লকডাউন না লুক ডাউন | সুমন সেনগুপ্ত | বোধ পত্রিকা

26.04.2020

 

 

 

 

লকডাউন সময়ে কলকাতার দক্ষিণে  এক ছোট ব্যবসায়ীর দুর্দশার কথা  উল্লেখ করছি। বছর ত্রিশের ছেলেটি অনেক সংগ্রাম করে একটি ছোট জুতোর দোকান দাঁড় করায়। দুই ভাইয়ের একজন দাদাকে ব্যবসায় সাহায্য করে। বাবা ও মা, দুই ভাই আর বউ-ছেলে নিয়ে সাত জনের পরিবার। দোকানের আয়ে সংসার মোটামুটি চলে যাচ্ছিল। লকডাউন আয়ের পথ বন্ধ করে দেয়। কিন্তু ছেলেটির মনের জোর অটুট ছিল।   ছেলেটির জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে। ৬৫ বছরের মা করোনায় আক্রান্ত হয়। সরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেলে, সেখানে জোটে অবহেলা। বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করে মাকে। ইতিমধ্যে ছেলেটি ও তার পরিবারকে প্রশাসন কোয়ারান্টাইনে পাঠায়। কোবিড টেস্টে  ছেলেটির বাবার করোনা ধরা পড়ে। অন্যদিকে ওর মা সুস্থ হয়ে ওঠেন। বেসরকারি হাসপাতাল থেকে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকার বিল ধরানো হয়। ধারদেনা করে বিল মেটায় সে। ভবিষ্যতের কথা ভেবে ছেলেটি এখন দিশেহারা। মাথায় পাঁচ লাখ টাকার দেনা। পাশাপাশি  রোজগার বন্ধ। এই ছেলেটির মতো অনেকেই এই সমস্যায় হাবুডুবু খাচ্ছেন। এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? 

 

 করোনা ভাইরাস মহামারীটি বিশ্ব-অর্থনীতিকে এমনভাবে আঘাত করেছে এর আগে আর কোনও ভাইরাস এই সঙ্কট করেনি। ১৯১৮র মহামারী — স্প্যানিশ ফ্লু বিশ্বকে আঘাত করেছিল যা আজকের তুলনায় অনেক কম সংহত ছিল। সবচেয়ে বড় বিষয় সরবরাহ-শৃঙ্খলাগুলি তখন গোটা বিশ্ব জুড়ে এভাবে বিস্তার লাভ করে নি।  তখন দূরপাল্লার ভ্রমণের ব্যাপকতা এই পর্যায়ে ছিল না যা ভাইরাসটি সর্বত্র পরিবহণ করতে পারে।  

 ২০০২ সালের মহামারী সার্স এর ব্যাপকতা গোটা বিশ্ব জুড়ে ছিল না।  করেনা ভাইরাসের প্রভাব আটকাতে দেশগুলি যখন তাদের সীমানা বন্ধ করে দেয় এবং সমস্ত অপ্রয়োজনীয় ব্যবসা বন্ধ করার আদেশ দেয় তখনই তৈরি হয় সঙ্কট, নেমে আসে অর্থনৈতিক বিপর্যয়। উৎপাদন ও বণ্টন বন্ধ হয়ে যায়। অনেকেই  প্রশ্ন করছেন, এই বিপর্যয় কি আটকানো যেত না? উন্নত দেশগুলির  পরিষেবা অনেকটাই অনলাইন কেন্দ্রীক। ফলে সেই সব দেশের স্বাভাবিক পরিষেবা বিশেষভাবে ব্যাহত হয়নি।  কিন্তু এখনও ভারতে স্বাভাবিক পরিষেবা অনলাইন নির্ভর নয়। ফলে বাজারে মানুষের ভীড়, লকডাউনকে উপেক্ষা করেই।

 চুল কাটা, ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়া বা রেস্তোঁরায়   রাতের খাবার  খাওয়া আপের মাধ্যমে করা যায় না।

 এখন প্রশ্ন,  অতীতের অভিজ্ঞতাগুলি থেকে কোনও গাইডলাইন তৈরি করা যায় কি? সর্বশেষ বড় মহামারীটি ছিল 1918 সালের স্প্যানিশ ফ্লু যা গোটা বিশ্বের অর্থনীতিকে এভাবে বিপর্যস্ত করেনি। 

ফলে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে পথ পাওয়া অসম্ভব।

বর্তমানে গোটা বিশ্ব জুড়ে যে অর্থনৈতিক শৃঙ্খল তৈরি হয়েছে, এই উদারনীতিটির ওপর কি আঘাত আসবে? কেননা ইতিমধ্যে ভারত চিনের হাত থেকে দেশীয় ব্যবসা বাঁচাতে নতুন আইন এনেছে। ভারত

 ইতিমধ্যে ক্রমবর্ধমান জাতীয়তাবাদ ও মন্দার কবলে পড়া দেশ, এখন একটি মহামারীর সম্মুখীন। লকডাউন গোদের ওপর বিষফোড়া।  এই সংকট থেকে পরিত্রাণের উপায় নিয়ে পণ্ডিতরা নানা মত দিচ্ছেন।  তবে সকলেই একটি বিষয়ের ওপর জোর দিচ্ছেন, গরিবদের হাতে টাকা দিতে হবে। সকলেই পরিত্রাণের উপায় খুঁজচ্ছেন! 

এই ক্রান্তিকালে, প্রতিটি দেশ অভ্যন্তরীণ দিকে তাকিয়ে আছে, নিজেকে রক্ষা করার জন্য।  সম্পদ, অঞ্চল, সংস্থান এবং এর সীমানা পুনর্নির্মাণ ও

 পুনরুদ্ধার করে সুরক্ষা, আর ব্যবহারের জন্য দেশীয় জ্ঞানের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি করা। উদার বিশ্বের জানালাকে সাময়িক বন্ধ করা। ভারতের প্রধানমন্ত্রীও অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীল হওয়ার কথা বলছেন।

মহামারী আক্রান্ত সমাজে দুটি দিক রয়েছে। একটি অর্থনৈতিক, আর একটি সামাজিক। শারিরীক দূরত্ব বিধি, মানুষকে আরও বেশি একা করে দেবে। মানুষ আরও বেশি করে স্বার্থপর হয়ে উঠবে। এখানে একটি কথা না বললেই নয়। ভারতে অনেকের মধ্যে চিনের প্রতি বিদ্বেষ তৈরি হয়েছে। চীনে করোনার ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটে,২০১৯ এর ডিসেম্বরে। পশ্চিমে আলোকিত লোকেরা তখন চিনের খাদ্যাভাসের দিকে আঙ্গুল তুলেছেন। চিনের গণতন্ত্র ও সিস্টেমের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আজকের এই বিপর্যয়ের জন্য চিনই দায়ী।  ঠিক একই ভাবে, মহামারী এতটাই প্রবল যে সামাজিক পদ্ধতিতে কোনও অপ্রিয় প্রশ্নের  অনুমতি দেয় না।

একটি রোগ-আক্রান্ত সমাজ পরিচালনার জন্য মোতায়েন পুলিশ ও আইন।  পূর্বের একটা  ঘটনার কথা স্মরণ করাই যায়। ব্রিটিশ প্লেগ কমিশনার ওয়াল্টার চার্লস রান্ড, যিনি ভারতে প্লেগ রুখতে সেনা নামিয়ে সাধারণ নাগরিকদের জীবন  তছনছ করেছেন, হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেনপুনেতে ১৯৯৭ সালে।

মানুষের ব্যাপক অভিযোগ ও ক্ষোভ যখন বিশেষ প্লেগ কমিটির কমিশনার ওপর, তখন সেনাবাহিনীকে নামিয়ে প্রতিরোধ করার চেষ্টা হয়েছে। জারি হয়েছে জরুরি অবস্থা।  কমিটির পদক্ষেপগুলির মধ্যে ছিল ব্যক্তিগতভাবে জোর করে আইন মানানো, মানুষদের

পৃথকীকরণ শিবিরে সরিয়ে নেওয়া, ব্যক্তিগত সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও ধ্বংস, চলাচল প্রতিরোধ করা। ফলে

মুম্বই, দিল্লি এবং কলকাতা থেকে আতঙ্কে লোকেরা বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে। এর কারণ, পৃথকীকরণ এবং বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে। এটি ছিল, সম্ভবত, ভাগ করে নেওয়ার ভয় হাসপাতালে আলাদা জাতের সঙ্গে। এর সঙ্গে রয়েছে পুরুষ চিকিৎসক বিশেষত বাড়ির বাইরে মহিলাদের পরীক্ষা করছেন। বর্তমানে সামাজিক এই অবস্থানের কিছুটা বদল ঘটেছে। কিন্তু অর্থনৈতিক দূরত্ব অনেকটাই বেড়েছে। 

বর্তমানে সামাজিক অভিঘাত অনেক গভীরে। লকডাউনে মহানগরের মানুষ যখন ব্যস্ত খাবার মজুতে। তখন দেখা গেল দেশের নানা শহরের বাস স্ট্যান্ডে জমায়েত হয়েছে অনেক অনেক মানুষ। ওদের পোশাকি নাম পরিযায়ী শ্রমিক। শুধু বাসস্ট্যান্ডেই নয়, ন্যাশনাল হাইওয়েতে দেখা গেল হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিকের মাথায় লোটাকম্বল নিয়ে যাত্রা। এই দৃশ্য দেশভাগের অসহনীয় যন্ত্রণার কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু  এই মানুষগুলোর সঙ্কটের যেন একটা অন্য মাত্রা আছে। 

এই পরিযায়ী শ্রমিকদের  এক বিরাট অংশ গ্রামের অর্থনীতিকে পুষ্ট করে। ভারতীয়  অর্থনীতিতে এদের ভূমিকা রয়েছে। এদের আমরা ভুলে যাই।

পরিযায়ী শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত আমাদের চোখের সামনে কাজ করেন। আমরা তাঁদের দেখেও দেখি না। আচমকাই তাঁরা আমাদের সামনে চলে আসেন। আমরা ডিজিটাল মাধ্যমে ওদের জন্য দুফোঁটা চোখের জল ফেলে, পিএফ থেকে কত টাকা তোলা যায় তার হিসেব করতে বসি।

 

 

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com