নাগরিকত্বের জালে বাঙালি

 

 

দেশ ভাগ ও বাঙালি উদ্বাস্তুদের নির্দয় নির্বাসন

 

 ১৯০৫এর বঙ্গভঙ্গের সময়  রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে বাঙালির যে বিশাল ও ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ হয়েছিলো, তার সামান্যও আমরা  দেখিনি ১৯৪৭এর দেশ ভাগের সময়।এর মূলকারণ এককথায় বর্ণবাদ ।বাঙালিকে রাজনৈতিক নানা সংকীর্ণতা দীর্ণচিন্তা আর উগ্রধর্মান্ধতার  বহ্নি আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল ।তথাকথিত শিক্ষিতরাও হিন্দু ও মুসলমানে ভাগ হয়ে পড়েন । এ প্রসঙ্গে  আরও এক-দুটি কথা বলা এখানে অবান্তর হবেনা,ক) যে দেশ ভাগের সময় জনসংখ্যার ধর্মীয় যে ভিত্তিতে জেলাগুলিকে  বিভাজন করাহয়,তা   সঠিক ভাবে মানা হয়নি বাংলা ভাগের ক্ষেত্রে, তাই মুসলিম প্রধান নদীয়া, মুর্শিদাবাদ এলো ভারতে আর খুলনার তিনভাগের দুই ভাগ হিন্দু হওয়া সত্ত্বেও; খুলনা গেল পাকিস্তানে।অন্যদিকে বেশ কিছু কায়স্থ ও শূদ্র-অঞ্চল গেল পাকিস্তানে আর ব্রাহ্মণ-প্রধান অধিকাংশ অঞ্চল এলো হিন্দুস্থানে।*১। খ) শুধু তাই নয় উদ্বাস্তু নির্বাসনের ক্ষেত্রেও আসাম ত্রিপুরার কোন উদ্বাস্তুদের এক লরি মানুষকেও ভারতে অন্য রাজ্যের অনুর্বর ও বসবাসের অযোগ্য ঊষর বনবাদাড় আর সমুদ্র পাহাড়েছুড়ে ফেলা হলনা ।কিন্তুপশ্চিমবঙ্গে আসা মুখ্যত নমঃশুদ্র-উদ্বাস্তুদের  পাঠানো হয়েছে ভারতের ১৮টি রাজ্যে নিষ্ঠুর ও নির্দয় ভাবে ।অন্যদিকে অনেকে যুক্তি দেন এরাজ্যের জনসংখ্যা বেশি। হ্যাঁ বেশি, কিন্তু অন্য রাজ্যের লোকেদের স্থায়ী ভাবে বসবাসের ফলে এ রাজ্যের যে জনবিন্যাস আজ হয়েছে তার চেয়েও কি তারা থাকলে তা খুব বেশি হতো ?আর  এই কয়েক লাখ উদ্বাস্তু এখানে থেকে গেলেবরঞ্চ এরাজ্যের শহরসন্নিহিতঅঞ্চলেযেঅবাঙালিপ্রধান্যতারকিছুটাসমতাথাকতো।পূর্বেই বলেছি আসলে এর পেছনেও কাজ করেছে  ততকালীন শাসক শ্রেণীর বর্ণবাদী চরিত্র। যার প্রতিবাদ সেদিন কিছুটা হলেও করেছিল বামপন্থীরা।যা তেমন কাজে লাগেনি।যাই হোক এই অবিচার বহনকরেই সারা ভারতে বাঙালিরা দ্বিতীয়, তৃতীয় শ্রেণীর সস্তা শ্রমজীবী জনমজুর হয়ে নানা অত্যাচার আর অবিচার সহ্যকরে, নাগরিক অধিকার যথাযথভাবে না পেয়ে, জন্ম-অপরাধীর মতো বেঁচেছিলেন। ২০০৩-এর নাগরিক আইনের সংশোধনী তাঁদের বড় অংশকে আবার বেনাগরিক করে দিলো।বাংলাভাষী মানে বাংলা দেশিবলে  বিভিন্ন রাজ্য থেকে তাদের গরু-বাছুরের মতো বাংলাদেশ সীমান্তের ওপারে নোম্যান্স-ল্যান্ডে ফেলে আসা হতে থাকলো। এই ভয়ানক ট্রাজেডি ভারতের অন্য কোন ভাষাভাষীদের ক্ষেত্রে হয়নি। এসব ঘটনা  কলকাতার বনেদী সাংবাদিকদের সংবেদনশীল মনে রেখাপাতেও বিফল হয়েছে । তাই রাজ্যের সাধারণ মানুষ  সে কথা তেমন ভাবে  জানতেও পারেননি। অন্য দিকে ১৯৫৫ সালের ভারতের  নাগরিকত্ব আইনেরনানা অসুবিধা নিয়েই ধীরে ধীরে উদ্বাস্তু বাঙালিরা কমবেশি নাগরিকত্ব পাচ্ছিলেন ।কিন্তু ২০০৩ এর সংশোধনী তা চিরতরে বন্ধ করে দেয়। আর্থাৎ এই অপকর্মটি বিজেপিই  করেছিলো।সেই হন্তারক কাপালিকেরা  আজ রামের অবতার হয়ে অহল্যার ত্রাতা হিসেবে নিজেদের প্রতিভাত করার চেষ্টাকরে, অজস্র মিথ্যা ভাষণে উদ্বাস্তুদের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। কিন্তু সঠিক তথ্য সঠিক ভাবে জেনে সঠিক ভাবে প্রতিবাদ করার সঠিক লোকও তেমন চোখে পড়ছে কোথায়!মনে করুন, যে বিজেপি বলছে উদ্বস্তুদের সত্তর বছরে নাগরিকত্ব দেওয়া হয়নি, যা তারা দিচ্ছেন, একথা সর্বৈব মিথ্যা । কারণ, সে অপরাধ অমানবিক ভাবে অন্য কেউ নয়, তারাই করেছে আর এখনও আসামসহ সারা ভারতে তারাই তা করে চলেছে।যে হুঙ্কারে সারা ভারতের বাঙালি উদ্বাস্তুরা  আজ ত্রস্ত।

 

 ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে কয়েকটি কথা

 

 

২০০০সালএপ্রিল ও মে মাস। আমি অবিভক্ত উত্তপ্রদেশের উধম সিং নগর জেলা ও সংশ্লিষ্ট কিছু বাঙালি উদ্বাস্তু অঞ্চলে ভাষা-সমীক্ষার কাজে যাই। ওখানের স্থানীয় সংবাদ পত্রে সে বিষয়েখবরাদিও হয়। অল্পদিনে ব্যাপক বাঙালি বন্ধু লাভ করি। তারা আমাকে রাজনৈতিক দলনির্বিশেষে এক অকৃত্রিম বাঙালি সেবক হিসেবে গ্রহণ করেন। এখানে ফিরে এসে আমি বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় বিশেষ ভাবে প্রতিদিন পত্রিকায় কয়েকটি প্রতিবেদন লিখি । আজকের  মতো ফোনের এতো সহজ সংযোগ না থাকলেও বেশ কিছু বন্ধুর সঙ্গে প্রায় নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। এই সময়ে ওখানে রাজ্য ভাগ হয়, প্রথমে উত্তরাঞ্চল ও পরে উত্তরাখন্ড নামে নতুন রাজ্য গঠন হয়। তখন কেন্দ্রে বাজপেয়ির সরকার চলছে। ২০০৩এর এই সর্বনাশা নাগরিক আইন আসে নি।তবে উত্তরাঞ্চলেও বিজেপির রাজ্য সরকারও গঠিত হয়।আমার জানা মতে আসাম ছাড়া প্রথম এন আর সি-র প্রয়োগ তথা বাঙালিদের বেনাগরিক করার পরিকল্পনার প্রথম প্রয়োগকরা হয় এইউধম সিং নগর জেলা ও সংশ্লিষ্ট বাঙালি অঞ্চলে ।জেলা হেড কোয়ার্টার রুদ্রপুরের ডি-এম এই সময়ে এক ধরনের ডোমেসাইল সার্টফিকেট দেওয়া শুরু করেন। তারমধ্যে পাহাড়িসহ অন্যদের জন্য লেখা হয় “ইনি এখানে ১৫বছরের বেশি বসবাস করছেন, তিনি ভারতীয় নাগরিক।“ কিন্তু বাঙালি উদ্বাস্তুদের ক্ষেত্রে দেওয়া সার্টিফিকেটে ঐ“তিনি ভারতীয় নাগরিক” অংশটি কেটে দেওয়া হয়।ফলে ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তি, ছাত্র-বৃত্তি, চাকুরির দরখাস্তসহ সর্ব প্রকার নাগরিক অধিকার যেটুকু এই হতভাগ্য রিফিউজিদের ছিলো তা কেড়ে নেওয়া হল।দুই রাজ্যের দশটি জেলার প্রায় ১৪লক্ষ মানুষের জীবনে ভয়ানক বিপর্যিয় নেমে এলো। ২০শে সেপ্টেম্বর২০০১ তারা রুদ্রপুরের গান্ধিপার্কে লক্ষ লোকের সমাবেশ ও সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিলেন। স্থানীয় হিন্দিভাষীরা বাঙালিদের সমর্থণ দিলেন ।দিল্লীর মিডিয়াও ভালো কভার করলো ।কিন্তু পশ্চিম বঙ্গের সে ব্যপারে ছিলো ভয়ানক উদাসীনতা । যেন তাদের কিছুই দায়বধ্বতা নেই।  নানা সংবাদ পত্রের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে আমার যতটা সাধ্য শক্তি তানিয়ে প্রচারের চেষ্টা করি। এখানে একথা স্বীকার করতে হবে যে রুদ্রপুরের বাঙালি সন্তান সাংবাদিক পলাশ বিশ্বাস, সাহারা পত্রিকার ডঃ কৃপাশংকর চৌবে, বাংলা একাডেমির সচিব সনৎকুমার চট্টোপাধ্যায়, সাংবাদিক গীতেশ শর্মা, অধ্যাপক পবিত্র সরকার আর আমার দীর্ঘ দিনের সাথী সাহিত্যিক কপিলকৃষ্ণ ঠাকুর, অগ্রজ শতদ্রু চাকী, সাগর বিশ্বাস আর অখানের সক্রিয়বন্ধু কেকেদাসডঃ পিজি বিশ্বাস, শংকর চক্রবর্তী, চিত্তরঞ্জন রাহা, হরেন্দ্রনাথ সরকার, বিবেকানন্দ বিশ্বাস, নিত্যানন্দ মল্লিকসহ অনেকেই বাঙালিদের এই বিপদের দিনে একত্রে পাশে দাঁড়ান।কলকাতায় আমরা বাংলার বাইরে বাঙালি সহায়ক সমিতি “সহমর্মী” গড়েতুলি।১১ই অক্টোবর ২০০১। বাংলার প্রায় সর্বস্তরের বুদ্ধিজীবীরা তাদের সহমর্মিতা দেখান।রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মাননীয় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের প্রত্যক্ষ হস্থক্ষেপে সেবারের জন্য বাঙালিদের বেনাগরিক করার চক্রান্ত রোধ হয়।আমি তাই এটাকে ভারতে বাঙালির প্রথম এন আর সি- বিরোধী সফল আন্দোলন বলতে চাই। যার জন্য সামান্য হলেও আমরা আজও আনন্দ প্রকাশ করে থাকি।  এই আন্দোলনের শিক্ষা হল বাঙালি যদি ঐক্যবদ্ধ ভাবে প্রতিবাদ জানাতে পারে তাহলে সাফল্য পায়।

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com