শুধু ত্রাণের নয়, এ পরিত্রাণেরও টাকা

 

অনিন্দ্য ভুক্ত

অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, নেতাজি মহাবিদ্যালয়, আরামবাগ

 

 সোমনাথ হাজরা  

গবেষক, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়

 

রাস্তাটা প্রথম বাতলেছিলেন জনৈক ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ, সারা পৃথিবী জুড়ে অর্থনীতির প্রাথমিক পড়ুয়ারাও যাঁকে চেনে জন মেইনার্ড কেইনস নামে। সেটা 1930এর দশকের একেবারে গোড়ার দিক। সারা পৃথিবী জুড়েই শুরু হয়েছে মন্দা। মন্দার বহর আর তার প্রকোপ  দেখে সবাই যাকে মহামন্দা বলে চিহ্নিত করতে শুরু করেছেন, চিন্তা করতে শুরু করেছেন পরিত্রাণের উপায় নিয়ে, সেই উপায় বাতলাতে গিয়েই রাস্তাটার কথা বলেন কেইনস। কেইনস বলেছিলেন, এই মন্দার হাত থেকে রক্ষা পাবার একমাত্র উপায় সরকারের হাত খুলে খরচ করা। গেল গেল রব উঠেছিল কেইনসের প্রেসক্রিপশন শুনে। কিন্তু শেষপর্যন্ত রোগ সেরেছিল সেই ওষুধেই।

       প্রায় নয় দশক পরে আবার সেই একই রোগ। এক মহামারির ধাক্কায় মহামন্দার সম্ভাবনা। প্রেসক্রিপশন সেই এক‌ই। ওষুধ যে এছাড়া আর কিছু নেই, সারা বিশ্ব জুড়েই অর্থনীতিবিদরা  এই ব্যাপারে মোটামুটি    একমত। আর এই ঐক্যমত্যের কারণেই কাজ‌ও শুরু হয়ে গেছে চটপট, কোন‌ওরকম বিতর্ক ছাড়াই।

       কিন্তু তাই বলে প্রশ্ন পিছু ছাড়তে পিছপা হয়নি। প্রশ্ন একটিই, এর জন্য যে বিপুল পরিমাণ টাকার প্রয়োজন আমাদের দেশে সেই টাকা আসবে কোত্থেকে? এমনিতেই তো বাজেটে ঘাটতি লেগেই আছে। তবে কি লাগে টাকা দেবে  গৌরী সেন? প্রশ্নটি আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে সদ্য নোবেলজয়ী  অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়-এর একটি মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে। শ্রী বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, যত টাকা লাগে ততই বের করতে হবে, প্রয়োজনে নোট ছাপাতে হবে। অর্থাৎ মোদ্দা কথা, টাকার যোগান নিয়ে মাথাব্যথা করার প্রয়োজন নেই, লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন। 

        এই প্রেসক্রিপশনে সাধারণ মানুষের কোন‌ও সমস্যা নেই। কিন্তু মাথাব্যাথা শুরু হয়ে গেছে অর্থনীতিবিদদের। হয়ে গেছে কারণ, অর্থনীতির তত্ত্বে বলে, ঘাটতি পূরণের জন্য বেশি করে নোট ছাপালে অর্থনীতিতে দামস্ফীতির উদ্ভব হয়। কি হতে পারে আর কি পারে না, বোঝার জন্য সামান্য অর্থনীতি জানা দরকার। একটু সহজ করে বলা যাক। আমাদের দেশে নোট ছাপানোর অধিকার আছে রিজার্ভ ব্যাংকের হাতে। কিন্তু যখন ইচ্ছে, যত ইচ্ছে তত নোট কি ছাপতে পারে রিজার্ভ  ব্যাংক? উত্তরটা ইতিবাচক। পারে, হাতে শুধু থাকতে হবে 200 কোটি টাকার একটি তহবিল। কি তহবিল, কেন তহবিল, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। এটা অর্থনীতির ক্লাস নয়। তবে এটা শুধু জেনে রাখা দরকার যে, যখন ইচ্ছে, যত ইচ্ছে টাকা ছাপানোর সুযোগ থাকলেও অর্থনীতির তত্ত্ব মেনে সাধারণত সেটা করা হয় না। করা যেটা হয় সেটা হল, অর্থনীতির উৎপাদন ক্ষেত্রটি যত বিকশিত হয়, পাল্লা দিয়ে ততই বাড়ানো হয় টাকার যোগান। না বাড়ালে যেটা হবে সেটা হল, চাহিদার তুলনায় যোগান বেড়ে যাওয়ার ফলে জিনিসপত্রের দাম- টাম যাবে কমে, আর তার জেরে পরবর্তী সময়ে উৎপাদনে আবার ভাটার টান দেখা দেবে।তার ফলে অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ হারানো, চাহিদা হ্রাস, সেসব এসে পুরো ব্যাপারটিকেই আরো জটিল করে দিয়ে যাবে। অন্যদিকে একইভাবে আবার  কোনো কারনে উৎপাদন কমে গেলে টাকার যোগান‌ও কমিয়ে আনা হয়। 

     গোলমালটা এইবার ঠিক এইখানেই। লকডাউনের ফলে কাজকর্ম বন্ধ, উৎপাদন বন্ধ, আয় বন্ধ, অতএব চাহিদা তৈরি হবে কোথা থেকে?  এই অবস্থায় টাকা ছাপাতে গেলে অর্থনীতিতে অবাঞ্ছিত দামস্ফীতি ঘটে গিয়ে অন্য কেলেঙ্কারি হয়ে যেতে পারে বলে শোরগোল তুলেছেন একদল মানুষ।

      প্রশ্ন হল, ঘটতে কি পারে, এই ঘটনা? আমাদের ধারণা, সম্ভাবনা  কম। একটু ব্যাখ্যা করা যাক। বাড়তি নোট ছাপলে দামস্ফীতি ঘটে যাবার সম্ভাবনাটি থাকে দুটি কারণে। এক মানুষের হাতে হঠাৎ করে টাকা এসে গেছে,  চাহিদা বেড়েছে, কিন্তু যোগান বাড়ানো সম্ভব হয়নি। ফলে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ার‌ই কথা। দুই, টাকার যোগান বেড়ে গেলে  তা যে সবসময়  বেশি বেশি করে ঠিক যাদের প্রয়োজন তাদের হাতেই গিয়ে পৌঁছোবে,  তেমনটি নাও হতে পারে। ফলে যাদের প্রয়োজন নেই কিন্তু হাতে টাকা আছে, তাদের মধ্যে বাজারে দরদাম করে কেনার প্রবণতা কমবে, যার প্রভাব গিয়ে পড়বে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির উপর।

      এগুলো মোটামুটিভাবে তত্ত্বকথা। কিন্তু এমনটি এবারে ঘটার সম্ভাবনা কম। প্রথম কথা, উৎপাদন বন্ধ থাকার ধাক্কাটা সবচেয়ে বেশি গিয়ে পড়েছে শিল্পক্ষেত্রে। চা চাষ বা কিছুটা ধান চাষ, মানে এই ধরনের কৃষিপণ্য, যেগুলির সঙ্গে কোনো না কোনো পর্যায়ে শিল্পের একটা যোগ আছে,  সেগুলি ছাড়া কৃষিক্ষেত্রে আঘাতটা কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম । অন্যদিকে কাজের অভাবে অসংগঠিত ক্ষেত্রে আয় কমেছে কিন্তু সাংঘাতিকভাবে,  ফলে কমেছে চাহিদা। এই অবস্থায় সরকার যদি অনুদান দিতে শুরু করে, তাহলে সেই চুপসে যাওয়া চাহিদাটা আগে বাড়বে। সেটা আগে যাবে কৃষিক্ষেত্রে, কারণ সবার আগে জরুরী খিদে মেটানো। কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদন এখন‌ও ততটা আহত হয়নি।  সেটা যাতে না হয়, সরকার সে চেষ্টাও করছেন। এমনিতে  গ্রামগুলিতে সংক্রমনের সম্ভাবনা কম, যদি না সেখানে বাড়ি ফিরে আসা পরিযায়ী শ্রমিকের ভিড়টা বাড়ে। সেদিকে নজরটা একটু বিশেষভাবে দেওয়াটা বরং দরকারি।

    টাকার যোগান বাড়ায় দামস্ফীতি ঘটে যাওয়ার  দ্বিতীয় যে কারণটি, সেটি এক্ষেত্রে ঘটার সম্ভাবনা কম। টাকা ছাপা হলে সেই টাকা যেহেতু কেবলমাত্র একটি নির্দিষ্ট সামাজিক গোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা, সেহেতু লোকে হাতে টাকা এলে ফূর্তিতে দেদার কেনাকাটা করবে, সেটা ঘটবে না।

       অর্থাৎ সব মিলিয়ে আমাদের যেটা বক্তব্য, তা হল নোট ছাপিয়েই হোক বা অন্য কোন‌ও ভাবে, অত্যধিক দাম-টাম বেড়ে যাওয়ার যে আশঙ্কাটা  করা হচ্ছে, সেটা ঠিক নয়। এখন বরং কাজটা জোর কদমে শুরু করে দেওয়ার দরকার, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। যদি তা না হয়, দুর্দিন বোধহয় তাহলেই অবশ্যম্ভাবী। খিদের জ্বালায় মানুষ কি করতে পারে তার পরিচয় পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে দিল্লি এবং মুম্বই- এর দুটি ঘটনা থেকে প্রমাণ হয়ে গেছে। পেটে খাবার না জুটলে, আগামী দিনে যে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে সেটা সামাল দেওয়া করোনাকে সামাল দেওয়ার চেয়ে অনেক বেশি সমস্যাদীর্ণ হতে পারে। মানুষ 'আপনি বাঁচলে বাপের নাম' নীতি নিয়ে ছুটতে শুরু করলে এইসব সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং-এর মতো সামাজিক ভাবনা পালাবার পথ পাবে তো? 

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com