সেদিন পাবলিক বাসে আসছি কোলকাতার রাসবিহারী থেকে , যাব সি এম আর আই । শীতের সন্ধ্যে হলেও দুদিন হঠাৎ বর্ষার টানাপোড়েন গেছে শহরটার ...  সদ্য ভিজে শহর যেন একটু বেশিই জবুথবু । হাজরায় পৌঁছতেই একটা হালকা কোলাহল হাতে জনা দশ পনেরো লোক একসাথে উঠে পড়ল বাসে , তবে সে কোলাহলে একটা শ্রী ছিল। মোটের ওপর বাসটি খালি-ই। যে যেখানে পারল নিজেদের গুছিয়ে জায়গা করে নিল । দু-চারজন ছাড়া সকলেই সিটে বসে নিজেদেরকে মশগুল করে রেখেছে নিজেদের বৃত্তে । আমি  বাস ড্রাইভারের কাছাকাছি সংলগ্ন সিটে , ওদের বেশ কিছু সঙ্গী আমার আশেপাশে জায়গা করে নেবার সময় ইঙ্গিতপূর্ণ দৃষ্টিতে সৌজন্যপূর্ণ হাসি বিনিময় সেরে নিল সহজেই , একজন বয়স্কা আমার শরীরেই ভর দিয়ে পাশের সিটে এসে বসলেন । তাদের সাজগোজ তাৎক্ষণিক আচরণ এবং নিজেদের মধ্যে কথোপকথনের ভাষা বলে দিচ্ছিল ওরা উড়িষ্যাবাসী। আমার মধ্যে ওড়িয়া ভাষার জ্ঞান যতটুকু , তা দিয়ে  বুঝলাম ওরা কোলকাতায় বেড়াতে এসেছে আর সকলেই নিজেদের ঘনিষ্ঠ এবং একজন বয়োজ্যেষ্ঠ রয়েছেন যিনি সকলকে নানান ব্যাপারে নির্দেশ দিয়ে চলেছেন,  আর সকলেই তাকে মান্যতাও দিয়ে চলেছে ।

এভাবেই এগোচ্ছিল বাস, ওরা আমার এতটাই  কাছাকাছি যে ওই সময় আমার সব দৃষ্টি জুড়েই ওদেরকে ছাড়া  সেই মুহূর্তে অন্য কিছু ভাববার অবকাশ নেই । তবে এটাও অস্বীকার করার নয় যে ওদের কথা , ওদের কোলকাতা সম্পর্কে কৌতুহল সর্বোপরি ওদের আচরণের সৌজন্যবোধ আমার ওই সময়টুকু ছেয়েছিল, কোলকাতায় হঠাৎ পাওয়া শীতের মতন। ।

 

কিছুক্ষণের মধ্যেই আর পাঁচটা অনুমেয় দিনের মত যাত্রী সংখ্যায় বাস ভরে উঠল।শুরু হল সাধারণ যাত্রীদের নানান ধরনের বাক্য বিনিময়, আর সেটা সবটাই ওই পর্যটকদের  ঘিরে । আশ্চর্য রকম ভাবে দেখলাম ওই অল্প সময়ে, বাসের যাত্রীরা দেশভাগের মত দুটো ভাগে নিজেদের ভাগ করে ফেলেছে -- আমি এবং আমার পাশে বসে থাকা একজন মহিলা যাত্রী ছাড়া, বাসে ওঠা স্থানীয় প্রায় সব যাত্রীদের কাছেই ঊড়িষ্যাবাসী পর্যটকেরা সেইসময় একপ্রকার দ্রষ্টব্য জীব। কিন্তু ওই গুটিকয়েক ভীন রাজ্যবাসী তখনও নিজেদের নিয়েই  মশগুল। যত সময় এগিয়েছে ততই বাসের যাত্রীরা ওই পর্যটকদের নিয়ে হাসি বিদ্রুপ, নানা অসুবিধে সৃষ্টি করে তাদের হেনস্থা করা , এমন কি একসময় তো একজন মহিলা এসে আমার পাশে বসে থাকা উড়িষ্যাবাসী এক বয়স্কার ওপর বসে পড়লেন প্রায় জোর করেই। তিনি ব্যাথায় চীৎকার করে উঠলেন । আমি তাকে বাধা দিতে গেলে তিনি বলে উঠলেন, 

-- আপনার তো কেউ হয়  না ওরা;

আমি কিছুটা থতমত খেয়ে বললাম, 

-- ভাবুন তো একবার,  আপনি যখন ওদের জায়গায় বেড়াতে যাবেন, এই ব্যবহার পেলে আপনার কেমন লাগবে?

আমার কথা শুনে সে উদাসীন ভাবে মুখ ঘুরিয়ে নিল।

এই কোলকাতাই তো ফ্লিম ফেস্টিভ্যাল দেখে, কখনও বা ইডেনে প্রতিবেশী দেশের সাথে ক্রিকেট খেলায় উদ্দাম , বইমেলায় দেশী বিদেশী লেখার সাথে ধুলো মাখে আবার লেলিহান আগুনের মুখ থেকে মানুষকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেদের জীবন কে কিছু না ভেবেই বাজী রেখে ফেলে ! তবে আজ কেন ?

বার বার আমার এটাই মনে হচ্ছিল, বাসের প্রতিটি যাত্রী কোন জাদুবলে আজ এইটুকু সময়ে একই ভাবনাদর্শে উদ্দীপিত হলেন যে উপহার স্বরূপ ব্যবহারে অমন উপচে পড়া রাজকীয় সম্ভার ; অথচ কোন সাধারণ বা বিপদসংকুল অবস্থায় এই মানুষ গুলোই অবাক করা নির্লিপ্ততায় মগ্ন থাকেন , অথবা যখন শুনি পথ চলতি কোন মানুষ অসুস্থ অবস্থায় বিনা জল, বিনা চিকিৎসায় পথেই শেষ হয়ে গ্যাছে ! 

এমন করেই বুঝি  আমাদের মানসিক নিকৃষ্টতা অতি সহজেই সস্তায় বিক্রি হয়,  হয়ত আগামী-কে আমাদের কিছুই দেওয়ার নেই ।

কতবার কোথায় যেন শুনেছি,  কোলকাতাবাসী খুব সহজেই বৈচিত্র্যে গা ভাসায় , যে কোন দূর-কে আপন করে নিতে কোলকাতার জুড়ি মেলা ভার, বোধ হয় সেটা কোনো নিম্ন মানের দ্রব্য বিকোনোর বিজ্ঞাপন ছিল।

সময় সময়ে আমি ভেতর থেকে প্রতিবাদ করে উঠছিলাম, একসময় এ-হেন চক্ষুলজ্জা ঢাকতে গিয়ে সাধারণ কথা বলার ভঙ্গিমায় নিজেকে এগিয়ে দিলাম,  

-- আপনারা কোলকাতায় বেড়াতে এসেছেন ? ওরা সাবলীল বাংলা ভাষায় আমাকে উত্তর ফিরিয়ে দিল

-- হ্যাঁ,  আমরা কুড়ি জন বেড়াতে এসেছিলাম ,  তিনজন পথে হারিয়ে গেছে, এখন সতেরো জন আছি । কালীঘাট মন্দির দেখতে যাব একদিন ।

-- এখন কোথায় যাচ্ছেন?

-- বড়ো বাজার,  ওখানে শুনেছি অনেক জিনিস পাওয়া যায়।

-- কিন্তু এখন তো রাত আটটা , সব দোকান বন্ধ, কোথায়  যাবেন? একথা শুনেই তারা নিজেদের মধ্যে কথোপকথনে অস্থির হয়ে উঠল ।

এরই মধ্যে বাসের যাত্রীদের ভেতর থেকে কটূক্তি এমনকি গালিগালাজ'ও ভেসে আসছিল ওদের উদ্দেশ্যে । আর ওরা অসহায়ের মত পরস্পরের দিকে তাকিয়ে ।

কেন কে জানে আমি লজ্জায় মিশে যাচ্ছিলাম।বাসের কন্ডাক্টর যথাসময়ে ন-টাকা হিসেবে ওদের সকলের ভাড়া নিয়ে গ্যালো  শুধু বাসের যাত্রীদের ব্যবহারের  উপঢৌকনটুকু তার চোখ এড়িয়ে কোলকাতার নান্দনিক সৌন্দর্যে শীতের রাস্তায় পথ হারাল । বুঝলাম মানুষ কেমন নিজের মত করে সময় সময়ে ঝাপসা দেখে, হয়ত বা দেখতেই পায় না ।

আমি সি এম আর আই নেমে পড়লাম । ওরা সম্ভবত আমার কথায় বড়োবাজার বন্ধ শুনে হোটেল ফিরে যাবে সিদ্ধান্তে আমার সাথেই নেমে পড়ল। কিন্তু কয়েকজন বাস থেকে নামার পর বাকীদের রেখেই বাস ছেড়ে চলল , ওরা অসহায়ের মত চীৎকার করতে করতে বাসের সাথে ছুটে গ্যালো ।

 

ফেরার পথে হাঁটতে হাঁটতে এটাই মনে হল, সমগ্র ভারতবাসীর মনের মধ্যে আঞ্চলিক বৈষম্য যেখানে এত প্রবল , সেখানে হিন্দু-মুসলমান প্রেম এটা যে অনেক দুরস্ত আর সেটাই নানাবিধ ফন্দিতে রাজনৈতিক নেতারা কাজে লাগিয়ে চলছে আপন স্বার্থে অনন্তকাল যাবৎ।

সারা দেশ যখন বিশিষ্ট গুটি দুই-তিন ধর্মের গ্রন্থন ধ্বজা নিয়ে উত্তাল,  সেখানে খোদ কোলকাতার স্বাধীন  উচ্চ মননশীলতার পরিচয় দিয়ে চলা কতিপয় মানুষেরা , হ্যাঁ বলা ভালো বিভিন্ন ভাষাভাষী-সমাহারে সাজানো শহরের রুচিশীল মানুষদের  , অমন শৌখিন শ্রেণীভাগ করার প্রবণতা আমার কাছে অসহনীয় তো বটেই,  অরুচিশীল ।

 

' শব্দটি এ ক্ষেত্রে উহ্য'ই রাখলাম , মানবিকতা-- সে তো বর্তমানার্থে প্রায় বিলীন ।

:::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::

 

 

 

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com