করোনা ও অর্থনীতি অতঃপর

 

অনিন্দ্য ভুক্ত

অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, নেতাজি মহাবিদ্যালয়, আরামবাগ

 সোমনাথ হাজরা

গবেষক, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়

 

ক্রমশ চ‌ওড়া হচ্ছে করোনার থাবা। আশঙ্কিত, ত্রস্ত হয়ে উঠছে সারা বিশ্ব। তবে কিনা মানুষ মরতে মরতেও স্বপ্ন দেখে, পরিকল্পনা করে ভবিষ্যতের। আর সেই মনোভাব থেকেই করোনা থেকে বাঁচার লড়াই লড়তে লড়তেও মানুষ ভাবছে আগামী দিনে কি হবে। এই ভাবনার একটা বড় অংশ জুড়ে আছে রুটি-রুজির ভাবনা।

       একটা কথা সবাই জানে, বুঝতে খুব একটা অসুবিধাও হয় না, অর্থনীতির চাকা একটা ঘন্টা বন্ধ থাকলেও সমস্যা কত বড় হয়ে ওঠে। যারা মাস মাইনের চাকুরে, তারা ততটা বোঝেনা, এই ধরনের সাময়িক বন্ধকে তারা ছুটির মেজাজে গ্রহণ করে। কিন্তু দিন না আনলে যাদের দিন খাওয়া জোটে না, তারা বোঝে একদিন সবকিছু বন্ধ থাকলে কতটা নাভিশ্বাস ওঠে। তবে নাভিশ্বাসটা যে কেবল ব্যক্তিগত স্তরেই আটকে থাকে তা কিন্তু নয়। অর্থনীতির যারা ছাত্র, তারা জানে এই দিন আনা- দিন খাওয়া মানুষজনের আয়ের প্রায় সবটাই চলে যায় নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে। এই মুহূর্তে আমাদের দেশের একজন অদক্ষ শ্রমিকের দৈনিক মজুরি, স্থানভেদে ১৮০-৩৮০ টাকার মধ্যে। এমন একটি মানুষকে যদি একদিন‌ও ঘরে বসে থাকতে হয় তাহলে বাজারে জিনিসপত্রের চাহিদা  টাকার অংকে কতটা কমতে পারে তা বোঝার জন্য বিশেষ বুদ্ধি ধরার প্রয়োজন পড়ে না। যে দেশের অধিকাংশ মানুষ এই দিন আনি- দিন খাই গোত্রের সে দেশের অর্থনীতির চাকা দিনের পর দিন বন্ধ থাকলে তাই ভবিষ্যতের চিন্তা স্বাভাবিক। 

        গত দু'মাস যাবৎ সারা পৃথিবীর কোথাও না কোথাও সামাজিক জীবনযাপনের ঝাঁপ সরকারি নির্দেশে সাময়িক বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। গালভরা নাম‌ও এর একটা দেওয়া হয়েছে - লকডাউন। এর ফলে উৎপাদন কার্যত বন্ধ, উৎপাদন বন্ধের ফলে একের পর এক কাজ হারাচ্ছে মানুষ। কিন্তু অদূর হোক বা সুদূর, ভবিষ্যতে একদিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। তখন কেমন দাঁড়াবে অর্থনীতির অবস্থা?

     আলোচনা তো সব দেশেই চলছে। ভারত‌ও অত‌এব তার ব্যতিক্রম নয়। ভারত একটি বিকাশশীল দেশ। কোন‌ও মহামারী বা মহামারী-উত্তর পরিস্থিতির মোকাবিলা করার সামর্থ্য তার উন্নত দেশগুলোর তুলনায় স্বভাবতই কম। তার উপর এদেশের শ্রমবাহিনীর গরিষ্ঠাংশ যেহেতু অস্থায়ী ও সাময়িক কর্মী, সেহেতু এদের কাজ হারানোর নেতিবাচক প্রভাবটি ভারতীয় অর্থনীতির পক্ষে এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। এদের কাজ হারানোর অর্থ জাতীয়  আয়ের পরিমাণ কমা, তার ফলে সামগ্রিক চাহিদা কমা। তবে এক্ষেত্রে আরো বড় সমস্যা এই যে, আয়  কমার জন্য চাহিদা কমা এবং চাহিদা  কমার জন্য আয়  কমার বিষয়টি একবার শুরু হলে চক্রাকারে চলতেই থাকে।     

     এখন প্রশ্ন তাই,  এই করোনা বিপর্যয় সামলে ওঠার ক্ষমতা আমাদের কতটা আছে? কততা আছে, এই নিবন্ধের আলোচ্য বিষয় সেটিই। তবে একথা বোধ হয় অনস্বীকার্য, ক্ষমতাটি অন্যান্য দেশের চেয়ে ভারতের‌ই  বেশি। বর্তমানে ভারতের জাতীয় আয়ের   শতাংশ আসে পরিষেবা ক্ষেত্র থেকে। এই পরিষেবা ক্ষেত্রে নিযুক্ত মানুষদের একটা অংশের  পক্ষে সোশ্যাল ডিস্ট‍্যান্সিং মেনে চলা খুব সহজ হলেও অন্য অংশের পক্ষে ততটা সহজ নয়। একজন নাপিতের পক্ষে দোকান বন্ধ রেখে ভার্চুয়ালি খদ্দেরের চুল কেটে দেওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু একজন শিক্ষকের পক্ষে সম্ভব অনলাইনে একটা ক্লাস নিয়ে নেওয়া। আই টি সেক্টরের কর্মীদের কাছে ওয়ার্ক ফ্রম হোম তো একটা বেশ চালু ধারণা। কিন্তু যেহেতু আমাদের পরিষেবা ক্ষেত্রের আয়ের বড় অংশটাই আসে আইটি সেক্টর থেকে সেহেতু আন্দাজ করা যেতে পারে পরিষেবা ক্ষেত্র থেকে জাতীয় আয়ের যে অংশটা আসে সেটা খুব একটা কমবে না।

    আমাদের শ্রমবাহিনীর চল্লিশ শতাংশের বেশি কাজ করে কৃষিক্ষেত্রে। কৃষিক্ষেত্রের উৎপাদন যেহেতু স্থানীয় ভিত্তিতে হয় এবং একসঙ্গে অনেক মানুষের এক জায়গায় ভিড় করার ব্যাপারটি যেহেতু বিশেষ থাকে না, সেহেতু কৃষিক্ষেত্রের উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান, এদুটির কোনোটিরই বিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হবার কথা  নয়।

   ভয়ংকর ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করেছে অবশ্য শিল্পক্ষেত্রটি। আমাদের মোট কর্মসংস্থানের এক-চতুর্থাংশ হয় শিল্পক্ষেত্রে। জাতীয় উৎপাদনে শিল্পক্ষেত্রের অবদান সাতাশ শতাংশের মতো। সবচেয়ে বড় কথা শিল্পক্ষেত্রের চেইন  প্রভাবটি বেশ শক্তিশালী। শিল্পক্ষেত্র যেমন অন্যান্য ক্ষেত্রের উপর নির্ভরশীল, তেমন‌ই অন্যান্য ক্ষেত্রগুলিও শিল্পক্ষেত্রের উপর নির্ভরশীল। ফলে শিল্পক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার একটা বড় প্রভাব অর্থনীতির উপর পড়ার কথা। তাছাড়া বর্তমানে এই ক্ষেত্রটি এমনিতেই একটি মন্দার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। মন্দার প্রধান কারণ চাহিদার অভাব। চাহিদার অভাবের এই সমস্যাটির আর‌ও প্রকটতর হ‌ওয়ার কথা। শিল্পপণ্যগুলিকে মোটামুটি ভাবে দু' ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। একদিকে সাধারণ মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য , অন্যদিকে উচ্চবিত্তদের বিলাসদ্রব্য। উচ্চবিত্তদের একটা বড় অংশের নিযুক্তি পরিষেবা ক্ষেত্রে। যদি আমাদের অনুমান মত পরিষেবা ক্ষেত্রের উৎপাদনে বিশেষ হেরফের না ঘটে তাহলে বিলাসদ্রব্যের চাহিদার উপর আলাদা করে কোনো প্রভাব পড়বে না। কিন্তু এই লকডাউনের ফলে অসংগঠিত ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত মানুষগুলির  আয় ও উপার্জন যেভাবে ধাক্কা খেতে শুরু করেছে তাতে সাধারণ শিল্পপণ্যের  চাহিদা যে মারাত্মকভাবে ঘা খাবে সে নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

      আমাদের এই নাতিদীর্ঘ আলোচনা থেকে এইটুকু অতএব পরিষ্কার যে করোনা লকডাউন এর ফলে , আমাদের দেশে অন্তত,  মূল আঘাতটা আসবে শিল্পক্ষেত্রের একটি বিশেষ অংশের উপর। আর যেহেতু শিল্পক্ষেত্র থেকে আমাদের জাতীয় আয় এর এক-তৃতীয়াংশেরও কম আসে, যেহেতু শিল্পক্ষেত্রে নিযুক্তির পরিমানও মোট  নিযুক্তির মাত্র এক-চতুর্থাংশ সেহেতু  আঘাতটা সামলে নেবার সম্ভাবনা ভারতীয় অর্থনীতির পক্ষে অনেকটাই সহজ। অন্যদিকে, অন্যান্য শিল্পোন্নত দেশ , যাদের অর্থনীতির কোমরের জোরটা আসে শিল্পক্ষেত্র থেকে, তাদের পক্ষে আঘাত সামলানো একটু বেশি শক্ত হবে।

        আমাদের সমস্যাটা অন্য জায়গায়। সাধারণ শিল্পপণ্যের চাহিদা বাড়িয়ে এই শিল্পগুলিকে পুনরায় স্থিতিশীল করার জন্য দরকার সরকারি সাহায্যের। অসংগঠিত ক্ষেত্রের বেকার হয়ে যাওয়া মানুষগুলির হাতে সরাসরি টাকা তুলে দিতে হবে যাতে তারা আবার বাজারে ফিরে আসতে পারে। সেই বিপুল পরিমাণ পুঁজির জোর আমাদের আছে কি?  

   দ্বিতীয় আরেকটি সমস্যাও আছে। বন্টনের সমস্যা। গরিব মানুষের হাতে সরাসরি টাকা তুলে দেওয়ার একটা বিপদ‌ আছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই কাঁচা টাকার সদ্ব্যবহার করে না গরিবগুর্বো মানুষগুলি। একটা কাজ এক্ষেত্রে করা যেতে পারে। সরকার রেশন  দোকানগুলিকে ব্যবহার করতে পারে মানুষের হাতে ভর্তুকি মূল্যে খাদ্যদ্রব্য পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি নিত্যব্যবহার্য অ-খাদ্যদ্রব্যগুলিকেও পৌঁছে দেওয়ার কাজে। এতে আরেকটা কাজও হবে। শিল্পসংস্থাগুলি তাদের পণ্যের বরাত সরাসরি সরকারের কাছ থেকে পাওয়ায় অনেকটা নিশ্চিন্তে উৎপাদন করতে পারবে। আবার সরকার‌ও সরাসরি শিল্পসংস্থাগুলির কাছ থেকে অনেকটা কম দামে পণ্য সংগ্রহ করতে পারায় একই খরচ করে মানুষের হাতে অনেকটা বেশি জিনিস পৌঁছে দিতে পারবে। তবে এই পরিকল্পনাতেও বড়োসড়ো ফাঁক আছে। আমরা ধরে নিচ্ছি দেশে পর্যাপ্ত সংখ্যায় রেশন দোকান আছে এবং রেশন দোকানগুলি সততার সঙ্গে সরকারি প্রকল্পের রূপায়ন ঘটাবে। আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে এই দুই অনুমানের কোনওটিই সংগতিপূর্ণ  কি? 

 

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com