দেশের রাজনীতি ও বহুস্বর গণতন্ত্র

 

 

দিল্লীর নির্বাচনী ফল তো সকলেই জানেন। ফল নিয়ে কাটাকুটি খেলা, নাচ, মান-অভিমান অনেক হয়েছে। দেশের তাতে কী লাভ বা ক্ষতি হল? সেটা বুঝতে আর একটু কাটাকুটি খেলা  খেলতেই হয়। 

আপ মেয়েদের ভোট অনেকটা পেয়েছে, কংগ্রেস পায়নি।  বিজেপিও ভোট কিছু তেমন পায়নি, তবে তাদের কথা না হয় পরে আলোচনা করব।

 কংগ্রেসের হাল এমন হল কেন?  

শাহিনবাগের প্রতি অকুন্ঠ ও কার্যত শর্তহীন সমর্থন জানিয়েছে কংগ্রেসই, আপ নয়। তবু, কেন কংগ্রেস তাদের ভোট পেল না? নির্বাচন কেবল তো নাগরিকত্ব আইন নিয়ে নয়।

 

সম্প্রতি(১৭/২), সুপ্রিম কোর্ট তার রায়ে বলেছে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া মেয়েদের পূর্ণ সম্মান ও সমান অধিকারের কথা। কংগ্রেস বা বিজেপি  সরকার তো মেয়েদের পূর্ণ সম্মান ও সমান অধিকারের  নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। আজ প্রতিবাদের যে স্বর বা মূল অভিযোগগুলি থেকে শাহিনবাগ তৈরী হয়েছে তার পেছনে কংগ্রেস বা তার সহযোগী দলগুলির ভূমিকা নেই নাকি? সেসব দলও অত্যাচার করেছে ক্ষমতায় থাকাকালীন, কখনও আইন করে, কখনও আইন ভেঙ্গে ( বিজেপি আমলের অত্যাচার সব রেকর্ড ভেঙ্গে দিয়েছে যে তা মেনে নিয়েও বলতে হচ্ছে একথা)। - কখনও এ রাজ্যে, কখনও ও রাজ্যে এমন ছোট-বড় অধিকার তথা ন্যায্য এবং প্রাপ্য সম্মান আপ ছাড়া অন্য কেউ দিতে পারবে এমন ভরসা তারা পায়নি। 

মহিলারা ভোলেন কেমনে যে কংগ্রেস আমলেই ঘটে 'নির্ভয়া' কান্ড। মহিলাদের ক্ষমতায়ন নিয়ে ক্ষমতায় থাকার সময় কংগ্রেস অনেক প্রতিশ্রুতি দিলেও শিক্ষা বা পুষ্টি বা অন্য ক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্য ঘোচেনি। দিল্লির মহিলারা তাই আর যেন ঐ দলটির পাশে থাকতে চায়নি।

থাকতে চায়নি শিখরাও। তাদের অন্তরের ঘা শুকোয়নি আজও। দলিতরাও ভরসা রাখার কারণ পায়নি, তারা ভরসা করেনি মায়াবতীজির দলটিকেও। 

তবু, মানতেই হয় যে দিল্লি নির্বাচনে আপ ইতিবাচক সমর্থন নিয়েই ফিরেছে।  জল, বিজলি, শিক্ষা, বাসভাড়া ইত্যাদি ক্ষেত্রে আপ সরকার অসহায় দুর্বল মানুষের পক্ষে থেকেছে, প্রতিপক্ষের সঙ্গে কথা বা বিজ্ঞাপনের যুদ্ধে না গিয়ে প্রশাসনিক দক্ষতা ও স্বচ্ছতার পথে হেটেই মানুষের আস্থা ধরে রেখেছে।

 

 কিন্তু কী পেল দেশ 'আপ'-এর কাছে? গণহত্যার কৌশল!

ছোট একটা রাজ্য চালাতে যারা তাদের ওপর ভরসা রেখেছে দেশ চালাতে সেই মানুষগুলো তাদের ওপর ভরসা রাখেনি, এমনকি ভিন্ন রাজ্যের মানুষও আপ-কে সমর্থন করেনি।  ভাগ্যিস!

জয় চেয়েছিনু মহারাজ, জয়ী আমি আজ' - এই তো ক্ষত্রিয়ের ধ্যান-জ্ঞান। তা অরবিন্দ কেজরিওওয়ালজি ক্ষত্রিয় কিনা জানি না, কিন্তু, কেবল ক্ষত্রিয় হলে চলে না, রাজ্যপাট চালাতে ব্রাহ্মণী কৌশলও চাই বুঝি। কৌশল করলেন অরবিন্দজিঃ শপথ অনুষ্ঠানে বিরোধী নেতাদের ছেড়ে তিনি মোদিজির মহামূল্যবান কোটের কোণা ছুয়ে ঝুলে পড়ার চেষ্টা করলেন। যদিও এই আপ থেকেই বিতাড়িত হয়েছেন যোগেন্দ্র যাদব বা প্রশান্তভূষণের মতো নেতারা।  তবু, আরও কিছু চমক বাকি ছিল। 

কেন্দ্রের শাসক বিজেপি দল 'আপ'-এর কাছে পর্যুদস্ত হয়েছে, তারপর দেশে এসেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প - তিনিও শাসকদলের সম্মান তথা গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে তেমন কিছু করলেন না বা বললেন না। হতাশ নাগপুরপন্থী শাসক দলের নেতা-কর্মীরা শাসনযন্ত্র বা পুলিস-প্রশাসনকে মুঠোবন্দী রেখে উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে তারা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধাল। এরপর স্পষ্ট হল অরবিন্দজির কৌশল। কেন্দ্রের শাসকদলের প্রত্যক্ষ মদতে শুরু হল যে গণহত্যা, তার দোসর হল অরবিন্দ কেজরিওয়াল।

১৯৮৪-র শিখ-নিধনযজ্ঞের পর দিল্লির বা দেশের মানুষ এমন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা গণহত্যা আর দেখেনি দিল্লিতে।  মানুষ দেখেনি আরও কিছু। দাঙ্গায় প্রায় ৫০ জন মানুষ প্রাণ হারাল। সে দাঙ্গা রোধে 'আপ' অন্তত গোড়ায় কিছু করেনি, রাজনৈতিক বা সামাজিক বা প্রশাসনিক কোনও উদ্যোগ নেয়নি। কোনও  সরকারই এগিয়ে এলনা ত্রাণে। পরে, দাঙ্গা নিজ নিয়মে বা চাপে, থামার মুখে মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল রাজঘাটে গেলেন প্রার্থনায় বসতে।  গণহত্যাকে বললেন পাগলামি।  বললেন না কার পাগলামি।  মানলেন না নিজের বা তার দলের কোনও ত্রুটি। 

এখানে উল্লেখ করতে পারি যে, কোনও রাজনৈতিক দলই সেই দুঃসময়ে অসহায় মানুষের পাশে দাড়াতে যায়নি, যদিও দিল্লিতে বাস করেন সোনিয়া গান্ধি, প্রকাশ কারাতরা। 

তবু কেবল  'আপ'কেই অসংবেদনশীলতার অপরাধে অভিযুক্ত করছি যে সে তো অকারণ নয়। অন্তত দিল্লিতে তো অন্য কোনও দলের ওপর ভরসা করা যায় না। 

আর 'আপ' সদ্য বিপুল জনসমর্থন পেয়ে তখতে আসীন হয়েছে। মানুষ তাদের কাছে বেশি আশা করেছে স্বাভাবিক নিয়মে। তারা যে শুধু সে আশায় জল ঢেলেছে তাই নয়।  এই 'আপ' সরকারের সাহায্যে কানহাইয়া কুমারের বিরুদ্ধে দিল্লি পুলিস দেশদ্রোহিতার মামলা রুজু করল। সেও এক মস্ত আঘাত। দিল্লি তথা ভারতরাষ্ট্রের পুলিস বা প্রশাসন নিয়ে কথা না বলাই বুঝি ভালো, তারা আকাশ জুড়ে কেবল অন্ধকারের ঘোমটা টানে যে ঘোমটার আড়ালে যাবতীয় অন্যায় মান্যতা পায় একটি শর্তে - সে আঁধার যেন উজ্জ্বলতর করে মোদি নামের নক্ষত্রকে। কেজরিওয়ালজিও আর অন্ধকার আকাশে অস্পষ্ট হয়ে থাকতে চান না, তিনিও চান  স্পষ্ট আর এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হতে, মোদির কাছাকাছি হয়ে। 

 

নিয়মমতো নক্ষত্রের মৃত্যু হয়।  সে নিয়ম অমান্য করে দুরভিসন্ধি আর অহংকারে  এই দুই নক্ষত্র নিজেরাই নিজেদের মৃত্যু  প্রায় ডেকে এনেছেন। এদের শাস্তি দেবে কে? এরা হয়তো ভাবছে এভাবেই রাজ্যপাট চিরদিন তাদের দখলে থাকবে। কংগ্রেসের হাল দেখেও তাদের শিক্ষা হয় না। 

শাস্তি তাদের হবেই। অপেক্ষা  শুধু জনজাগরণের। 

 

এরপর আপ অন্য রাজ্যের নির্বাচনে কী করবে? অর্থাৎ, জাতীয় নির্বাচনী রাজনীতিতে দিল্লির এই ফল কতখানি প্রভাব ফেলবে? 

আপের এই সাফল্য কিছু প্রশ্ন, কিছু সমস্যারও জন্ম দিয়েছে। আঞ্চলিক দলগুলি আত্মবিশ্বাসে ভরপুর হয়ে যে যেমন খুশি লড়াই-এর ময়দানে ঝাপ দিতে পারে। কেবল আপ নয়, মায়াবতীর দল বা চন্দ্রশেখর আজাদ বা Asaduddin Owaisi -- র দল এমন বেআক্কেলে চটকদার রাজনীতিতে ঝাপ দিতে পারে। ফল হতে পারে এই যে সে ঝাপ হবে তাদের জন্য, দেশের জন্য এবং অবশ্যই কংগ্রেস দলের জন্য মরণ ঝাপ।

 লাভ হবে বিজেপি দলের।

দিল্লির নির্বাচনেও বিজেপি দলের লাভ হয়েছে এটা না মানলে বিরোধী রজনৈতিক দলগুলিরই ক্ষতি। 

এও সত্য যে বিজেপির জয় ঘাবড়ে দেবার মতো কিছু হয়নি। দিল্লি বিধানসভায় ২০১৫-র তুলনায় তারা আসনসংখ্যা ও ভোটের পরিমাণ যথেষ্ট বাড়িয়েছে কিন্তু তা লোকসভা নির্বাচনী ফলের ধারে-কাছেও পৌঁছাতে পারেনি। তবে, মাথায় রাখতে হবে যে, দিল্লির ভোটাররা মূলত শহরাঞ্চলের,  বিজেপির মূল ভরসা গ্রামাঞ্চলের ভোট। তারা যে বিশ্বাস করে গ্রামের মানুষকে আজও ধর্মের নামে বোকা বানিয়ে ভোট লুট করা যায়। সেখানে তাদের মূল প্রতিদ্বন্ধী আজও কংগ্রেস। 

কংগ্রেসের অপরাধ বা ত্রুটি অনেক। তবু, তারা বিজেপি দলের মতো  সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির ওপর আঘাত হানেনি, মানুষের বেশ কিছু গণতান্ত্রিক অধিকার স্বীকার করেছে চিরদিন। আঞ্চলিক দলগুলি যদি কংগ্রেসকে উপেক্ষা করে তো বিজেপি অধিকাংশ রাজ্যে লাভবানই হবে। অন্তত যতদিন না দেশের প্রতিটি কোণে সুশিক্ষার আলো  পৌঁছোয়।

প্রশ্ন হতে পারে যে, বিজেপি জিতলে ক্ষতি কী?

আমার মতে প্রধান ক্ষতি এই যে তারা ভারতীয় তথা হিন্দু সংস্কৃতি ও ভারত রাষ্ট্রের ধারণা বদলে দিতে চায়, হিন্দুধর্মের ও ইতিহাসের ভুল ও বিকৃত ব্যাখ্যা ছড়াতে চায়, গড়তে চায় অন্য এক ভারত যে ভারত আর কোনদিন  উচ্চারণ করতে পারবে না বসুন্ধৈব কুটুম্বেকম। এই ভারতের সাগরতীরে আর কখনও সবাইকে নিয়ে একসাথে বাচার স্বপ্ন দেখার অধিকারই থাকবে না। মৃত্যু হবে বহুস্বর গণতন্ত্রের। 

দিল্লি গণহত্যা স্পষ্ট করেছে বামপন্থার স্বরূপ, 'আপ' -এর মানুষ-নিধনের উচ্চাকাংখা। 

দেশের কী দুর্ভাগ্য - এই দেশ এখন নেতার অপেক্ষায়,  যোগ্য দলের অপেক্ষায়। দেশের কী সৌভাগ্য শাহিনবাগ আন্দোলন তবু থামেনি।

এই গণহত্যা ভারতীয় রাজনীতিতে আলো জ্বালাবে - আশার আলো,  বহুস্বর গণতন্ত্রের আলো। 

 

ReplyReply allForward

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com