অবরুদ্ধ পৃথিবী

 

এক

 

করোনা ভাইরাস কোভিড ১৯      

 

 

 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে ট্রাম্প করোনা ভাইরাসের হ্যাপা সামলাতে গিয়ে বলেছেন, ‘I am a wartime President’. আমি এক যুদ্ধকালীন সময়ের প্রেসিডেন্ট। তাঁর বক্তব্যের রহস্যময় গভীরতা নিয়ে দেশের সমালোচক-বিশ্লেষকদের ব্যাখ্যার ঝড় মন্তব্যের পরেই শুরু হয়ে গিয়েছে। আরও চলবে যতক্ষণ পর্যন্ত এর শেষ রেশটুকু নিয়ে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে তুলোধুনো আলোচনা করা যায়। কারণ তিনি বিশ্বের সবচাইতে শক্তিশালী দেশের রাষ্ট্রপ্রধান। তাঁর চারপাশে দৃশ্যমান এবং অদৃশ্য এমন অনেক কিছুই ঘনিয়ে উঠতে পারে, যাতে অনুরাগ কিংবা বিরাগে তাঁর পক্ষে যেমন মন্তব্য করা স্বাভাবিক তেমনি স্বাভাবিক আলোচকদের বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা আর বিশ্লেষণ।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্যের ব্যাখ্যা যাইই হোক বর্তমান বাস্তবতা হলো, অদৃ্শ্য শত্রু করোনার উপস্থিতি প্রবলভাবে কাঁপিয়ে দিয়েছে প্রযুক্তিসভ্যতার পৃথিবীকে। অনুন্নত থেকে সুউন্নত, পূর্ব থেকে সুদূর পশ্চিমে যত দেশ রয়েছে সব জায়গাতেই প্রমাণিত হচ্ছে, মানুষ এখনও তাদের অস্তিত্ব রক্ষায় কতটা অসহায়৤ কতটা নিরুপায় অদৃশ্য শত্রু মুছে দেওয়ার ক্ষেত্রে৤ প্রায় মাস তিনেক ধরে তার একটি খণ্ডচিত্র তামাম দুনিয়া জুড়ে প্রদর্শিত হচ্ছে। আপাতত করোনা ভাইরাসের দুর্ধর্ষ অভিযাত্রা, মার্কিনসাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য জুড়ে।

সেই সঙ্গে দেশে দেশে মানুষের উর্বর কল্পনাও করোনার জন্মবৃত্তান্ত নিয়ে গুজব ছড়াচ্ছে গল্প তৈরি করে। এই যেমন, ২০০৩ সালে চীনারাজ্যে যখন SARS (Severe Acute Respiratory Syndrome) ভাইরাসে উহান সিটিতে মানুষ মরেছিল, তখন জনমনে এই ধারণাই সুদৃঢ় হয়েছিল, উহান সিটির গবেষণাগারেই জন্ম নিয়েছে সার্স। ছেড়ে দেওয়া হয়েছে মানুষ নিধনের কাজে। এবারও গুজব উঠেছে, গুষ্ঠি গুষ্ঠি বয়োবৃদ্ধ মানুষগুলোর মানবাধিকারের নানা হ্যাপা সইতে না পেরে সরকারই বিজ্ঞানীদের দিয়ে এই কাজটি করিয়েছেন। পৃথিবীর অন্যসব বিজ্ঞানীরা অবশ্য এর উৎপত্তিস্থল সম্পর্কে নিশ্চিত নন। তবে একটা বিষয়ে সুনিশ্চিত হয়েছেন, কোভিড-১৯ মানুষের দেহে প্রথম পশু থেকেই সঞ্চারিত হয়েছে। উহান সিটির ল্যাবরেটরি থেকে ছাড়া পায়নি সে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তারা করোনার দুর্নিবার বিস্তারকে মহাবিপর্যয় বলেছেন। মহামারি হিসেবে ঘোষণা দিয়ে জগতকে সতর্ক করেছেন বারবার। শুরুর দিকে ভাইরাস বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছিলেন, নোভেল করোনার বেশিরভাগ শিকার হবেন বয়োবৃদ্ধ মানুষের দল। তরুণদের ভেতর এর প্রকোপ তেমন দৃশ্যযোগ্য থাকবে না। কেন বলেছিলেন কে জানে। কোথাও কোথাও সত্য হলেও এই ভবিষ্যদ্বাণী সর্বত্র ধোপে টেকেনি। কোভিড-১৯ অসংখ্য তরুণদের হাসপাতালে পাঠিয়েছে। যাই হোক, এখনও অবধি আক্রান্ত মানুষের ৮০ শতাংশই চিকিৎসা ছাড়া আরোগ্যলাভ করেছেন। কোনো অসুস্থতা অনুভব করেননি করোনার সংস্পর্শে এসে, এমন দৃষ্টান্তও ঢের রয়েছে। বাকী ২০ শতাংশর মধ্যে মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে যারা মারা যাচ্ছেন তারা হয় অতি বৃদ্ধ নয়তো আন্ডারলায়িং মেডিক্যাল প্রবলেমে আগে থেকেই সমস্যাগ্রস্ত। যেমন হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অ্যাজমা প্রভৃতি ক্রনিক রোগের রোগীরা এর দৃষ্টান্ত। কোভিড-১৯ এদের মধ্যেই মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি বাড়িয়েছে। তবে করোনার গতিপ্রকৃতি যেভাবে বদলে যাচ্ছে বারবার, তাতে কোনো মন্তব্যেই অটল থাকছেন না ভাইরাস বিশেষজ্ঞরা।

নোভেল করোনা নতুন ভাইরাস হওয়ায় সুস্থির তথ্যচিত্র এখনো প্রতিষ্ঠিত নয়। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের হিসেব নিকেশ অনুযায়ী এই রোগে বিশ্বব্যাপি মৃত্যুর হার ৩.৪ শতাংশ। চীনের এ্যানালাইসিস ভিন্ন অনুপাত জানাচ্ছে। সেখানে আনুপাতিক সংখ্যা ২.৩। এই গণনা কি যথাযথ? কারণ, যখন থেকে করোনা ভাইরাসের আবির্ভাব হয়েছে, তখন থেকেই আনুপাতিক নম্বর বদলে গিয়েছে কয়েকবার। এছাড়াও যারা সামান্যভাবে আক্রান্ত হওয়ার কারণে কোনোরকম চিকিৎসা নেননি অফিসিয়্যালি তাদের সংখ্যাও গণনা করা হয়নি। তবে প্রচার অপপ্রচার দুটোই মিডিয়ার কল্যাণে জোরেসোরে চলছে। নতুন ভাইরাস পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ জীবন কেড়ে নেবে এমন বক্তব্যও রেখেছেন কেউ কেউ। তাতেই বিশ্ব জুড়ে মানুষের মৃত্যুভয় আর উৎকণ্ঠা বাতাসতাড়িত অগ্নিশিখার মতো উড়ে বেড়াচ্ছে সবখানে।   

অতএব অদৃশ্য শত্রুর গতিবেগ সহস্র সহস্র মাইল পেরিয়ে যত দ্রুত ছড়াচ্ছে, ততোই অবরুদ্ধ হচ্ছে সামাজিক মানুষের পৃথিবী। বিশ্বায়নের যুগে হঠাৎ ইউ টার্ন নিয়ে দেশের সঙ্গে দেশের, কমিউনিটির সঙ্গে কমিউনিটির, প্রতিবেশির সঙ্গে প্রতিবেশির যোগাযোগের পথ বন্ধ হয়েছে একে একে। উহান সিটির প্রথম খবরেই চীনের সঙ্গে সীমান্ত যোগাযোগ বন্ধ করেছিল মঙ্গোলিয়া আর রাশিয়া। এরপর একে একে বন্ধ হয়েছে অন্যান্য দেশের আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনগুলো। কোথাও ডোমেস্টিক ফ্লাইট। অবশেষে দেশে-দেশে স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি, ব্যাংকের পাশাপাশি অন্যসব প্রতিষ্ঠান। অফিস, আদালত, স্কুল-কলেজের প্রয়োজনীয় কাজ করার নির্দেশনা রয়েছে অনলাইনে বসে। ভাইরাসের বিস্তৃতি ঠেকাতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্তারা পাঁচটি প্রধান সতর্ক নিদের্শেনা দিয়েছেন। পালন না করলে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা বাড়ায় মৃত্যুর হারও বাড়বে।

এরই মধ্যে ক্ষতি যতখানি হয়েছে তার খেসারত বড় করেই দিতে হবে৤ এই পরিস্থিতি যত দীর্ঘ হবে, আর্থসামাজিক সংকট ততোই তীব্র হয়ে উঠবে। তবে আধুনিক বিশ্বে মানবজাতিই সব থেকে বড় সংকটের জন্ম দেয়। দেহমনে সব ধরনের নিরাপত্তার আশ্বাস পেতে পেতে মানসিকভাবে বড় কমজোর হয়ে পড়েছে তারা। জীবনযুদ্ধে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে বড় ভয় তার৤ সংগ্রাম করে নয়, সবকিছু সহজস্বাচ্ছন্দ্যে করায়ত্ত করাই আধুনিক মানুষের স্বপ্ন৤  সব সমস্যার কারণ সেটাই। কেন এবং কিভাবে, পরবর্তী আলোচনায় সেটাই থাকছে।

 

 

 

 

 

 

 

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com