সময়ের অলিন্দে 'সময় রক্ষক'

 

 

একটা কাজে গেছিলাম জলপাইগুড়ি । আগস্টের শেষাশেষি । নিউ মাল জংশন থেকে কাঞ্চনকন্যায় উঠলাম । আমাদের নির্দিষ্ট সিটে গিয়ে দেখলাম দুজন বয়স্ক ভদ্রলোক বসে আছেন । তারমধ্যে একজন বেশ ছিপছিপে, বয়স সত্তরের আশেপাশে । জিজ্ঞেস করে জানলাম ওনার সিট পড়েছে আপার বার্থে । বয়ষ্ক মানুষ, উঠতে অসুবিধা হবে ভেবে বললাম, যে আপনি নিচে আমার সিটে শুতে পারেন, আমি আপনার বার্থে চলে যাবো। উনি বললেন, না না আমার সিঁড়ি চড়তে কোনো অসুবিধা নেই । তখন ভাবিনি এ কথার কি তাৎপর্য !!

 

তারপর কথায় কথা বাড়লো । উনি বেশ মিশুকে । কোথায় গেছিলেন, জিজ্ঞেস করাতে বললেন, ভুটানের গোমটু । পেনডেন সিমেন্টের অফিসে । অডিট বা এরকম কোনো কাজে? উত্তরে উনি যা বললেন, তাতে বুঝলাম আমার জানাশোনা কাজের বাইরে কত বড় জগৎ পড়ে আছে । উনি গেছিলেন পেনডেন সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে একটি ক্লক টাওয়ার আছে, তার দেখভাল করতে !! সিঁড়ি দিয়ে ওঠা তো ওনার কাছে জলভাত !!!

 

স্বপন দত্ত, ওনার নাম । কলকাতার 'সময় রক্ষক' । কলকাতার যত ক্লক টাওয়ার আছে, তার উনিই রক্ষাকর্তা। ভারতেরও বহু ক্লক টাওয়ারের দেখভাল ওনার হাতেই । চার পুরুষ ধরে ওনারা এই কাজেই জীবন যৌবন সঁপেছেন । ওনার প্ৰপ্ৰপিতামহ ছিলেন ধরণীধর দত্ত । তিনি ঘড়ির কাজ করতেন বিখ্যাত ' কুক এন্ড কেলভি' কোম্পানিতে । তখন কলকাতায় বিভিন্ন ক্লক টাওয়ার তৈরী হচ্ছে, ওনার ওপর দায়িত্ব পড়লো এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের । সেই থেকে সময় ধারা বয়ে চলেছে । কলকাতায় ভারতের মধ্যে সবথেকে বেশি হেরিটেজ ক্লক টাওয়ার আছে, যার প্রত্যেকটি দেখভালের দায়িত্ব এই দত্ত ফ্যামিলির ।

 

আজ তিনশো বছর ধরে ওনারা কলেজ স্ট্রিট অঞ্চলের বাসিন্দা । ওনারা নয় ভাই , শুধু উনিই এখনো এই প্যাশন ধরে রেখেছেন। ওনার দুই ছেলে, তার মধ্যে বড় ছেলে সত্যজিৎ ওনার ব্যাটন হাতে তুলে নিয়েছেন । এক অদ্ভুত উজ্জ্বল চোখে উনি বলে চলেছিলেন এইসব হেরিটেজ ক্লক টাওয়ারের গল্প ।

 

কুড়ি বছর বয়সে প্রথম একা কলকাতার সেন্ট ক্যাথিড্রাল চার্চের ক্লক টাওয়ার দেখভাল করতে গেছিলেন । কর্মকর্তারা বিশ্বাসই করেননি ওনাকে । কাজ শেষ হওয়ার পর ওনারা উচ্ছসিত হয়েছিলেন । তারপর, আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি ।

 

আজ উনি এবং ওনার ছেলে কলকাতার সব ক্লক টাওয়ার তো বটেই, ভারতের বিভিন্ন হেরিটেজ ক্লক টাওয়ার দেখাশোনা করেন । প্রচুর গল্প করলেন কলকাতা ও ভারতের অমূল্য, জটিল সব ক্লক টাওয়ার নিয়ে । তার মধ্যে ওনার সবচেয়ে প্রিয় পাটনা বিধানসভার ক্লক টাওয়ার, তার গঠনশৈলী ও কারুকাজ নাকি অপূর্ব । এছাড়াও কাঠমান্ডুর কিংস টাওয়ার, হরিদ্বারের হর-কি-পৌরি'র ক্লক টাওয়ার, কাপুরথালা ক্লক টাওয়ার, সিমলা মলে বিএসএনএল ক্লক টাওয়ার, দার্জিলিঙে ভানু ভক্ত বিল্ডিঙের ক্লক টাওয়ার হলো গুটিকয় নাম যেগুলো ওনাদের দায়িত্বে আছে ।

 

কলকাতার লেক টাউনে লন্ডনের বিগ বেনের আদলে যে ১৩৫ ফিট উঁচু ক্লক টাওয়ার, তার ঘড়ির সমস্ত কিছু ওনার করা । ওনার কৃতিত্ব হলো অনেক কম রিসোর্স নিয়ে উনি নিখুঁতভাবে ওটা করেছেন । আরো একটা মজার গল্প বললেন, শিবপুর ইঞ্জিয়ারিং কলেজে পুরোনো জিনিসপত্রের মধ্যে হঠাৎ এক যন্ত্র পাওয়া গেছিলো । বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ বিভিন্ন মত দিলো, ভূমিকম্প মাপার যন্ত্র থেকে হরেক রকম । উনি বলেছিলেন এটি একটি ঘড়ি, এবং সেটা উনি প্রমাণও করেছিলেন।

 

জীবনে কোনোদিন কোন প্রথাগত শিক্ষা নেননি উনি বা ওনার ছেলে । ওনাদের জিনে আছে এই মেকানিক্যাল ঘড়ির প্রতি প্যাশন। এমনকি ওনার চার বছরের নাতনি পর্যন্ত পাশে বসে ঘড়ির বিভিন্ন জটিল কলকব্জা নিয়ে নাড়াচাড়া করে এখনই ।

 

এই বয়সে এসেও আপনি এখনো এত প্যাশনেট? ওনার বক্তব্য ' ঘড়ির পেন্ডুলামই আমার হার্টবিট। আমি ঘড়ির টিক-টকের সাথেই সুরে তালে বাঁধা পড়ে গেছি'।

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com