দেশ আমার দায় আমার

 

 

না কোন রাজনৈতিক দলের উপর বিশেষ কিছু অনুরাগ নেই। তবে শ্রদ্ধা আছে ভারত বর্ষের আপামর জনতার বিশ্বাসের উপর, সেই বিশ্বাস যা একজন মানুষ কে এই কোটি কোটি মানুষের ভিড়ে বিশেষ একটা দায়িত্বপূর্ণ পদ ও কাজের জন্য নির্বাচন করে। আমার দেশের সংস্কার আমাকে আমার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বা দেশের প্রধানমন্ত্রী কাওকে ই "ফাজিল" বা "পাগল" বলে সম্বোধন করার শিক্ষা দেয়না। এর অর্থ এই নয় যে আমি তাদের অন্ধ ভাবে সমর্থন করি, এর অর্থ তারা যে বিশেষ স্থানটি তে বসে আছেন আমি সেই পদ টি কে যথাযথ সম্মান করি, সম্মান করি আমার দেশের মানুষের, আমাদের বৌদ্ধিক নির্বাচন কে।

যখন সারা বিশ্ব এক ভয়ানক বিপর্যয়ের সম্মুখীন তখন মানুষ হিসেবে প্রথম কর্তব্য বোধ হয় মানবিক হওয়া। আমরা গণতান্ত্রিক দেশের জনগন। আমরা স্বাধীন মতাদর্শ রাখতেই পারি কিন্তু তার আগে নিজেদের কে কি নুন্যতম নাগরিক কর্তব্য পালন করতে হবে না? এই মহামারীর সাথে লড়াই এর যে পন্থার সামনে সারা বিশ্ব মাথা নিচু করতে বাধ্য হয়েছে সেই লক ডাউন নিয়ে ও আমাদের দ্বিমত এর শেষ নেই। কারণ আমরা প্রতিবাদী? না কি প্রতিবাদ করলে বেশি লাভ হবে, নাকি না করলে বেশি উপকার হবে এই বোধ আমাদের নেই? না কি আমরা হই হট্টগোল করে একটা কিছু আসলে পন্ড করে মজা পাই? নাকি আমাদের দেশের সরকার হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর আগে ই এই সাবধানতা অবলম্বন করেছেন তাই? নাকি আসলে আমরা যত ই ভালো লাগছে না বলে নাকে কাঁদি আসলে এখন ও আমরা বেশ ভালো ই আছি?

অনেক জ্ঞান আছে এমন দাবী না করে ই বলছি, শুধু বিশ্বের সব কটা আক্রান্ত দেশ গুলো এই পথ অনুসরণ করেছে বলে ই নয়, সাধারণ বুদ্ধি তেই তো এটা বোঝা উচিত যে একটা রোগ যা থেকে সংক্রমণ সম্ভব তাকে শুধু মাত্র দুরত্ব বজায় রাখার মধ্যে দিয়ে ই সবথেকে বেশি নিরস্ত্র করে রাখা সম্ভব। এই সাধারণ কথা একটা শিশু ও বুঝবে তা আমরা বুঝতে পারলাম না। কিন্তু প্রয়োজনীয় সামগ্রী সবসময় পাওয়া যাবে এই কথা সরকার থেকে বার বার বলা সত্বেও আমরা এটা বুঝলাম যে দোকান সব বন্ধ হয়ে যাবে অর্থাৎ গুলি মারো সামাজিক দুরত্ব, আক্রমণ করো সব বাজারে, একদিন নয়, দুদিন নয়, রোজ। সরকার জন ধন্ অ্যাকাউন্টে 3মাস সব মহিলাকে 500 টাকা করে দেবে, 80কোটি মানুষ কে 3মাস ফ্রী রেশন দেবে কিন্তু তাদের কথা ভেবে ঘুম হচ্ছিলো না যাদের, যারা গরীব মানুষ কে এক টাকার সাহায্য করতে গিয়ে হাজার বার ভাবা জনগন, নিজের বাড়ির পরিচারিকাদের ছুটি দিতে বুক ফেটে যাওয়া নাগরিক, এই দুর্দিনে ফুর্তির মেজাজে বাজার করা মানুষ তারা হঠাৎ করে এমন একটা অভাবের পরিমণ্ডল আগে ভাগে তৈরি করে বসলো যে সব সামগ্রীর মূল্য আগে থেকেই বৃদ্ধি পেয়ে গেলো। যে লক ডাউন নাকি আমাদের দেশের অর্থনীতির বিশাল ক্ষতি করবে বলে আমরা একে সমর্থন ই করতে পারছিলাম না সেই আমরা ই লজ্জা শরম বিসর্জন দিয়ে এটাকে বিশেষ ছুটি ও নিজেদের ভোজন রসিক প্রমাণ করে সেই লক ডাউন কে প্রায় ব্যর্থ করতে সক্ষম হলাম।

আমাদের মুখ্যমন্ত্রী যিনি এক সময় "পাগলী" আবার কারও কাছে "লড়াকু দিদি" বলে ভূষিত থাকলেও যখন হাতে ইট নিয়ে রাস্তায় নেমে গোল করে দাগ টেনে সামাজিক দুরত্ব কিভাবে মানতে হবে দেখিয়ে দিলেন তখন প্রায় সবাই সমবেত ভাবে প্রশংসা করলাম..." না সত্যিই খুব কাজ করছেন" কিন্তু বাস্তবিক ভাবে সেই বৃত্তে বাজারের থলি টি রেখে সচেতন ভাবে লাইন মেইনটেইন করে যাতে আমার পরের জন আমার আগে সামগ্রী পেয়ে না যায় সেদিকে খেয়াল করে গায়ে গা লাগিয়ে বসে গল্প করলাম, আলোচনা করলাম কবে করোনা যাবে এবং মুখ্যমন্ত্রীর ডাল ভাত খেয়ে থাকার পরামর্শ কে হেসে উড়িয়ে দিয়ে আবার ও বাজারের ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পরলাম। যেন তিনি ভালো কাজ করছেন নিজের জন্য, করলে ভোট পাবেন আবার কি! ভাবতে হলে ভাবুন অন্য দলের লোকে রা কিভাবে আরও ভালো কাজ করে আরও ভোট পাবেন বা কিভাবে এই অবদান কে ছোট করবেন। যেন আমরা সিনেমা দেখছি এবং আমাদের কিছুই করার নেই, যেন আমাদের জীবন কোনো ভাবেই এর সাথে জড়িত নয়।

এরপর পুলিশ কে নামতে হলো লাঠি হাতে, এই এত বড় একটা পদক্ষেপ যা দেশের অর্থনীতির এতখানি ক্ষতি করছে বলে আমরা রাতে ঘুমাতে পারছিলাম না এবং বাস্তবিক ভাবেই অপূরণীয় একটা ক্ষতি হচ্ছে একথা সত্যিও আর তা আসলে কোন উৎসব নয়, এক বিপর্জয় আর সেখানে দাড়িয়ে আমাদের শুধু মাত্র বাড়িতে থেকে আমাদের দেশ কে বাঁচাতে হবে এই কথা বোঝাতে। না লজ্জা পেলাম না তবুও। খুব রেগে গেলাম, পুলিশের বাবা মা তুলে গালি দিলাম, বললাম ওরা খুব বাড়াবাড়ি করছে, আমরা একটু বাজার করবো না? একবার ও না বেরোলে বাড়িতে থাকা যায় এভাবে? যেন আমরা বাইরে বেরোলে আমরা ও আমাদের পরিবার নয় পুলিশ ও পুলিশের বাবা মা ই আক্রান্ত হবেন আগে। সুযোগ পেয়ে পুলিশ কে দু ঘা দিয়েও দিলাম। এমন কি স্বাস্থ্যকর্মী দের ও ছাড়লাম না, কেন অযাজিত ভাবে পরীক্ষা করতে আসবে? ব্যাপারটা যেন এরকম আমাদের রোগ হলে আমরা বুঝতে পারবো না? বা আমাদের এসব হতেই পারে না অথবা আমাদের রোগ হলে আমরা ই বুঝে নেবো। তারপর চিৎকার করলাম সরকার যখন লক ডাউন করলো তবে তা কঠোর ভাবে কেন পালন করছে না। ইয়ার্কি হচ্ছে আমাদের সাথে? যেন সরকার ম্যাজিক করে সবাই কে বোধ জাগিয়ে দেবে বা অন্তত ঘুম পাড়িয়ে দেবে। আর আমরা শুধু হাত তালি দেব "বেশ ভালো কাজ হলো"।

হাত তালি প্রসঙ্গে এখন সবথেকে চর্চিত যে ঘটনা, আমাদের প্রধানমন্ত্রী বললেন হাত তালি দিয়ে সেই সব ডাক্তার বা চিকিৎসা ব্যবস্থার সাথে জড়িত সব মানুষ বা যারা এই করুন পরিস্থিতিতে আমাদের জন্য লড়াই করে চলেছেন তাদের সম্মান জানাতে। আমরা প্রায় সবাই ফেসবুকে সারাদিন সময় কাটিয়ে এরকম কর্মসূচী অন্য দেশে কিভাবে পালন করছে তা দেখে ফেলার পর ও বাজি থেকে ঢাক সব ব্যবহার করে ফেললাম। তিনি চাইলেন একতা ও কৃতজ্ঞতা আমরা করলাম ভাসানের নাচ। দোষ হলো প্রধানমন্ত্রীর আমাদের নয়। আমরা করতে পারলাম কারণ আমরা মনে মনে জানি আসলে আমরা ভালো আছি। ইতালি তে লোক মরেছে বলে কি আর আমাদের কিছু সত্যি ই হবে! কারণ আমাদের কজন ই বা আর এই সব কাজে যুক্ত আর রোগী তো আমাদের মধ্যে প্রায় কেও ই নয়।

আবার ও প্রধানমন্ত্রী আমাদের মধ্যে সেই সব মানুষ যারা কোথাও একটা অনুভব করেছেন এই খারাপ সময়ের গুরুত্ব ও সেই মত পথ চলছেন তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে যা করতে বললেন তা শুনে তো আমরা রেগে, হেসে পাগল হয়ে গেলাম। কি না মোমবাতি জ্বালাবো? মোমবাতি জ্বেলে করোনা তাড়াবো? যখন কোনো বড় অপরাধ হয় আমরা ই কেন মোমবাতি জ্বালিয়ে মিছিল করি? তখন তো তার মানে আমরা একতা বুঝি, বুঝি আমরা বোঝাতে চাইছি আমরা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানাচ্ছি বা লড়াই করছি। তবে এ ক্ষেত্রে মিছিল টা নেই বলে ই কি এত অসুবিধা? আমরা কি এত টাই অবুঝ? না কি আমরা এত মৃত্যু মিছিল দেখেও বুঝতে পারছিনা যে যারা আজ আমাদের দেশে আক্রান্ত তাদের কি মানসিক অবস্থা? কি অবস্থা তাদের পরিবারের যারা না পারছে নিজেদের রুগী কে চোখের দেখা টুকু দেখতে বা কখন ও আবার দেখতে পাবে এই আশা টুকুও রাখতে, আর না পারছে নিজেরা সাধারণ জীবন কাটাতে? যদি আমরা কটা মিনিট ঘরের আলো জ্বালিয়ে বা নিভিয়ে একটা মোমবাতি জ্বেলে তাদের বলতে পারি যে আমরা সবাই আছি সবার পাশে, এই দুরত্ব সামাজিক, মানবিক নয় তাতে ক্ষতি তা কি? কি এমন অসুবিধা আছে যদি বোঝাতে পারি আমরা একে অন্যের থেকে অনেক দূরে আছি আসলে প্রকৃত অর্থে পাশে থাকারই জন্য?

আমরা কি আশা করেছিলাম যে প্রধানমন্ত্রী এসে বলবেন ম্যাজিক হয়ে গেছে, 15 ই এপ্রিল থেকে সব ঠিক হয়ে যাবে ? আমরা কি জানি না এটা সম্ভব না? যে লড়াইতে একতা আর সচেতনতা ই বড় অস্ত্র সেখানে এই বক্তব্যে অন্যায় কি আছে? আমরা কি বিশ্বাস করতে পারি রাতারাতি 130 কোটির দেশে সবার জন্য ভেন্টিলেটর এর ব্যবস্থা হবে, সারাজীবন মন্দির মসজিদ তৈরি করা মানুষদের জন্য হাসপাতাল তৈরি হবে এই কদিনে? তবু ও সরকার চেষ্টা করছে যতটা সম্ভব বেশি সংখ্যার রোগী কে চিকিৎসা ও পরিষেবা দেওয়ার। আর কি আমরা চাই যা আমাদের কিছুমাত্র অবদান না থাকলেও সরকার একা ই করতে পারবে?

সরকার যে পার্টির ই হোক, দেশ টা আমাদের। বাঁচলে আমরা বাঁচবো। তাই আমরা কি এই সস্তার সমলোচনা বন্ধ করে নিজেদের ও নিজের পরিবারের জন্য একটু সচেতন হতে পারি না? কোটি কোটি মানুষের স্বার্থে, কোটি কোটি শিশু ও বৃদ্ধ মানুষের স্বার্থে শুধু মাত্র নিজের বাড়ি তে থেকে, অহেতুক অর্থহীন তর্ক বিতর্ক দিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে মানুষ কে আরও অসচেতন হতে সাহায্য না করে যে টুকু চেষ্টা আজ ও চলছে এই মহামারী কে রোধ করতে, যা করতে সারা বিশ্ব প্রায় হেরে বসে আছে, পারি না সেই চেষ্টা কে একাগ্র ভাবে সফল করতে? এটাই কি এখন সর্বাগ্রে আমাদের মানবিক কর্তব্য নয়?

শুরু থেকে "আমাদের" শব্দ টা ব্যবহার করলে ও এটা আমার একান্ত বিশ্বাস এই "আমাদের" মধ্যে আমাদের বেশির ভাগ জন ই নেই। বেশির ভাগ মানুষ ই আসলে বুঝতে পারছেন বা চাইছেন  আমরা সত্যি ই কি অবস্থায় আছি, কি ভয়ানক একটা দিন আসতে চলেছে। সত্যি ই রাতে আমরা আতঙ্কে ঘুমাচ্ছি। বার বার নিউজ চ্যানেল এ শুনতে চাইছি একটা আশার খবর।চোখের পাতা ভিজে যাচ্ছে স্বাস্থ্যকর্মী দের অসহায় তবু মরিয়া প্রচেষ্টা দেখে। আমাদের চেতনা আর বোধ প্রকাশ করার এটাই বোধ হয় সময়। কিছু সংখ্যক লোকের নির্বুদ্ধিতার ফল কেন দেব আমরা আমাদের পরিজন দের? আসুন যে কটা দিন ও আর সময় আছে সরকার, পুলিশ, প্রশাসন কে সাহায্য করি ধর্ম, বর্ণ, রাজনীতির গন্ধ নির্বিশেষে। দু জন কে লাইনে দাড় করিয়ে হোক বা দু দিন ডাল ভাত খেয়ে হোক, নির্বোধ লোকের সাথে ঝগড়া করে হোক বা বাধ্য ভাবে সরকারি বিধি নিষেধ মেনে হোক, যতটুকু সম্ভব এই লড়াই তে সামিল হই, প্রমাণ করি উপরোক্ত " আমাদের" মধ্যে আমরা নেই। তবেই তো ঈশ্বরের চোখে চোখ রেখে আমরা প্রার্থনা করতে পারবো, যেন ভালো থাকি আমরা, মৃত্যু মিছিল যেন না দেখতে হয় আমাদের প্রিয় দেশ কে, যে প্রিয়জন দের জন্য আমরা জীবন ও দিতে পারি সেই তাদের ই যেন ভুল করে এমন যন্ত্রণার একাকী মৃত্যু উপহার দিয়ে না ফেলি হে ঈশ্বর! কোন দল না, কোন রঙ না, যেন জয়ী হই আমরা, আমরা সবাই একসাথে।

 

 

 

 

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com