মাধবের আদর্শ-অন্তর

 

 

পথসভা শেষ। মাধবের কেমন হতাশ লাগছিল। লোকজন তেমন ভীড় করে শোনেনি। দোকান-বাজারের লোকজনের ক’জনই-বা শুনেছে বলা মুশকিল। মাধব বক্তা না। তবে বলা যায় তারই উদ্যোগে সভাটা হয়েছে। মাধবের এক বন্ধু মানবাধিকার-কর্মী, তাকে  ভয়ের বিরুদ্ধে কোনও কর্মসূচি নেওয়া যায় কি না ভাবতে বলেছিল। এবং তার ভাবনার কথাও জানিয়েছিল। মাধবের ভাবনা অনুযায়ী সভাটা হয়েছে। সাকুল্যে তারা দশ জন। এলাকার চার জন। বাইরে থেকে এসেছে ছ’ জন। বাইরের তিন জন ইতিমধ্যে চলে গেছে। আর তিন জন আজ এখানে থেকে যাবে। এলাকার দু’ জন ডেকরেটারসের ছেলেদের সহযোগিতা করছে। মাধব সহ আর পাঁচ জন বসে আছে যাত্রী-প্রতীক্ষালয়ের শেডের নীচে। এখানেই ছিল সভামঞ্চ। মাইক্রোফোনটা এখনো দাঁড়িয়ে আছে।

আশ্চর্য! কেউ কোনও কথা বলছে না! তার মানে এরাও কি মাধবের মতো হতাশ? এদের মধ্যে দু’ জন অবশ্য কথা বলেছে প্রচুর। এমন হতে পারে, অনেক কথা শোনা ও বলার পর যে যার মতো কথা ভাবছে। ভাবল মাধব। মন দিয়ে মাধব কথা শুনতে পারেনি, সে কথার প্রতিক্রিয়া দেখতে চেয়েছে আশেপাশে আলোছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা মুখগুলোতে। বুঝতে পারেনি বলেই  তার এই হতাশা।

মাধব কিছু বলতে যাচ্ছিল তখনি সে দেখল একটি মেয়ে শেডের চাতালে ঢুকে একেবারে তাদের কাছে এসে দাঁড়াল। বলল, ‘আমি পাপড়ি মণ্ডল, আপনাদের সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই!’ মাধবের মনে ‘বলুন’ কথাটা ফুটতে না ফুটতেই কেউ একজন বলে ফেলল, ‘বলুন!’ মেয়েটি বলল, ‘আপনাদের কথা আমার বাবা বাড়ি বসে সব শুনেছেন, তিনি আপনাদের সঙ্গে একটু কথা বলতে চান— দয়া করে যদি আমাদের বাড়িতে আসেন! বাজারের পেছনেই বাড়ি।’ মাধব অতি উৎসাহে বলে উঠল, ‘বাড়ি যেখানেই হোক, এটা দয়ার ব্যাপার নয়, আমরা নিশ্চয়ই যাব!’ তখন আর-একজন মধ্যবয়স্ক এসে সবার উদ্দেশে নমস্কার জানাল। প্রতি নমস্কার জানিয়ে মাধব বলল, ‘বলুন নির্মলদা!’

‘কথা শুনতে শুনতে একটু কৌতূহল হল, কোথাও একটু ভুল হচ্ছে বলেও মনে হল—তাই—’

‘ভুলটা বলুন আগে!’

‘ভুলটা হল— একজন বলছিল, যদি বিশ্বাস করি— মানুষ ঈশ্বরের সৃষ্টি তা হলে আমরা সকলেই ঈশ্বরের সন্তান... ভুলটা রয়েছে এই ধারণাতে — হিন্দুর ঈশ্বর নিজেকে খণ্ড খণ্ড করে আমাদের সৃষ্টি করেছেন, মুসলমানের ঈশ্বর নিজের সাদৃশ্যে মানুষ সৃষ্টি করেছেন... সবারই ঈশ্বর মঙ্গলময়! ভুলটা এখানে। আর কৌতূহল— কোন পার্টির হয়ে প্রচার করছ তোমরা? এক সময় তুমি তো মাধব কমিউনিস্ট ছিলে, আমাদের সঙ্গেই ছিলে!’ পাপড়ি দাঁড়িয়ে আছে। মাধব তাকে বসতে বলল। পাপড়ি বসলে পর বাইরে থেকে আসা একজন বক্তা বলল, ‘কোনো রাজনৈতিক দলের হয়ে আমরা আসিনি। কিছু মনে করবেন না কাকু, আপনি কি মানবাধিকার সম্বন্ধে কিছু জানেন?

দশই ডিসেম্বর— আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস, পালন করেছেন কখনও?’

‘না।’

‘আপনি যদি চান, এ বিষয়ে কথা হতে পারে।’

এবার মাধব বলে উঠল, ‘মনে আছে নির্মলদা, এক সময় আমরা গাইতাম, মে দিনের গান... আমাদের প্রতিটি দিন তো মে দিন? তেমনই প্রত্যেকটা দিনকে আমরা মানবাধিকার-দিন হিসাবে মনে রেখে প্রাত্যহিক কাজকর্ম করে থাকি!’

‘যেমন?’

‘যেমন ধরুন, কারও ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত না-করা। বা, এমন কথা না-বলা যাতে কারও সম্মানহানী হয়। আর একসাথে— এই যেমন, অ্যাওয়ারনেস ডেভেলপ করা! এটা অবশ্য যে কেউ ব্যক্তিগতভাবে করতে পারে।’

‘আচ্ছা, একদিন বসা যাবে, বলব তোমাকে!’

 

দুই

বাড়ির গলিপথে কয়েক পা গিয়ে পাপড়ি ‘এক মিনিট’ বলে থমকে দাঁড়াল। বলল, ‘দুটো ব্যাপার, আপনাদের জানিয়ে রাখি, এক, বাবা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।’

‘কারণ?’

‘এই যা নিয়ে আপনারা কথা বললেন। আর দুই হল, ধর্ম ও দেশ সম্বন্ধে উনি যদি কিছু বলেন, প্লিজ!মেনে নেবেন! আসুন!’ তার পর হাঁটতে হাঁটতে কথা বলে গেল, ‘বাবার ডেংগু হয়েছিল। খুব দুর্বল। মন দিয়ে আপনাদের কথা শুনছিলেন। এক সময় যেতে চাইলেন। উঠে দাঁড়ালেনও। বসে পড়লেন পরক্ষণেই। তার পর প্রায় বায়না ধরলেন, আপনাদের একজনকে অন্তত বাড়িতে নিয়ে আসার জন্য।’ উঠোনে পা রেখে বলল, ‘এটা আমাদের বাড়ি।’ ঘরে ওঠার সিঁড়িতে পা রেখে সে আহ্বানের মুদ্রা সহ বলল, ‘আসুন!’

পাপড়ির বাবা বসার ঘরে বসে ছিলেন। ঘরে ঢোকার মুখে পাপড়ি সোচ্ছ্বাসে বাবাকে বলল, ‘তুমি বলেছিলে একজন, দেখ পাঁচ জন এসেছেন!’ দু’হাত জোড় করে তিনি বললেন, ‘আসুন ভাই! বসুন!’

নমস্কার বিনিময় করে সকলে বসলে পর পাপড়ি আরও একটা আলো জ্বালিয়ে দিল।

কোনও মুখেই আর ছায়া নেই। পাপড়ির বাবা বললেন, ‘আপনাদের কথায় একটু ভরসা পেলাম! আবার কেমন যেন মিথ্যা আশ্বাস বলেও মনে হল। আর একটু যদি বলেন! খুব ভয়ে আছি।’ মাধবকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘আপনার মুখ চেনা মনে হচ্ছে!’ মাধব বলল, ‘আমি আপনি তো একই পঞ্চায়েত এলাকায় থাকি। আমার বাড়ি স্টেশনপাড়ার ওদিকে, আমার নাম মাধব।’

‘ওঃ হো!... আমি অরিন্দম মণ্ডল। প্রাইমারী স্কুলের মাস্টার ছিলাম। অবসরের বয়েস দু’ বছর হতে চলল।’

মাধব বলল, ‘আমার বাঁধাধরা কোনো জীবিকা নেই।’ তার পর অন্যদের নাম-কাজ জানিয়ে বলল, ‘মাস্টার মশাই, বলুন, আপনার ভয় কেন?’

পাপড়ি বাবার বাঁ পাশে বসে ছিল। সে বলল, ‘আমি বলি বাবা!’ অরিন্দম সায় দিলেন। পাপড়ি বলল, ‘একটা গল্প বলতে হবে। আমাদের মণ্ডল বংশের কোনও এক পুরুষ ইসলাম কবুল করেছিলেন। তার কোনো ইতিহাস আমাদের জানা নেই। আমার বাবা প্রথম লেখাপড়া জানা মানুষ। দেশভাগের সময় আমার ঠাকুরদার বাবা পুব পাকিস্তানে চলে যান। কিন্তু আমার ঠাকুরদা বাংলাদেশ হওয়ার পর আবার এ দেশে ফিরে আসেন। তাঁর আত্মীয়-কুটুমদের কাছে। এখানে কাজকর্মের সুযোগ ছিল বেশি। অথচ ভাষা আন্দোলনের পর বাঙালিজাতি-পরিচয়ে তিনি তাঁর ছেলের নাম রেখেছিলেন অরিন্দম।’

অরিন্দম বললেন, ‘বুঝলেন? ভয়টা হল ডাউটফুল ভোটার হওয়া! আমি অনুপ্রবেশ করিনি। আর একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য এ দেশে এসেছি। ফিরে এসেছি বলছি না। কিন্তু এটা আমার দেশ— তার কোনও কাগুজে প্রমাণ আমাদের নেই। এখনই শুনতে হচ্ছে— নাম ভাড়িয়ে পার পাবে না! ভয়টা হল, বুঝলেন তো! মুসলমান বলে খুন হয়ে যাওয়া! গুজরাট দাঙ্গার কথা মনে পড়ে— বীভৎস স্বপ্ন দেখি...’ তাঁর এক হাত যেন পক্ষপুট হয়ে পাপড়িকে আড়াল করতে চাইল, ‘ভীষণ অসহায় লাগে!’

সুজন নামের ছেলেটা বলল, ‘কাকু, আপনার কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে— সকলে মিলে ভাবলে নিশ্চয় একটা পথ বেরিয়ে আসবে! চিন্তা করবেন না!’ এই কথায় যেন তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিল অরিন্দমের মনে— তাঁর সমস্ত শরীর না ভঙ্গিতে আন্দোলিত হল। ‘বাবা তুমি শান্ত হও! আমি বলছি।’ বলে পাপড়ি সুজনদের উদ্দেশে বলল, ‘এই যে সকলে মিলে ভাবনার কথা— এ কথাই তো সকলে বলছে, সরকারি বিজ্ঞাপনে বলছে—বাবার  মতে, এটা বিরোধী রাজনীতির কথা— এর কোনো মানে নেই! বাবার যুক্তি, তা হলে অসমে বীভৎস সব কাণ্ড ঘটত না, ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি হত না! আর এই যে দিল্লিতে যা ঘটল!’ অরিন্দম ভীষণ বিরক্তি প্রকাশ করে বললেন, ‘কোথাও একটা আশাপ্রদ ঘটনা যদি ঘটত! ঘটছে কোথাও? বলুন!’

মাধব বলল, ‘না। বরং যা ঘটছে তাতে অত্যধিক ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।’  পাপড়ি বলল, ‘পরিবেশ না বলে আবহাওয়া বলা ভালো— ছড়িয়ে পড়েছে এই বাংলায়, এ পর্যন্ত কত জন যে নিজের জীবন শেষ করে দিলেন!’

‘সেপ্টেমবর পর্যন্ত হিসাব রেখেছিলাম, চোদ্দ জন।’ বলে অরিন্দম একটা খাতা বের করলেন, ‘দেখুন! দশজনই মুসলমান—’ খাতাটা মাধবের দিকে বাড়িয়ে ধরলেন। মাধব খাতাটা দেখে বলল, ‘আর মিলন মণ্ডল ও দুই মন্টু— সরকার, মণ্ডল— এঁরা যদি আপনার মতো হন, তা হলে মোট তের জন।’

পাপড়ি বলল, ‘এঁরা সকলেই সন্ত্রাসের বলি! মানে মুসলমান নিধন। এই ভয়টা যে কীভাবে ছড়িয়েছে— একটা ঘটনা বলি, আমার এক বন্ধুর বিয়ের কথাবার্তা চলছিল, মাঘ-ফাল্গুনের দিকে দিন ঠিক হবে, এ রকম কথা ছিল। হঠাৎ একদিন ছেলে পক্ষের ঘটক এসে জানতে চাইল, মেয়ে যে এদেশি, প্রমাণ করা যাবে তো? মেয়ের বাবা বলল, মেয়ের জন্ম তো এ দেশে! কাগজপত্রে মা-বাবা এদেশি কি না জানতে চাইলে কী বলা হবে? অপরাধীর মতো বাবা-মানুষটা মাথা নাড়ল। বিয়েটা ভেঙে গেল। বিয়েটা ভেঙে গেল মানে একটা মুসলমান মেয়ের মা হওয়ার সম্ভাবনাকে অন্তত কিছুদিনের জন্য রুখে দেওয়া গেল!’

প্রকাশ নামের ছেলেটা বলল, ‘এটা কি একটু কষ্টকল্পিত হয়ে গেল না?’

অরিন্দম বললেন, ‘আমরা ভাবছি— ভাবনাটা তো পরিপার্শ্ব থেকেই আসছে— নেলি হত্যাকাণ্ডের ছবি দেখেছন তো? বাচ্চাগুলোর ছবি মনে করুন! জন্মশাসনও তো এক ধরনের হত্যা! পাপড়ি যে ঘটনা বলল, এটা ওর নিজের জীবনেই ঘটেছে!’

পাপড়ি বলল, ‘আপনাদের কেউ একজন বলছিলেন, আজকের পৃথিবীতে কোনো মানুষ অনাগরিক হতে পারেন না। বরং প্রতিটি মানুষ আজ বিশ্বনাগরিক। এই কথাগুলো বাবার কাছে নতুন মনে হয়েছে। বাবা, তোমার কিছু জানার থাকলে বলো!’

‘তোমরা মানবাধিকারের কথা বলছিলে— এ বিষয়ে আমি জানতে চাই!’

মাধব বলল, ‘আমি আপনাকে কিছু বইপত্র দিয়ে যাব!’

 

তিন

পাপড়ি আর মাধব পাশাপাশি হাঁটছে— এটা স্বপ্ন। সেদিন বইপত্র দিয়ে ফেরার পথে মাধবের সঙ্গে পাপড়ি বাসরাস্তা পর্যন্ত এসেছিল— এটা বাস্তব। আর এই দুটি বিষয় মিলেমিশে এক ধরনের মনে হওয়া তৈরি করেছে। এটাকে বাস্তব বলা যায়। ভাবল মাধব। সেদিন পাপড়ির সঙ্গে পাশাপাশি টুকরো টুকরো কথায়  হাঁটাটা, একা হাঁটলেই মাধব টের পায়, পাপড়ি তার পাশে হাঁটছে, কথা বলছে, যেমন এখন, পাপড়ি বলল, ‘তা হলে কোন পরিচয়ে মানুষ বাঁচবে?’ আর সেদিন যা হয়নি, আজ তা হল— প্রথম  যৌবনের এক গানের কলির অংশ মাধবের মনে গুনগুনিয়ে উঠল ‘মানুষ তো মানুষের পরিচয়’ তার পরের কথাগুলো ঠিক ঠিক মনে করতে পারল না। কোনও এক লাইনে ছিল, ‘তাকে মুক্ত করতে কে আর আসবে’— এ রকমই ছিল কি? তার মানে গানটা ভেঙে গেছে। ভাবল মাধব। স্বাভাবিক। কিন্তু ‘মানুষ তো মানুষের পরিচয়’— এটাই           অখণ্ড! যেন একটা আবিষ্কার! আর সে সাবলীয় ভাবতে পারল, এই অখণ্ড চেতনাই মানুষকে ভয় থেকে মুক্ত করতে পারে। আর পাপড়িকে বলল, ‘মানুষ পরিচয়েই মানুষ বাঁচবে!’

কে একজন মাধবের পথ আটকালো। ঘোর কাটিয়ে মাধব দেখল, পরিচিত জন। বলল, ‘বলো সুধন্য! কী খবর?’

‘চলো! কোথাও বসি!’

এক চা-দোকানে গিয়ে তারা বসল। কোনো ভণিতা না করেই সুধন্য বলল, ‘তা হলে এ বয়সে তুমি মাওবাদী হলে?’

মাধব মৃদু মাথা নাড়িয়ে বলল, ‘ ইজম যদি বলো, হিউম্যানিজম— আমাদের ইস্তাহার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ— তা তোমার এ ধারণা হল কেন?’

‘সেদিন তোমাদের সভা শুনছিলাম— তোমরা তো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছ! এ তো মাওবাদ ছাড়া সম্ভব না!’

‘তুমি তা হলে মন দিয়ে শোননি। আমরা রাষ্ট্র ও সংবিধানের পক্ষে কথা বলেছি— আমাদের দেশের মানুষ বিশ্বক্রেতা, এই নিরিখে প্রতিটি মানুষ বিশ্বনাগরিক। এবং বিক্রেতাও বটে! এবং মানুষ নিজেও পণ্য!— এটাই আমরা বলতে চেয়েছি।’

চায়ে চুমুক দিয়ে সুধন্য বলল, ‘এন. আর. সি. ব্যাপারে তোমরা যা বললে, তা কি সরকার বিরোধী না?’

‘না। একটা দেশে নাগরিক পঞ্জি থাকবে— স্বাভাবিক। কিন্তু কাউকে অনাগরিক হিসাবে ট্রিট করা যাবে না। ‘মানবাধিকার সনদ’-অনুসারে প্রত্যেক মানুষকে তার ‘বেঁচে থাকার অধিকার’ দিতে হবে। এই সবই আমাদের কথা।’ পর পর কয়েকটা চুমুকে চা শেষ করে মাধব বলল, ‘আমরা চাইছি মানুষকে বিদ্বেষ-বঞ্চনা না করে, তাকে হত্যার আয়োজন না করে, এই সে দিন দিল্লিতে যা হল— তা না করে মানুষের বেঁচে থাকার পরিবেশ তৈরি করে দিক রাষ্ট্র! আমাদের সংবিধান-কিন্তু সেভাবেই রচিত হয়েছে!’

সুধন্য মাধবের মুখের দিকে কেমন মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সুধন্যদের কাছে সেই স্কুলবয়েস থেকেই মজার খোরাক হয়ে থাকা মাধব বলল, ‘বলো! কী ভাবছ?’

‘ভাবছি, তুমি কি এমন গুছিয়ে কথা বলতে কখনো!’

মাধব চুপ করে থাকল। কিন্তু তার স্মৃতিতে ফিরতে ইচ্ছে করল না। কেবল বলল,

‘কথাগুলো মন থেকে, বিশ্বাস থেকে বলছি বলে হয়তো গুছানো মনে হচ্ছে! যেমন আমি বিশ্বাস করি বিদ্বেষ-বঞ্চনা না করে বেঁচে থাকা যায়!’

‘এখন বলতে দ্বিধা নেই— তুমি তার উদাহরণও! একটা কথা জানতে ইচ্ছে করছে!’

‘বলো!’

‘এই অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে কত দিন?’

‘খাতা-কলমে আমার কোনো যোগ নেই। সুজন মিত্রকে তো তুমি চেনো! ও এই সমিতির সদস্য। ওকে আমি একটা ঘটনার প্রেক্ষিতে... আগে ঘটনাটা বলি, বুঝতে সুবিধে হবে— তুমিও জানো বোধহয়, ওই নাগরিক পঞ্জি নিয়ে সৌমিত্র দস্তিদারের এক সাক্ষাৎকার দেখেছিলাম, তার একটা ঘটনা ভীষণ ছবি হয়ে গেল আমার মাথার মধ্যে। একটা গল্প। ভয়ংকর গল্প। খালবিল থেকে ধরে আনা অল্প কিছু মাছ বিক্রি করছিল একটা মানুষ। পুলিশদের মনে হল লোকটা বিদেশি। তাকে তুলে নিয়ে গেল। থানায় জিজ্ঞাসাবাদের পর এক বস্তায় ভরে তাকে সীমান্তবেড়ার ওপাশে ফেলে দিল। ওদিকের সীমান্ত রক্ষীর নজরে পড়ায় তাকে ফের এদিকে চালান করে দিল বস্তাবন্দি!... সুধন্য আমি তোমাকে বুঝিয়ে বলতে পারব না আমার ভেতরের কষ্টের কথা— আমি সুজন মিত্রের কাছে যাই, তাকে বলি সমিতিগতভাবে কিছু করা যায় কি না, এদিকে এটা রুখতে হবে— আতঙ্কে মানুষ আত্মহত্যা করতে শুরু করছে... তারপর এই সেদিন— প্রথম পথসভা।’

‘আর কোনও প্রোগ্রামের কথা ভাবছ?’

‘হ্যাঁ,কয়েকদিনের মধ্যে আর-একটা পথসভা করব। তা ছাড়া আর-একটা কর্মসূচি নেওয়া হবে— একটা সমীক্ষা করা হবে, মুসলমানরা কীভাবে হিন্দুদের ‘বেঁচে থাকার অধিকার’ খর্ব করছে— প্রস্তাবটা-কিন্তু সমিতি দেয়নি, দিয়েছেন অরিন্দম মণ্ডল—সমিতি সিদ্ধান্ত দিয়েছে। যদি মনে করো, তুমিও প্রস্তাব দিতে পারো!’

‘ঠিক আছে, ভাববো! তুমি আমাকে দ্বিতীয় সভার কথা জানিও!’

 

চার

এবারকার সভা আরও পরিকল্পিতভাবে হতে চলেছে। একজন সাংবিধানিক অধিকারের কথা বলবেন। একজন বলবেন মানবাধিকারের কথা। অরিন্দম মণ্ডল বলবেন, পাপড়িও থাকবে। মাধবকেও বলতে হবে— পাপড়ির আবদার। সেই যে এক তৃতীয় বাস্তব মাধবের সম্মুখে এসে হাজির হয়, বক্তৃতা দেওয়ানোর ব্যাপারে সে ভীষণ ‘অ্যাক্টিভ’—মাধব যতই বলে, আমি গুছিয়ে কথা বলতে পারি না! ততই সে বলে, পারবে, পারবে!

কী বলব আমি?

তুমি অখণ্ড মানুষের কথা বলবে! বলবে বঞ্চনা না করার কথা! বঞ্চনা হত্যার চেয়েও বেশি! বলবে প্রতিবেশিকে নিজের মতো ভালবাসতে শেখার কথা!

এ সব তো পুরনো কথা!

তুমি নতুন করে বলবে!

ঠিক সময়ে আমার ঠিক কথাটি মনে পড়ে না যে!

আমি মনে করিয়ে দেব! আর মনে রেখ, তুমি নিজের জন্য কিছু বলছ না, তুমি অত্যধিক ভয়ের বিরুদ্ধে কথা বলছ, মানে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইতে নেমেছ!

তার মানে আমি এক মৌলবাদী!

মরমী মৌলবাদী!

তৃতীয় বাস্তব থেকে মাধব স্বপ্নবাস্তবে ঢুকে পড়ছে... দ্বিতীয় পথসভা... পাপড়ি তার নাম বক্তা হিসাবে ঘোষণায় রাখছে...

  

     

 

        

 

 

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com