রাজনীতিতে ধর্মের কোনও জায়গা থাকবে না:প্রতুল মুখোপাধ্যায়

12.06.2017

 

 

 গায়ক শ্রী প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের সাথে আলোচনা করলেন

সাংবাদিক শ্রী সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

 

 

প্রতুল      ঃ           সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে সব কথা বলতে গেলে তো একটু মুশকিল হয়ে যায়! বাম মনের মধ্যেও কিন্তু ভালো রকমের সাম্প্রদায়িকতা আছে৷ আর দুনম্বর হল--- একটা কনসোলিউট সাম্প্রদায়িকতা আমাদের মধ্যে দেখা যায়৷ এই যে মুসলিম মৌলবাদ... তসলিমাকে তাড়ানোর সময়েও তো আমরা তার বিরুদ্ধে লড়েছি৷ এটা তো আমরা বলতে চাই না!  ভোটব্যাঙ্কের জন্য বলে না৷ এই যে মুসলিম মৌলবাদ আর হিন্দু মৌলবাদ--- দুটোই যে আমাদের সমান শত্রু, এটা কিন্তু একটা বলার জায়গা৷ এটা যদি আমরা না বলি...

 

সঞ্জয়      ঃ           এটা কিন্তু আমি আমার লেখায় দিয়েছি৷ আমার সম্পাদকীয়তে দিয়েছি, যে মুসলমানরা বিচ্ছিন্নতার দাবী তুললে যদি অপরাধ হয়, তাহলে কোন যুক্তিতে কোন বা বিশ্বাসে হিন্দু মৌলবাদকে আমরা সমর্থন করতে পারি?

 

প্রতুল      ঃ           হ্যাঁ৷ আর এই যে বাংলাদেশে যে রকম র্যাডিকাল নিধন হচ্ছে, সেটা তো একইরকম নিন্দনীয়৷ তাই না! মানে ইনটলারেন্সের চূড়ান্ত ওখানেও হচ্ছে--- দুজাগাতেই হচ্ছে৷ আরে আই এ এস তো আর কোনো ধর্ম নয়! ওটা তো একটা সম্পূর্ণ অন্যরকমের চিন্তা৷ একটা অ্যাগ্রেসিভ চিন্তাধারা... একটা আগ্রাসী ভাবনা কাজ করছে৷ এরমধ্যে ধর্মটর্ম তো জিগির মাত্র৷ এই জায়গাটা কিন্তু খুব খারাপ৷ সোজা কথা হল, আমাদের খুব সংস্কারমুক্ত মন নিয়ে কথা বলতে হবে, লড়তে হবে৷ আর যারা শাসকদল...তাদেরও কনভিন্স করতে হবে৷ সমস্ত মানুষকে নিয়ে লড়তে হবে৷ সমস্ত মানুষ বলতে আমাদের বায়াসড হলে চলবে না৷ মুসলমানদের কোন দোষ দেখব না... এরকম নয়৷ সব রকমের সংস্কার থেকেই নিজেদের মুক্ত করতে হবে৷

 

সঞ্জয়     ঃ           যে রাজনীতি বর্তমানে সমাজে চলছে, অর্থাৎ ভোটের রাজনীতি... তা কি আমাদের সংস্কারমুক্ত মন গড়ে তুলতে সাহায্য করবে?

প্রতুল      ঃ           সে জন্যই যারা হলেন গণতন্ত্রের প্রকৃতবন্ধু, তাদেরকে এই কথাটাই বারেবারে বলতে হবে৷  একথা তাদের বোঝাতে হবে যে ভোট ব্যাঙ্কের উপর ভিত্তি করে গণতন্ত্র হয় না৷

 

সঞ্জয়      ঃ           গণতন্ত্র আর ভোটব্যাঙ্ক তো এক নয়৷

প্রতুল      ঃ           এখন সেটাতো প্রায় একই হয়ে গেছে৷ দেখাইতো গেল কিরকম দুটো তিনটে সেশন হয়ে যেতেই আদিত্যনাথকে চার্টার্ড প্লেনে দিল্লি নিয়ে যাওয়া হল৷ অমিত শা কেমন করে এই মুসলিম বিদ্বেষ... কবরীস্তান...রাম...কাশীতে বিরাট পূজা... এগুলো শুরু করল৷ আর তিন তালাক...তিনতালাক অস্ত্র প্রয়োগ করে মুসলিম মেয়েদের কাছে নিয়ে এল৷  খুব ধূর্ত ৷ ধূর্ততার একেবারে চূড়ামণি৷ এবং আমাদের কিন্তু কিছুই নেই৷

 

সঞ্জয়      ঃ           যারা আমরা ধর্ম নিরপেক্ষতা চাইছি--- এই বাংলায় যে আপনি বলেন, ওরা কিন্তু আস্তে আস্তে এখানে ঢুকে পড়ছে৷ এই যে মন্দিরগুলোর সংস্কার করছে--- প্রতিরোধ করব কি করে?

প্রতুল      ঃ           আমাদের মধ্যে তো ধর্মনিরপেক্ষ লোক কমই আছে! এখানে যখন দাঙ্গা হচ্ছে, তখন এক সক্রিয় সিপিএম কর্মী জিজ্ঞেস করছেন--- ‘‘ওদের কটা মরল? আমাদের কটা মরল?’’ এই ‘ওদের কটা-আমাদের কটা’ ব্যাপারগুলো মানুষের একেবারে মজ্জায় মজ্জায় ঢুকে আছে৷ এই যে মাদ্রাসা টাদ্রাসা বিভিন্ন জায়গায় মৌলবীরা যে সমস্ত বত্তৃণতা দেন, তার মধ্যেও নানা রকম উস্কানীমূলক মন্তব্য থাকে৷ এবং সেগুলো বিজেপিদেরই সুবিধে করে৷ এইরকম নানারকম বিশ্রী ব্যাপার রয়েছে এখানে৷ এটা যে একেবারেই সেকিউলার নয়৷ শুধু তাই নয়, এই যে বিভিন্ন হাউজিং কমপ্লেক্স হচ্ছে--- সেখানে শুধু যে হিন্দুরাই থাকবে, তা নয়৷ কোনো রকম বাঙালী যে ঢুকবেনা, এটা ওরা মোটামুটি চুক্তিপত্রে লিখিয়ে নিয়েছে৷

 

সঞ্জয়      ঃ           সে কী!

প্রতুল      ঃ           বাঙালী মানে কোন ননভেজিটেরিয়ান নট অ্যালাউড৷

 

সঞ্জয়      ঃ           কোথায় হচ্ছে এটা?

প্রতুল      ঃ           বিভিন্ন মারোয়াড়ীরা যেসব হাউজিং কমপ্লেক্স করছে৷

 

সঞ্জয়      ঃ           রাজার হাটে?

প্রতুল      ঃ           শুধু রাজার হাটে কেন? এই আমাদের কাঁকুড়গাছিতেও৷ জিজ্ঞেস করছে লোকে--- ওখানে আপনারা মাছ খেতে পারেন? ওটা তো রাজস্থানী কমপ্লেক্স৷ ওখানে কোন বাঙালীকেই ঢুকতে দিচ্ছে না... মুসলমান তো নয়ই৷ পার্কসার্কাস ছাড়া মুসলমানের কোন জায়গা নেই এখনো৷ এই যে হোসেনুর রহমান, যাকে ওরা হিন্দু বলে গালাগাল করে... যিনি বিবেকানন্দের কথা উদ্ধৃতি দেন... তিনিও তথাকথিত কোন হিন্দু পাড়ায় জায়গা পাননি৷ তিনি রাজাবাজার বা পার্কসার্কাস ছেড়ে কিন্তু যেতে পারেননি৷ এখানে বিজয় বর্গীরা আসবে না তো কারা আসবে? আমরা কী দেখাতে পেরেছি যে আমরা সেকিউলার? না৷ এসব কথা বললে তো কেউ শোনে না৷ বলে---একটা গান হোক৷ আমার কথা তো কেউ শোনে না৷ আমাকে তো গানের জন্য নিয়ে যায়৷

 

সঞ্জয়      ঃ           ঠিকই বলেছেন৷ স্বাধীনতার পর দীর্ঘ পঞ্চাশ ষাট বছর ধরে আমরা যে মেকি সেকিউলারিজমকে বড় করেছি, সেটাকে ব্যবহার করেই এই মেরুকরণ করাটা সম্ভব হচেছ৷

প্রতুল      ঃ           হচ্ছেইতো৷ সেটাকেই তো বিজেপি ব্যবহার করে৷ আমরা তো ওদের হাতে এটা করার অস্ত্র তুলে দিয়েছি৷

 

সঞ্জয়      ঃ           আজকে যদি কংগ্রেস এই মেকি সেকিউলারিজমটা না করত... কংগ্রেসের বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ আছে যে ওরা অসাম্প্রদায়িক হওয়ার নামে ঘুরিয়ে সাম্প্রদায়িক বিভাজনকেই মদত দিয়েছে৷

প্রতুল      ঃ           আমাদের সেকিউলারিজম মানে তো সমস্ত ধর্মের সমান আদর৷ কিন্তু আসল সেকিউলারিজম হচ্ছে রাজনীতিতে ধর্মের কোন জায়গাই থাকবে না সেটা সুনিশ্চিত করা৷

 

সঞ্জয়      ঃ           একদম ঠিক৷

প্রতুল      ঃ           ধর্ম হচ্ছে পারিবারিক ব্যাপার৷ বাইরে কোন ধর্মের জায়গাই থাকবে না৷ কিন্তু এটা কখনই হয় না৷ এটা করলে তো ভোটব্যাঙ্ক হবে না৷

 

সঞ্জয়      ঃ           এটাই তো করবেই না৷

প্রতুল      ঃ           এটা তো করবেই না৷ এই যে আমি গান গাই--- ‘কি আমাদের জাত আর ধর্মই বা কি? মাটি ছেনে যখন ইটের পাঁজা বানাচ্ছি’--- এটাতে বলা হচ্ছে না৷ বলা হচ্ছে ‘সাদাও ভালো, কালোও ভালো... তুমিও ভালো আমিও ভালো.... কিন্তু সবার চাইতে ভালো পাঁউরুটি আর ঝোলাগুড়’৷ এইসবই তো হচ্ছে এখানে৷

 

সঞ্জয়      ঃ           এখন তো মানুষ ধর্মের থেকে বেশি বোঝে পকেট৷ যা কিছু  হোক সমাজে, কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই৷ মুনাফা হলেই হল৷ এই মুনাফার জন্য সমাজ সংসৃকতি সবকিছু বিসর্জন দিচ্ছে৷ তারা চোখ বুজে থাকতেই ভালোবাসে৷

প্রতুল      ঃ           ধর্মের সাথে রাজনীতির কোনো সম্পর্কই থাকবে না৷ শুধু হিন্দু মুসলমান কেন? বৌদ্ধ, শিখ, জৈন ইত্যাদি সবাইকে নিয়ে করো৷ শেষের দিকে যেটা মাও সে তুং করে ছিলেন৷ সবাই কনফুসিয়াস পড়ো... পড়ে তাকে সমালোচনা করো৷ সবাই বেদ পড়ো, গীতা পড়ো, রামায়ণ পড়ো, কোরাণ পড়ো... এবং সমালোচনা কর৷ যেগুলো ভালো সেগুলো নাও, যেগুলো নয়... সেগুলো বর্জন কর৷ এভাবে তো আমরা পড়ি না৷ গীতাকে বাদ দিয়ে আমরা পড়ি ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু’৷ সব ধর্মেই তো ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু’৷ তা হচ্ছে কোথায়? এখানে র্যাডিকালদের কোন জায়গা নেই৷ র্যাডিক্যালদের সবাই খুন করছে৷ হিন্দুরা একরকম করে খুন করছে, মুসলমানরা আরেকরকম করে খুন করছে৷

 

সঞ্জয়      ঃ           আমাদের কিন্তু ঘুরে দাঁড়াতেই হবে৷ এভাবে চলতে পারে না৷

প্রতুল      ঃ           ঘুরে কিভাবে দাঁড়াবেন জানি না৷ আপনারা কিছু করলে নিশ্চয় যাব৷ অনুষ্ঠান করলে নিশ্চয় যাব৷

 

সঞ্জয়      ঃ           বাংলাতে এই জিনিসটা খুব গোপনে ছড়াচ্ছে৷

প্রতুল      ঃ          হ্যাঁ৷ খুব ভালোই ছড়াচ্ছে৷ মানে অনেকের সম্মতিও আছে৷

 

সঞ্জয়      ঃ           আসলে রাজনৈতিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়--- বাম শক্তি যেখানে পর্যুদস্ত হয়... বামচর্চা বন্ধ হওয়া মানেই ফ্যাসিজমের একটা উত্থান হওয়া৷ আর সেই ফ্যাসিজম যখন উঠে আসে, ভারতের মতো দেশে তখন সেটা ধর্মকে আশ্রয় করেই উঠে আসবে, এটাই স্বাভাবিক৷ ইওরোপ হলে সেটা জাত্যাভিমানকে কেন্দ্র করে উঠে আসবে৷ সোশাল রেভলিউশনের প্রসেস অনুযায়ী এখানে মাঝখানে তৃণমূল এসেছে৷ কিন্তু সমাজ বিবর্তনের দিক থেকে চিন্তা করলে ভবিষ্যতে পিওর ফ্যাসিজিমের উঠে আসাটাকেই ইণ্ডিকেট করছে৷

প্রতুল      ঃ           এরা তো হিটলারকে গুরু মানে৷ এরা ‘মেইন ক্যাম্ফ’ পড়ে... একেবারে ধর্মগ্রন্থের মতোই৷ ভবিষ্যতে এই বাংলাতেও আশঙ্কা বাড়ছে৷

 

 

 

Share on Facebook
Share on Twitter
Please reload

জনপ্রিয় পোস্ট

I'm busy working on my blog posts. Watch this space!

Please reload

সাম্প্রতিক পোস্ট
Please reload

A N  O N L I N E  M A G A Z I N E 

Copyright © 2016-2019 Bodh. All rights reserved.

For reprint rights contact: bodhmag@gmail.com

Designed, Developed & Maintained by: Debayan Mukherjee

Contact: +91 98046 04998  |  Mail: questforcreation@gmail.com