরিকেরা যেমন, তেমনি অবৈধরাও অবাধ চলাচলের ছাড়পত্র পেয়ে যায়। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সামাজিক (অপরাধ বৃদ্ধি), অর্থনৈতিক এবং জাতীয় রাজনীতিতে। এরপর ২০১০ থেকে ২০১৬-এর মধ্যে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ, সিরিয়া, ইরাক, লেবাননের লক্ষ লক্ষ যুদ্ধবিধ্বস্ত রিফিউজিরা ইউরোপকে যখন সীমাহীন সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়, তখন কমিউনিটির কর্তাব্যক্তিদের বোধোদয় হতে শুরু করে। কিন্তু মূল সমস্যার সমাধান তাতে হয়নি। কারণ কিভাবে ইমিগ্রেশন পলিসির সংস্কার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, সে উপায় তাঁদের জানা নেই।   

জাতীয় অর্খনীতি নিয়ন্ত্রণ: ইউনিয়নের নীতিনির্ধারকেদের বহু সিদ্ধান্তের সঙ্গেই লণ্ডনের অবস্থান পরস্পরবিরোধী। সেসব সিদ্ধান্ত থেকে তাই সরে থেকেছে যুক্তরাজ্য। যেমন সীমান্ত বাতিলের চুক্তি কিংবা ইউনিয়নভুক্ত রাষ্ট্রে কমন কারেন্সি হিসেবে ইউরোর ব্যবহার, ব্রিটেন সমর্থন করেনি। ২০০৪ সালে  EU-এর সব নাগরিকদের UK-তে অবাধ চলাচলের সুযোগ দেওয়ার দাবী উঠলে অসন্তোষ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। কেননা ক্রাইমের ঘটনা বাড়ার মূলে অবাধ চলাচলের ছাড়পত্র। এছাড়া হঠাৎই অতিরিক্ত জনসংখ্যার আগমন এখানকার জাতীয় অর্থনীতিতেও তীব্র চাপ বাড়ায়। ২০০৪ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে ৩০০০০০ মানুষ প্রবেশ করেছে যুক্তরাজ্যে। যার সিংহভাগই ছিল আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং পূর্ব ইউরোপের মানুষ। ব্রেকজিট সমর্থকদের তাই অভিযোগ-The EU threatens UK's trade, investment and stifles its economic growth.

সার্বিক প্রতিযোগিতা : আধুনিক বিশ্ব তীব্র প্রতিযোগিতার বিচরণভূমি। যার কোনো সীমারেখা নেই। প্রযুক্তির উন্নয়ন যত ঘটেছে, বিশ্বায়নের ক্ষেত্রে রাজনীতির প্রভাব যত বেড়েছে, রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বিতাও ততোই বেড়ে গিয়েছে দ্রুত। রাষ্ট্রের প্রতিযোগিতার পেছনে থাকে জাতির ভালো থাকার বিষয়টিকে নিশ্চিত করা। কিন্তু মানুষের জীবনে ভালো থাকার আকাঙ্ক্ষার শেষ নেই। অতএব চাহিদার তালিকা বাড়তে বাড়তে যেমন নাগরিকের জীবনে, তেমনি প্রতিযোগিতার চ্যালেঞ্জ বেড়েছে রাষ্ট্রের সামনেও। এই চ্যালেঞ্জে পড়েই গ্রেট ব্রিটেন সার্বিক উন্নয়নের জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে নিশ্চিত করতে চায়। ২০১৮-এর World Economic Forum-এর রিপোর্ট অনুসারে ২০০৭ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল গড়ে ১০০-এর মধ্যে ২৩ পয়েন্ট। সবচেয়ে বেশি পয়েন্ট ২০১৭-য়, ৮২.১১। সর্বনিম্ন ২০১০ সালে, ৫.১৮। অর্থাৎ যু্ক্তরাজ্যে স্থিতিশীল অর্জন বজায় নেই। ব্রেকজিট সমর্থকরা এরজন্য EU-এর পলিসিকেই দায়ী করেছেন। কারণ বর্তমান বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার জন্য যে ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার, ইউনিয়নের নানা শর্তের ভেতর আটকে থাকায় ইউনাইটেড কিংডম সেক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে পদক্ষেপ ফেলতে পারছে না। 

             

                                   

 

 

 

 

 

 

 

 

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com